ক্ষমতায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ চায় বিএনপি : সংস্কারে আপসহীন জামায়াত : আ’লীগের রাজনীতিতে ফেরার বেপরোয়া চেষ্টা

রাজনীতিতে ত্রিমুখী লড়াই


১৮ জুন ২০২৬ ১০:০৪

॥ ফারাহ মাসুম ॥
২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব ও অত্যন্ত জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দেশের রাজনৈতিক চালচিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ক্ষমতার প্রধান ভরকেন্দ্র, রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল এবং তাদের মধ্যকার টানাপড়েন এক নতুন মোড় নিয়েছে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপির সরকার গঠনে শুরু হয়েছে নতুন অধ্যায়। এই নতুন অধ্যায়ের গতিপথ কোন দিকে এগোবে- এ নিয়ে রয়েছে নানা কৌতূহল। মনে হচ্ছে ক্ষমতায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চাইছে বিএনপি। আর জামায়াত সংস্কারের প্রশ্নে থাকবে আপসহীন। দলটি গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বাইরে সংবিধান সংশোধনের শর্টকাট কোনো পথে আপস করতে চাইছে না। আর বিএনপি সরকারের শাসনজনিত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফেরার বেপরোয়া চেষ্টা চালাতে শুরু করেছে।
বিএনপির বর্তমান অবস্থান ও কৌশল
দীর্ঘদিন মাঠের বিরোধীদলে থাকা বিএনপি সরকার গঠনের পর বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজেদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছে। দলটির মূল লক্ষ্য হলো যত দ্রুত সম্ভব ক্ষমতাকে সংহত করে ক্ষমতার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করা। আর এর মধ্যে আসা যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ প্রতিহত করা। তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার প্রস্তাবগুলোকে দৃশ্যত সমর্থন করলেও এর বাস্তবায়ন তাদের মতো করে করতে চায়। স্থানীয় সরকার নির্বাচন তারা দলীয় প্রস্তুতি শেষ করার পর এগিয়ে নিতে চায়।
ক্ষমতার সুবিধা নিয়ে বিএনপি তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত দল গোছানোর কাজ করছে। তবে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর হঠাৎ মাঠের নিয়ন্ত্রণ আসায় অনেক স্থানে স্থানীয় কোন্দল ও দখলদারিত্বের অভিযোগ দলের ভাবমূর্তির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা কেন্দ্র কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। তবে সব ক্ষেত্রে সাফল্য আসছে না।
বিএনপি সরকার গঠনের পর তাদের নিজস্ব কৌশলগত কারণে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের দৃশ্যমান জোটগত অবস্থান থেকে নির্বাচনের আগে দূরত্বই বজায় রেখেছে। ক্ষমতায় যাওয়ার পর সময় পার হওয়ার সাথে সাথে সে দূরত্ব আরও বেড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। সংসদে বিরোধীদল হিসেবে দৃশ্যত জামায়াতের মোকাবিলা করছে বিএনপি, আবার অন্তরালে জামায়াতের সামাজিক প্রভাব মুছে দিতে কাজ করছে। বিএনপি একক শক্তিতে স্থানীয় নির্বাচন করার এবং একটি বৃহত্তর সেক্যুলার বা উদারপন্থী ভাবমূর্তি বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
জামায়াতের পুনরুত্থান ও নতুন সমীকরণ
জুলাইয়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান ও সুসংগঠিতভাবে মাঠে নামে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট নির্বাচনে প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং ৩৮ শতাংশ ভোট লাভ করে। জোটের নেতারা বিশ্বাস করেন, একটি বৃহৎ প্রতিবেশী দেশের গোপন তৎপরতার মাধ্যমে আওয়ামী ভোটকে জোটের বিপক্ষে নিয়ে যাওয়া এবং প্রশাসনিক কিছু কারসাজি না হলে জোটের ক্ষমতায় যাওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো।
ফ্যাসিবাদের বিগত বছরগুলোয় চরম চাপের মধ্যে থাকা জামায়াত এখন অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক ও সক্রিয়ভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। জুলাইয়ের পরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন সংকটে (যেমন বন্যা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা) তাদের কর্মীদের সক্রিয় উপস্থিতি সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলে।
জামায়াত বিএনপির পার্টনার হিসেবে না থেকে গত নির্বাচনে সমান্তরাল জোট তৈরি করে ৩০০ আসনেই নির্বাচন করে ভালো ফলাফলের মাধ্যমে নিজেদের একটি প্রধান বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড় করাতে পেরেছে। দলটি নিজেদের প্রান্তিক ইমেজ ভেঙে একটি আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ধারণাকে সামনে আনছে, যা তরুণ প্রজন্মের একটি অংশকে আকৃষ্ট করছে।
আওয়ামী লীগের সংকট ও অস্তিত্বের লড়াই
সরকার পতনের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ইতিহাসের অন্যতম কঠিন ও নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শীর্ষনেতৃত্ব থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের সিংহভাগ নেতাকর্মী হয় আত্মগোপনে আছেন, না হয় আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি। দলের সভাপতি শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে মাঠপর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কোনো কার্যকর চেইন অব কমান্ড এই মুহূর্তে দৃশ্যমান নয়। দলটিকে নিষিদ্ধ করার দাবি কিংবা বিগত সরকারের আমলের দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার প্রক্রিয়া দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।
প্রকাশ্যে কোনো বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে না পারলেও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক লবিংয়ের মাধ্যমে তারা পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। তবে মাঠের রাজনীতিতে দল হিসেবে ঘুরে দাঁড়াতে তাদের দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে।
বিএনপি-জামায়াত বনাম আওয়ামী লীগ
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসন ঠেকাতে বিএনপি এবং জামায়াত উভয়েই কি একমত? এ প্রশ্নের জবাব অনেকখানি ধোঁয়াশাপূর্ণ। জামায়াত ফ্যাসিবাদ ফিরে আসুক বা আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন হোক- সেটি চায় না। বিগত সরকারের আমলের কর্মকাণ্ডের বিচার এবং আওয়ামী লীগকে ক্ষমতার বাইরে রাখা- এই একটি বিন্দুতে দুই দলের অবস্থান দৃশ্যত এক মনে হয়। তবে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের বিষয়ে দুই দলের দৃষ্টিভঙ্গি এক বলে মনে হয় না। আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ রাখার বিষয়টিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত বিএনপি সরকারের সময়ও বহাল রয়েছে। কিন্তু সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা ডা. জাহেদউর রহমান বলেছেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতা-সমর্থকরা অংশ নিতে পারবেন; এমনকি দলের কোনো পদে থাকলেও।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ মানে হলো তাদের রাজনৈতিক পুনর্বাসন এবং আগামী নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া। দলের নেতাকর্মীদের জামিনে মুক্ত হয়ে আসা এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ লাভ থেকে মনে হয়, সরকার তাদের পুনর্বাসন বা সক্রিয় হওয়ার সীমিত সুযোগ দিতে চাইছে। তবে এই সুযোগ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সরকার ফেলে দেওয়ার পরিস্থিতিতে পরিণত হোক, সেটিও মনে হয় চাইছে না। এই সমীকরণের পেছনে বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাঙ্কের সমর্থন নিয়ে গোপন কোনো প্রতিশ্রুতির বিষয় থাকতে পারে।
বিএনপি বনাম জামায়াতের নতুন শীতলযুদ্ধ
একসময়ের মিত্র এই দুই দলের মধ্যে এখন চরম মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চলছে। সরকার গঠনের পর বিএনপি চায়, তাদের মতো করে সরকার চালাবে এবং প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবায়ন করবে। এজন্য তারা গণভোটের রায়কে অকার্যকর করে দিয়েছে। সংবিধানের গণভোট এবং জুলাই সনদের রায় বাস্তবায়নকে অসাংবিধানিক হিসেবে চিহ্নিত করছে। অন্যদিকে জামায়াত চায় রাষ্ট্রযন্ত্রের ও সংবিধানের মৌলিক সংস্কার গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ অনুসারে সম্পন্ন করা হোক। সে রাস্তায় বিএনপি ইতিবাচক সাড়া না দিয়ে সংঘাতের পথ নিয়েছে।
বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে যুগপৎ আন্দোলন করলেও, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার সম্পর্ক এক অভূতপূর্ব ‘শীতলযুদ্ধে’ রূপ নেয়। একসময়ের চারদলীয় জোট কিংবা ২০ দলীয় জোটের প্রধান দুই শরিক মাঠের রাজনীতিতে একে অপরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়। নির্বাচনের পরও সে পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে। এই মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু কৌশলগত ও আদর্শিক কারণ।
ক. নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে দুই মেরুর অবস্থান : এই শীতলযুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রকাশ ঘটে নির্বাচনের সময় নির্ধারণকে কেন্দ্র করে। জুলাইয়ের পটপরিবর্তনের পর বিএনপির রাজনীতি হয় সম্পূর্ণ নির্বাচনমুখী। দলটির হাইকমান্ড মনে করে, আওয়ামী লীগের পতনের পর দেশে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তাতে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিএনপি বিপুল ভোটে জয়লাভ করে সরকার গঠন করবে। দীর্ঘ সতেরো বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটির তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতাকর্মীরা এখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার হতে উন্মুখ হয়ে থাকে। ফলে বিএনপি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কেবল নির্বাচনমুখী জরুরি সংস্কার সম্পন্ন করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণার জন্য ক্রমাগত চাপ দেয়।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর কৌশল ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। জামায়াত ভালো করেই জানে যে, জুলাই-উত্তর পরিস্থিতিতে তড়িঘড়ি নির্বাচন হলে সাংগঠনিক ও ভোটের দিক থেকে তারা বিএনপির চেয়ে পিছিয়ে থাকবে। তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সংস্কার বাস্তবায়ন ও ফ্যাসিবাদের বিচারের জন্য দীর্ঘসময় দেওয়ার পক্ষে ছিল। জামায়াতের দাবি ছিলÑ রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং সংবিধানের আমূল ও মৌলিক সংস্কার আগে সম্পন্ন করতে হবে। তাদের এই অবস্থানের পেছনে একটি রাজনৈতিক হিসাব ছিল যে; সংস্কার বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যত বেশি সময় পাবে, জামায়াত নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি, নতুন কর্মী সংগ্রহ এবং বিগত বছরগুলোর ক্ষত নিরাময় করে দেশজুড়ে নিজেদের অবস্থান গুছিয়ে নেওয়ার তত বেশি সময় পাবে। এক্ষেত্রে দুই দলের অবস্থানে দৃশ্যমান ব্যবধান ছিল।
খ. মাঠপর্যায়ে আধিপত্য বিস্তার ও জবরদখলের রাজনীতি : আওয়ামী লীগের পতনের পরপরই দেশের স্থানীয় প্রশাসন, ব্যবসায়ী সংগঠন, পরিবহন সেক্টর এবং হাটবাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিএনপি তৎপর হয়ে ওঠে। তবে এই প্রতিযোগিতায় জামায়াত অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় অগ্রসর হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে বিএনপির অতি-উৎসাহী নেতাকর্মীদের বিশৃঙ্খল আচরণের চেয়ে সাধারণ মানুষের কাছে ইতিবাচক ইমেজ তৈরি করে। বিএনপি কেন্দ্র থেকে কঠোর ব্যবস্থা এবং বহিষ্কারের নাটক করলেও মাঠপর্যায়ে এই আধিপত্য বিস্তারের লড়াই দুই দলের দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
গ. তরুণ ভোটার ও জেনারেশন জেড-কে টানার প্রতিযোগিতা : জুলাই-আগস্টের ছাত্র-আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল তরুণ প্রজন্ম; বিশেষ করে জেনারেশন জেড। এই বিশাল এবং অরাজনৈতিক তরুণ ভোটারদের নিজেদের বাক্সে টানতে দুই দলই মরিয়া হয়। বিএনপি তাদের দীর্ঘদিনের ‘জাতীয়তাবাদী’ ও ‘উদার গণতান্ত্রিক’ বয়ান দিয়ে তরুণদের আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। তবে জামায়াত এখানে কিছুটা এগিয়ে থাকার কৌশল নেয়। তারা নিজেদের পুরোনো ইমেজটি ঝেড়ে ফেলে একটি ‘আধুনিক’, ‘দুর্নীতিমুক্ত’ এবং ‘ইনসাফভিত্তিক’ কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণা প্রচার করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াতের আইটি সেল এবং তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তরুণদের মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তারা ভালো ফল পায়, যা বিএনপির জন্য একটি বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আ’লীগের পুনর্বাসন প্রতিরোধ ও ভোটব্যাঙ্কের মনস্তত্ত্ব
আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণে দলটির অদৃশ্য উপস্থিতি এবং দীর্ঘদিনের তৈরি করা ভোটব্যাঙ্ক এখনো একটি বড় ফ্যাক্টর। বিএনপি এবং জামায়াতÑ উভয় দলই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের ঘোরবিরোধী, কিন্তু এই বিরোধিতার পেছনে তাদের নিজস্ব সমীকরণ ও পর্দার আড়ালের হিসাব-নিকাশ অত্যন্ত জটিল।
বিগত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত ও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা। গুম, খুন, জেল-জুলুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার দুই দলের হাজার হাজার কর্মী। ফলে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের বিচার নিশ্চিত করা এবং দলটিকে কোনোভাবেই যাতে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার অধীনে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হতে না দেওয়া হয়- এই একটি বিন্দুতে বিএনপি ও জামায়াত সম্পূর্ণ একমত। তারা রাজপথে বা নীতিগত জায়গায় আওয়ামী লীগের যেকোনো ধরনের উত্থানচেষ্টাকে যৌথভাবে প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে রাখে।
রাজনীতিতে চরম সংকটে পড়লেও আওয়ামী লীগের একটি ঐতিহ্যগত ভোটব্যাঙ্ক রয়েছে (যা গড়ে ৩০% থেকে ৩৫%-এর আশপাশে ওঠানামা করত)। জুলাইয়ের পর সেটি ১৫ শতাংশের আশপাশে নেমে এসেছে বলে মনে করা হয়। এই ভোটব্যাঙ্ক নিয়ে বিগত নির্বাচনে বিএনপির সাথে একটি সমঝোতার মাধ্যমে বিএনপি ভালো ফল পেয়েছে বলে মনে করা হয়। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বক্তব্য হলোÑ সেটি ছিল দলের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের শর্তে। সেটি পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না বলে তাদের অভিমত।
বিএনপি মনে করে, আওয়ামী লীগের ভোটারদের একটি বড় অংশ কট্টর ইসলামপন্থী রাজনীতির বিরোধী। ধর্মনিরপেক্ষ বা উদারপন্থী এই ভোটাররা জামায়াতকে ঠেকাতে এবং নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শেষ পর্যন্ত বিএনপিকেই বেছে নেবে। এ কারণে বিএনপি অতি-ডানপন্থী ইমেজ পরিহার করে নিজেদের একটি মধ্যপন্থী দল হিসেবে উপস্থাপন করছে।
জামায়াত আবার ভিন্ন সমীকরণে হাঁটে। জামায়াত আওয়ামী লীগের সাথে যেকোনো গোপন সমঝোতার বিপক্ষে ছিল। কিন্তু তারা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক মামলাবাজি ও দখলবাজিতে যুক্ত না থাকায় মাঠে দলটির প্রতি এক ধরনের সমর্থন ছিল, যেটি প্রতিবেশী দেশের শেষ সময়ের কঠোর বোঝাপড়ায় ১১ দলের বিপক্ষে গেছে বলে ধারণা করা হয়।
তারা দেখাতে চায় যে, বিএনপি ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগের মতোই আবার দুর্নীতি ও জবরদখলের রাজনীতি ফিরে আসবে। জামায়াত নিজেদের ‘সুশাসক’ হিসেবে তুলে ধরে আওয়ামী লীগের সেসব ভোটারদের আকৃষ্ট করতে চায়, যারা ক্ষমতার পরিবর্তন দেখলেও সুশাসন চায়। একই সাথে আওয়ামী লীগের সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক যেন আতঙ্কে না পড়ে, সেজন্য জামায়াত নেতারা মন্দির পাহারা দেওয়া বা সংখ্যালঘুদের সাথে মতবিনিময় সভার মতো কর্মসূচি জোরদার করে।
শেষ পর্যন্ত দুই দলের কৌশলের ওপর প্রভাব বিস্তার করে প্রতিবেশী দেশের আওয়ামী লীগের ওপর নিয়ন্ত্রক প্রভাব। ফলে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।
আওয়ামী লীগ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং এর পুরো সংস্কার প্রক্রিয়াকেই সম্পূর্ণ অবৈধ ও অসাংবিধানিক বলে মনে করে। দলটির কৌশল ছিল এই সরকারের যেকোনো ব্যর্থতাকে (যেমন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বা অর্থনৈতিক সংকট) পুঁজি করে জনমনে অসন্তোষ তৈরি করা। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং আন্তর্জাতিক মহলে এই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে যে, অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে একটি অস্থিতিশীল ও অরাজক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তারা বর্তমান রূপরেখাকে সম্পূর্ণ অচল বা সাবোটাজ করার জন্য সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। সে চেষ্টা সফল না হওয়ায় তারা বিএনপির সাথে নির্বাচনী বোঝাপড়ায় যায়।
কিন্তু তারা যত দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া বন্ধ এবং রাজনৈতিক পুনর্বাসন চাইছে, সেটিকে বিএনপি সরকার নিজের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে। ফলে এখন ‘ধীরে চলো’ নীতি নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এতে ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগ নিজেদের সংগঠিত করে সুযোগের জন্য অপেক্ষা করছে বলে মনে হচ্ছে।
শেষ কথা
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক ক্রান্তিকাল পার করছে। একদিকে আওয়ামী লীগকে ছাড়াই একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরির চেষ্টা চলছে; অন্যদিকে সেই শূন্যস্থানে নিজেদের একতরফা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে বিএনপি। এ চেষ্টায় জামায়াতের প্রভাব মুছে দেওয়ার বিএনপি সরকারের নানা পদক্ষেপে দুই দলের মধ্যকার দূরত্ব ও প্রতিযোগিতা দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আর এ সুযোগ নিতে চাইছে পতিত ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক শক্তি। তারা নতুন বয়ান নির্মাণের চেষ্টা করছে যে- জুলাইয়ে জনগণের বিপ্লব ছিল না, সেটি ছিল ষড়যন্ত্রের ফল। ফলে তারা মরিয়া হয়ে ফিরে আসার চেষ্টা করছে, যার পেছনে রয়েছে প্রতিবেশী দেশের আশীর্বাদ। বিএনপির সুশাসনে বিচ্যুতি ও বিরোধীদলের সাথে সংঘাত তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।