মুসলমানদের হারানো জমির মালিকানা ফিরে পাবার ইতিবৃত্ত
২১ মে ২০২৬ ১০:৩৬
॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
১৭৫৭ সালে বাংলা দখল করার পর একপর্যায়ে মুসলিমদের জমির মালিকানাও কেড়ে নিয়েছিল ব্রিটিশরা। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের নামে এক কালো আইনের মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার ভূমির মালিকানা স্থায়ীভাবে হিন্দু জমিদারদের হাতে তুলে দেয়। ব্রিটিশদের কথিত ভূমি আইনের মাধ্যমে বাংলার মুসলিমরা নিজেদের জমি হারিয়ে প্রজা হয়ে পড়ে। ব্রিটিশরা জমিদারতন্ত্র চালু করলে মুসলিমদের জমিজিরাত সব হিন্দু জমিদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ব্রিটিশ বেনিয়া ও হিন্দু জমিদারদের বেআইনি সিদ্ধান্তে মুসলিমরা নিজ দেশেই পরবাসী হয়ে পড়েছিল, যা ছিল সম্পূর্ণ অন্যায় ও বেআইনি। জমিদারদের জমির মালিকানার বিনিময়ে ব্রিটিশদের নির্দিষ্ট পরিমাণে কর দিতে হবে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জমিদারদের এমন অধিকার দেয় যে, জমিদাররা নিজের ইচ্ছামতো কৃষক প্রজাদের ওপর করারোপ করতে পারতো। এ আইনের বলে হিন্দু জমিদাররা মুসলিমদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন করেই অতিরিক্ত কর আদায় করতো। আজ থেকে ৭৫ বছর আগে পাকিস্তান সরকার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন বাতিল করলে মুসলিমরা তাদের জমির মালিকানা পুনরায় ফিরে পায়। জমিদারি উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইন পাসের মাধ্যমে হিন্দু জমিদারদের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটে। ১৯৫০ সালে জমিদারি উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইন-১৯৫০ পাস করা হয়। ১৯৫০ সালের মে মাসে আইনটি পাস করার পর কার্যকর হয় ১৯৫১ সালে মে মাসেই।
মুঘল শাসনামলে বাংলার বেশিরভাগ বড় জমিদার ছিলেন মুসলমান। ব্রিটিশদের নির্ধারণ করা উচ্চ কর দিতে হলে প্রজাদের ওপর জমিদারদের অত্যাচার করা ছিল অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু অধিকাংশ জমিদার কৃষকের ওপর অত্যাচার করে উচ্চ কর সংগ্রহ করতে পারতেন না, তাই মুসলিম জমিদাররা দ্রুত জমির মালিকানা হারাতে থাকেন। এ সুযোগে হিন্দু ব্যবসায়ী ও মহাজনরা বাংলার বিভিন্ন এলাকায় ব্রিটিশদের থেকে জমিদারি কিনে নিতে থাকে। ফলে বাংলার মুসলিম জমিদার শ্রেণি কমতে থাকে এবং এক পর্যায়ে শেষ হয়ে যায়। মুসলিমদের পরিবর্তে নতুন এক হিন্দু জমিদার শ্রেণির উদ্ভব ঘটে।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাংলার মুসলমানদের ওপর অন্যতম বড় আঘাত হানে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনের ফলে বাংলার মুসলমানরা শুধু অর্থনৈতিকভাবেই নয়, রাজনৈতিকভাবেও দুর্বল হয়ে পড়ে। জমিদারি হারানোর ফলে মুসলমান অভিজাত শ্রেণির শক্তি কমে যায়, মুসলিম কৃষকদের দারিদ্র্য বাড়ে, ব্যবসা ও প্রশাসনেও মুসলিমদের অবস্থান কমতে থাকে। যেমনটা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশে হয়েছিল।
ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার ‘দ্য ইন্ডিয়ান মুসলমানস’ বইতে উল্লেখ করেন পলাশীর আগে বাংলায় কোনো দরিদ্র মুসলমান পরিবার ছিল না, তার বিপরিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল ১০০ বছর পরে, তখন কোনো অবস্থাসম্পন্ন পরিবার ছিল না। প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ১৮১৪ সালে ঢাকার চৌকিদারি ট্যাক্সের পরিমাণ ছিল ৩০ হাজার টাকা। ১৮৩৬ সালে এটা কমতে কমতে হয় মাত্র ৮ হাজার টাকা। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনের ফলে বাংলার অবস্থাপন্ন মুসলমান পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে যায়।
হিন্দু জমিদাররা যেসব কর গরিব প্রজাদের কাছ থেকে আদায় করতো তা ছিল অবিশ্বাস্য। বলতে গেলে সাধারণ মানুষ ছিল জমিদারদের দাস। স্বপন বসু তার ‘গণঅসন্তোষ ও উনিশ শতকের বাঙালি সমাজ’ বইতে এবং মেসবাহুল হক, ‘পলাশী যুদ্ধোত্তর মুসলিম সমাজ ও নীল বিদ্রোহ’ বইতে হিন্দু জমিদারদের আদায় করা করের কিছু নমুনা উল্লেখ করেছেন। জমির খাজনার বাইরেও তাদের বিভিন্নভাবে ২৬ ধরনের কর দিতে হতো। সে খাতগুলো হচ্ছে-
১. ধুলট : গরুর গাড়িতে মাল পরিবহন করলে ধুলা উড়ত এই অজুহাতে গাড়ির মালিকের কাছ থেকে আদায়কৃত কর। ২. কয়ালী : নৌকায় মাল ওঠানো বা নামানোর সময় আদায়কৃত কর। ৩. খোটাগাড়ৌ কর : ঘাটে নৌকা ভেড়ানোর জন্য প্রদেয় কর। ৪. চৌথ : প্রজা নিজ জমিতে গাছ লাগালে তার ওপর ধার্যকৃত কর। ৫. ইক্ষুগাছ কর : গরিব কৃষক আখের গুড় তৈরি করলে আদায়কৃত কর। ৬. ভাগাড়ে কর : গরু বা মহিষ মারা গেলে মৃত পশু ভাগাড়ে ফেলতে যে কর দিতে হতো। ৭. সেলামি : চাষি নতুন ঘর নির্মাণ করলে বা জমি লিজ নিলে জমিদারকে প্রদেয় অর্থ। ৮. খারিজ দাখিল : জমিদারের খাতায় নাম অন্তর্ভুক্ত বা রেকর্ড সংশোধনের জন্য আদায়কৃত অর্থ। ৯. টহুরী : বছরের শেষে হিসাব-নিকাশের নামে আদায়কৃত অর্থ। ১০. রসদ খরচ : জমিদার, ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মচারীদের আপ্যায়নের খরচ প্রজাদের কাছ থেকে আদায়। ১১. গ্রাম খরচ : গ্রামের উন্নয়ন বা সাধারণ ব্যয়ের নামে আদায়কৃত অর্থ। ১২. ডাক খরচ : ডাক বা সরকারি যোগাযোগ ব্যবস্থার খরচের নামে আদায়। ১৩. পুলিশ খরচ : পুলিশ বা নিরাপত্তা রক্ষার ব্যয়ভার প্রজাদের ওপর চাপানো হতো। ১৪. আয়কর : জমিদারের প্রদেয় আয়কর প্রজাদের কাছ থেকে আদায়। ১৫. ভোজ খরচ : জমিদার বাড়ির ভোজ বা আপ্যায়নের ব্যয় প্রজাদের বহন করতে হতো। ১৬. ভিক্ষা : জমিদারের ব্যক্তিগত ঋণ শোধের জন্য এই নামে অর্থ আদায়। ১৭. গারদ সেলামি : জমিদার কোনো কারণে কারাবন্দি হলে তাঁকে ছাড়িয়ে আনার ব্যয় প্রজাদের কাছ থেকে আদায়। ১৮. বিয়ের সেলামি : জমিদার পরিবারের বিয়ে উপলক্ষে আদায়কৃত অর্থ। ১৯. পার্বণী : পূজা উপলক্ষে আদায়কৃত অর্থ। ২০. তীর্থ খরচ : জমিদার বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের তীর্থযাত্রার খরচের জন্য আদায়কৃত অর্থ। ২১. নাজরানা : জমিদারের সঙ্গে সাক্ষাৎ, আনুগত্য প্রকাশ বা খাজনা আদায়ের সময় প্রদেয় অর্থ বা উপঢৌকন। ২২. দাড়ি কর : মুসলমানরা কেউ দাড়ি রাখলে কর দিতে হতো। ২৩. গোঁফ কর : কোনো মুসলমান গোঁফ খাটো করলেও কর দিতে হতো। ২৪. মসজিদ নির্মাণ কর : যেকনো প্রকারের মসজিদ নির্মাণের আগে মসজিদের আকারের বিচারে ন্যূনতম পাঁচশত থেকে এক হাজার টাকা হারে কর দিতে হতো। ২৫. মুসলিম নামক : মুসলমান নাম রাখলে নামের জন্য কর দিতে হতো ২৬. কালী পূজার চাঁদা : মুসলমান প্রজাদেরও বাধ্যতামূলকভাবে কালীপূজার চাঁদা দিতে হতো।
আমেরিকার দাস প্রভুদের পরই বাংলার হিন্দু জমিদাররা ছিল ইতিহাসের নৃশংসতম শাসকগোষ্ঠী। ১৯৫০ সাল পর্যন্ত বাংলায় এ জমিদারি প্রথা বিদ্যমান ছিল। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পর মুসলিম লীগ সরকার এ জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করতে উদ্যোগ নেয়। মুসলিম লীগ সরকার ১৯৫০ সালে পূর্ববঙ্গ পরিষদে জমিদারি উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব বিল পাস করে। পরদিন অধুনালুপ্ত দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে শিরোনামে লেখে ‘পূর্ববঙ্গের সাড়ে ৪ কোটি অধিবাসীর বুকের ওপর হইতে জমিদারি প্রথার জগদ্দল পাথর অপসারিত; দেশের শোষিত ও নিগৃহীত জনসাধারণের অর্থনৈতিক মুক্তির সূচনা; বৃহস্পতিবার পূর্ববঙ্গ পরিষদে জমিদারি উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব বিল গৃহীত; মুসলিম লীগ ও কায়েদে আজমের বহু আকাঙ্ক্তি স্বপ্নসাধ বাস্তবে রূপায়িত।’
এই গৃহীত বিলটিই ১৯৫১ সালের ১৬ মে গভর্নর খাজা নাজিমুদ্দিন এক সরকারি আদেশে অ্যাক্টে পরিণত করেন। এ প্রজাস্বত্ব আইনের মাধ্যমে ২০০ বছর পরে বাংলার মুসলমানরা আবার জমির মালিকানা ফিরে পায়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই এ আইনের মাধ্যমে বাংলার মুসলমানরা কলকাতার হিন্দু জমিদারের প্রজা থেকে নাগরিক হোন।
১৯৫০ সালের জমিদারি উচ্ছেদ আইন মূলত ‘রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন-১৯৫০’ (The State Acquisition and Tenancy Act, 1950) নামে পরিচিত। ১৯৫০ সালের ১৬ মে আইনটি পাস হলেও এটি মূলত ১৯৫১ সালের ১৬ মে থেকে কার্যকর হয়। এটি কার্যকর হওয়ার পর থেকে প্রজাদের অধিকার নিশ্চিত হয় এবং আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে এক বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়।
আইনটি পাসের পর জমিদারি প্রথা বিলোপ হয়, জমির খাজনা সরকারের অধীনে আসে সর্বোপরি বাংলার কৃষকদের জমির ওপর তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন থেকেই জনগণ ভূমি অফিস তথা ভূমি তহশীল অফিসের মাধ্যমে জমির খাজনা দেয়া শুরু করে।
জমিদারি প্রথা বিলোপ : সব ধরনের মধ্যস্বত্বভোগী, যেমনÑ তালুকদার, ইজারাদার ও জমিদারদের স্বার্থ বা অধিকার সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ করা হয়।
সরাসরি খাজনা প্রদান : মধ্যস্বত্বভোগী উচ্ছেদ হওয়ায় প্রজারা সরাসরি সরকারের অধীনে চলে আসে এবং সরকারের নির্ধারিত তহশীল অফিসে খাজনা জমা দেওয়ার নিয়ম চালু হয়।
জমির সিলিং : একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০০ বিঘা (পরে বিভিন্ন সময়ে সংশোধিত) পর্যন্ত কৃষিজমির মালিক হতে পারতেন। অতিরিক্ত জমি সরকারের খাস খতিয়ানে চলে যায়।
ব্রিটিশদের থেকে মুক্ত হয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাংলার মুসলিমরা বিভিন্ন শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে থাকে।
রায়ত বা প্রজাদের অধিকার : কৃষকরা জমির স্থায়ী, হস্তান্তরযোগ্য ও উত্তরাধিকার সূত্রে ভোগের অধিকার লাভ করে, যার ফলে জমিদাররা ইচ্ছামতো তাদের উচ্ছেদ করতে পারত না।
বাংলার মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ তথা মুসলিম নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে যেমন পূর্ব বাংলা স্বাধীনতা লাভ করে, তেমনিভাবে তাদের উদ্যোগেই জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হয়। পূর্ব বাংলার মুসলিমরা আজাদী লাভ করার পাশাপাশি প্রজা থেকে নাগরিক হয়ে ওঠে। ধনী-গরিব সবাই ভোটাধিকার লাভ করে। অতীতে যেমন করে মুসলিম নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে বাংলার মুসলিমরা হিন্দু জমিদারদের অত্যাচার-নির্যাতন থেকে মুক্তি লাভ করেছে, তেমনিভাবে বর্র্তমান ইসলামী আদর্শের ধারক বাহক নেতৃত্বের মাধ্যমেই এদেশের জনগণ দুনিয়া ও আখিরাতে মুক্তিলাভ করবে, ইনশাআল্লাহ।