আলোকে তিমিরে

সর্বাগ্রে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে


১০ জুন ২০২৬ ২২:০২

॥ মাহবুবুল হক ॥
আমাদের মূল্যবোধ নিয়ে গত কিছুদিন যাবত দেশব্যাপী প্রচুর আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। বিষয়টি ‘টপ অব দ্য কান্ট্রি’ হয়ে গেছে। মূল্যবোধ যে ধসে পড়েছে, সেটা নতুন কিছু নয়। আবার সেটা যে একমাত্র ভিন্নভাবে আমাদের দেশেই ঘটেছে, এমনটিও নয়। আমাদের সিনিয়র সিটিজেনরা বরাবর বলে আসছেন, ৬০-এর দশকই ছিল মূল্যবোধের মাপকাঠিতে শেষ দশক। কথাটা ফেলে দেয়ার নয়। মনে হয় অনেকটাই সত্য।
একটি দেশ, একটি রাষ্ট্র বা একটি জাতির মূল্যবোধ কয়েক দশকেও গড়ে ওঠে না। এর জন্য কয়েক শতকও প্রয়োজন হতে পারে। একটি ছোট্ট উদাহরণ দিলে বিষয়টি সহজ হয়ে যাবে। রোমানরা ব্রিটিশদের শাসন করেছে অনেককাল। তারা ব্রিটিশদের মূল্যবোধকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছে। বলেছে, তারা মূলত ছিল জেলে সম্প্রদায়। রাস্তার বাম পাশ দিয়ে হাঁটতে হবে বা গাড়ি চালাতে হবে- এ বিষয়টি শেখাতে আমাদের লেগেছে প্রায় একশত বছর।
আমাদের রাষ্ট্র বা দেশের বয়স সাড়ে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার বছর। হিউয়েন সান থেকে শুরু করে ইবনে বতুতা পর্যন্ত পর্যটক ও ইতিহাসবিদগণ আমাদের সম্পর্কে যেসব কথা বলেছেন, সেসবও প্রণিধানযোগ্য। আমরাও ছিলাম মূলত জেলে ও কৃষক। মূলত জেলে, পরবর্তীতে জঙ্গল কেটে কেটে আমরা কৃষক হয়েছি। এর মধ্যে কালে কালে আমাদের সংস্কৃতি বদল হয়েছে। এর কারণও অনেক।
ভয়ের মধ্যেই ছিল আমাদের বসবাস। বনের হিংস্র পশু-জন্তু-জানোয়ারের দ্বারা নিত্যদিন আমরা আক্রান্ত হতাম। তার সাথে ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বৃষ্টি-বাদল, ঝড়-বন্যা ইত্যাদি। এই ভয়, আশঙ্কা, দুর্ভোগ থেকে বাঁচার জন্য মানুষ শক্তির পূজা শুরু করেছিল। সূর্য-চন্দ্র থেকে জন্তু-জানোয়ার, কীট-পতঙ্গ পর্যন্ত মানুষের আরাধনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। বহুকাল যাবত এই ভয়ের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছিল বৈদেশিক আক্রমণ। আক্রমণটা চলছিল উত্তর থেকে, পশ্চিম থেকে শুরু করে চারদিক থেকে। এসব কারণে ভয়ভীতি, শঙ্কা-আশঙ্কা সবসময় এ ব-দ্বীপে বিরাজিত ছিল। দৈনন্দিন কাজকর্মের মাঝে এ ভীতি ও শঙ্কা দূর করার জন্য পূজা-অর্চনাও সমানতালে চলে আসছিল। যাকে এখন আমরা পূজা বলছি।
বলে রাখা ভালো, এটা যে শুধু আমাদের দেশে বিরাজিত ছিল, তা নয়; মানুষের ইতিহাস যদি সাড়ে ১২ হাজার বছর হয় (কুরআন ও হাদিসের প্রেক্ষিতে), তাহলে দেখা যাবে সর্বত্রই এই ভয়ভীতি এবং তারই প্রেক্ষাপটে সাহায্যের জন্য এই পূজা-অর্চনা। সভ্যতার পর সভ্যতা এসেছে, পূজা-অর্চনা, আরাধনা ইত্যাদির রকমফের হয়েছে অথবা বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে এর উত্থান ও পতন হয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর মাটি থেকে এই ‘মূল্যবোধ’ নির্মূল হয়ে যায়নি। সব ধর্মের মধ্যে, সব বিশ্বাসের মধ্যে, সব মতবাদের মধ্যে এই সাহায্য ও উন্নতির জন্য এখনো নানাভাবে অর্চনা ও আরাধনা রয়েই গেছে। চলছে। এই অকারণ আরাধনা পৃথিবী থেকে মুছে যাবে বলে মনে হয় না।
আমাদের ইতিহাস মোটামুটিভাবে আমরা জানি। সেই দীর্ঘ প্রেক্ষাপটের দিকে আমরা যাচ্ছি না। মহান আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, এই পূজা-অর্চনা ও আরাধনাকে নির্মূল করার জন্য যুগে যুগে, কালে কালে তিনি রাসূল ও নবী পাঠিয়েছেন এবং এ অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন- মানুষ যেন একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, বিধাতা, পালনকর্তা আল্লাহকেই ভয় করে। অন্য কাউকেই যেন ভয় না করে। যারা অন্য কাউকে ভয় করে, তারা হলো মুশরিক। যারা ভয়ের বিষয়ে আল্লাহসহ এবং আল্লাহকে ছাড়া অন্য মানুষ বা অন্য সৃষ্টিকে মানে। তারাই মহান আল্লাহর সাথে শরিকানা সৃষ্টি করে। আল্লাহর পাশাপাশি অংশীদার বানায়। সমকক্ষ শক্তি বানায়। প্রতিদ্বন্দ্বী বানায়। এখানেই সবকিছুর বিপত্তি। সব অঘটনের মূল সূত্র, মূল প্রেক্ষাপট। মহান আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া থেকে এ বিশৃঙ্খলা দূর করার জন্যই রাসূল ও নবী পাঠিয়েছেন। শুধু তাই নয়, যেসব মানুষ মহান আল্লাহর অনুগত বান্দা হতে চেয়েছেন, তাদের তিনি হেদায়েত দান করে উন্নত মানুষে পরিণত করেছেন। তারাও আল্লাহ ও নবী-রাসূলদের অনুসরণ করে দুনিয়াকে শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে যুগে যুগে, কালে কালে মৌলিক অবদান রেখেছেন। উদ্দেশ্য একটাই, মানুষকে আল্লাহমুখী করা। মানুষকে ভালো মানুষে রূপান্তরিত করা। মহান আল্লাহ একপর্যায়ে নবী-রাসূল পাঠানোর প্রক্রিয়া বন্ধ করেছেন এবং সর্বশেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মদ (সা.)-কে কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির রাহবার হিসেবে মান্য করার নির্দেশ দিয়েছেন। এভাবেই শেষ নবীর দেড় হাজার বছর পার হয়ে গেছে। এ সময় দুনিয়ার অন্যান্য দেশের মতো আমরাও কিছুটা উন্নত হয়েছি। আবার ধীরে ধীরে অবনতির দিকেও ধাবিত হয়েছি।
দেড় হাজার বছর পূর্ব পর্যন্ত আমরা মুশরিক ছিলাম। ধীরে ধীরে মহান আল্লাহর জ্ঞান পেয়ে মুশরিকি থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন হতে হতেও সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হতে পারিনি। কারণ অনেক, মূল কারণ হলোÑ মহান আল্লাহর বিধিবিধান, আইনকানুন, রসম-নেওয়াজ সবকিছু আমরা সরাসরি পাইনি বা রপ্ত করতে পারিনি। মহান আল্লাহর বিধিবিধানগুলো মূলত আরবি ভাষায় রচিত। যারা আরবি ভাষী, তারা যেভাবে সরাসরি আল্লাহর বিধিবিধান পেয়েছে, আমরা সেভাবে তো পাইনি।
এদেশ মুসলিমরাও শাসন করেছে প্রায় ৬শত বছর। মুসলিম সুলতানগণ অত্যন্ত উদারভাবে মুশরিকদের প্রধান ও অপ্রধান ধর্মগ্রন্থগুলো বাংলা ভাষায় অনুবাদ করিয়েছেন। মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আল্লাহর কুরআন, যেটা জানানো ফরজ ছিল, সেটা তারা করেননি বা করতে পারেননি। তারা দেশের বা মানুষের ভাষা বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করেননি। করেছেন পারস্য ভাষায়। সেটাকে আমরা বলি, ফার্সি ভাষা। পারস্য বা ইরানের কবিরা সেসময় বিশ্বে দারুণভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। ইরানিরা এবং উর্দুভাষী লোকেরা ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরি-বাকরির জন্য এবং ধর্ম প্রচারের জন্যও বিপুলভাবে এদেশে আসতেন। সেসব কারণে ফার্সি ও উর্দু ভাষার বিস্তার এদেশে লাভ করেছিল। ফার্সি এবং উর্দুর মধ্যে সুলতানগণ ফার্সি ভাষাকে উন্নত ধারণা করায় তারা ফার্সি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এটাই ছিল আমাদের জন্য বিরাট ও বিশাল ভুল। আমাদের আলেমগণ উর্দু ও ফার্সিভাষা জানে না কিন্তু শুদ্ধ বাংলা ও আরবি ভাষা সেভাবে জানেন না। আরবি ভাষা পড়তে পারলেও তারা অর্থ জানেন। বলাবাহুল্য, আমাদের ওয়াজ-মাহফিলে এখনো অপ্রচলিত ফার্সি ভাষার কাব্য, কবিতা ও গজল নানাভাবে উচ্চারণ করা হয়। কিন্তু আরবি ভাষার ইসলামী কাব্য ও গজল সেভাবে উচ্চারিত হয় না। উচ্চারিত হলে কুরআনের দিকে আমরা অনেকটা অগ্রসর হতে পারতাম। এ না পারা আমাদের জন্য সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমাদের ‘মূল্যবোধ’ যেভাবে গড়ে ওঠা উচিত ছিল, সেভাবে গড়ে উঠতে পারেনি। কারণ যুগে যুগে, কালে কালে আমরা নানাভাবে ষড়যন্ত্র ও আক্রমণের শিকার হচ্ছিলাম।
তারপরও আমরা যা ছিলাম, তাকে কেন্দ্র করেই, অর্থাৎ মুসলিমদের কেন্দ্র করেই। আমরা এ দেশের মুশরিকগণ, দ্রাবিড়গণ ক্রমাগতভাবে মুশরিকি ছেড়ে মুসলিম হচ্ছিলাম। এটাই ছিল এখানকার স্বতন্ত্র ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ঐতিহাসিক পরম্পরা। পূর্বেই আমরা উল্লেখ করেছি, এই ব-দ্বীপের মানুষ অতীতে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারী ছিল না। ‘ভয়’কে ভিত্তি করে একেক এলাকার মানুষ একেকভাবে ‘ভয়’কে দমানোর জন্য, ‘ভয়’ থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য, সুখ-শান্তি-স্বস্তির জন্য ‘শক্তির’ পূজা-অর্চনা করত। এটা মানুষের স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক অবস্থান। মানুষ বাঁচতে চায়। রোগহীন থাকতে চায়। প্রজন্মকে বাঁচাতে চায়। মায়া-মমতা, স্নেহ-প্রেম-প্রীতির মধ্যে আনন্দ উদযাপন করতে চায়। মানুষ তো পশু নয়, মানুষ তো জানোয়ার নয়। মানুষ তো সৃষ্টির সেরা। এ ধরনের বোধ ও বিশ্বাস মানুষের মধ্যে সর্বকালে, সর্বসময়ে বিরাজমান ছিল। তারা বুঝত, অনুধাবন করত, উপলব্ধি করত ‘মানুষ’ পশু নয়, জন্তু নয়, তারা উন্নত কিছু। তারা এটাও অনুভব করত, মানুষ ও পশু একসাথে বাস করতে পারবে না। ঝাড়-জঙ্গল-বন পশু বা জন্তু-জানোয়ারের জন্য অভয়ারণ্য হলেও মানুষের জন্য সেসব অভয়ারণ্য হতে পারে না। কারণ একসাথে বা পাশাপাশি বাস করে মানুষের অভিজ্ঞতা হয়েছে যে, পশু-জন্তু-জানোয়ারসহ ছোট-খাটো সৃষ্টিও মানুষকে আক্রান্ত করে, বিপদগ্রস্ত করে, হামলা করে; কিন্তু মানুষ সকল সৃষ্টিকে ধ্বংস করতে চায় না। নিশ্চিহ্ন করতে চায় না। সেটা তার কাজ নয়। সেটা তার প্রয়োজনও নয়। খাদ্যের জন্য বা প্রয়োজনে সে অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট নিরীহ পশু-পাখিকে নিধন করে বা আয়ত্ত করে। এর বেশি কিছু নয়। তারা জন্মের পর থেকে অনুভব করেছে, মানুষের প্রবণতা ও অন্যান্য সৃষ্টির প্রবণতা এক নয়, অভিন্ন নয়।
এভাবে মানুষ উপলব্ধি করেছে, তাদের নিরাপত্তা এবং জান-মালের রক্ষার জন্য পৃথক অভয়ারণ্য বা নিকেতন দরকার। তারা অনিকেত থাকতে পারবে না। ঘরবাড়ি ছাড়া থাকতে পারবে না। একা একা থাকতে পারবে না। শান্তির জন্য, প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসার জন্য এবং সর্বোপরি নিরাপত্তার জন্য তাকে অনেককে নিয়ে অর্থাৎ সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করতে হবে। এভাবেই মানুষ গুহা, পর্বতমালা এবং ঝাড়-জঙ্গল থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এসে ঘরবাড়ি তৈরি করার প্রয়াস পেয়েছে। এই ঘরবাড়ির আবার একরকমভাবে তৈরি করছে না। এক্সপেরিমেন্ট করছে। ঋতুর সঙ্গে, আবহাওয়ার সঙ্গে পরিবেশ ও পরিস্থিতির সঙ্গে বিপুলভাবে তাল মেলানোর চেষ্টা করছে। এভাবে মূল্যবোধ পরিবর্তন হচ্ছে। অগ্রসর হচ্ছে।
মজার ব্যাপার হলো, পৃথক পৃথক মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, ধর্ম ও ঐতিহ্যের যত গোষ্ঠীর মানুষ, যত সিলসিলার মানুষ এ দেশে এসেছে, তারা সকলে কাজ সেরে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যায়নি। যাদের সংসার ছিল, তারা হয়তো সংসারের টানে। কেউ কেউ হয়তো মাতৃভূমির টানে ফিরে গেছে। কিন্তু যারা অপেক্ষাকৃত যুবক ও তরুণ ছিল, তাদের অধিকাংশই এদেশের ‘শ্যামলিমায়’ শুধু নয়, মাটির গুণে, মাটির টানে, প্রকৃতির টানে, মানুষের টানে, আতিথেয়তার কারণে, সরলতার কারণে এখানে থেকে গিয়েছে। সে কারণে এই ক্যানভাসে নানা ধর্ম, নানা সভ্যতা, নানা সংস্কৃতি ও নানা কৃষ্টির বৈচিত্র্যময় সংমিশ্রণে এক ধরনের ‘শংকর’ জাতির উত্থান ঘটেছে। এখানে বৌদ্ধরা এসেছে, খ্রিস্টানরা এসেছে, নাস্তিকরা এসেছে, আস্তিকরা এসেছে। আর্য হিন্দুরা এসেছে, পৌত্তলিকরা এসেছে। দীর্ঘসময় পালরা (বৌদ্ধ), সেনরা (আর্য হিন্দু) এবং শক, হুন, মুঘল, পাঠানসহ বহু জাতির মানুষ শাসন করেছে। এদেশের চিরন্তন ও শাশ্বত মূল্যবোধ বরাবরই ওলট-পালট হয়েছে। ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
পালরা শাসন করার কারণে সনাতন কৃষ্টির মানুষ বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছে। আর্য-ব্রাহ্মণ তথা দাক্ষিণাত্বের হিন্দু কৃষ্টির মানুষ শাসন করার কারণে দেশের সনাতন কৃষ্টির মানুষ আর্য হিন্দু কৃষ্টি গ্রহণ করেছে। মধ্য এশিয়া, ইরান, তুরান, তুরস্ক, স্পেন, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর ও মধ্য আফ্রিকা এবং পূর্ব এশিয়া থেকে নানা বর্ণের, নানা ভাষার, নানা কৃষ্টির এবং নানা মাজহাবের মুসলিমগণ ধর্ম প্রচার, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শাসন-প্রশাসনে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত হওয়ায় এদেশের সনাতন কৃষ্টি ও হিন্দু কৃষ্টির মানুষ ব্যাপকভাবে ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম হয়। তাদের মধ্যে সাধারণ একতা থাকলেও ‘মূল্যবোধের’ দিক থেকে পরিপূর্ণ ঐক্য ছিল না। নানা বিভক্তি ছিল। তার মধ্যে শিয়া, সুন্নি, সুফি, শরিয়াহপন্থী, আহলে হাদিস, খেলাফতপন্থী, চিশতি, মারফতি, পীর-মুর্শিদ, দুনিয়াপন্থী, আখিরাতপন্থী, নানা মাজহাবের নানা শাখা-প্রশাখাসহ শত শত পন্থার মুসলিম বা মুসলমান গোষ্ঠী রয়েছে। এত বিভক্তির মধ্যেও ঐক্য স্থাপনের চেষ্টা ও প্রচেষ্টা চলেছে। সুতরাং মুসলিমদের মধ্যে অবশ্যই ‘একক মূল্যবোধ’ সৃষ্টি হয়নি।
এদেশের সহজ-সরল, স্বাভাবিক মানুষকে ‘মূল্যবোধের’ দৃষ্টি থেকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে সেন এবং ইংরেজরা। সেনরা মনুষ্য সমাজকে বিভক্ত করে মনুষ্যত্ব-মানবতা-মানবিক সমাজ ও মানবাধিকার তছনছ করে দিয়েছে।
ব্রিটিশরা বর্ণবাদী হিন্দুদের অনুসরণে ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বব্যাপী একদিকে যেমন নানা সেক্যুলার মুসলিম গোষ্ঠীর উত্থান ঘটিয়েছে; অপরদিকে মধ্যপ্রাচ্যের হাজার হাজার ইহুদিকে (জায়নিজমপন্থী) তথাকথিত মুসলিম আলেম বানিয়ে ইসলামের মূল স্পিরিট তথা মূল্যবোধকে বহুলাংশে ধ্বংস করেছে। ব্রিটিশ ও জায়নিস্টদের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ৩০০ বছরের প্রাচীন এই সংগ্রাম ও চেষ্টা-প্রচেষ্টা এখনো বিদ্যমান রয়েছে। এখনো মাঝে মাঝে ইহুদি আলেম ধরা পড়ছে। তাদের প্রধান কাজ ছিল এবং যা এখনো চলছে, তা হলো মুসলিমরা যেন কুরআন থেকে বহু দূরে থাকে। দুনিয়ার সব ইসলামী বই পড়ুক, গবেষণা করুক ও প্রকাশ করুক; কিন্তু কুরআনের অর্থ যেন না জানে, না পড়ে এবং গবেষণা না করে। এটা করলে মুসলিম শুধু নয়, দুনিয়ার উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিলীন হয়ে যাবে।
এ কারণে ব্রিটিশরা উপমহাদেশে বড় বড় মাদরাসা তৈরি করে এবং কওমি সিস্টেমে কোনো অবস্থাতেই যেন কুরআনের চর্চা, পরিচর্যা, চিন্তা, পড়া, গবেষণা না থাকেÑ এখনো পর্যন্ত সেই চেষ্টা, সাধনা ও পরিচর্যা করে যাচ্ছে। যার ফলে এদেশে সেক্যুলার মুসলিম এবং আখিরাতপন্থী মুসলিমে কোনো ভেদাভেদ এখন আর পরিদৃষ্ট হচ্ছে না। ‘কন্যা-জায়া-জননী’কে আমরা ‘সেক্স মেশিনে’ পরিণত করেছি। এর চেয়ে অনৈতিক, অমানবিক, নিকৃষ্ট লোভ-লালসা, অচিন্তনীয়-অভাবনীয় নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা এবং পশুত্ব আর কী হতে পারে?
আসুন, ধর্ম, বর্ণ, মতবাদ ও আদর্শ নির্বিশেষে আমাদের মূল্যবোধকে ফিরিয়ে আনি। প্রয়োজনে রাজনীতিকেও রিকাস্ট করি।