ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা প্রত্যেক ঈমানদারের ওপর ফরজ
১৪ মে ২০২৬ ১০:৫১
॥ ফিরোজ মাহবুব কামাল ॥
মুসলিম রাষ্ট্রগুলোয় শত্রুশক্তির বারবার আগ্রাসন, গণহত্যা, ধর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞ থেকে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, পূর্ণ ইসলাম পালন, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচতে হলে ইসলামী রাষ্ট্রের বিকল্প নেই। কারণ একমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রই পূর্ণ ইসলাম পালন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে বাঁচার লড়াইকে সর্বোচ্চ ইবাদত তথা জিহাদে পরিণত করে। কোনো সেক্যুলার জাতীয়তবাদী, গোত্রবাদী, বর্ণবাদী বা রাজতন্ত্রী রাষ্ট্রে সে ইবাদতের কাজটি হয় না। তাছাড়া ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না পেলে শরিয়া আইনের বিচার, মহান রবের সার্বভৌমত্ব, প্যান-ইসলামী মুসলিম ভ্রাতৃত্ব, অবিচার ও দুর্বৃত্ত নির্মূলের জিহাদ- ইসলামের এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো স্রেফ কিতাবেই থেকে যায়। বুঝতে হবে, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজটি মসজিদ-মাদরাসার নয়, কোন নেতা বা পীর সাহেবেরও নয়। সে দায়টি একমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রের।
মহান রব শুধু সালাত ও সিয়ামই ফরজ করেননি, ফরজ করেছেন ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ। ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণের কাজটি ফরজ না হলে নবীজী (সা.) কেন সেরূপ একটি রাষ্ট্রের নির্মাণে নেতৃত্ব দিলেন? কেন তিনি বার বার যুদ্ধ করলেন? কেন নিজে আহত হলেন এবং কেন ১০টি বছর সে রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাস রেখে গেলেন? যে ব্যক্তি পূর্ণ ইসলাম পালন এবং নবীজী (সা.)-এর পূর্ণ অনুসরণে আগ্রহী- এ প্রশ্নগুলো নিয়ে তাদের ভাবা উচিত। নইলে নবীজী (সা.)-এর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি অজানা ও অনাদৃত থেকে যাবে। নবীজী (সা.) ও তাঁর সাহাবাদের জীবনে সবচেয়ে বেশি কুরবানি দিতে হয়েছে ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণের কাজ সফল করতে এবং নবীজী (সা.) যা কিছু করেছেন, তা নিজের খেয়াল খুশি মেটাতে করেননি, বরং করেছেন একমাত্র মহান রবের নির্দেশে তাঁরই এজেন্ডাকে বাস্তবায়ন ও বিজয়ী করতে। মহান রবের এজেন্ডাই ছিল নবীজী (সা.)-এর এজেন্ডা। এবং সে এজেন্ডাটি প্রতিপালন করতে হয় প্রতিটি মুসলিমেরও। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদকে বিজয়ী করতে মহান আল্লাহ তায়ালা রণাঙ্গনে ফেরেশতাদের নামিয়েছেন। সে বর্ণনা এসেছে নিচের আয়াতে : ‘তোমরা যখন সাহায্যের আবেদন করেছিলে স্বীয় প্রতিপালকের নিকট, তখন তিনি তোমাদের ফরিয়াদ গ্রহণ করে বললেন, আমি তোমাদিগকে সাহায্য করবো সারিবদ্ধ হাজার ফেরেশতা নামিয়ে।’ (সূরা আনফাল : ৯) ।
ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে নিহিত নবীজী (সা.)-এর পূর্ণ অনুসরণ
নবীজী (সা.) সিরাতাল মুস্তাকীমকে দৃশ্যমান করেছেন নিজে সে পথে চলে। বস্তুত তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কেটে ছিল সিরাতাল মুস্তাকীমের ওপর, যা বলা হয়েছে নিচের আয়াতে: ‘নিশ্চয় আপনি প্রেরিত রসূলগণের একজন। আপনি আছেন সিরাতাল মুস্তাকীমের ওপর।’ (সূরা ইয়াসিন : ৩-৪)।
তাই নবীজী (সা.)-এর পথই হলো সিরাতাল মুস্তাকীমের পথ। যারা সিরাতাল মুস্তাকীমে চলতে চায়, তাদের অবশ্যই অনুসরণ করতে হয় শুধু নবীজী (সা.)-এর নামাজ রোজা, হজ, জাকাতের মতো ইবাদত পালন নয়, বরং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর জীবনের রাজনীতি, সমাজনীতি ও যুদ্ধ বিগ্রহসহ প্রতিটি কর্মকাণ্ডকে। গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে হলে পথের কোনো অংশকে কি বাদ দেয়া যায়? বাদ দিলে কি গন্তব্যস্থলে পৌঁছা যায়? হাজার মাইল পথের আধা মাইল বাদ দিলে গন্তব্যে পৌঁছার কাজটি হয়না। ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ ছিল নবীজী (সা.)-এর জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এজন্যই সেটি সিরাতাল মুস্তাকীমের অবিচ্ছদ্য অংশ। তাই সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্ম হলো ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ। ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ ছাড়া অসম্ভব হয় নবীজী (সা.)-এর পূর্ণ অনুসরণ। এবং অসম্ভব হয় পূর্ণ ইসলাম পালন। অথচ আজকের মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে। তারা ৫০টি বেশি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দিয়েছে, নির্মাণ করেছে বহু লক্ষ মসজিদ এবং প্রতিষ্ঠা দিয়েছে হাজার হাজার মাদরাসা। কিন্তু একটি ইসলামী রাষ্ট্রও প্রতিষ্ঠা দিতে পারিনি। এর অর্থ রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও যুদ্ধ-বিগ্রকে তারা ইবাদতে পরিণত করতে পারেনি। মুসলিম উম্মাহর সকল ব্যর্থতার জনক হলো এই ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণে ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতা কখনোই নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ও মসজিদ মাদরাসার সংখ্যা বৃদ্ধি করে দূর করা যাবে না।
ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না পেলে মুসলিমদের জানমাল কি নিরাপত্তা পেত? পেত কি স্বাধীনতা? মুসলিম উম্মাহ কি বিশ্বশক্তির মর্যাদা পেত? প্রশ্ন হলো, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দিতে নবীজী (সা.) যেভাবে জিহাদ করলেন, নবীজী (সা.)-এর সে গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত ঈমানদারের জীবন থেকে বাদ পড়ে কীরূপে? নবীজী (সা.)-এর সে গুরুত্বপূর্ণ সুন্নতকে বাদ দেয়ার অর্থ তো সিরাতাল মুস্তাকীমের বিশাল এক গুরুত্বপূর্ণ অংশকে জান্নাতের যাত্রাপথ থেকে বাদ দেয়া। আর জান্নাতের যাত্রা পথের কোন একটি অংশ বাদ পড়লে কি জান্নাতে পৌঁছা যায়? তাছাড়া মহান আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা, যারা নবীজী (সা.)-কে অনুসরণ করে, তারাই অনুসরণ করে মহান আল্লাহকে, যা বলা হয়েছে নিচের আয়াতে: ‘যে ব্যক্তি অনুসরণ করে রাসূলের হুকুমের, সে অনুসরণ করলো আল্লাহর হুকুমের। আর যে ব্যক্তি মুখ ফিরিয়ে নিল, (হে মুহাম্মদ), আমি আপনাকে তাদের জন্য রক্ষণাবেক্ষণকারী নিযুক্ত করে পাঠায়নি।’ (সূরা নিসা : ৮০)।
তবে ইসলামী রাষ্ট নির্মাণের দায়টি কোনো রাজনৈতিক দল, কিছু মৌলভী-মাওলানা ও কিছু মুসলিম রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নয়। এটি ফরজ প্রতিটি ঈমানদারের ওপর। নামাজ, রোজা, হজ জাকাত বহু ঘুষখোর, সুদখোরও পালন করে। কিন্তু ঈমানের মূল পরীক্ষা হয় ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদে। অথচ যাদের জীবনের ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের ভাবনা ও তাড়না থাকে না, তাদের জীবনে জিহাদও থাকে না। নবীজী (সা.)-এর যুগে আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের মতো যারাই এ জিহাদ থেকে দূরে থেকেছে তাদের মুনাফিক বলা হয়েছে। ইসলামী রাষ্ট নির্মাণের কাজটি প্রতিটি ঈমানদারের; তাই প্রতিটি ঈমানদারের ঈমানী দায় হলো জিহাদের এ পবিত্র ময়দানে অবশ্যই হাজির হওয়া। সেটিই দেখা গিয়েছিল নবীজী (সা.)-এর আমলে।
মুসলিম উম্মাহর সকল ব্যর্থতার শুরু ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণে ব্যর্থতা থেকে। তখন সকল প্রকার ব্যর্থতা মাথার ওপর এসে ভর করে। তখন বন্ধ হয়ে যায় উন্নত মানব, উন্নত সমাজ, উন্নত সংস্কৃতি ও উন্নত সভ্যতা নির্মাণের কাজ। এ ব্যর্থতা তাই শুধু ব্যর্থতা নয়, বরং গুরুতর অপরাধ। সে অপরাধ হাজারো অপরাধের রাস্তা খুলে দেয়। আনে প্রতিশ্রুত আযাব। তখন দেশ শত্রু শক্তির দখলে চলে যায় এবং দেশবাসীর স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত কবরবাসী হয়। ফলে বুঝতে কি বাকি থাকে, বর্ণ, ভাষা, ফেরকা ও আঞ্চলিকতার ঊর্ধ্বে উঠে একতাবদ্ধ হওয়া মুসলিমদের জন্য কতটা জরুরি? এ বিশাল কাজটি বিশেষ কোন গোত্র, বর্ণ বা ভাষা গোষ্ঠীর লোকদের কাজ নয়। এজন্য চাই নানা ভাষা, নানা বর্ণ ও নানা অঞ্চলের মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা। এ বিষয়টি সর্বজ্ঞানী মহান রবের চেয়ে আর কে অধিক বুঝেন? তাই তিনি মুসলিম উম্মাহর একতাকে ফরজ করেছেন এবং হারাম করেছেন বিভক্তিকে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, মুসলিমদের সুস্পষ্ট বিদ্রোহটি মহান রবের সে বিধানের বিরুদ্ধে। তারা ত্যাগ করেছে একতার পথ এবং বেছে নিয়েছে বিভক্তির পথ। ফলে মুসলিম উম্মাহ খণ্ডিত হয়েছে ৫০টির অধিক টুকরোয়। ফলে ব্যর্থ হয়েছে উম্মাহ রূপে বেড়ে ওঠার কাজ। এরূপ বিভক্তির পথই নিশ্চিত আযাবের পথÑ মহান রবের পক্ষ থেকে সে হুঁশিয়ারিটি এসেছে পবিত্র কুরআনে। সে আযাব আসে শত্রু শক্তির অধিকৃতি, বোমা বর্ষণ, জেল জুলুম এবং গণহত্যা রূপে।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়া
মানবজাতির অতি গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানের ভাণ্ডার হলো ইতিহাস। জাতি কীভাবে সফল হয়, কীভাবে ব্যর্থ হয় এবং কীভাবে ধ্বংস হয়ে যায় -তা নিয়ে ইতিহাসের বইয়ে রয়েছে অসংখ্য বিবরণ। পবিত্র কুরআনের বিশাল ভাগ জুড়ে রয়েছে নানা ব্যর্থ জাতির ইতিহাস। বর্ণিত হয়েছে বহু নবী-রাসূলের কাহিনী। এসব কাহিনী শুধু তেলাওয়াতের জন্য নাযিল হয়নি। বরং বর্ণিত হয়েছে এজন্য যে, মানবজাতি এ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিবে। যারা নিজেদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টি বাড়াতে চায় এবং বিপর্যয় এড়িয়ে আগামীতে সফল হতে চায়, তাদের জন্য ইতিহাস পাঠের বিকল্প নাই। বৈজ্ঞানিক ল্যাবে গবেষণা হয় নানা বৈজ্ঞানিক সূত্রের। আর ইতিহাসের ল্যাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা হয় নানা জাতির নানা রূপ আদর্শ, রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, চরিত্র ও সংস্কৃতির।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ও ভারতের মতো শক্তিধর দেশগুলো থেকেও শিখবার বহু বিষয় আছে। এ দেশগুলোর বৃহৎ শক্তি রূপে গড়ে ওঠার মূল কারণ, তাদের রয়েছে বিশাল ভূগোল। দেশগুলোর জনগণ সামর্থ্য রাখে বর্ণ, ভাষা ও অঞ্চলভিত্তিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে একতাবদ্ধভাবে বাঁচার ও দেশগড়ার। সে সামর্থ্য বর্ণবাদী, জাতীয়তাবাদী ও আঞ্চলিকতাবাদী বাঙালিদের নাই। আরব ও তুর্কিদেরও নাই। ফলে তারা আজ শক্তিহীন। অতীতে মুসলিম উম্মাহও বিশ্বশক্তি ছিল। তখন বিশ্বশক্তি রূপে তাদের বেড়ে ওঠার মূল কারণ ছিল, নানা ভাষা, নানা বর্ণ ও নানা অঞ্চলের মুসলিমগণ বিশাল এক অখণ্ড ভূগোলে একতাবদ্ধ ভাবে বসবাস করার সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। ইতিহাস বার বার প্রমাণ করেছে, একতাবদ্ধভাবে বসবাসের সামর্থ্য থাকলে বিজয় ও গৌরবের পথটি সহজ হয়ে যায়। সে সামর্থ্য না থাকলে বাঁচতে হয় বিভক্তি নিয়ে; তখন আসে পরাজয় ও গোলামি।
অবশ্যই ভূগোল বদলাতে হবে
শক্তি, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচতে হলে সর্ব প্রথম মুসলিম বিশ্বের ভূগোল বদলাতে হবে। নইলে সম্পদে শতগুণ বৃদ্ধি এনেও কোনো লাভ হবে না। বিভক্ত মানচিত্র নিয়ে স্বাধীনতা ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচা অসম্ভব। ইতিহাসের বড় শিক্ষা হলো, বৃহৎ ভূগোলের বিকল্প নাই। ক্ষুদ্র ভূগোলের অর্থই শক্তিহীনতা ও পরাধীনতা। মুসলিম উম্মাহর আজকের শক্তিহীনতার মূল কারণ জনশক্তি বা সম্পদের কমতি নয়। বরং সেটি হলো, বিভক্ত মানচিত্র। এজন্যই ইসলাম অতীতে শুধু বিশাল এলাকার জনগণের ধর্ম তথা মনের মানচিত্র পাল্টে দেয়নি, পাল্টে দিয়েছে তাদের দেশের ভূরাজনৈতিক মানচিত্রও। এটিই নবীজী (সা.)-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সূন্নত। বিশাল এলাকার ভূগোল পাল্টানোই ছিল তাঁর সুন্নত। অপরদিকে দেশকে খণ্ডিত করার পথটি হলো শয়তানকে খুশি করার পথ। সেটি পরাজয়, পরাধীনতা ও বেইজ্জতির পথ।
উম্মাহর বিভক্তি ভূগোলের মধ্য দিয় দৃশ্যমান হয় মহান রবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও বেঈমানী এবং একতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় মহান রবের প্রতি আনুগত্য ও ঈমান। পরিতাপের বিষয় হলো, মুসলিমগণ দীর্ঘকাল যাবত বাঁচছে নিজ ভূগোল ক্ষুদ্রতর করার কদর্য রাজনীতি নিয়ে। এ রাজনীতি হলো শয়তান ও তার খলিফাদের খুশি করার রাজনীতি। সে সাথে এ বিভক্তির এ রাজনীতি হলো মহান রবের প্রতিশ্রুত আযাব নামিয়ে আনার। সে আত্মঘাতী রাজনীতির পথ ধরেই ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ ও ফরাসিদের অস্ত্র ও অর্থ নিয়ে ছোট মনের আরব জাতীয়তাবাদীগণ খেলাফত ভেঙেছে। ১৯৭১-এ পৌত্তলিক ভারতের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে ছোটমনের বাঙালি জাতীয়তাবাদীগণ ভেঙেছে পাকিস্তান। জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, গোত্রবাদ ও আঞ্চলিকতাবাদ এভাবেই জনগণের মনকে ছোট করে। তখন ছোট মনের এ ক্ষুদ্র জীবদের জন্য অসম্ভব হয় ঈমানদার হওয়া। ঈমানদার তো তারাই হয়, যাদের মনটি বড় এবং মহৎ। যারা সামর্থ্য রাখে ভিন ভাষা, ভিন বর্ণ ও ভিন অঞ্চলের মুসলিমকে ভাই বলে আপন করে নেয়ার। কিন্তু যারা শুধু মুখের ভাষা, গায়ের রং এবং জন্মস্থান ভিন্ন হওয়ার কারণে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণে নামে তাদেরকে কি ঈমানদার বলা যায়? সেটি তো নিরেট বেঈমানী। বাঙালি মুসলিম জীবনে যে বেঈমানী প্রকটভাবে দেখা যায়, তা অন্যদের মাঝে দেখা যায় না। বিহারি হত্যা, বিহারি মহিলাদের ধর্ষণ ও তাদের ঘরবাড়ি দখল করার মাঝে। ভাষা, বর্ণ ও জাত-পাতের ভিন্নতা সত্ত্বেও ভারতীয় পৌত্তলিকগণ যেরূপ ঐক্যবদ্ধ বিশাল ভারত গড়েছে, সে সামর্থ্য আরব মুসলিমগণও দেখাতে পারেনি। দেখাতে পারেনি বাঙালি মুসলিমগণও। তাই বিশ্ববাসীর সামনে যে ইজ্জত ও স্বাধীনতা ভারতের রয়েছে, তা আরবদের যেমন নেই, নেই বাঙালি মুসলিমদেরও। যারা ভাঙার পথ বেছে নেয়, এ বিশ্বে স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত কখনোই তাদের জন্য নয়। তাদের জন্য তো পরাজয়, পরাধীনতা ও বেইজ্জতি। সেটি শুধু ইতিহাসের নিয়ম নয়, সেটি মহান আল্লাহ তায়ালার বিধানও।
স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে বসবাসের কোনো সহজ রাস্তা নেই। এগুলো কারো করুণার বিষয় নয়; নিজগুণে সেগুলো অর্জন করতে হয়। মুসলিমগণ যতদিন ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চলভিত্তিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে এক বৃহৎ ভূগোলে একতাবদ্ধভাবে বসবাসের সামর্থ্য অর্জন না করবে ততদিন স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে বসবাসের বাসনা স্রেফ স্বপ্নই থেকে যাবে। কলহ ও বিভক্তি নিয়ে বাঁচাই সবচেয়ে বড় পশ্চাদপদতা এবং সবচেয়ে বড় অসভ্যতা। এ পথটি বিদ্রোহ ও কুফুরির। তখন জাতীয় আয় বহুগুণ বাড়িয়েও স্বাধীনতা ও ইজ্জত জোটে না। মাথাপিছু আয় বিশাল হওয়া সত্ত্বেও সৌদি আরব, কাতার, আমিরাত, কুয়েতকে তাই স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভিখারি হতে হয়। অথচ সে বিপর্যয় ও অসহায় অবস্থা থেকে বাঁচাতেই মহান আল্লাহ তায়ালা একতাকে অর্থাৎ জামায়াতবদ্ধ হওয়াকে ফরজ করেছেন এবং বিভক্তিকে হারাম করেছেন। সে একতার নীতি গ্রহণ করেছে পৌত্তলিক ভারত, খ্রিষ্টান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বহু জাতিক রাশিয়া এবং চীন। অথচ মুসলিমগণ সে নীতি বহু আগেই পরিহার করেছে এবং বিভক্তির পথ বেছে নিয়েছে। ভাষা ও ভূগোল এক হওয়া সত্ত্বেও আরবগণ ২২ রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়েছে।
বিভক্তি গড়া হারাম; কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালার সে হুঁশিয়ারিতে তারা কর্ণপাত করেনি। বরং বিভেদ গড়তে বেছে নিয়েছে জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ ও আঞ্চলিকতাবাদের হারাম মতবাদী রাজনীতি। এভাবে বেছে নিয়েছে আযাবের পথ এবং অসম্ভব করেছে ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ তথা প্রতিষ্ঠা।