কর্মক্ষম জনশক্তি বেকার, মেধাবীদের দেশত্যাগ : কাক্সিক্ষত উন্নয়ন কি সম্ভব


১০ জুন ২০২৬ ২২:০১

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
বাংলাদেশে দক্ষ ও বিশেষায়িত জনসম্পদের যেমন অভাব, তেমনি কর্মসংস্থানও হচ্ছে না যথাযথভাবে। বিশাল জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশে কোটি কোটি কর্মক্ষম জনশক্তি বেকার; অপরদিকে পরিশ্রমী ও মেধাবীদের বড় অংশ দেশত্যাগ করে চলে যাচ্ছে। অপরদিকে দক্ষ জনশক্তির অভাবে লাখ লাখ বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত। জনশক্তিকে জনসম্পদে পরিণত করে পরিশ্রমী ও মেধাবিদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানোর এ সমন্বিত কাজকে আঞ্জাম দেয়ার জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কি যথাযথ নেতৃত্ব ও উদ্যোগ আছে? যদি থাকে, তবে তা কি কাগজে-কলমে নাকি বাস্তবে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। অবশ্য দেশের জনসংখ্যাকে দক্ষ জনসম্পদে পরিণত করা এবং তাদের কর্মসংস্থানের জন্য যথাযথ নীতিমালা ও কর্মসূচি গ্রহণের জন্য সরকারের একটি পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয় রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন একজন পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রী। একজন সচিব ও একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন যুগ্ম সচিবসহ কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর বহর নিয়ে চলছে এ মন্ত্রণালয়টি। মন্ত্রণালয়টির অধীনে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। কিন্তু তাদের মাধ্যমে কি দেশের জনসংখ্যা জনসম্পদ তৈরি হচ্ছে এবং বেকার সমস্যা সমাধানে যথাযথ নীতিমালা, কর্মসূচি ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে?
২০২২ সালে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার কর্মক্ষম জনশক্তিকে যথাযথ কাজে নিয়োগ দিয়ে কর্মসংস্থান করে দিতে পারলেই দেশ এগিয়ে যেতে পারে এবং দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব- এ লক্ষ্যে একটি জাতীয় কর্মসংস্থান নীতি-২০২২ প্রণয়ন করে। সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ‘জাতীয় কর্মসংস্থান নীতি-২০২২’ প্রণয়ন করেছে। জাতীয় কর্মসংস্থান নীতির ভূমিকায়ই বলা হয়েছে, কর্মসংস্থানের সাথে একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্যবিমোচন নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।
আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় ২২ লাখ জনবল শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। এটা বাংলাদেশের জনমিতিক মুনাফার সুযোগ গ্রহণের মোক্ষম সুযোগ। কর্মক্ষম ও বিপুল জনসংখ্যাকে যুগোপযোগী শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে মানবসম্পদে পরিণত করতে পারলেই সম্ভব দেশের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন। বিগত সরকারের কর্মসংস্থান নীতিমালায় বলা হয়েছে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ৩ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্বের অবসান ঘটানোর বিষয়ে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।
কোটি যুবক বেকার ও ছদ্ম বেকার
আমাদের দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ছয় কোটির বেশি। দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ এবং ছদ্ম বেকারের সংখ্যা সোয়া কোটি। এ পরিসংখ্যান হচ্ছে সরকারের, কিন্তু বাস্তবে বেকারের সংখ্যা কয়েক কোটি। দেশে কর্মক্ষম মানুষের জন্য ফরমাল সেক্টরে কর্মসংস্থানের সুযোগ মাত্র ১৫ ভাগ, ইনফরমাল সেক্টরে কাজ করে প্রায় ৮৫ ভাগ মানুষ। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি বছর দেশের অভ্যন্তরে ১৮ লাখ এবং বৈদেশিক কর্মে ৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান করতে হবে।
লাখকোটি বেকারের দেশে কর্মসংস্থান বাড়ার বদলে বরং কমছে। বিশেষ করে বিগত এক দশক ধরে শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ না থাকায় নতুন নতুন শিল্প কারখানা যেমন স্থাপিত হচ্ছে না। অপরদিকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণেও অনেক বড় বড় শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ব্যবসা শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছিল, যার কারণে হাজার হাজার কর্মী তাদের চাকরি হারায়। যেমন ওয়ান গ্রুপ ও মিশন গ্রুপের অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। বিগত ড. ইউনূস সরকারের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও রাজনৈতিক কারণে বেক্সিমকোর মতো বেশ কয়েকটি গ্রুপের শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত রাজনৈতিক কারণে শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে বেকার করার এ নীতি গ্রহণযোগ্য নয়।
অপরদিকে অবকাঠামোগত সুবিধার অভাবেও অনেক সময় অনেক বড় বড় শিল্প কারখানার উৎপাদন কমে গেলে কর্মী ছাঁটাই করা হয়। যেমন- এ বছরের ঈদের ছুটির পর সাভারে আল-মুসলিম গ্রুপের ৭ পোশাক কারখানার মোট ১ হাজার ৮৬৮ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। শুধু আল-মুসলিম নয়, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ছয়টি শিল্পাঞ্চলে কয়েক হাজার শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে।
একদিকে ছাঁটাই হচ্ছে; অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গতি কম থাকায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে কমÑ মত বিশ্লেষকদের। তাতে বেকার পরিস্থিতি আগের চেয়েও খারাপ হচ্ছে। ২০২৪ সাল শেষে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ। তার আগের বছর ২০২৩ সাল এ সংখ্যা ছিল সাড়ে ২৫ লাখ। গত বছরের হিসাব এখনো প্রকাশ করেনি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিসি)।
রাষ্ট্রের বিভিন্ন দফতর ও বিভাগে প্রায় পাঁচ লাখ পদ শূন্য
দেশে লাখ লাখ কর্মক্ষম মানুষ বেকার। অথচর রাষ্ট্র ও সরকারে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দফতর, বিভাগ, কর্পোরেশন, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ইত্যাদি সেক্টরে হাজার হাজার পদ শূন্য। এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে যে, বর্তমানে সরকারের বিভিন্ন পদে চার লাখ ৬৮ হাজার পদ শূন্য রয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে ১৪ লাখ ৫০ হাজার ৮৯১ জন কর্মরত আছেন এবং বিপরীতে এই বিশালসংখ্যক পদ ফাঁকা রয়েছে। জাতীয় সংসদে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী কর্তৃক উপস্থাপিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী শূন্য পদের বিভাজনটি হচ্ছে, প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার শূন্য পদ হচ্ছে ৬৮ হাজার ৮৮৪টি, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১ লাখ ২৯ হাজার ১৬৬টি পদ তৃতীয় শ্রেণিতে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৯টি পদ এবং চতুর্থ শ্রেণির ১ লাখ ১৫ হাজার ২৩৫টি পদ শুণ্য রয়েছে।
টেক্সটাইল সেক্টরে ভারতীয়
বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক (RMG) খাতে কতজন ভারতীয় কাজ করেন, তার কোনো সঠিক সরকারি পরিসংখ্যান বা ডাটাবেজ নেই। তবে বিভিন্ন গবেষণামূলক সংস্থা, পোশাকশিল্প সংশ্লিষ্ট সংগঠন (BGMEA) এবং গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সংখ্যা ১ লাখেরও বেশি বলে ধারণা করা হয়। এই ভারতীয় কর্মীরা মূলত টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার, প্রোডাকশন ম্যানেজার, ডায়িং ও ফিনিশিং বিশেষজ্ঞ এবং মার্চেন্ডাইজার হিসেবে কাজ করছেন। তবে শুধু ভারতীয়ই নয়, কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানেরও একটি বড় সংখ্যার কর্মকর্তা বাংলাদেশের টেক্সটাইল সেক্টরে চাকরি করেন। সরকারের কর্মসংস্থান নীতিমালা যথাযথ হলে টেক্সটাইল সেক্টরে বিদেশি তথা ভারতীয়দের বদলে দেশের লাখ লাখ যুবকের কর্মসংস্থান করা সম্ভব।
যুগান্তর পত্রিকায় গত ১০ জুন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি হিসাবে এই মুহূর্তে দেশে প্রায় ২৫ হাজার বিদেশি নাগরিক অবস্থান করছেন। এদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিক সবচেয়ে বেশি। তাদের সংখ্যা সাড়ে ৮ হাজার। তারা অবৈধভাবে বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করছেন। তবে প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ চায়, নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে অবৈধ ভারতীয়দের সেই দেশে হস্তান্তর করতে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে ইতোমধ্যে ভারতকে বেশ কয়েকটি চিঠি দিয়েছে সরকার। কিন্তু এসব চিঠিকে খুব একটা পাত্তা দিচ্ছে না ভারত। অথচ বাংলাদেশে অবস্থানরত ভারতের অবৈধ নাগরিকদের ফেরত নেওয়ার কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না।
কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় মেধাবীদের দেশত্যাগ
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী এবং দক্ষ পেশাজীবী উচ্চশিক্ষা ও স্থায়ী বসবাসের উদ্দেশ্যে দেশত্যাগ করছেন। ইউনেস্কোর (UNESCO) গ্লোবাল ফ্লো অব টারশিয়ারি লেভেল স্টুডেন্টসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি বছর গড়ে ৫২,০০০ থেকে ৫৭,০০০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। এই প্রবণতা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, যা দেশের জন্য একটি বড় ‘মেধা পাচার’ বা ব্রেইন ড্রেন (Brain Drain) হিসেবে দেখা দিয়েছে।
মেধাবীদের দেশত্যাগের এই পরিসংখ্যান সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো
⁠ইউনেস্কোর (UNESCO) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, কেবল ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে রেকর্ড ৫২,৭৯৯ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়েছেন। এর আগের বছরগুলোয়ও এই সংখ্যা প্রায় ৫৭ হাজারের কাছাকাছি ছিল।
বাংলাদেশি মেধাবীদের প্রথম পছন্দ যুক্তরাষ্ট্র (USA)। ওপেন ডোরস ডাটার তথ্যানুসারে, এক বছরেই যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২৮% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি এবং জাপানেও প্রচুর মেধাবী শিক্ষার্থী যাচ্ছেন।
শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দেশের শীর্ষস্থানীয় ডাক্তার, প্রকৌশলী (ইঞ্জিনিয়ার), বিজ্ঞানী, আইটি বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিপুল সংখ্যায় দেশ ছাড়ছেন। এদের একটি বড় অংশ বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে আর দেশে ফিরে আসছেন না।
মেধাবীদের দেশত্যাগের মূল কারণ হচ্ছে যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়নের অভাব, চাকরিতে লবিং, স্বজনপ্রীতি বা সিস্টেমের ত্রুটির কারণে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই কর্মক্ষেত্রে সঠিক মূল্যায়ন পান না।
মেধাবীদের গবেষণার সুযোগ ও ফান্ডের অভাব, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য ল্যাবরেটরি সুবিধা এবং পর্যাপ্ত বাজেট বা পিএইচডি ফেলোশিপের তীব্র সংকট রয়েছে। দেশে মানসম্মত কর্মসংস্থানের অভাব এবং উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা না থাকা। এই বিশালসংখ্যক মানবসম্পদ হারানোর ফলে দেশ দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ পেশাদার ও গবেষক সংকটে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বেকারত্বের সামাজিক প্রভাব
বাংলাদেশে বেকার সমস্যার কারণে সমাজে বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, যার মধ্যে হতাশা ও মানসিক অবসাদ, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি, মাদকাসক্তি এবং বিবাহে বিলম্ব অন্যতম। কর্মহীনতার ফলে যুবসমাজের একটি বড় অংশ বিপথগামী হচ্ছে, যা সার্বিক পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
বেকারত্বের কারণে সমাজে অনেক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে; বিশেষ করে বেকার যুবকদের মধ্যে হতাশা থেকে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়ে, অপরাধ ও সহিংসতা বাড়ে, মাদকাসক্তি ও অনৈতিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়, সামাজিক অবক্ষয়, বিবাহ বিলম্বিত হয় এবং পারিবারিক জটিলতা তৈরি হয়।
দীর্ঘমেয়াদি কর্মহীনতা তরুণদের মাঝে আত্মবিশ্বাস ও মানসিক স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করে। এমনকি এটি অনেক সময় চরম মানসিক অবসাদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বেকারত্বের ফলে জীবিকার তাগিদে অনেকেই ছিনতাই, চুরি এবং সাইবার ক্রাইমসহ নানা অবৈধ কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ছে। কর্মহীনতার অলস সময় কাটাতে এবং হতাশা থেকে বাঁচতে অনেক তরুণ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে, যা সমাজে পারিবারিক কলহ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে।
বেকারত্বের কারণে পরিবারগুলোয় আর্থিক টানাপড়েন তৈরি হয়, যা সমাজকে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রের দিকে ঠেলে দেয় এবং ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ায়। যুবসমাজের এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রান্তিকীকরণ সামগ্রিক সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটায় এবং সামাজিক সুরক্ষাকে হুমকির মুখে ফেলে।
কর্মসংস্থান না থাকায় সমাজের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। অন্যদিকে যুবক অবিবাহিতদের বিয়ের বয়স পেরিয়ে যায় তথা বিবাহ বিলম্বিত হয় এবং দাম্পত্য জীবনে নানা ধরনের অশান্তি সৃষ্টি হয়।
কোন দর্শনে কর্মসংস্থান নীতিমালা প্রণয়ন
বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার একটি কর্মসংস্থান নীতিমালা প্রণয়ন করে গিয়েছে, যেটা বিগত দুই বছরে কোনো পরিবর্তন বা পরিবর্ধনের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কিন্তু এ কর্মসংস্থান নীতিমালার দর্শন কী, তার কোনো উল্লেখ নেই। অবশ্য বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির যথাযথ কোনো দর্শন নেই বললেই চলে। অনেকটা গোঁজামিল দিয়ে তৈরি চার মূলনীতিকেই রাষ্ট্রের দর্শন হিসেবে বলা হয়ে থাকে। বিগত ৫৫ বছরে এ চার মূলনীতি অবশ্য বেশ কয়েকবার পরিবর্তন করা হয়েছে। যেমন কোনো একসময় ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দিয়ে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসকে প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল, পরবর্তীতে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ আবার ধর্মনিরপেক্ষতাকেই ফিরিয়ে আনে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর প্রথমে চার মূলনীতি ছিল- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এ চার মূলনীতি হচ্ছে পরস্পরবিরোধী। যার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের কর্মসংস্থান নীতিমালা থেকে শুরু করে অধিকাংশ নীতিমালা ও কর্মকৌশল বাস্তবমুখী যেমন হয় না, তেমনিভাবে ফলপ্রসূ হচ্ছে না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শিল্প ও বাণিজ্য পরিচালিত হয় বেসরকারি উদ্যোগে; অপরদিকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিচালিত হয়ে থাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে। তাই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অধিকাংশ কর্মসংস্থান হয়ে থাকে রাষ্ট্র ও সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানে। আমাদের দেশে এ দুই দর্শনের কোনটিকে নেয়া হয়েছে তার কোনো লিখিত বক্তব্য নেই।
অগ্রাধিকার পাবে কারা- নারী নাকি পুরুষ?
আমাদের দেশে সরকারি চাকরি তথা কর্মসংস্থানের চাহিদাই বেশি। তার কারণ হচ্ছে সরকারি চাকরি স্থায়ী হয় এবং সুযোগ-সুবিধা বেশি। তাই যুবক-যুবতী বেকারদের সরকারি চাকরি করার দিকে চিন্তা ও আগ্রহ বেশি। সরকারি চাকরি না পাওয়ার পরই তারা বেসরকারি চাকরি করতে বাধ্য হয়। কিন্তু সরকারি চাকরিতে রাষ্ট্রের বিভিন্ন নীতিমালা ও বিধিতে মহিলাদের অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। এতে করে মহিলারা সহজে চাকরি পেলেও বেকার যুবকদের একটি বড় অংশের কর্মসংস্থান হচ্ছে না। এতে করে দেখা গেছে, সমাজে অবিবাহিত চাকরিজীবী থাকলেও প্রচুর বেকার যুবক ছেলে যারা বোহেমিয়ান জীবনযাপন করছে। এ চাকরির অগ্রাধিকার নিয়ে বাংলাদেশের এক সময়ের ধনাঢ্য ব্যক্তি ইসলাম গ্রুপের চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলামের একটি নীতি উল্লেখ করা যায়। ইস্টার্ন হাউজিং ও জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজসহ অসংখ্য শিক্ষা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা তিনি। তার প্রতিষ্ঠানগুলোয় বেকার যুবকদের নিয়োগে অগ্রাধিকার দিতেন। তার যুক্তি ছিল একটি বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হলে চার ধরনের কল্যাণ হয়- প্রথমত, বেকার যুবকটি চাকরি পেয়ে আয়ের পথ খুঁজে পায় এবং বেকারত্বের অভিশাপের অবসান হয়; দ্বিতীয়ত, যুবকটির পিতা-মাতা দুশ্চিন্তামুক্ত হয়; তৃতীয়ত, যুবকটি বিয়ে-শাদী করলে কন্যাদায়গ্রস্ত একটি পরিবার দায়ভারমুক্ত হয় এবং চতুর্থত, যুবকটির বিয়ের মাধ্যমে একটি নতুন পরিবার গঠিত হয়। এটা যদিও জহুরুল ইসলামের নিজস্ব চিন্তা ও দর্শন ছিল, কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশে একটা রূঢ় বাস্তবতা।
কর্মসংস্থান নীতিমালা কী যথাযথ কাজ করছে?
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্য করেই সরকার জাতীয় কর্মসংস্থান নীতিমালা করছেÑ এ প্রশ্ন সমাজচিন্তক ও গবেষকদের। সরকারের একটি মন্ত্রণালয় রয়েছে, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীসহ সচিবদের নেতৃত্বে সচিবালয় ও অনেকগুলো বিভাগ এবং প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তারপরও দেশে কেন কর্মসংস্থান বাড়ছে না এবং বেকার সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। কোটি কোটি কর্মক্ষম জনশক্তি বেকার, লাখ লাখ মেধাবীর দেশত্যাগই তার প্রমাণ যে, রাষ্ট্রের কর্মসংস্থান নীতিমালা অনুযায়ী যথাযথ কাজ হচ্ছে না। দেশ এভাবে চললে দেশের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন কি সম্ভব? সর্বোপরি জনশক্তিকে জনসম্পদে পরিণত করতে না পারা, কর্মক্ষম জনশক্তিকে কাজে লাগাতে না পারা ও পরিশ্রমী এবং মেধাবীদের দেশত্যাগ বন্ধ করতে না পারা আমাদের দেশের জন্য একটি গুরুতর ও বিপজ্জনক সংকট। তাই সরকারকে কর্মসংস্থানের জন্য যথাযথ নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি বাস্তবায়নেও উদ্যোগ নিতে হবে।
সংকট সমাধানে প্রয়োজন সরকারি ও বিরোধীদলের যথাযথ ভূমিকা
জনশক্তিকে জনসম্পদে পরিণত করতে না পারা, কর্মক্ষম জনশক্তির কর্মক্ষমতাকে কাজে লাগাতে না পারা এবং মেধাবী ও পরিশ্রমী জনশক্তির দেশত্যাগের যে প্রবণতা ও গতিধারা চলছে, এতে করে কি দেশের উন্নয়ন সম্ভব হবে? বিশেষজ্ঞদের অভিমত এভাবে জনশক্তির যথাযথ ব্যবহার না করতে পারলে যেমন দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়, তেমনিভাবে ভবিষ্যতে মেধা পাচার রোধ করাও সম্ভব হবে না। তাই সরকারি ও বিরোধীদলকে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্যমুক্ত একটি দেশ গড়তে হলে যথাযথ জাতীয় কর্মসংস্থান নীতিমালা প্রণয়ন করে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি গ্রহণ করে বাস্তবায়ন করতে হবে। জনগণের প্রত্যাশা, বর্তমান বিএনপি সরকার ও প্রধান বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী বেকারত্বহীন দারিদ্র্যমুক্ত একটি উন্নত বাংলাদেশ গঠনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসাথে কাজ করবে।