মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণে হজ কুরবানির শিক্ষা ও তাৎপর্য
২১ মে ২০২৬ ১০:৩২
॥ ড. এ. এইচ. এম হামিদুর রহমান আযাদ ॥
ইসলাম কেবল কিছু প্রথাগত আচারসর্বস্ব ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন এবং বৈশ্বিক সমাজকাঠামোর আমূল পরিবর্তনের চিরন্তন ইশতেহার। সমকালীন পুঁজিবাদী, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও চরম ভোগবাদী বিশ্বব্যবস্থায় ধর্মীয় বিধানগুলোকে প্রায়ই কেবল ‘ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতা’ বা ‘নির্জীব আচার’-এর ফ্রেমে বন্দি করার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক অপচেষ্টা লক্ষ করা যায়। কিন্তু ইসলামী শরীয়তের দুটি অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ও অনুষঙ্গ হজ ও কুরবানি কেবল নির্ধারিত কিছু শারীরিক ও আর্থিক রীতির সমষ্টি নয়; বরং এটি মুসলিম উম্মাহর সামষ্টিক পুনর্জাগরণ, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক ঐক্য এবং নৈতিক বিপ্লবের এক অনন্য বার্ষিক পাঠশালা। এটি ‘আল্লাহর দেখানো শিক্ষালয়’, যা মুসলিম উম্মাহকে পুনর্জীবিত করা এবং তার শক্তির নবজাগরণ ঘটানোর এক মহান মাধ্যম।
বর্তমান বিশ্ব যখন উগ্র জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, সাম্রাজ্যবাদ বা নব্য-উপনিবেশবাদ এবং করপোরেট পুঁজিবাদের জাঁতাকলে পিষ্ট, যখন উম্মাহর বিভিন্ন অংশ ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত অধঃপতনের মুখোমুখি, তখন জিলহজ মাসের এই বিশেষ বিধানগুলো মূলত উম্মাহর হারানো গৌরব ও আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারের একটি আন্তর্জাতিক ঘোষণাপত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। এটি কেবল পরকালীন নাজাতের একমাত্র উসিলা নয়, বরং ইহকালীন মুক্তি, সামাজিক ইনসাফ, অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও রাজনৈতিক সংহতির এক শক্তিশালী অনুঘটক। এই ইবাদতদ্বয়ের অন্তর্নিহিত দর্শনকে সমকালীন বিশ্ব রাজনীতি ও সমাজতত্ত্বের আলোকে নতুন করে বোঝা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
প্রথমত, হজ উম্মাহর ঐক্য ও বৈশ্বিক শক্তির প্রতীক
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে ‘ন্যাশন-স্টেট’ বা কৃত্রিম ভূ-রাজনৈতিক সীমানা, কাঁটাতারের বেড়া এবং পাসপোর্টের বেড়াজালে মানবজাতিকে টুকরো টুকরো করে বিভক্ত করে রেখেছে, সেখানে হজ এক অখণ্ড বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বেও জানান দেয়। এটি পৃথিবীর বুক চিরে জেগে ওঠা একমাত্র মহাসমাবেশ, যেখানে আধুনিক সভ্যতার তৈরি করা জাতিগত বৈষম্য, ভৌগোলিক সীমানা, ভাষা কিংবা শ্রেণিবৈষম্য সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
পরিচয় ও সংজ্ঞা
‘হজ’ আরবি শব্দ। এর অভিধানিক অর্থ হলো- সংকল্প করা, ইচ্ছা করা, দর্শন করা বা কোনো মহৎ স্থানের উদ্দেশে যাত্রা করা। আর পারিভাষিক অর্থে ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায়Ñ নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত নিয়মে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পবিত্র কাবাগৃহ, আরাফাত ময়দান, মিনা, মুজদালিফা প্রভৃতি বিশেষ স্থানসমূহে অবস্থান এবং শরীয়ত নির্দেশিত নির্দিষ্ট কার্যাদি সম্পাদন করাকে হজ বলে। মহান আল্লাহ সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলিমের ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ করেছেন। পবিত্র কুরআনে এর বাধ্যবাধকতা দিয়ে বলা হয়েছে, ‘আর আল্লাহর উদ্দেশ্যে এ গৃহের হজ করা মানুষের ওপর ফরজ, যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য রয়েছে।’ (সূরা আল ইমরান : ৯৭)।
উদ্দেশ্য ও কিবলার ঐক্য
হজের সবচেয়ে বড় বৈপ্লবিক শিক্ষা হলো এটি মুসলিম উম্মাহর মাঝে এক পরম ও অবিভাজ্য ঐক্যের ভিত্তি গড়ে তোলে। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে, হাজারো ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে মুসলমানরা মক্কায় একত্রিত হয়। তারা নিজেদের বর্ণ, ভাষা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও জাতিগত সংকীর্ণ পরিচয় থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে এক কিবলার (পবিত্র কাবা) দিকে মুখ করে দাঁড়ায়। এই একক কেন্দ্রিকতা কেবল একটি শারীরিক অবস্থান নয়, বরং এটি উম্মাহর মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক ঐক্যের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ।
লাখো মানুষ যখন একই আহ্বানে সাড়া দিয়ে সমস্বরে একই তালবিয়া ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ পাঠ করে, তখন পৃথিবীর সমস্ত কৃত্রিম বিভেদ ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এই ঐক্য উম্মাহকে মনে করিয়ে দেয় যে, তাদের উৎস এক, তাদের যাত্রাপথ এক এবং তাদের চূড়ান্ত গন্তব্যও এক। সমকালীন ভূ-রাজনীতিতে যেখানে মুসলিম বিশ্বকে আঞ্চলিক ও গোত্রীয় দ্বন্দ্বে লিপ্ত রেখে দুর্বল করার নানামুখী আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র চলছে, সেখানে হজের এই ‘এক কিবলা ও এক উদ্দেশ্য’-এর দর্শন মুসলমানদের এক অজেয় ও অবিচ্ছিন্ন প্রাচীরে পরিণত হওয়ার দীক্ষা দেয়। এটি উম্মাহর সামষ্টিক শক্তিকে এক বিন্দুতে এনে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার প্রেরণা জোগায়।
সমতা প্রতিষ্ঠা ও মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব থেকে মুক্তি
ইহরামের পোশাকে ধনী-গরিব, শাসক-শাসিত সবাই সমান হয়ে যায়। এখানে কোনো রাজকীয় পোশাক নেই, কোনো রাজমুকুট নেই। সবার পরনে একই শুভ্র ও সেলাইহীন কাপড়। এটি উম্মাহর বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ বা মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব থেকে মুক্তির সর্বোচ্চ প্রকাশ। তাকওয়া ছাড়া কারো ওপর কারো কোনো শ্রেষ্ঠত্ব থাকে না। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত জোরালোভাবে এরশাদ করেছেন, “আর মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা প্রচার করো, তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে।” (সূরা হজ : ২৭)।
এই আয়াতের সমাজতাত্ত্বিক গভীরতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘দূরদূরান্ত’ শব্দবন্ধটি কেবল ভৌগোলিক দূরত্বের কথা বলে না, বরং এটি বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের এক অভূতপূর্ব মিলনমেলার ইঙ্গিত দেয়। হজের এই আন্তর্জাতিক মহাসম্মেলন প্রমাণ করে যে, মুসলিমরা বৈশ্বিকভাবে বিচ্ছিন্ন কোনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নয়, বরং তারা এক বিশ্বজনীন সুপার-ন্যাশন বা একক উম্মাহ। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিখ্যাত হাদিসটি সমকালীন সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, “এক মুমিন অপর মুমিনের জন্য ইমারতস্বরূপ, যার এক অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে।” (সহিহ বুখারি : ৪৮১; সহিহ মুসলিম : ২৫৮৫)।
বিদায় হজের ভাষণ আধুনিক মানবাধিকারের প্রথম বৈশ্বিক ইশতেহার
বর্তমান সভ্যতায় যখন বর্ণবাদবিরোধী নানা বিশ্বজনীন স্লোগান দিয়েও মানুষের চামড়ার রং ও জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার দূর করা যাচ্ছে না, তখন হজের শুভ্র বসন মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতিকে প্রতিষ্ঠিত করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে বিদায় হজের ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে যে বৈশ্বিক সাম্যের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা আধুনিক মানবাধিকারের তথাকথিত প্রবক্তাদের জন্য এক জীবন্ত ইশতেহার, “হে লোক সকল! শোনো, তোমাদের প্রতিপালক এক, তোমাদের পিতা এক। শোনো, আরবির ওপর অনারবির এবং অনারবির ওপর আরবির, কৃষ্ণকায়ের ওপর শ্বেতকায়ের এবং শ্বেতকায়ের ওপর কৃষ্ণকায়ের কোন শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নেই। শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা আছে তো কেবল ‘তাকওয়ার’ কারণেই।” (মুসনাদে আহমাদ : ২৩৪৮৯)।
পারস্পরিক পরিচয় ও সহযোগিতা
হজ হলো ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক সুদৃঢ় করা, উম্মাহর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করা এবং দলগত চেতনা ও পারস্পরিক সম্প্রীতি পুনর্জাগরণের এক মহান সুযোগ। হজের মাধ্যমে উম্মাহর বুদ্ধিজীবী ও নীতিনির্ধারকদের একটি বৈশ্বিক থিঙ্কট্যাঙ্ক তৈরি করার সুযোগ থাকে, যার মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের সংকটগুলোর সম্মিলিত ও স্বাধীন রাজনৈতিক সমাধান খোঁজা সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, কুরবানি ত্যাগ, আনুগত্য ও সমাজ সংস্কারের হাতিয়ার
কুরবানি হলো নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পশুকে আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে জবাই করা। এটি এমন এক ইসলামী নিদর্শন, যা মানুষের অন্তরে ইখলাস (নিষ্ঠা) এবং আল্লাহ তায়ালার আদেশের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের শিক্ষা জাগ্রত করে। এর মাধ্যমে মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর সুন্নতকে পুনর্জীবিত করা হয়।
ভোগবাদের বিরুদ্ধে এক আত্মিক প্রতিরোধ
আধুনিক পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা ও করপোরেট সংস্কৃতি মানুষকে প্রতিনিয়ত চরম ভোগবাদের মন্ত্র শেখাচ্ছে- যেখানে মানুষের অবদমিত ইচ্ছা, ব্যক্তিগত বিলাসিতা এবং বস্তুগত স্বার্থই জীবনের শেষ কথা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। মানুষ আজ নিজের অনিয়ন্ত্রিত লোভ ও স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য পুরো সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংস করতেও দ্বিধা করছে না। ঠিক এমন একটি বস্তুবাদী অবক্ষয়ের যুগে কুরবানি কেবল একটি নির্দিষ্ট পশু জবেহ করার প্রথাগত নাম নয়; বরং এটি মানুষের ভেতরের ‘পশুত্ব’ এবং এই আধুনিক ভোগবাদী মানসিকতাকে আল্লাহর রাস্তায় জবেহ করার এক মহান মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক সংগ্রাম।
এটি মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর সেই কালজয়ী ঐতিহাসিক ত্যাগের স্মারক, যেখানে আল্লাহর সুনির্দিষ্ট নির্দেশের সামনে পার্থিব কোনো মহব্বত, মোহ বা ব্যক্তিগত স্বার্থের বিন্দুমাত্র স্থান ছিল না। কুরবানির এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট উম্মাহকে কঠোরভাবে শেখায় যে, আদর্শের পথে সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে উৎসর্গ করাই হলো যেকোনো সফল সামাজিক ও নৈতিক বিপ্লবের চাবিকাঠি। কুরবানির মূল উদ্দেশ্য, রূহানিয়াত ও খোদাভীতির গভীরতা ব্যাখ্যা করে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (আল্লাহভীতি)।’ (সূরা হজ : ৩৭)।
একনিষ্ঠ আনুগত্য ও নিখাদ অনুসরণ
কুরবানির অন্যতম প্রধান বৈপ্লবিক শিক্ষা হলো- কোনো প্রকার শর্ত, যুক্তি বা দ্বিধা ছাড়া আল্লাহর সুনির্দিষ্ট আদেশের সামনে নিজের বুদ্ধিমত্তা ও ইচ্ছাকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করা। মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.) যখন বৃদ্ধ বয়সের একমাত্র আশার আলো, কলিজার টুকরো পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-কে জবেহ করার জন্য ওহীর নির্দেশ পেয়েছিলেন, তখন তিনি কোনো বাহ্যিক যুক্তি বা মানবিক আবেগের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। এই একনিষ্ঠ আনুগত্যের স্বরূপ তুলে ধরে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ে ফয়সালা করে দিলে কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য সেই বিষয়ে নিজের পক্ষ থেকে অন্য কোনো সিদ্ধান্তের ইখতিয়ার (সুযোগ) থাকে না।’ (সূরা আল-আহযাব : ৩৬)।
এই পরীক্ষার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল কিশোর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর অবিচল সম্মতি ও স্বতঃস্ফূর্ত আত্মসমর্পণ। পিতা যখন পুত্রকে স্বপ্নের কথা জানিয়ে তাঁর অভিমত জানতে চাইলেন, তখন তিনি কোনো অজুহাত বা বাঁচার আকুতি জানাননি; বরং একবাক্যে যা বলেছিলেন, তা আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন, ‘হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তা-ই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’ (সূরা আস-সাফফাত : ১০২)।
পিতা ও পুত্রের এই যৌথ আত্মসমর্পণ প্রমাণ করে যে, আল্লাহর বিধানের সামনে পুরো পরিবারের ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষাকে বিলীন করে দেওয়াই হলো প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য। আধুনিক বস্তুবাদী সমাজ যেখানে প্রতিটি বিষয়ে কেবল ‘পার্থিব লাভ-ক্ষতি’ ও ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতা’র যুক্তি খোঁজে, সেখানে কুরবানি উৎসাহকে পিতা-পুত্রের এই ‘নিখাদ অনুসরণ’-এর মহত্তম পাঠ। পশুর গলায় ছুরি চালানো কেবল একটি বাহ্যিক ইবাদত নয়, বরং এটি আল্লাহর প্রতি মুমিনের সেই গভীরতম প্রতিশ্রুতির প্রতীকÑ যেখানে দীনের প্রয়োজনে নিজের জীবন, পরিবার ও সম্পদ উৎসর্গ করতে মুমিন বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করবে না। এই আপসহীন আনুগত্যই মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণের মূল চালিকাশক্তি।
দানশীলতা ও বৈষম্যহীন অর্থব্যবস্থার মডেল
কুরবানি কেবল একটি আধ্যাত্মিক আচার নয়, বরং এটি বর্তমান শোষক ও বৈষম্যমূলক পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার বিপরীতে ইসলামি অর্থনীতির একটি বাস্তব ও সুষম বণ্টন ব্যবস্থার প্রাকটিক্যাল মডেল। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা যেখানে সম্পদকে গুটিকয়েক ধনকুবের বা করপোরেট শক্তির হাতে কুক্ষিগত করে সাধারণ মানুষকে চরম অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত করে, সেখানে ইসলামী অর্থনীতি সম্পদকে সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রবাহিত করার নির্দেশ দেয়। কুরবানির পশুর মাংসকে তিন ভাগে ভাগ করে দরিদ্র ও আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার যে অমোঘ বিধান, তা সমাজের অবহেলিত ও প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের মুখে হাসি ফোটায় এবং তাদের মৌলিক আমিষের চাহিদা পূরণ করে। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন, ‘যাতে (সম্পদ) তোমাদের মধ্যকার ধনীদের মধ্যেই কেবল আবর্তিত না হয়।’ (সূরা হাশর : ৭)।
কুরবানির এই মৌসুমে বিশ্বজুড়ে চামড়া, পশুপালন এবং মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে কেন্দ্র করে যে বিশাল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক লেনদেন হয়, তা মূলত তৃণমূল অর্থনীতির চাকাকে সচল করে। এই দানশীলতা ও সুষম বণ্টন ব্যবস্থার দর্শনকে যদি সামষ্টিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায়, তবে মুসলিম বিশ্ব থেকে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য চিরতরে দূর করা সম্ভব। এটি সমাজ থেকে কৃপণতা ও ব্যক্তিকেন্দ্রীকতার দেয়াল ভেঙে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও বৈষম্যহীন এক নতুন অর্থসামাজিক দিগন্তের উন্মোচন করে।
তৃতীয়ত, হজের আনুষ্ঠানিকতা থেকে উম্মাহর পুনর্জাগরণের শিক্ষা
হজের প্রতিটি রুকন বা আনুষ্ঠানিকতা কেবল আধ্যাত্মিক পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম নয়; বরং এগুলো বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার মতো অত্যন্ত শক্তিশালী সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক ইশতেহার। যদি উম্মাহ বাস্তব জীবনে এই প্রায়োগিক শিক্ষাগুলো ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে তাদের হারানো গৌরব পুনরুজ্জীবিত করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। হজের প্রধান চারটি আনুষ্ঠানিকতা থেকে উম্মাহর পুনর্জাগরণের সেই দিকনির্দেশনাগুলো নিচে আলোচনা করা হলো-
আকিদা ও একতা
হজ আমাদের প্রাক্টিক্যালি শেখায় যে, মুসলিম উম্মাহর আসল শক্তি কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা বা সামরিক অস্ত্রের মাঝে নয়; বরং তা নিহিত রয়েছে তাদের আকিদাগত একতা ও ‘এক দেহ’ হয়ে সংহত থাকার মাঝে। হজের ময়দানে লাখো মানুষ যখন সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে একই স্থানে সমবেত হয়, তখন তা এক অবিভাজ্য তাওহীদি প্রাচীরের রূপ নেয়। এই আকিদাগত ঐক্যের ব্যাপারে মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে কঠোর নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে ধারণ করো এবং পরস্পরের মধ্যে বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সূরা আল ইমরান : ১০৩)।
ধৈর্য, শৃঙ্খলা ও সুসংগঠিত সামরিক প্রশিক্ষণ
হজের পুরো সফরটি অত্যন্ত শ্রমসাধ্য এবং একটি কঠোর নিয়মতান্ত্রিক শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। নির্দিষ্ট নিয়মে ইহরাম বাঁধা, তীব্র ভিড় ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মাঝে আরাফাত অবস্থান, মুজদালিফায় খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন এবং মিনায় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ- এই পুরো প্রক্রিয়াটি হাজীদের মাঝে কষ্ট সহ্য করার চরম ধৈর্য, কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলা ও নিখুঁত সময়ানুবর্তিতা তৈরি করে। এই শৃঙ্খলার গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন, যারা তাঁর পথে সারিবদ্ধভাবে (শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে) লড়াই করে, যেন তারা এক সীসাঢালা প্রাচীর।’ (সূরা আস-সাফ : ৪)।
লাখ লাখ মানুষের এই বিশাল জনসমুদ্র যেভাবে একজন আমীর বা পরিচালকের নির্দেশনায় এবং শরীয়তের বেঁধে দেওয়া সুনির্দিষ্ট সময়ের ফ্রেমে অবলীলায় ওঠাবসা করে, তা মূলত উম্মাহকে একটি সুসংগঠিত এবং সুশৃঙ্খল বাহিনীর মতো এক অনন্য প্রশিক্ষণ দেয়। সমকালীন বিশ্বে মুসলিম উম্মাহর অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো শৃঙ্খলার অভাব এবং নিয়মহীনতা। হজের এই প্রায়োগিক শিক্ষা উম্মাহকে শেখায় কীভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ধৈর্যধারণ করে একটি সুনির্দিষ্ট ও সুশৃঙ্খল কাঠামোর অধীনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হয়, যা একটি জাতির জাগরণের জন্য মৌলিক পূর্বশর্ত।
আচরণগত ও নৈতিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ
একটি জাতির বাহ্যিক পতন আসলে তার নৈতিক ও আচরণগত অবক্ষয়েরই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। হজ ও কুরবানি মূলত মুসলিম উম্মাহর সেই ঝিমিয়ে পড়া নৈতিক চরিত্রকে পুনর্গঠন করার এক মহান বার্ষিক মনস্তাত্ত্বিক কর্মশালা। কুরবানির শিক্ষা মানুষকে শেখায় কৃপণতা, লোকদেখানো মানসিকতা, হিংসা ও পরশ্রীকাতরতা থেকে মুক্ত হয়ে অবলীলায় নিজের স্বার্থ ত্যাগ করতে। অন্যদিকে হজের সফর শেষে একজন হাজী যখন সমস্ত পাপাচার, অহংকার, কাদা ছিটানো এবং অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সম্পূর্ণ বর্জন করে একটি ‘নতুন জীবন’ ও প্রশান্ত আত্মা নিয়ে সমাজে ফিরে আসেন, তখন তার আচার-আচরণে এক আমূল পরিবর্তন ঘটে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করলো এবং তাতে কোনো প্রকার অশ্লীল আচরণ ও পাপাচার লিপ্ত হলো না, সে (হজ শেষে) এমনভাবে গুনাহমুক্ত হয়ে ফিরে এলো, যেন আজই তার মা তাকে জন্ম দিয়েছেন।’ (সহিহ বুখারি : ১৫২১, ১৮২০; সহিহ মুসলিম : ১৩৫০)।
উম্মাহর পুনর্জাগরণের জন্য এই নৈতিক রূপান্তর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকÑ সবার আচরণে যখন হজ ও কুরবানির এই সততা, ধৈর্য, নম্রতা এবং খোদাভীতি প্রতিফলিত হবে, তখনই উম্মাহর ভেতর থেকে দুর্নীতি, জুলুম ও সামাজিক অনাচার দূর হবে। এই নৈতিক ও আচরণগত বিপ্লবই মুসলিম জাতিকে বিশ্বমঞ্চে আবারো এক অনন্য ও অনুকরণীয় সুশৃঙ্খল জাতি হিসেবে মর্যাদা ফিরিয়ে দেবে।
ঈমানী শক্তি ও মনস্তাত্ত্বিক বিজয়
হজের সর্বোচ্চ চূড়া হলো ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা। লাখ লাখ শুভ্রবসন পরিহিত মানুষের এই সুবিশাল জনসমুদ্র হাশরের ময়দানের চিত্রকল্প তৈরি করে মানুষের হৃদয়ে আখিরাতের জবাবদিহি এবং আল্লাহর নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্বের চেতনাকে তীব্রভাবে শানিত করে। আরাফাতের ময়দানের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘হজ হচ্ছে আরাফাত (অর্থাৎ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করাই হজের প্রধান রুকন)।’ (সুনান আন-নাসায়ী: ৩০১৬, সুনান তিরমিযী : ৮৮৯)।
কাবা তাওয়াফের মাধ্যমে মুমিন যেভাবে ঘোষণা করে যে তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু কোনো পার্থিব পরাশক্তি নয়, তেমনি আরাফাতের ময়দানে দাঁড়িয়ে উম্মাহ সমস্বরে ঘোষণা করে যে, সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর। যে জাতি একমাত্র আল্লাহর সার্বভৌমত্বের কাছে মাথা নত করতে শেখে, সে পৃথিবীর কোনো জুলুম, অন্যায় বা স্বৈরাচারী শক্তির কাছে মনস্তাত্ত্বিকভাবে কখনো পরাজিত হতে পারে না। এই তাওহীদি শক্তিই উম্মাহর মাঝে বাতিলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চূড়ান্ত সাহস জোগায়। সমকালীন ভূ-রাজনীতিতে মুসলিম উম্মাহর যে হীনম্মন্যতা ও মনস্তাত্ত্বিক পরাজয় লক্ষ করা যায়, আরাফাতের এই খাঁটি তাওহীদী শিক্ষা তা চিরে এক নতুন আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়।
চতুর্থত, একটি পরিবার ত্যাগ ও প্রেরণার বাতিঘর
হজ ও কুরবানির এই সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক শিক্ষালয়টি দাঁড়িয়ে আছে একটি মহান পরিবারের ত্যাগের ইতিহাসের ওপর। যে পরিবারটি বিশ্ব মুসলিমের জন্য ত্যাগের মহত্তম ও চিরন্তন এক আদর্শ। একটি আদর্শ সমাজ গঠনে এই পরিবারের প্রতিটি সদস্যের পরীক্ষা ও পুরস্কারের ঘটনা উম্মাহর জন্য বাতিঘর স্বরূপ।
হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর পরীক্ষা ও পুরস্কার
হযরত ইব্রাহীম (আ.) জীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় শতভাগ উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাঁর এই আপসহীন জীবন ও সফলতার ঘোষণা দিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেন, “আর স্মরণ করো, যখন ইব্রাহীমকে তাঁর রব কয়েকটি কথা দ্বারা পরীক্ষা করেছিলেন, অতঃপর তিনি সেগুলো পূর্ণ করেছিলেন। আল্লাহ বললেন, নিশ্চয়ই আমি তোমাকে মানুষের ইমাম (নেতা) বানাবো।” (সূরা আল-বাকারা : ১২৪)।
এই পরীক্ষাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন ও অগ্নিপরীক্ষা ছিল, প্রায় ৮৬ বছর বয়সে লাভ করা কলিজার টুকরো পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-কে কুরবানি করার নির্দেশ। আল্লাহ তায়ালা সেই দৃশ্যপট তুলে ধরে বলেন, ‘অতঃপর বালকটি যখন পিতার সাথে কাজ করার মতো বয়সে উপনীত হলো, তখন ইব্রাহীম তাকে বললেন, হে বৎস! আমি স্বপ্নে তোমাকে জবেহ করতে দেখেছি। এখন বলো, তোমার অভিমত কী?’ (সূরা আস-সাফফাত : ১০২)।
পুরস্কার : এই কঠিনতম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আল্লাহ তায়ালা হযরত ইব্রাহীম (আ.)-কে তিনটি অসামান্য পুরস্কারে ভূষিত করেন: (১) বিশ্বনেতৃত্বের মর্যাদা, (২) মাকামে ইব্রাহীম ও (৩) আল্লাহর খলিল হওয়া।
হযরত হাজেরা (আ.)-এর পরীক্ষা ও পুরস্কার
একজন নারী হিসেবে হযরত হাজেরা (আ.) যে ধৈর্য, সহনশীলতা ও অবিচল ঈমানের পরিচয় দিয়েছেন, তা আধুনিক বস্তুত্ববাদী নারীবাদের অহংকার চূর্ণ করার জন্য এক পরম শিক্ষা। তাঁর পরীক্ষাগুলো ছিল অত্যন্ত কঠিন থেকে কঠিন। আল্লাহর নির্দেশে এক ফোঁটা পানি ধু-ধু মরুভূমিতে দুগ্ধপোষ্য শিশু সন্তানসহ একাকী নির্জনতায় অবস্থান করা। তীব্র তৃষ্ণায় ছটফট করতে থাকা সন্তানের জীবন বাঁচাতে মক্কার তপ্ত বালুর ওপর সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে একা সাতবার হন্যে হয়ে দৌড়ানো। দীর্ঘসময় স্বামী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থেকে এক প্রতিকূল পরিবেশে সন্তান লালন-পালনের কঠিন সংগ্রাম করা।
পুরস্কার : আল্লাহ তায়ালা তাঁর এই চরম তাওয়াক্কুল ও ত্যাগকে এমনভাবে কবুল করেছেন যে, তা আজ বিশ্ব ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ-
১. কোটি কোটি মানুষের তৃষ্ণা মেটানোর মতো যমযম কূপের নিয়ামত দান।
২. সাফা-মারওয়ায় সাঈ করাকে হজের অন্যতম প্রধান রুকন হিসেবে বিধান করা।
৩. তাঁর অবস্থানের কারণেই জনবসতিহীন মক্কা আজ বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ ও বরকতময় নগরীতে পরিণত হয়েছে।
হযরত ইসমাইল (আ.)-এর পরীক্ষা ও পুরস্কার
শৈশব থেকেই হযরত ইসমাইল (আ.) ছিলেন ত্যাগের জীবন্ত প্রতীক। তাঁর জীবন পরীক্ষা ও আত্মসমর্পণের এক অনন্য পাঠশালা। পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.) যখন তাঁকে স্বপ্নের মাধ্যমে পাওয়া আল্লাহর কঠিন নির্দেশটির কথা জানালেন এবং তাঁর মতামত চাইলেন, তখন ইসমাইল (আ.) কোনো অজুহাত বা বাঁচার আকুতি জানাননি। তিনি নবীন বয়সেই বিশ্ববাসীকে আল্লাহর আইনের সামনে মস্তক অবনত করার এক জাজ্বল্যমান শিক্ষা দিয়ে বীরদর্পে জবাব দিলেন, “হে আমার পিতা! আপনি যা আদেশপ্রাপ্ত হয়েছেন তা-ই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।” (সূরা আস-সাফফাত : ১০২)।
পুরস্কার : কিশোর বয়সে আত্মসমর্পণের এই মহোত্তম নজির স্থাপন করায় আল্লাহ তাঁকে যে পুরস্কৃত করেন, তা হলো- (১) এক মহান কুরবানির বিনিময়ে মুক্ত, (২) নবুওয়াতের মর্যাদা ও (৩) তাঁরই পবিত্র বংশধারায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আগমন।
পঞ্চমত, সমকালীন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ ও উম্মাহর অর্থনৈতিক সংহতি
আজকের পৃথিবীতে মুসলিম উম্মাহ ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, আরাকান ও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যে অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয় ও অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন, তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো কৌশলগত অনৈক্য, সম্পদের অসম বণ্টন এবং আপসকামিতা। আজ যখন গাজা বা ফিলিস্তিনের মজলুম মুসলমানরা জায়নবাদী নিষ্ঠুর আগ্রাসনের মুখে শুধু এক টুকরো রুটি বা বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারের জন্য লড়ছে, তখন বিশ্ব মুসলিমের এই হজও কুরবানি কেবলই আচার-সর্বস্ব আনন্দ-উৎসব বা বার্ষিক মাংস খাওয়ার উৎসবে রূপ নিলে তা হবে উম্মাহর জন্য চরম এক নৈতিক ট্র্যাজেডি।
মুসলিম কমন মার্কেট
হজের মৌসুমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিম ব্যবসায়ীরা একত্রিত হন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যদি একটি ‘অভিন্ন মুসলিম বাজার’ এবং সুষম কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেত, তবে মুসলিম বিশ্বকে আজ পশ্চিমা শোষক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন IMF বা World Bank) ওপর পরনির্ভরশীল থাকতে হতো না।
ষষ্ঠত, মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণ প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
বিশ্ব মুসলিমের আত্মপরিচয় ও অধিকার আদায়ের এই লড়াইয়ে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত জনপদ বাংলাদেশ এক বড় শক্তি। জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হওয়ায় উম্মাহর যেকোনো ক্রান্তিকালে বাংলাদেশের একটি কৌশলগত ও নীতিগত ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অভ্যন্তরে যে গণবিপ্লব সাধিত হয়েছে তা সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘাপটি মেরে বসে থাকা নানা অনিয়মের পুরোনো জঞ্জালকে ধুয়ে-মুছে দেওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছিল। তার সঙ্গে হজ ও কুরবানির সাম্য, ত্যাগ, আত্মশুদ্ধি ও সুশৃঙ্খল আন্দোলনের শিক্ষা মেলালে আমাদের সামনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এক নতুন দুয়ার খুলে যেতে পারে।
আমাদের দেশ থেকে প্রতি বছর লাখো মানুষ হজের বিশ্বমঞ্চে শামিল হন। এটি কেবল একটি ধর্মীয় যাত্রা নয়; বরং বৈশ্বিক দরবারে এ দেশের মানুষের ঈমানী চেতনার এক বিশাল উপস্থিতি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিপুলসংখ্যক হাজী যখন মক্কার সেই বৈষম্যহীন ভ্রাতৃত্ব আর সামাজিক সুবিচারের জীবন্ত দীক্ষা নিয়ে দেশে ফেরেন, তখন তার প্রতিফলন আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে কতটুকু ঘটছে? হজের সেই বৈপ্লবিক শিক্ষা সমাজ সংস্কার, দুর্নীতির মূলোৎপাটন এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কাজে লাগানোই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
অন্যদিকে কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে আমাদের পশুপালন, চামড়া শিল্প ও গ্রামীণ জনপদে যে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন হয়, তা কোনো সাধারণ বাণিজ্য নয়। পুঁজিবাদী করপোরেট শোষণের বিপরীতে এটি মূলত ইসলামের এক অনন্য জনকল্যাণমুখী ও সুষম অর্থনৈতিক মডেল। এই বিশাল উৎসবকেন্দ্রিক অর্থপ্রবাহকে যদি পরিকল্পিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায়, তবে তা কেবল দেশের দারিদ্র্য আর বেকারত্বই ঘোচাবে না; বরং বাংলাদেশকে একটি স্বনির্ভর ও স্বাধীন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড় করাবে। আর তখনই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উম্মাহর অন্যান্য মজলুম ও নিপীড়িত মানুষের পাশে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর মতো হিম্মত ও সক্ষমতা অর্জন করবে।
বাংলাদেশের এই ভ্রাতৃত্ববোধের সবচেয়ে বড় প্রমাণ আমাদের ঘরের পাশেই রয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের মতো এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়কে কাঁধে তুলে নিয়ে এ দেশের মানুষ যে অভাবনীয় উদারতা দেখিয়েছে, তা ইসলামের সেই সোনালি যুগের ‘আনসার ও মুহাজির’দের ঐতিহাসিক ত্যাগ ও চেতনারই এক আধুনিক রূপ। আজ দেশের তরুণ সমাজ যখন বৈষম্যহীন ও ইনসাফভিত্তিক এক নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখছে, তখন তাদের সামনে হজের ভ্রাতৃত্বে চেতনা এবং কিশোর ইসমাইল (আ.)-এর আপসহীন ঈমানদীপ্ত চরিত্রই হতে পারে পথ চলার বাতিঘর।
আমরা যদি আমাদের এই বিশাল তরুণ জনশক্তি, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ভৌগোলিক গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে হজ ও কুরবানির সামষ্টিক শিক্ষাকে সমাজ ও রাষ্ট্রে বাস্তবে রূপ দিতে পারি, তবেই এই জনপদ কেবল নিজের ভাগ্যই বদলাবে না; বরং গোটা মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণে এক অগ্রণী চালিকাশক্তি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
সপ্তমত, ঈদুল আজহার প্রকৃত তাৎপর্য ও বর্তমান সমাজের বিকৃতি
আমাদের সমাজে আজ কুরবানিকে একটি লোকদেখানো প্রতিযোগিতা বা সামাজিক আভিজাত্য প্রকাশের মাধ্যমে পরিণত করার এক ভয়ঙ্কর প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। কে কত বেশি টাকা দিয়ে পশু ক্রয় করল, কার পশুর গোশত কত বেশি সুস্বাদু, কার গরুটা কত বেশি মোটাতাজা- এগুলোই আজ আলোচনার মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে আবার গরিবের হক যথাযথভাবে আদায় না করে গোশতের সিংহভাগ নিজের ফ্রিজে জমিয়ে রাখেন সারা বছর খাওয়ার জন্য।
এটি কুরবানির মূল চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কুরবানি কোনো লোকদেখানো উৎসব নয়। আল্লাহ আপনার পশুর দাম বা মাংসের পরিমাণ দেখেন না। তিনি মানুষের অন্তরের অবস্থা দেখেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নবী (সা.)-কে নির্দেশ দিয়ে বলেন: ‘বলো, আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু সবকিছু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য, যিনি একক ও অদ্বিতীয়।’ (সূরা আনআম : ১৬২)।
কুরবানির পশুর গলায় ছুরি দেওয়ার সাথে সাথে আমাদের শপথ নিতে হবে যে, আমরা আমাদের জান, মাল, সম্পদ ও মেধা সবকিছু আল্লাহর দীনের পুনর্জাগরণের জন্য উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। যদি আমাদের কুরবানি আমাদের ভেতরের অহংকার ও কৃপণতাকে দূর করতে না পারে, তবে তা কেবলই একটি পশু জবাইয়ের অনুষ্ঠান ছাড়া আর কিছুই নয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, হজ ও কুরবানি কেবল বছরের নির্দিষ্ট কিছু দিনের ধর্মীয় রুটিন বা ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানোর উৎসব নয়; বরং এটি মুসলিম উম্মাহর আত্মশক্তি ও আদর্শিক চেতনা রিচার্জ করার বার্ষিক ‘পাওয়ার হাউস’। একটি জাতির পুনর্জাগরণ বা রেনেসাঁ তখনই সম্ভব, যখন তার সদস্যরা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সামষ্টিক কল্যাণে ত্যাগের মানসিকতা লালন করে।
আজকের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলিম তরুণ প্রজন্মকে বুঝতে হবে যে, আমাদের প্রকৃত সমৃদ্ধির পথ কেবল পশ্চিমা সভ্যতার অন্ধ অনুকরণে বা ভোগবাদের চোরাবালিতে হারিয়ে যাওয়ার মধ্যে নেই; বরং আমাদের মৌলিক ইবাদতগুলোর বিপ্লবী ও গতিশীল শিক্ষাকে ব্যক্তি, সমাজ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রয়োগ করার মধ্যে নিহিত।
ইব্রাহীমি আদর্শের সেই আপসহীন ত্যাগ, হযরত হাজেরার সেই অবিচল তাওয়াক্কুল, ইসমাইলের সেই নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ এবং মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শের সেই সুদৃঢ় বৈশ্বিক ঐক্যই পারে বর্তমানের পরাধীন ও শোষিত মুসলিম উম্মাহকে আবারও বিশ্বমঞ্চের নেতৃত্বের আসনে আসীন করতে। আমাদের হজ ও কুরবানি কেবল আনুষ্ঠানিকতা মুক্ত হয়ে একনিষ্ঠ ঈমানী শক্তির জাগরণ ঘটাক, তবেই বিশ্বমঞ্চে উদিত হবে উম্মাহর এক নতুন গৌরবময় দিগন্ত।