অপরাধ সূচকে উচ্চমাত্রায় বাংলাদেশ : পুলিশ সপ্তাহ

নিরাপদ জনপদ গঠনে ইসলামী মূল্যবোধ ধারণ করতে হবে


১৪ মে ২০২৬ ১০:৪৮

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে প্রতিনিয়ত এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। তাই স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ হয়ে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি লাভ করতে যাচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের তকমা পাওয়া দেশটি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিক থেকে বাংলাদেশ অনেকটা এগিয়ে গেলেও দুর্নীতি ও অপরাধ দমন, সততা, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার এবং সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কিত সামাজিক বৈশিষ্ট্য ও সূচকগুলোয় কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নয়, বরং বিশ্বমানে অনেক পেছনে। দেশের সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ কিছুটা ভালো হলেও, প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতা; যেমনÑ অফিস-আদালত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনীতি ও বিচার ব্যবস্থা এবং ব্যবসায়িক সততার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বৈশ্বিক মান থেকে অনেক পেছনে। তাই দুর্নীতি ও অপরাধ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উচ্চমাত্রায়। বিগত দশকগুলোয় দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গবেষণা ও সমীক্ষা প্রতিষ্ঠানের তথ্য-উপাত্ত ও সমীক্ষায় এসব চিত্র উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ পুলিশ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত অপরাধ সম্পর্কিত তথ্য ও উপাত্তগুলো পর্যালোচনা করলে দেখতে পাওয়া যায় যে, খুন, ডাকাতি, ছিনতাই ও মাদকাসক্তির মতো অপরাধগুলো বাংলাদেশ কমছে না। বিগত এক দশকের পরিসংখ্যান হচ্ছে, গত ১০ বছরে বাংলাদেশে খুনের সংখ্যা বছরে গড়ে ৩,৫০০ থেকে ৪,৫০০। তবে ২০১৪ সালের তুলনায় বর্তমানে খুনের হার কিছুটা কমলেও তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়নি। পুলিশের সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, শুধু এপ্রিল মাসেই ২৮৮ খুন হয়েছে। তন্মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় ১৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
অন্যদিকে ডাকাতির সংখ্যা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও দস্যুতা বা ছিনতাইয়ের প্রবণতা সাম্প্রতিক বছরগুলোয়; বিশেষ করে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে বেশ বেড়েছে। পুলিশের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষের দিকে মাসিক দস্যুতার সংখ্যা বিগত কয়েক বছরের তুলনায় প্রায় ২০০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। চুরির মামলা প্রতি বছরই ঊর্ধ্বমুখী। এর পেছনে অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং মাদকের বিস্তারকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়। পুলিশের মোট অপরাধের একটি বড় অংশ প্রায় ৩০-৪০ ভাগ হচ্ছে মাদক সংক্রান্ত মামলা, যা গত ১০ বছরে অনেকগুণ বেড়েছে। চুরি-ডাকাতির এসব অপরাধের পরিসংখ্যান পুলিশ ও পরিসখ্যান ব্যুরোর তথ্য থেকে বেশি হবে। কারণ অনেকেই এসব অপরাধের তথ্য পুলিশকে অবহিত করে না। পুলিশকে জানাতে গিয়ে অহেতুক ঝামেলা এড়াতে সাধারণ মানুষ তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে চায় না।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নাম্বিও ক্রাইম ইনডেক্স (Numbeo Crime Index) ২০২৬ অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশের অপরাধ সূচক স্কোর ৬১.৬, যা বিশ্বের মধ্যে উচ্চ অপরাধপ্রবণতা হিসেবে বিবেচিত হয়। বৈশ্বিক অবস্থান হিসেবে ১৪৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ২৩তম। দক্ষিণ এশিয়ায়ও বাংলাদেশ অপরাধের দিক থেকে ওপরের সারিতে রয়েছে। ২০২৫ সালের সূচক অনুযায়ী এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪র্থ, যেখানে ভারত ১৬তম ও পাকিস্তানের ১৭তম এবং এ দুদেশের স্কোর বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম।
অপর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল অর্গানাইজড ক্রাইম ইনডেক্স (Global Organized Crime Index)-২০২৫ অনুযায়ী বাংলাদেশের অপরাধ জগতের ধরন কিছুটা ভিন্ন। বাংলাদেশে মানব পাচার, মাদক ব্যবসা এবং সাইবার অপরাধের মতো সংঘটিত অপরাধের হার এশিয়ায় তুলনামূলক বেশি (স্কোর ৫.২৭)। অপর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (Transparency International)-এর তথ্যমতে, দুর্নীতি অপরাধের একটি বড় অংশ, যা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ট্র্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (TI) কর্তৃক প্রকাশিত ২০২৫ সালের দুর্নীতি ধারণা সূচক (CPI) অনুযায়ী, ১০০ স্কোরের মধ্যে বাংলাদেশ ২৪ অর্জন করেছে। বিশ্বের ১৮২টি দেশের মধ্যে নিচ থেকে গণনা করলে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম (অর্থাৎ দুর্নীতির হার বেশ উচ্চ)। দক্ষিণ এশিয়ায় আফগানিস্তানের পরই বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে উদ্বেগজনক।
বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থার জরিপ ও সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে দুর্নীতি ও অপরাধের মাত্রা বিশ্বের অধিকাংশ দেশের তুলনায় বেশি এবং উচ্চমাত্রায়। তার কারণ কী, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র, তার একটি শক্তিশালী নির্বাহী বিভাগ রয়েছে, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ আছে। প্রতিটি বিভাগে পর্যাপ্ত ও প্রশিক্ষিত জনবল রয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয় এবং তারা নিয়মিত বেতন ভাতা পান। বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী, যার সদস্য সংখ্যা হচ্ছে দুই লক্ষাধিক। বাহিনীটাকে পরিচালনার জন্য একজন পুলিশ প্রধানের নেতৃত্বে একটি চৌকস কর্মকর্তাবৃন্দ রয়েছে। জেলা ও মহানগরির জন্য দায়িত্বশীল কর্মকর্তা তথা জেলা পুলিশ সুপার ও কমিশনার আছে। প্রায় ছয় শতাধিক থানার দায়িত্ব পালন করেন ছয় শতাধিক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং তাকে সহযোগিতায় রয়েছে একাধিক পুলিশ অফিসার। তারপরও বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হচ্ছে না, বরং কমছে। তা যেমন রাষ্ট্র ও সরকারের কর্তাব্যক্তিদের পক্ষ থেকে পর্যালোচনার দাবি রাখে, তেমনিভাবে বাংলাদেশ পুলিশকেও ভাবতে হবে। তবে অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণ করার কাজটা পুলিশের একার না, এটার সাথে রাষ্ট্র ও সরকারের পাশাপাশি জনগণেরও দায় রয়েছে।
অপরাধ দমন করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন করে নিরাপদ দেশ গঠনে যেমন সরকারের সদিচ্ছার অভাব নেই, তেমনিভাবে সাধারণ জনগণেরও প্রত্যাশা একটি নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ জনপদ। এ লক্ষ্যে পুলিশ বাহিনী দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। তারপরও দেশে অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণে আসছে না কেন। সমস্যাটা কোথায়, কেন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসছে না, মানুষ তার নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। তবে এভাবে চলতে পারে না, একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতেই হবে। নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে সরকার, প্রশাসন, রাজনীতিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যথাযথ পলিসি ও কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
প্রতিবারের মতো এবারও শুরু হয়েছে পুলিশ সপ্তাহ। বিগত ১০ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধন করেছেন। তিনি ১০ মে পুলিশ কল্যাণ প্যারেডে অংশগ্রহণ করেছেন এবং গত ১১ মে সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে বিশেষ মতবিনিময় সভা করেছেন।
অনুষ্ঠানে পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তুলে ধরা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পরপর দুদিন তাদের সাথে বৈঠক করেছেন। মাদক, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজে বাল্যবিবাহ, নারী ও শিশু নির্যাতন কিংবা চুরি-ডাকাতি, সংঘবদ্ধ অপরাধ, কিশোর গ্যাং, আর্থিক জালিয়াতিসহ নানা ধরনের অপরাধপ্রবণতা রয়েছে। সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত এসব অপরাধের শিকার হচ্ছেন। দেশে মাদক এবং অনলাইন জুয়ার ব্যাপারেও জনমনে উদ্বেগ রয়েছে। তাই আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে ‘মাদক সরবরাহকারী এবং মাদকের উৎসমূল’ টার্গেট করে মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে কার্যক্রম চালাতে হবে।’
সরকার দেশে মানবাধিকার সমুন্নত রেখে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে চায় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গুম-অপহরণ কিংবা বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিটি নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা পুলিশের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। বাংলাদেশ পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা, পেশাদারিত্ব ও জনআস্থা আরও সুদৃঢ় করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বদলি, পদোন্নতি কিংবা পুলিশে নিয়োগ এসব ক্ষেত্রে মেধা যোগ্যতা, দক্ষতা এবং সততাকেই আমরা প্রাধান্য দিতে চাই।’
প্রধানমন্ত্রী তার নাতিদীর্ঘ বক্তব্যে বলেছেন, সমাজে অপরাধপ্রবণতা রয়েছে এবং সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত এসব অপরাধের শিকার হচ্ছেন। তাই প্রতিটি নাগরিকের অধিকার রক্ষায় পুলিশের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্বকে স্মরণ করে দিয়েছেন।
পুলিশ সপ্তাহে বাংলাদেশ পুলিশ বরাবরের মতো অনেক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তারা দেশে অপরাধ কীভাবে দমন করা যায়, নিয়ন্ত্রণ করা যায় তা নিয়েও পর্যালোচনা করেছে বলে আমরা মনে করি। কিন্তু একটি বিষয়ে পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, তা হচ্ছে যে জনগণের নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশের কাজ ও দায়িত্ব তাদের সাথে মতবিনিময় করা। এটা প্রতিটি থানায় প্রতিনিধিত্বমূলক গণসমাবেশ করে অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে জনগণকে সম্পৃক্ত করা।
রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সরকার ও প্রশাসন সাধারণ জনগণের অধিকার রক্ষা ও সেবার জন্য প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। তন্মধ্যে পুলিশ সরাসরি মাঠপর্যায়ে কাজ করে। পুলিশকে যেমন সমাজের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, তেমনিভাবে অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণের কাজেও দায়িত্ব পালন করতে হয়। সিটিজেন চার্টারে বর্ণিত দায়িত্বগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশের জনগণের গুরুত্বপূর্ণ অনেক দায়িত্বই পুলিশকে পালন করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইটে সিটিজেন চার্টারে ভিশন ও মিশনে তাদের আদর্শিক অঙ্গীকারকে তুলে ধরা হয়েছে। ভিশনে তুলে ধরা হয়েছে, ‘সকল নাগরিককে সেবা প্রদান করা এবং বসবাস ও কর্মোপযোগী নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা।’ অপরদিকে মিশন হিসেবে অনেকগুলো কাজ ও দায়িত্ব উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে- ‘আইনের শাসন সমুন্নত রাখা, সকল নাগরিকের নিরাপত্তা সুনিশ্চিতকরণ, জনগণের অংশীদারিত্বের (Community Partnership) ভিত্তিতে সামাজিক শান্তি রক্ষা, অপরাধ চিহ্নিতকরণ ও প্রতিরোধ, আইন লঙ্ঘনকারীকে বিচারের আওতায় আনা, শান্তিও জনশৃঙ্খলা রক্ষা, জনগণকে সুরক্ষা, সাহায্য ও সেবা প্রদান এবং আশ্বস্তকরণ, সমব্যথি, বিনম্র এবং ধৈর্যশীল হওয়া, অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং উন্নততর কর্মসম্পাদনের পন্থা অন্বেষণ, বিভিন্ন সংস্থার সাথে সমন্বয় সাধন।’
প্রতিশ্রুত সেবার মধ্যে নাগরিক সেবার বিভিন্ন কাজ ও দায়িত্ব সুচারুভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য সেবাসমূহ হচ্ছে, সাধারণ নাগরিকের জিডি গ্রহণ, মামলা রুজু ও তদন্ত, পাসপোর্ট ও চাকরির ভেরিফিকেশন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, পুলিশ এস্কট, ৯৯৯ জাতীয় জরুরি সেবা প্রদান ও আইনি সহায়তা প্রদান ইত্যাদি।
বাংলাদেশ পুলিশের ভিশনে যা বলা হয়েছে, এককথায় তা খুবই দায়িত্বপূর্ণ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন অভিব্যক্তি, আর তা হচ্ছে ‘সকল নাগরিককে সেবা প্রদান করা এবং বসবাস ও কর্মোপযোগী নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা।’ বাংলাদেশ পুলিশ তার ভিশনে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, এটাই সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা। কিন্তু বাংলাদেশ পুলিশ কি সে লক্ষে যথাযথ কাজ করছে এবং পারছে, এটা পর্যালোচনাসাপেক্ষ। পুলিশের এ ভিশন রাষ্ট্রেরই ভিশন, তা করতে পারলে তো বাংলাদেশ একটি নিরাপদ ও সফল রাষ্ট্রে পরিণত হবে। তবে তার জন্য বাংলাদেশ পুলিশের জনবল যেমন বাড়াতে হবে, তেমনিভাবে পুলিশকে আদর্শিক ও নৈতিক প্রশিক্ষণও দিতে হবে। বাংলাদেশে জনসংখ্যা ও পুলিশের বর্তমান অনুপাত হচ্ছে (৮৬৯:১), অর্থাৎ বাংলাদেশে প্রতি ৮৬৯ জন মানুষের জন্য ১ জন পুলিশ সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন। অপরদিকে জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি ৪৫০ জন মানুষের জন্য ১ জন পুলিশ থাকা আদর্শ। সেই তুলনায় বাংলাদেশে পুলিশের সংখ্যা অর্ধেকেরও কম। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে কনস্টেবল থেকে আইজিপি পর্যন্ত মোট পুলিশ সদস্যের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার। কাক্সিক্ষতসংখ্যক পুলিশ বাড়ানোর পাশাপাশি আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে।
বাংলাদেশকে নিরাপদ বাসযোগ্য করতে যেমন পুলিশ তার ভিশনে দায়িত্বপূর্ণ আশাবাদ ব্যক্ত করেছে, তেমনি দেশের জনগণেরও আশাবাদ একটি সুখী-সমৃদ্ধ ও নিরাপদ বাংলাদেশ। জনগণ চায় তার জানমালের নিরাপত্তা ও নিশ্চিন্ত বসবাস। তবে এ কঠিন কাজ একা যেমন পুলিশের পক্ষে সম্ভব হবে না, তেমনিভাবে সরকারও পারবে না। তাই সরকার, রাজনীতিক, পুলিশ ও জনগণকে যৌথভাবেই কাজ করতে হবে। বাস্তবমুখী কাজের পাশাপাশি আমাদের আদর্শিক মূল্যবোধ ও নৈতিক দিক থেকেও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পুলিশের আদর্শিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার চেতনা বৃদ্ধির সাথে জনগণকেও আদর্শিক মূল্যবোধ ও নৈতিক দিক থেকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। পুরো জনগোষ্ঠীকে শুধুমাত্র আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না, আদর্শিক মূল্যবোধের মাধ্যমে নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমেও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মুসলিম দেশ হিসেবে আমাদের আদর্শিক মূল্যবোধ হতে হবে ইসলামী আদর্শভিত্তিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতাপূর্ণ।
ইসলামে অপরাধ দমন ও তা নির্মূলে নৈতিক শিক্ষা, পরকালীন জবাবদিহি এবং কঠোর শাস্তিমূলক আইনের (হুদুদ ও কিসাস) সমন্বিত পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। ইসলামে অপরাধের প্রবণতা কমানোর জন্য কেবল শাস্তির ওপর নির্ভর না করে, মানুষের মন ও ঈমান পরিশুদ্ধকরণ এবং সমাজে ন্যায়বিচার ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে অপরাধ দমনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সর্বোপরি পরামর্শ হচ্ছে, অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণ করে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন করতে হলে সরকারকে পুলিশ বাহিনী ও জনগণের নৈতিক মানোন্নয়নে আদর্শিক বিশ্বাস ও মূল্যবোধ বিকাশের নীতিমালা গ্রহণ করা দরকার। ইসলামী মূল্যবোধ ও নৈতিকতার বিকাশের নীতিমালাই হতে পারে আমাদের দেশের অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সঠিক কর্মপদ্ধতি ও কর্মসূচি। ইসলামী আদর্শ ও মূল্যবোধের আলোকেই একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। আশা করি, সরকার প্রশাসন, রাজনীতিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ইসলামী আদর্শ ও মূল্যবোধের আলোকে যথাযথ পদক্ষেপ এবং কর্মনীতি ও কমসূচি গ্রহণ করবে।

লেখক : বার্তা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা
মেইল : ferdous.ab@gmail.com