ভারতে মুসলিম নিপীড়ন : লঙ্ঘিত সংবিধান ও মানবাধিকার


১০ জুন ২০২৬ ২২:০০

॥ ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম ॥
ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচিত। দেশটির সংবিধান সকল নাগরিকের জন্য ধর্মীয় স্বাধীনতা, আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করে। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, বৈষম্য, ঘৃণামূলক বক্তব্য এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ঘটনাগুলো দেশটির সাংবিধানিক আদর্শ ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ভারত সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা (UDHR) এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (ICCPR)-এর নীতিমালা মেনে চলার অঙ্গীকার করেছে। এসব নথি ধর্মীয় স্বাধীনতা, সমঅধিকার এবং বৈষম্যমুক্ত জীবনের নিশ্চয়তা দেয়।
মানবাধিকার রক্ষার স্বার্থে যেকোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংঘটিত নির্যাতন, বৈষম্য বা ঘৃণামূলক কর্মকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি তার সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার মধ্যেই প্রতিফলিত হয়।
কোনো রাষ্ট্রের সভ্যতার মানদণ্ড নির্ধারিত হয় তার জনগণের প্রতি আচরণ এবং সকল নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার মাধ্যমে। ভারত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেকে সভ্য, সুশীল, ধর্মনিরপেক্ষ ও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচিত করার চেষ্টা করে। পাশাপাশি নিজেকে তারা আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টার কোনো কমতিই রাখছে না। কিন্তু সুশীল, ধর্মনিরপেক্ষ ও বৃহত্তর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র দাবি করলেও ভেতরে ভেতরে ভারত পচে তো গেছেই, এখন উগ্র হিন্দুত্ববাদের তীব্র সাম্প্রদায়িক দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। প্রতিদিনই দেশটির কোথাও না কোথাও মুসলমানদের ওপর তীব্র নিপীড়নের নির্মম খড়গ নেমে আসছে।
সংখ্যালঘু মুসলমানদের স্বাভাবিক জীবনকে পর্যন্ত তারা দুর্বিষহ করে তুলছে। ঈদ, নামাজ, রোজা, ইফতার, জুমা, হিজাব, বোরকা, এককথায় মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনের সবকিছুর মধ্যেই উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো থেকে শুরু করে রাষ্ট্র ও প্রশাসন সবাই একযোগে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নেমে পড়েছে। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অস্ত্রে নয়, বরং নাগরিকদের প্রতি তার ন্যায়পরায়ণ আচরণে নিহিত। যে রাষ্ট্র জনগণের মর্যাদা রক্ষা করে, সেই রাষ্ট্রই সভ্যতার সর্বোচ্চ পরিচয় বহন করে।
আমরা প্রায়ই বিভিন্ন ভিডিওতে দেখি, জুমার দিন মসজিদে জামাতের জন্য জায়গা না পাওয়ায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করলে সেই মুসল্লিকেও পুলিশ সদস্যরা নামাজরত অবস্থাতেই লাথি দিচ্ছে। মুসলিম মেয়েরা হিজাব পরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মক্ষেত্রে গেলে সেখানেও হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীরা হিজাব নিয়ে টানাহেঁচড়া করে।
এই যে দশকের পর দশক ধরে দেশটির রাজনৈতিক পরিসরে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ক্রমেই বেড়ে চলছে, নিগৃহীত হচ্ছে ভিন্নধর্মী মানুষ, সমাজের বিভিন্ন স্তরে মেরুকরণ, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি ভীষণ জোরালো হচ্ছে, এগুলো কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এসব একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রবণতার অংশই।
একটা দেশ ধর্মনিরপেক্ষ ও বৃহত্তর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র দাবি করার পরও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে নামাজ পড়ার জন্য শাস্তি দিতে পারে, মানে হিন্দুদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছেন! চিন্তা করেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কোনো ঘটনা আছে কি না, যেখানে পূজা করার অপরাধে কোনো হিন্দু ধর্মাবলম্বী ব্যক্তি কিংবা শিক্ষকের শাস্তি হয়েছে? এজন্য বলা হয়, ‘কোনো দেশের উন্নতি শুধু অবকাঠামোয় নয়; জনগণের অধিকার, নিরাপত্তা ও সম্মানের নিশ্চয়তায় তার সভ্যতা প্রতিফলিত হয়।’
শুধু তা-ই নয়, আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান গত ৩ জুন তার একটি কলামে উল্লেখ করেন যে, গত রমজানেই তিনজন মুসলিম যুবক গঙ্গা নদীতে ইফতার করার অপরাধে জেলে যেতে হয়েছে। তাদের প্রতিও ইফতারের পরে মুরগির উচ্ছিষ্ট ফেলে গঙ্গার জল অপবিত্র করার অভিযোগ আনা হয়েছে। আর এতে ৬৩ দিন তাদের জেলও খাটতে হয়েছে! অথচ গঙ্গার অবস্থা কেমন, সেটা তো আমরা কমবেশি সবাই জানি। সেসব নিয়ে এসব উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের মাথাব্যথা দেখা না গেলেও কিন্তু মুসলিম ছেলেদের ইফতারে ঠিকই তাদের কথিত ধর্মীয় অনুভূতি জেগে ওঠে। এটা যে নিছক ধর্মীয় অনুভূতি না, মুসলিমবিদ্বেষ, সেটা কি বলার প্রয়োজন আছে?
ভারতে মুসলিম প্রশ্ন : সাংবিধানিক আদর্শ বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে স্বাধীনতা কেবল একটি শব্দে পরিণত হয়। সংবিধান জনগণের অধিকার রক্ষার ঢাল, আর আইনের শাসন তার কার্যকর প্রয়োগের নিশ্চয়তা। নাগরিকের অধিকার রাষ্ট্রের অনুগ্রহ নয়; এটি সংবিধান প্রদত্ত ও আইনসিদ্ধ অধিকার।
ভারতের সংবিধান বরাবরই নিপীড়ন ও বৈষম্যমূলক। তবুও যতটুকু নাগরিক সমতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বৈষম্যহীনতার নিশ্চয়তা রয়েছে তাতে, বাস্তব রাজনৈতিক পরিবেশে এটুকুর প্রয়োগও বারবার ব্যাহত হচ্ছে। যেমন ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪-তে বলা হয়েছে, আইনের দৃষ্টিতে সকলের সমতা।
১৫-তে ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ লেখা আছে এবং আর্টিকেল ২৫ অনুযায়ী ধর্ম পালন ও প্রচারের স্বাধীনতা থাকতে হবে। এটুকুও তারা বাস্তবায়ন করছে না। সুতরাং যে রাষ্ট্র তার নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করে, সেই রাষ্ট্রই প্রকৃত গণতন্ত্রের ধারক। আইনের চোখে সকল নাগরিক সমানÑ এই নীতিই সভ্য রাষ্ট্রের ভিত্তি। সংবিধান কেবল একটি দলিল নয়; এটি জনগণের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের অঙ্গীকার। জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে সংবিধানের চেতনা আহত হয়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব হলো আইন ও সংবিধানের আলোকে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা। অধিকারবঞ্চিত নাগরিক গণতন্ত্রকে দুর্বল করে, আর অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। তাই সংবিধানের মর্যাদা রক্ষার সর্বোত্তম উপায় হলো জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা।
মুসলিম নিধনের ইতিহাস
আমাদের দেশের কতিপয় সেক্যুলার দাবি করেন, ভারতে নাকি ইদানিংই এসব হচ্ছে। ব্যাপারটি কি আসলেই তাই? না, ব্যাপারটা সেরকম না। ভারতের অভ্যন্তরীণ সামাজিক বাস্তবতায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ইতিহাস নতুন না। ১৯৮৩ সালের নেলি, ভাগলপুর, বোম্বে, হাশিমপুরা, মুজাফফরনগর এবং ২০২০ সালের দিল্লি গণহত্যা- এগুলো নিয়ে তো সারা দুনিয়া তোলপাড় হয়েছে। এসব ঘটনাকে ঘিরে মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন পর্যবেক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগও প্রকাশ করেছে। ২০০২ সালের গুজরাট গণহত্যায় তো এই বিতর্ককে আরও গভীর করে তোলে, যেখানে সরকারি হিসাবে বিপুল প্রাণহানির ঘটনা ঘটে এবং পরবর্তী সময়ে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তীব্র আলোচনা হচ্ছে। গুজরাট রাজ্যের সেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় অন্তত ৫ হাজার মুসলমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। মহিলাদের জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। একইভাবে মুসলিম শিশুদেরও পুড়িয়ে মারা হয়। মুসলমানদের বাড়িঘর লুট করা হয় এবং আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। দাঙ্গাকারীরা ‘মুসলমানরা ভারত ছাড়ো’ স্লোগান দিয়ে হামলা চালায়। তারা এ স্লোগান মুসলমানদের বাড়িঘরে লিখে রাখে।
এগুলোর নেতৃত্বও সাধারণ কেউ দেয়নি, বরং আজকের ভারতের প্রধানমন্ত্রী যিনি, তিনিই দিয়েছেন। এগুলো কি ধর্মনিরপেক্ষতা কিংবা গণতন্ত্র?
গণতন্ত্র কখন শক্তিশালী হয়?
গণতন্ত্র তো তখনই শক্তিশালী হয়, যখন রাষ্ট্রের সংখ্যালঘুরা নিজেদের সমান নাগরিক হিসেবে অনুভব করতে পারে। যেই রাষ্ট্রের নাগরিক নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে ধর্মীয় বিধান পালন করতে পারে না, জুমার সালাত কিংবা কুরবানির মতো ইবাদত পালন করতে পারে না, সেখানে নাগরিকরা নিজেদের কীভাবে সমান অনুভব করবে?
যেই রাষ্ট্র নিজেদের সবচেয়ে বড়ো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচয় দেয়, সেই রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড একজন মুসলিম নিধনকারী হিসেবে ফুটে উঠেছে। সেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ মুসলমানদের বহিরাগত প্রমাণ করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিতে তৎপরতা চালাচ্ছে। জয় শ্রীরাম স্লোগান দিয়ে ধর্মীয় স্থাপন ভেঙে ফেলা, মুসলমানদের পিটিয়ে মারা, মুসলিম মহিলাদের ধর্ষণ করা, হিজাব টেনে ছিঁড়ে ফেলা, এগুলো কোন ধরনের ধর্মনিরপেক্ষতা ও কোন ধরনের গণতন্ত্র?
প্রতিবেশী সম্পর্ক : শক্তি বনাম আস্থা
ভারতের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তার প্রভাবশালী অবস্থান। কিন্তু এই প্রভাব কখনোই আস্থায় রূপান্তরিত হয়নি। নেপাল, মালদ্বীপ, চীন, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ সবার সাথেই ভারতের খারাপ সম্পর্ক, উত্তেজনা ও সন্দেহ বিদ্যমান। একটি রাষ্ট্রের শান্তি ও নিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভর করে তার প্রতিবেশীদের প্রতি ন্যায়সঙ্গত আচরণের ওপর। সুপ্রতিবেশী সম্পর্ক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে নয়, পারস্পরিক সম্মান ও অধিকার রক্ষার মাধ্যমে গড়ে ওঠে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অধিকারকে সম্মান করা আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারের মৌলিক ভিত্তি। কিন্তু ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে কতটুকু বিশ্বাস করে, বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সেই প্রশ্নটি দারুণভাবে দেখা দিয়েছে।
প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অধিকার লঙ্ঘন করে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমতা ও সহযোগিতাই সুপ্রতিবেশী সম্পর্কের মূলমন্ত্র।
‘একটি রাষ্ট্রের মহত্ত প্রকাশ পায় তখনই, যখন সে নিজের স্বার্থের পাশাপাশি প্রতিবেশীর ন্যায্য অধিকারকেও মূল্য দেয়।’ ভারত এই অঞ্চলের মোড়ল হতে চায়। নেতৃত্ব দিতে চায়। অথচ আঞ্চলিক নেতৃত্ব কেবল শক্তির ওপরই দাঁড়াতে পারে না; তা দাঁড়ায় পারস্পরিক সম্মান ও সমমর্যাদার ওপর। এই জায়গায় ঘাটতি থাকলে শক্তি দিয়েও কখনো নেতৃত্বে দেওয়া যায় না, বরং প্রভাব খাটাতে গেলে আস্থাহীনতা ও শত্রুতাই বরং বেশি বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশের সাথে ভারত বিমাতাসুলভ সম্পর্ক
ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী তারাই। তাদের সাথে হওয়া উচিত ছিল সবচেয়ে সুন্দর এবং উত্তম সম্পর্ক। কিন্তু ভারত বাংলাদেশের সাথে সবচেয়ে বেশি বৈষম্য, জুলুম ও খারাপ আচরণ করে আসছে।
বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদকে টিকিয়ে রাখা
বাংলাদেশে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে অগণতান্ত্রিক ফ্যাসিস্ট এক সরকারকে ইন্ডিয়াই শেল্টার দিয়ে টিকিয়ে রেখেছিল। তারা নিজের উদ্যোগেই আওয়ামীদের দ্বারায় এদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক সকল অধিকার বছরের পর বছর কেড়ে নিয়েছিল। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানিবণ্টন, অভিবাসন এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব- এসব ইস্যু ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কে বারবার টানাপড়েন তৈরি করেছে। আমাদের সীমান্তে নির্বিচারে পাখির মতো মানুষ মারার কথা কে না জানে? যেভাবে আমাদের নাগরিকদের তারা হত্যা করে, এভাবে কি চীন কিংবা পাকিস্তানের সাথে পারে তারা? শুধু তা-ই নয়, ভারত খুনিদের আশ্রয়দাতা হিসেবেও নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করছে।
শহীদ হাদি : দেশপ্রেমিক অ্যাক্টিভিজমের জন্য খুন
তাদের সমালোচনার জন্য সাধারণ এক তরুণ, শহীদ ওসমান হাদির মতো একটি অরাজনৈতিক ছেলেকেও ছেড়ে দিলো না। নির্মমভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে খুন করেছে। শুধু খুন করেই চুপ থাকেনি, খুনিদের আশ্রয় দিয়েছে। এগুলো কেবলই অনুমান নয়, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির স্বীকৃতি এবং তিনি এই স্বীকৃতিতে তাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকেই দায়ী করেছেন একরকম।
পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা কলকাতার ধর্মতলায় এক রাজনৈতিক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে দাবি করেন, হাদি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কারা জড়িত ছিল এবং কার নির্দেশে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, এর সবকিছু তিনি জানেন।
শরীফ ওসমান হাদি ছিলেন ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী জনমত গঠনে এক সোচ্চার কণ্ঠ। ফলে তিনি ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের টার্গেট হওয়া অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। অমিত শাহর ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক আক্রোশের কারণে তাকে হত্যা করার কোনো কারণ নেই। ভারতের কথিত স্বার্থের বিরুদ্ধে কথা বলেন, এমন মানুষদের বিশ্বের নানা অঞ্চলে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়েছে। গুপ্তহত্যার জন্য বিশ্বজুড়ে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ইতোমধ্যে যথেষ্ট কুখ্যাতি অর্জন করেছে। এ ধরনের গুপ্তহত্যার কাজে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংযোগ আছে- এমন অপরাধী চক্রকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তিনটি দেশে এ ধরনের ঘটনার উদাহরণ থেকে আমরা বিষয়টি সহজে বুঝতে পারব।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো সমালোচনা হজম করতে পারা। অথচ একটা সাধারণ ছেলেকে, যে কোনো বড় রাজনৈতিক নেতা কিংবা কর্মীও না, তাকে নির্মমভাবে ইন্ডিয়ার হাইকমান্ডের জানাশুনার মাধ্যমেই খুন করা হয়েছে। খুনিকে নিরাপদ আশ্রয় পর্যন্ত দিয়েছে।
এছাড়া জামায়াত নেতৃবৃন্দের খুনের কথা আর না-ই বা বললাম। তাদের ইশারা ছাড়া তাদের তাঁবেদার আওয়ামীরা কি কস্মিনকালেও এই সাহস করতো? আওয়ামীরা ভারতের দাসত্বের সর্বোত্তম নাজরানা পেশ করতে এবং তাদের ক্ষমতার খায়েশ দীর্ঘায়িত করতে, সৎ-যোগ্য দেশপ্রেমিক এই মানুষগুলো খুন করেছে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানে ভারত তার সেবাদাস আওয়ামীদের পতনের পরে তাদের ঠিকই নিজের কোলে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে। এভাবে প্রতিটি পদে পদে প্রতিবেশীদের সাথে বৈরী আচরণ করে ভারত কী হাসিল করতে চায়? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা। অথচ ইন্ডিয়া তার নাগরিকদের সাথেই বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে জুলুম করছে।
ভারতের একগুঁয়েমি, জুলুম : ১৯৪৭-থেকে বর্তমান
উপমহাদেশে ইংরেজদের অবৈধ দখলের পর থেকে ইন্ডিয়ার হিন্দুত্ববাদী চিন্তায় পরিপুষ্ট নেতৃবৃন্দ তাদের দালালি করে এসেছে। ইংরেজদের সাথে হাত মিলিয়ে নামকাওয়াস্তের মুসলিম কিংবা মুসলিম নেতৃবৃন্দের সাথেও অবিচার করেছে কিংবা করার চেষ্টা করেছে।
এরপর একটা সময় স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে থাকা। ইন্ডিয়ার তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃবৃন্দও, যারা নিজেদের সেক্যুলার, ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দাবি করে, তখনো তারা মুসলমানদের সাথে বৈষম্যের চেষ্টা করে। অনেক মুসলিম নেতৃবৃন্দ কংগ্রেসের রাজনীতি করতে গিয়েও এসব অবিচারের জন্য করতে পারেনি। ফলে মুসলিম লীগের সৃষ্টি।
যদি কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ বৈষম্য ও অবিচারমূলক আচরণ না করতেন, তাহলে হয়তো পাকিস্তান-ভারত আলাদা নাও হতে পারতো। মূলত পাক-ভারত বিভাজন ছিল দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এক গভীর রাজনৈতিক মোড়। পাকিস্তান সৃষ্টি ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক অনাস্থা, প্রতিনিধিত্ব সংকট এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের ফলাফল। এই ইতিহাস আজও প্রাসঙ্গিক, কারণ এটি দেখায়Ñ রাষ্ট্র যখন আস্থার সংকট সমাধান করতে ব্যর্থ হয়, তখন বিভাজন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
আজকে যেই ভূখণ্ড নিয়ে ভারত গঠিত, সেখানেও তারা প্রতিটি পদে পদে জুলুম, অবিচার, নিষ্পেষণ চালিয়ে যাচ্ছে। সেভেন সিস্টার্স, কাশ্মীর, বাংলাদেশের সীমান্ত, কোথাও ইন্ডিয়া তার আগ্রাসী আচরণ কিংবা জুলুমের প্রকাশ ঘটায়নি? ইন্ডিয়া যদি সচেতন না হয়, পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে না চলে, তাহলে ইন্ডিয়া জুলুম করে, আধিপত্যবাদী আচরণ দিয়ে কয়দিন চলতে পারবে?
সহজ কথা হলো, ভারত আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে দুটি পথ স্পষ্টÑ একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে আরও দৃঢ় করা, অন্যটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মাধ্যমে আরও মেরুকরণের দিকে অগ্রসর হওয়া। এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে এই পথচয়নের ওপর। কারণ এই অঞ্চলে ভারতের ভূমিকা শুধু একটি রাষ্ট্র হিসেবেই নয়- এটি পুরো আঞ্চলিক কাঠামোর ভারসাম্যের সঙ্গে যুক্ত। সে যদি এই ভারসাম্য নষ্ট করে, তবে তার দায়ভার তাকেই নিতে হবে।
তবে সত্য হলো ইতিহাস দেখিয়েছে, কোনো রাষ্ট্র যদি দীর্ঘদিন জনগোষ্ঠীর পরিচয়, ধর্মীয় অনুভূতি বা রাজনৈতিক অধিকারকে উপেক্ষা করে, তাহলে তার ফল ভোগ করতে হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেতরেও মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নানা ধরনের নিয়ন্ত্রণ ও নিপীড়নের অভিযোগ ছিল। পরবর্তীতে সেই বিশাল রাষ্ট্র ভেঙে যায় এবং মধ্য এশিয়ায় একাধিক মুসলিম রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ভারতও তা অব্যাহত রাখলে রাষ্ট্রটি ভেঙে টুকরো হয়ে যাবে।
কোনো রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি কখনোই শুধু সামরিক বা অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা নির্ভর করে জনগণের আস্থা, ন্যায়বিচারের বাস্তব প্রয়োগ এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমমর্যাদার সম্পর্কের ওপর। এজন্য বলা হয়, সীমান্ত ভাগ করা যায়, কিন্তু পারস্পরিক দায়িত্ব ও সহাবস্থানের প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। প্রতিবেশীর প্রতি ন্যায়বিচার আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত। ভালো প্রতিবেশী হওয়া কেবল কূটনীতির বিষয় নয়; এটি নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধেরও পরিচয়।
এই আস্থা যত দুর্বল হবে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও তত বেশি অনিশ্চিত হবে। ভারত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থেই সকল অন্যায় থেকে ফিরে আসতে হবে।