আসছে সোয়া ৯ লাখ কোটি টাকার বাজেট
২১ মে ২০২৬ ১০:১৮
বাড়বে করের বোঝা, হবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি
বিশাল খরচের বাজেটের ব্যয়ভার বহনের সক্ষমতায় নেই দেশের অর্থনীতি
॥ উসমান ফারুক ॥
দেড় দশকের লুটপাটে ক্ষত-বিক্ষত অর্থনীতি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা শুরু করে। মাত্র দেড় বছর সময়ে সে চেষ্টা শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকার দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আগের চেয়ে কম বাজেট দেয় গত অর্থবছরে। সেই চেষ্টা শুরু হলেও স্বাভাবিক হতে পারেনি অর্থনীতি। সেই দুরবস্থার মধ্যে গত ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের চাপ সইবার চেষ্টা করছে অর্থনীতি। জ্বালানি ও ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েই চলছে। এমন সময়ে অর্থনীতিতে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট নিয়ে আসছে বিএনপি সরকার। বিশাল এ ব্যয় করতে আগের চেয়েও ঘাটতি থাকবে বেশি। বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনীতি এখন টিকে থাকার লড়াই করছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ, বাড়তে থাকা ক্রমবর্ধমান সরকারের ঋণ, দুর্বল রাজস্ব আদায়, দুর্বল আর্থিক কাঠামো, নেতিবাচক রপ্তানি, উচ্চ আমদানি ব্যয়, লুটপাটে তারল্য সংকটে ভুগতে থাকা ব্যাংকের এত বড় বাজেটের ব্যয়ভার বহন করার সক্ষমতায় নেই অর্থনীতি। লুটপাটে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা কমে গেছে গত ১৭ বছরে। এমন সময়ে অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চাপ সয়ে চলার মতো বাজেট হতে পারে সর্বোচ্চ ৮ লাখ কোটি টাকার।
তারা বলছেন, বিশাল অঙ্কের খরচের বাজেট মানেই অর্থনীতিকে সম্প্রসারণে করার পরিকল্পনা। ঋণ পরিশোধের সুদ ব্যয় বেড়ে যাবে সরকারের। তাতে ডলারের বিপরীতে টাকার মান আরো কমে যাবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ মন্দা ও বেকারের সংখ্যা বাড়িয়ে আরো দরিদ্র তৈরি হবে অর্থনীতিতে। সরকারের উচ্চাভিলাষী বাজেটের অর্থ জোগান দিতে কর হার বাড়াবে এনবিআর। বাড়তি করের চাপ গিয়ে পড়বে মধ্যবিত্তের ওপরে। এতে করে অর্থনীতিতে আরো বিশৃঙ্খলা হবে। বাজেটের আকার কমিয়ে সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা উচিত খাদ্য সরবরাহ ঠিক রাখা, নিত্যপণ্যের সহজলভ্যতা, জ্বালানি ও বিদ্যুতের নিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত ও সামাজিক নিরাপত্তার সুব্যবস্থা করা।
বাড়ছে বাজেটের আকার
সামনের অর্থাৎ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বিএনপি সরকার ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিতে যাচ্ছে। এরকম প্রস্তাবনা তৈরি করে ইতোমধ্যে সরকারের অর্থ জোগানদাতা সবচেয়ে বড় উৎস ও রাজস্ব আদায়কারী একমাত্র সংস্থা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে দিনভর সভা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
চলতি অর্থবছরের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস করে। এটি গত অর্থবছরের চেয়ে ৭ হাজার কোটি টাকা কম। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো বাজেট আগের অর্থবছরের তুলনায় কম ধরা হয়।
চলমান এই বাজেটের লক্ষ্য হচ্ছে, অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে এনে অর্থনীতির ক্ষতগুলো ঠিক করা। অপ্রয়োজনীয় ও অস্বাভাবিক ব্যয়ের প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ স্থগিত বা কোনো কোনোটির বেলায় তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এভাবে অর্থনীতিতে ভারসাম্য আনার চেষ্টার সফলতা পাওয়া যায়। মূল্যস্ফীতি কমে আসতে থাকে কয়েক বছর পর।
চলতি অর্থবছরের জন্য পাস হওয়া বাজটের মধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনার ব্যয়ও রাখা হয়। আগামী অর্থবছরের জন্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য কোনো বাজেট রাখার প্রয়োজন না থাকলেও স্থানীয় নির্বাচনের জন্য বরাদ্দ থাকবে কিছুটা।
চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। এনবিআরের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে রাজস্ব আদায় হয় ২ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। মার্চ পর্যন্ত আদায় করার কথা ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। আদায় ঘাটতি রয়েছে এক লাখ ৭৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা।
প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়। আদায় করার কথা প্রায় ৬৩ হাজার কোটি টাকা। বিশাল এই ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নিয়ে চলছে। অন্যদিকে বাজেটের বড় অংশই চলে যাচ্ছে পরিচালন ব্যয়ে। উচ্চ ঋণ ও সুদের হারের কারণে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধের খরচ বেড়েছে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও খাদ্যে ভর্তুকির চাপও রয়েছে।
এর সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-কমিশন বাস্তবায়ন হলে স্থায়ী ব্যয়ের চাপ আরও বাড়তে পারে। আগামী বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ লাখ কোটি টাকার ব্যয় অনুমোদন করা হয় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) খাতে। ফলে সামগ্রিক বাজেটের আকার বাড়লেও উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। তাতে আগামী বাজেটেও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়তে পারে অতিরিক্ত দেড় লাখ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারা এনবিআর বর্ধিত রাজস্ব আদায়ে এখন বিভিন্ন খাতে কর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে যাচেছ। এর মধ্যে প্রতি মোটরসাইকেলের জন্য আগাম কর চালু করতে যাচ্ছে।
দুর্বল ব্যাংক খাত আরো দুর্বল হবে
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার সঙ্গে জীবনযাত্রার খরচ সামাল দেওয়া ও কর্মসংস্থান করে অর্থনীতি সচল করা সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে দুর্বল সুশাসন, প্রশাসনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ঋণ অনিয়ম, ঋণের নামে অর্থ পাচার করে দুই ডজনের ব্যাংকে তারল্য সংকট, দুর্বল আদায় ব্যবস্থার কারণে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এতে ব্যাংক খাতের সক্ষমতা বছরের পর বছর দুর্বল হয়ে পড়েছে। সরকারের ব্যাংক ঋণ বাড়ায় বেসরকারি খাতের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন হচ্ছে। ব্যবসার ঋণ ব্যয়ও বাড়ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকাশিত এক শ্বেতপত্রে বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়ে থাকতে পারে। এমন অবস্থায় ব্যাংক খাত থেকে আরো ঋণ বাড়াতে চলেছে সরকার। চলতি বছরে ব্যাংক থেকে লক্ষ্যমাত্রার এক লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার পুরোটাই নিয়ে নিয়েছে সরকার। এতে সরকারকে ঋণ দিতে গিয়ে পুরো ব্যাংক খাত দুর্বল হয়ে পড়বে।
বাড়বে সুদহার ও বেসরকারি খাতে ঋণ দিতে পারবে না ব্যাংকগুলো। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যানুযায়ী, আগামী অর্থবছরে সরকারের ব্যাংক ঋণের সুদ বাবদ পরিশোধ করতে হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। বিশাল ব্যয়ের বোঝা আরো বাড়লে মূল্যস্ফীতি কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে দেশের পুঁজিবাজারও কার্যকর না হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা সেখানেও আস্থা পাচেছন না। পুঁজিবাজারও এখন ব্যাংক নির্ভর হয়ে গেছে।
কর নয়, স্বস্তি চায় সাধারণ মানুষ
২০২২ সালে ইউক্রেইন-রাশিয়া যুদ্ধের পর আওয়ামী লীগের লুটপাটের শিকার হওয়া অর্থনীতি ধীরে ধীরে খাদের কিনারায় চলে যায়। টানা জুলুম, লুটপাট ও গণতন্ত্রহীনতার মধ্যে ছাত্র-জনতার বিপ্লবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে আশ্রয় নেয় ভারতে। তারপর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে অর্থনীতির চোরাপথগুলো বন্ধ হতে থাকে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও কঠোর সুশাসনের পদক্ষেপ নেওয়ায় অর্থনীতি সচল হতে শুরু করে। চার থেকে পাঁচ বছর ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতির হার কমতে শুরু করে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান স্থির হতে শুরু করে।
লুটপাটে ক্ষয় হয়ে যাওয়া রিজার্ভ ফের ৩৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। আওয়ামী লীগ ১৭-১৮ বিলিয়ন ডলারে রেখে গিয়েছিল। অর্থনীতির এমন স্বস্তিকর সময় মাত্র বছর খানেক ছিল। গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পর ফের অর্থনীতি অশান্ত হতে শুরু করে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন বলেন, এখন প্রয়োজন অর্থনীতির সহনশীল ক্ষমতা বাড়ানো। বিশ্ব ও অভ্যন্তরীণ চাপে নাকাল হয়ে গেছে অর্থনীতি। এখন অর্থনীতি সচল করা প্রয়োজন আগে। সম্প্রসারণ বা বড় করার চাপ নিতে পারবে না।
কারণ হিসেবে তিনি বলেন, অর্থনীতি ভালো থাকলে তো রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। সরকারের ব্যয়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে টাকা পাবে কোথা থেকে। এনবিআর তো সেই সক্ষমতায় নেই। তাহলে সরকারের ঋণ না নেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। ব্যাংকগুলো এমনিতেই তারল্য সংকটে ভুগছে। দেশি-বিদেশি সুদ ব্যয় দিন দিন বেড়ে চলছে। এমন অবস্থায় সরকার আরো বেশি ঋণ নিলে অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে।
জাহিদ হোসেন বলেন, অর্থনীতির সূচকগুলোর বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে। সরকারকে বুঝতে হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সাজুস্য হওয়া দরকার। বিশাল অঙ্কের বাজেট নিলে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ঋণ নিতে হবে এক লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার। যেখানে এক লাখ কোটি টাকা নেওয়ার চাপ সামলাতে পারছে না অর্থনীতি। এছাড়া পেনশন দেনা, পরিচালন খরচ, বেতন ও রাজস্ব আদায়ের চিত্র বিবেচনায় নিলে বাজেটের আকার ৮ লাখ কোটি টাকার বেশি হওয়ার সুযোগ নেই।
আমদানি ব্যয় দিন দিন বেড়ে চলছে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি ও যুদ্ধের কারণে। তাতে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও আয় বাড়ছে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমদানি বাড়লেও গত ৯ মাস ধরে রপ্তানি বাড়ছে না। এমন সময়ে অর্থনীতি অচলাবস্থায় রয়েছে। এক জায়গায় এসে থেমে গিয়েছে। সরকারের নজর দেওয়া উচিত ব্যয় সংকুলান করে অর্থনীতি সচল করা। ব্যয় বাড়ালেই অর্থনীতি সচল হবে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষ চায় স্বস্তির বাজেট। যেখানে উচ্চ ব্যয়ের পরিবর্তে সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যয় পরিকল্পনা করা হবে। আগামী বাজেটের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা উচিত খাদ্য সরবরাহ ঠিক রাখা, নিত্যপণ্যের সহজলভ্যতা, জ্বালানি ও বিদ্যুতের নিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত ও সামাজিক নিরাপত্তার সুব্যবস্থা করা। এসব বিষয় ঠিক রেখেই অন্যান্য উন্নয়ন কর্মসূচিতে সরকারের মনোযোগ দেওয়া। আগামী বাজেট বাস্তবায়ন শেষে বৈশ্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সরকারের বাজেটের আকার বাড়ানো যেতে পারে, যদি রপ্তানি আয় বাড়তে শুরু করে।