সম্পাদকীয়

হাম মহামারি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন মানবিক আন্তরিক উদ্যোগ


১৪ মে ২০২৬ ১০:৪৯

দেশে হামের বিস্তার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এমন পরিস্থিতিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘মহামারি’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে মে মাসের ১০ তারিখ সম্পাদকীয় নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা সরকারি হিসাবে ৪০৯ এবং ৫০,০০০-এর বেশি মানুষ হামে আক্রান্ত হয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (উএঐঝ) সূত্রে জানা গেছে। তবে পত্রিকায় প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ইতোমধ্যে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে লক্ষ্য ধরে জরুরি গণটিকাদান কর্মসূচি চালু করেছে। কিন্তু মৃত্যুর মিছিল থামছেই না।
বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় বর্তমানে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডঐঙ) মে ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৯১ শতাংশ জেলায় হাম প্রাদুর্ভাবের শিকার। দেশের ৮টি বিভাগেই হামের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে ঢাকা বিভাগে। এর বাইরে রাজশাহী, চট্টগ্রাম এবং খুলনা বিভাগেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ও বস্তিগুলোয় সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল ও মিরপুর এলাকাকে সংক্রমণের মূল কেন্দ্র বা হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জেলা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে কক্সবাজার, বরগুনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, নাটোর ও ময়মনসিংহ জেলাকে। উল্লেখিত জেলা সংক্রমণের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। ফলে টিকাদান কর্মসূচি যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এ সংক্রান্ত ফাইল লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে আটকে ছিলো। তাছাড়া দ্রব্যমূল্য বাড়ার কারণে অধিকাংশ পরিবার ন্যূনতম পুষ্টি চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। পুষ্টি ঘাটতির কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় শিশু ও বৃদ্ধরা হামের মতো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছে। কথায় আছে রোগের প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ শ্রেয়। তাই সরকারের দায়িত্ব টিকা কার্যক্রম জোরদার করার সাথে সাথে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা। মানুষ যেন স্বল্পমূল্যে পুষ্টি চাহিদা পূরণ করতে পারে, সেই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। মৌলিক প্রয়োজন পূরণের মতো মজুরি নির্ধারণ করতে হবে এবং তা শ্রমিকদের হাতে তুলে নিতে মালিকদের বাধ্য করতে হবে।
তাছাড়া চিকিৎসা ব্যবস্থায়ও আছে নানা ত্রুটি। হাম সংক্রামক ব্যাধি। অথচ আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা করা আসা অভিভাবকরা সাথে করে তার অন্য বাচ্চাদের নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। আক্রান্তদের সংস্পর্শে এসে তারও আক্রান্ত হচ্ছেন। কিন্তু এ সম্পর্কে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসক কেউ কঠোরভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণ করছেন না। হাসপাতালগুলোয় পর্যাপ্ত শয্যা ও ওষুধ নেই। আইসিইউ তো সোনার হরিণ। এমন খবরও পত্রপত্রিকায় এসেছে বাড়িঘর বন্ধক রেখে টাকা নিয়ে উন্নত চিকিৎসায় সন্তানকে বাঁচানোর আশা নিয়ে ঢাকা এসেছেন অনেক অভিভাবক। কিন্তু অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় ওষুধপথ্য জোগাড় করতে ব্যর্থ হয়ে শেষে প্রিয় সন্তানের লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। এমন অমানবিক ঘটনার পরও আমাদের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়েছে না, যা মেনে নেয়া কোনো সচেতন নাগরিকদের বিক্ষুব্ধ করছে। তাই আর বিলম্ব নয়।
আসুন, আমরা সবাই সচেতন হই। আক্রান্ত দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াই। এ মহামারি মোকাবিলায় সরকার, বিরোধীদলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার সাথে সাথে প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর জরুরিভিত্তিক মানবিক উদ্যোগ। অর্থ-বিত্ত নয়Ñ মানুষ মানুষের জন্য এই অনুভূতি নিয়ে চিকিৎসা খাতসংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের দায়িত্ব নাগরিকদের পুষ্টি ঘাটতি পূরণে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করে খুব সহজে তাদের মুখে পুষ্টিকর খাদ্য তুলে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তবেই আমরা সুস্থ, স্বাস্থ্যবান ও মেধাবী জাতি গঠনের মাধ্যমে বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার পূরণ করতে পারব।