নয়া সমীকরণে আওয়ামী বয়ানের ফেরিওয়ালাদের আগমন
১৮ জুন ২০২৬ ০৯:৫৫
॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করার মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ এসেছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেয়ায় সেই সুযোগ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। প্রধান বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং তার নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারা গণভোটে জুলাই সনদের পক্ষে প্রাপ্ত রায় এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের রূপরেখাকে সমর্থন করে শপথ নিয়েছেন। বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথগ্রহণ না করায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও জনরায়কে পরোক্ষভাবে অবজ্ঞা করা হচ্ছে। প্রধান বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের রায় সংসদে নিষ্পত্তি না হলে তা রাজপথে আদায় করা হবে। তিনি বলেন, ‘উই আর কমিটেড। আমরা আমাদের কমিটমেন্ট ভায়োলেট করতে পারি না। জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবো না। জনগণের দাবি থেকে সরে আসার কোনো সুযোগ নেই। সংসদে সমাধান হলে ভালো, আর না হলে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করা হবে। জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবো না। এই দাবি আজ হোক, কাল হোক আদায় হবে, ইনশাআল্লাহ।’ এদিকে সরকার নির্বাচনের আগে জনগণের সাথে দেয়া ওয়াদা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জুলাই সনদে দেয়া স্বাক্ষরের দায়বদ্ধতা অস্বীকার করেছে। তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এ কমিটিতে তাদের নাম দেয়নি। সংবিধান সংশোধনে সরকারি দলের প্রস্তাবিত কমিটিতে বিরোধীদল প্রতিনিধি দেবে না জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের দাবি ছিল সংবিধান সংস্কার। এজন্যই রেফারেন্ডাম (গণভোট) হয়েছে। আমরা বলেছি, ৭০ শতাংশ (৭২ শতাংশ হবে) মানুষ যেখানে ভোট দিয়েছে, আমরা সংসদের ভেতরে এসে এটা বদলাতে চাই না। আমরা জনগণের পক্ষে, জনগণের রায়ের পক্ষে। অতএব সংশোধন নয়, সংস্কারের জন্য কমিটি করলে আমরা দেখবো, বিবেচনা করবো।
তিনি বলেন, আমরা পরিষ্কার বলে দিয়েছি, এটা নতুন করে আর বলার কিছু নেই যে- সংবিধান সংশোধনের জন্য কমিটির দরকার নেই। এটা তো একটা রুটিনওয়ার্ক। এটা বিল আকারে আসবে ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে, আমরা আলোচনায় অংশ নেবো। পাস হলে পাস হবে, রিজেক্ট হলে রিজেক্ট হবে, এটার জন্য কোনো কমিটি লাগে না। কমিটির প্রয়োজন সংবিধান সংস্কারের জন্য। সংস্কারের জন্য যদি তারা কোনো প্রস্তাব দেন, তখন আমরা বিবেচনা করবো।’
বিএনপির এ অবস্থানকে রাজনীতি বিশ্লেষকরা জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা বলে মন্তব্য করেছেন। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার অভিযোগ করেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে বিএনপি জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তার মতে, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ স্পষ্টভাবে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছিল এবং এই রায় থেকে সরে আসা জনগণের প্রত্যাশার প্রতি চরম অবজ্ঞা। তারা মনে করে, এর মাধ্যমে বিএনপি পুরোনো ফ্যাসিবাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বিএনপি পথ হারিয়েছে।
বিএনপি পথ হারিয়েছে
২০২৪ সালের আগস্ট বিপ্লবের চেতনায় পথচলার ওয়াদা করেছে ফ্যাসিস্টবিরোধী প্রতিটি রাজনৈতিক দল। কিন্তু সরকার গঠনের পর বিএনপি যে পথে হাঁটছে, তা সঠিক পথ নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তবে কী বিএনপি পথ হারিয়েছে, নাকি ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার স্বৈরাচারী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে পুরো ফ্যাসিজমের পথ ইচ্ছে করেই বেছে নিয়েছে। সদ্য পলাতক ফ্যাসিস্ট হাসিনার আওয়ামী লীগের পরিণতি থেকে শিক্ষা না নিলে পরিণতি তাদের চেয়েও মারাত্মক হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। ইতোমধ্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বাধীন পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে অবস্থান, সততা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব না দিয়ে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সব পদে দলীয় লোক নিয়োগ, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বদলে সিটি করপোরশন, জেলা পরিষদসহ সকল পর্যায়ে দলীয় ব্যক্তিদের বসানো। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রেও বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ও আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দলীয় লোকদের নিয়ে কথিত সার্চ কমিটির গঠন এবং দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ, ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ করে দেয়া। ইসলামী ব্যাংকের মতো দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক আওয়ামী কায়দায় দখলে নিতে নব্য এস আলম তৈরি। আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার নিজ দলের দুষ্টের লালন এবং বিরোধীদলের শিষ্টদের দমনের মতো দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি এবং চাঁদাবজি ও ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বদলে এবাউট টার্ন দেখে রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন বিএনপি সত্যি সত্যি পথ হারিয়েছে। বিরোধীদলের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার বদলে বিভেদ উসকে দিচ্ছে। বিরোধীদলের নেতা ও সংসদ সদস্যদের সাথে নিয়ে দেশ গড়ার সংসদীয় গণতন্ত্রের আদর্শ চর্চার চেয়ে ফ্যাসিস্ট আমলের অবজ্ঞা ও অবহেলার প্রতিচ্ছবি জাতিকে আতঙ্কিত করছে।
আতঙ্কের কারণ
২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনের পর ক্ষমতার নতুন মেরুকরণ এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতির প্রভাব বলয় বিস্তারের লড়াইয়ে সরকার বিরোধীদলের যে অবস্থানের কারণে জাতি আতঙ্কিত, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, হলো:
ক্ষমতার নয়া সমীকরণ নির্বাচনোত্তর দ্বন্দ্ব
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই বিএনপির লক্ষ্য ছিল যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল ও সরকার গঠন করা। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী জোর দিচ্ছিল দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্র সংস্কার ও নিজেদের স্বাধীন শক্তি হিসেবে পরিচিত করার ওপর। গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দুই দল আলাদাভাবে অংশগ্রহণ করায় তৃণমূল পর্যায়ে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়। ভোটের মাঠে পাবনা-৩সহ বেশকিছু আসনে দুই দলের প্রার্থীদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই এবং নির্বাচন-পরবর্তী ভোট পুনর্গণনার দাবিকে কেন্দ্র করে মাঠপর্যায়ে চাপা উত্তেজনা এখনো বিরাজমান।
নব্য আওয়ামী সংস্করণ
নির্বাচনী এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের নামে বিএনপি আওয়ামী লীগের ফেলে যাওয়া পুরনো বয়ানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা শুরু করে। অর্ধশতাব্দী আগে মীমাংসিত বিষয়, জাতীয় সংহতি নষ্টের ভারতীয় বয়ানকে নিজেদের করে নেয়। এর জবাব দিতে গিয়ে বিরোধীদলের তৃণমূলের নেতাদের বক্তৃতাও উত্তেজনা ছড়াচ্ছে। জামায়াত ইসলামভিত্তিক সংস্কার ও তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক এজেন্ডাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপির কিছু নেতা-কর্মী আদর্শিকভবে এর মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়ে অপরাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করছে। বট বাহিনী ফটো কার্ড তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষ ছড়াচ্ছে। ফলে গণতান্ত্রিক রাজনীতির সহনশীল সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে।
সংসদে আওয়ামী বয়ানের ফেরিওয়ালা
জামায়াতে ইসলামী এবার প্রধান বিরোধীদল হিসেবে দেশের আইনসভায় ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। ফলে বাজেট সেশন থেকে শুরু করে ব্যাংকিং খাত সংস্কার বা সংবিধানের নানা ধারা-উপধারা নিয়ে সংসদে সরকারি দল বিএনপি এবং বিরোধীদল জামায়াতের মধ্যে প্রায়ই তীব্র বাদানুবাদ ও কথার লড়াই চলছে। এখানেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সিনিয়র নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ফজলুর রহমান, খন্দকার মনিরুল হক; এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও জামায়াতে ইসলামীর প্রসঙ্গে বক্তব্য দিতে গিয়ে অপ্রাসঙ্গিকভাবে আওয়ামী বয়ান ফেরি করে উত্তেজনা ও দূরত্ব বাড়ানোর মতো বিষবাষ্প ছড়াচ্ছেন, যা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বিতর্কের সৌন্দর্য নষ্ট করছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।
কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে আধিপত্য ও সংঘাত
সেই পুরনো কায়দায় ক্ষমতা ও পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার করে বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন ভিত্তিহীন মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন জাতীয় সংবাদমাধ্যমে আসছে। ইসলামী ব্যাংকে অস্থিরতার কারণে দেশে অর্থনৈতিক ভিত কেঁপে উঠেছে। এর নেপথ্যেও সরকারি দল বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নিজে বলেছেন, ‘ইসলামী ব্যাংক বিএনপির কাছে ভালো থাকবে।’ এ কথার অর্থ কী? বিএনপির লোকের হাতে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংকসহ অনেকগুলোর অবস্থা সবার জানা। তারপরও অর্থমন্ত্রীর মুখের এমন বাণী যে বার্তা দিচ্ছে, তার অর্থ তৃণমূলের নেতাদের বিনামূল্যে, নয়তো টেন্ডার ছিনতাই করে হাট, ঘাট, বাজার, মাজার ও পুকুর দখলের মতোই নয় কী? হাসপাতাল বন্ধসহ এমন হাজারো উদাহরণ আছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এমন প্রতিহিংসা ও বিরোধীদল দমনের ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব দূরত্ব বাড়াচ্ছে। যার ফলে জাতীয় সংহতি নষ্ট হচ্ছে। তৃণমূলে সন্ত্রাস বাড়ছে। অবৈধ প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় বিএনপির নিজ দলের ৫ নেতা-কর্মী তাদের নেতা-কর্মীদের হাতে খুন হয়েছে গত মে মাসে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বিএনপি ও জামায়াত এখন আর কেউ কারো পরিপূরক নয়, বরং একে অপরের প্রধান প্রতিযোগী। অতীতে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তারা রাজপথে পাশাপাশি থাকলেও, ক্ষমতার চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রতিযোগিতার লড়াই চলবেই গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এটা দোষের নয়। কিন্তু প্রতিযোগিতা যদি প্রতিহিংসা ও শত্রুতার পর্যায়ে গড়ায়, তবে তা শুধু দুই দলের জন্য নয়, দেশ-জাতির জন্যও হুমকি। সংসদীয় গণতন্ত্রের রাজনীতিতে সরকার ও বিরোধীদল দুই চাকার সাইকেল। এ দুই চাকার ভারসাম্য নষ্ট হলে তা চলবে না। বরং গড়াগড়ি খাবে। সঙ্কট বাড়বে। ফ্যাসিবাদকে আমন্ত্রণ জানাবে, যা কারো কাম্য নয়।