জটিল সন্ধিক্ষণে দেশের অর্থনীতি


১৪ মে ২০২৬ ১০:১২

উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, সীমিত রিজার্ভ, বাড়ছে ঋণের সুদ, খেলাপি ঋণে মূলধন ঘাটতি, কমছে জিডিপির প্রবৃদ্ধি
॥ ফারাহ মাসুম ॥
২০২৬ সালের মে মাস বাংলাদেশের অর্থনীতি এক জটিল সন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্রমক্ষয়িষ্ণু ধারা এবং খেলাপি ঋণের পাহাড়সম চাপ; অন্যদিকে রেমিট্যান্সপ্রবাহে আশাব্যঞ্জক প্রবৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর অবস্থান- সব মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।
২০২৬ সালের মে মাসের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (বিপিএম৬ পদ্ধতি) দাঁড়িয়েছে ৩০.৯৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা পূর্ববর্তী মে মাসের ২০.২৯ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একসময়ের রিজার্ভের ধারাবাহিক পতনের এই উত্থান বহিঃখাতে চাপের মধ্যেও স্বস্তির ইঙ্গিত দেয়। তবে সম্প্রতি জ¦ালানি মূল্যসহ বহিঃখাতের চাপ অর্থনীতির আমদানিনির্ভর কাঠামোকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে শিল্প খাতের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানিতে এলসি খোলা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে উৎপাদন ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে মন্থরতা দেখা দিচ্ছে। ডলারের ঘাটতির কারণে ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তাও বাড়ছে।
অন্যদিকে আন্তঃব্যাংক টাকা-ডলার বিনিময় হার ১২২.৭৫ টাকায় স্থিতিশীল রাখার প্রচেষ্টা থাকলেও বাজারে ডলারের সরবরাহ সীমিত থাকায় টাকার ওপর অবমূল্যায়নের চাপ অব্যাহত রয়েছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তুলনায় এ বিনিময় হার প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে, যা আমদানিকৃত পণ্যের ব্যয় বৃদ্ধি করে মুদ্রাস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করছে। তবে এই বৃদ্ধি ঘটেছে আওয়ামী লীগ আমলের শেষ দিকে অস্থিরতার কারণে। ফলত জ্বালানি, খাদ্য এবং শিল্প কাঁচামালের দামের ওপর চাপ পড়ে সাধারণ ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা আরও সংকুচিত হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে রিজার্ভ সংকট ও বিনিময় হারের চাপ অর্থনীতির বহিঃখাতের দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের হার : সাধারণের নাভিশ্বাস
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে সাধারণ মুদ্রাস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯.০৪ শতাংশে। যদিও ১২ মাসের গড় হিসাবে এটি ৮.৫৯ শতাংশে নেমে এসেছে। তবুও খাদ্য ও জ্বালানির উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হচ্ছে, যা সামগ্রিক চাহিদা ও ভোগ-ব্যয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মুদ্রাস্ফীতির চাপ বিশেষভাবে খাদ্য নিরাপত্তা ও জ্বালানি ব্যয়ের ক্ষেত্রে বেশি দৃশ্যমান।
মুদ্রানীতির দিক থেকে কল মানি রেট ১৫.৪২ শতাংশে উন্নীত হওয়া বাজারে তীব্র তারল্য সংকটের ইঙ্গিত দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক নীতি গ্রহণ করলেও উচ্চ সুদের হার উৎপাদন ও বিনিয়োগ ব্যয় বাড়াচ্ছে। ফলে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বৃদ্ধি পেয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতি সৃষ্টি হতে পারে।
অন্যদিকে নেট সঞ্চয়পত্র বিক্রি ঋণাত্মক (-৬০৬৩.৩৩ কোটি টাকা) হওয়া নির্দেশ করে যে মানুষ সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাচ্ছে বা উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির প্রেক্ষাপটে বিকল্প বিনিয়োগকে অধিক লাভজনক মনে করছে। সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতি, তারল্য সংকট এবং সঞ্চয়ের নেতিবাচক প্রবণতা অর্থনীতির ভেতরকার চাপকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
ব্যাংকিং খাত ও খেলাপি ঋণের ভূত
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে ব্যাংকিং খাতের শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণে। ২০২৫ সালের জুনে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩৪.৪০ শতাংশ, যা সেপ্টেম্বরে বেড়ে ৩৫.৭৩ শতাংশে পৌঁছায়। যদিও ডিসেম্বরে তা কিছুটা কমে ৩০.৬ শতাংশে নেমে আসে, তবুও এই হার দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত উচ্চ এবং আর্থিক ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপের ইঙ্গিত দেয়। এমন মাত্রার খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর সম্পদমান দুর্বল করে, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে জটিল করে তোলে এবং সামগ্রিক আস্থার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করে।
উচ্চ খেলাপি ঋণের ফলে ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততায় ঘাটতি দেখা দেয়, যা নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা সীমিত করে। এতে উৎপাদন, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে ধীরগতি সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬.০৩ শতাংশ, যা সরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৩৩.৫৭ শতাংশের তুলনায় অনেক কম। এই ভারসাম্যহীনতা দীর্ঘমেয়াদি বেসরকারি বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিও কমিয়ে দেয়। ফলে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কেবল আর্থিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ না থেকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
বৈদেশিক বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স : অর্থনীতির প্রাণভোমরা
এই সংকটকালেও অর্থনীতির অন্যতম শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। অর্থবছর ২০২৫-এ রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৩০.৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা বার্ষিক ২৬.৮৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। ২০২৬ অর্থবছরের ১০ মাসে সালের ১৯.৫৪ শতাংশ রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এই উল্লেখযোগ্য প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক অবদান রাখছে এবং রিজার্ভ ধরে রাখতে কিছুটা সহায়তা করছে। একইসঙ্গে এটি অভ্যন্তরীণ ভোগ-ব্যয় ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে রপ্তানি খাতে ২০২৫ অর্থবছরে ৭.৭২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও আমদানি ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি মাত্র ২.৪৪ শতাংশে সীমিত রাখা হয়েছে কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। ২০২৫ অর্থবছরের ৯ মাসে ৪.৫৫ শতাংশ আমদানি বাড়লেও রফতানি আয় সাড়ে ৪ শতাংশ কমে গেছে। এটি বৈদেশিক খাতে বেশ চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এর আগে আমদানি নিয়ন্ত্রণ স্বল্পমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমালেও এর একটি কাঠামোগত প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানির সেটেলমেন্ট ২৫.৪২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমে ধীরগতির ইঙ্গিত দেয়। এর ফলে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং ভবিষ্যৎ রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। সামগ্রিকভাবে রেমিট্যান্স অর্থনীতির জন্য স্বস্তির বার্তা দিলেও বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণে সতর্ক ভারসাম্য প্রয়োজন।
রাজস্ব আদায় ও বাজেট ব্যবস্থাপনা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০২৫ অর্থবছরে মোট ৩,৭০,৮৭৪ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে, যেখানে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি মাত্র ২.২৩ শতাংশ। এই ধীর প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির সামগ্রিক গতির তুলনায় কম, ফলে বাজেট বাস্তবায়নে আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ঘাটতি থাকায় সরকারের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যা সামষ্টিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৬ অর্থবছরে অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে মাত্র ১১.১৫ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি করতে পেরেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। অথচ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্র অর্জন করতে হলে এর তিনগুণ রাজস্ব বাড়াতে হবে।
বাজেটে এ ঘাটতি অর্থায়নের প্রেক্ষাপটে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্চ ২০২৬-এর তথ্যানুযায়ী সরকারি খাতে নিট ঋণের প্রবৃদ্ধি ৩৩.৫৭ শতাংশে পৌঁছেছে। এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ তুলনামূলকভাবে কমে গিয়ে ‘ক্রাউডিং আউট’ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যেখানে সরকারি ঋণ চাহিদা বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য অর্থপ্রবাহ সীমিত করে দেয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি উদ্যোক্তা কার্যক্রম ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে ধীর করতে পারে।
রাজস্ব ঘাটতির কারণে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অর্থায়নেও চাপ দেখা দিচ্ছে। অবকাঠামো ও সামাজিক খাতে বরাদ্দে টান পড়লে বিনিয়োগ ব্যয় কমে যেতে পারে, যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে। তাই রাজস্ব সংস্কার, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এখন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উৎপাদনশীল খাত : কৃষি ও শিল্প
অর্থনীতির উৎপাদনভিত্তিক খাতে চিত্রটি মিশ্র। কৃষি খাতে ঋণ বিতরণে লক্ষ্যমাত্রার ৭৮.৪৬ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। জুলাই-মার্চ ২০২৬ সময়ে মোট ৩০ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা কৃষি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতি ও খাদ্য উৎপাদন ধারাবাহিক রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। কৃষি ঋণের এই প্রবাহ সেচ, বীজ, সার ও যান্ত্রিকীকরণে অর্থায়ন নিশ্চিত করে খাদ্য নিরাপত্তাকে সমর্থন দিচ্ছে। সামগ্রিকভাবে সংকটময় অর্থনীতিতে কৃষি খাত একটি স্থিতিশীল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। তবে এবার হাওর অঞ্চলে ব্যাপক ফসলহানিতে খাদ্য ঘাটতি বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর চাপ পড়তে পারে আমদানি দায়ে।
অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) খাতে ঋণ বিতরণে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি (-৬.১৪ শতাংশ) উদ্বেগের বিষয়। এসএমই খাত সাধারণত কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়; তাই এই সংকোচন নতুন উদ্যোক্তা বিকাশ ও স্থানীয় উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে শ্রমবাজারে চাপ বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
তবে বড় শিল্প ঋণের ক্ষেত্রে ১১.৪৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কিছুটা ইতিবাচক সংকেত দিচ্ছে। এটি বৃহৎ উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে। তবুও ভারসাম্যপূর্ণ প্রবৃদ্ধির জন্য এসএমই খাতে অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধি এবং কৃষি ও শিল্পের মধ্যে সমন্বিত নীতি অপরিহার্য, যাতে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন উভয়ই সমানভাবে এগিয়ে যায়।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি : ধীরগতির পথরেখা
২০২৫ অর্থবছরের সংশোধিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা সাম্প্রতিক কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম নিম্ন হার হিসেবে বিবেচিত। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ৭.৩২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় এই পতন অর্থনীতির গতিশীলতায় উল্লেখযোগ্য শ্লথতা নির্দেশ করে। উচ্চ প্রবৃদ্ধির পর্ব থেকে এমন নিম্নমুখী প্রবণতা সামষ্টিক অর্থনীতির কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও বহিঃআঘাতের সম্মিলিত প্রভাবকেই তুলে ধরে। চলতি বছরও প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের কোটায় থাকতে পারে বলে আভাস দেয়া হচ্ছে।
কোভিড-পরবর্তী সময়ে সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক চাহিদার ওঠানামা অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে। পাশাপাশি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের চলমান অস্থিরতা জ্বালানি মূল্য, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যপ্রবাহে চাপ সৃষ্টি করেছে। এসব ভূ-রাজনৈতিক সংকটের প্রভাব বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়, রপ্তানি বাজার এবং ডমেস্টিক সাপ্লাই চেইনÑ সব ক্ষেত্রেই প্রতিফলিত হয়েছে।
ফলস্বরূপ শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে মন্থরতা দেখা দিয়েছে, যা জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি কমিয়ে দিয়েছে। সামগ্রিকভাবে এই সূচকটি ইঙ্গিত দেয় যে টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু স্বল্পমেয়াদি উদ্দীপনা নয়, বরং কাঠামোগত সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং বৈশ্বিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা অপরিহার্য।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট : সংকটের মেঘ
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে একটি কঠিন সময় পার করছে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, ডলার সংকট এবং ব্যাংকিং খাতের অস্থিতিশীলতার মধ্যে নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে। এই বাজেটে সরকারের সামনে প্রধান সাতটি চ্যালেঞ্জ নিচে বিশ্লেষণ করা হলো-
১. মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ : জীবনযাত্রার ব্যয় বনাম নীতিনির্ধারণ : বর্তমানে ৯ শতাংশের ওপরে থাকা মুদ্রাস্ফীতিকে ৬-৭ শতাংশের কাক্সিক্ষত পরিসরে নামিয়ে আনা নতুন বাজেটের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি কেবল ভোগ-ব্যয়ই নয়, সামগ্রিক অর্থনৈতিক আস্থাকেও প্রভাবিত করে। বিশেষ করে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির চাপ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করা হয়েছে, যার ফলে ঋণের সুদের হার ১৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। উচ্চ সুদহার বাজারে তারল্য কমাতে সহায়তা করলেও এর একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো উৎপাদন ও বিনিয়োগ ব্যয় বৃদ্ধি। শিল্প খাতে ঋণের খরচ বাড়ায় ব্যবসা সম্প্রসারণ ধীর হতে পারে, যা কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই মুদ্রানীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদনশীলতা- এ দুইয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।
বাজেটের দিক থেকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা সম্প্রসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য নগদ সহায়তা ও খাদ্য সহায়তা বৃদ্ধি করলে মূল্যস্ফীতির নেতিবাচক প্রভাব কিছুটা প্রশমিত করা সম্ভব। পাশাপাশি টিসিবির মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখা দরকার। একইসঙ্গে বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং সিন্ডিকেটভিত্তিক মূল্য নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে প্রশাসনিক ও নীতিগত পদক্ষেপ জোরদার করতে হবে। সমন্বিত কৌশল ছাড়া মুদ্রাস্ফীতি টেকসইভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।
২. রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা ও এনবিআর : ২০২৫ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব প্রবৃদ্ধি মাত্র ২.২৩ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এই ধীর প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির সামগ্রিক গতি ও কর আহরণ ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে। রাজস্ব ঘাটতির ফলে সরকারের অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের ওপর চাপ বাড়ছে, যা বাজেট ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি করছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফের শর্তানুযায়ী জিডিপির অনুপাতে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি করা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক মন্থরতার প্রেক্ষাপটে নতুন কর আরোপ বা করহার বৃদ্ধি করা হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, যা বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধিকে আরও শ্লথ করে দিতে পারে। ফলে নীতিগতভাবে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করা প্রয়োজন, যেখানে রাজস্ব বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।
এই পরিস্থিতিতে করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা সম্প্রসারণ সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন, তথ্যভিত্তিক কর শনাক্তকরণ এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করলে কর ফাঁকি কমানো সম্ভব হবে। বিশেষ করে উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও করপোরেট খাতে কর ফাঁকি রোধে কঠোর নজরদারি ও অটোমেশন ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। এতে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি পাবে এবং ব্যাংক ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা কমবে।
৩. বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ডলার ব্যবস্থাপনা : বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুযায়ী প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের আশপাশে ওঠানামা করছে, যা অর্থনীতির বহিঃখাতের জন্য একটি সংবেদনশীল অবস্থান নির্দেশ করে। এই সীমিত রিজার্ভ পরিস্থিতি বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে, ফলে সামগ্রিক বৈদেশিক দায় ব্যবস্থাপনা আরও জটিল হয়ে উঠছে।
একইসাথে আমদানি নিয়ন্ত্রণমূলক নীতির কারণে শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদন সক্ষমতার ওপর, যা রপ্তানি খাতের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎসগুলোর একটিই আবার চাপের মুখে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে নীতিগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়ানো। হুন্ডি প্রতিরোধ এবং প্রবাসী আয়ের ওপর প্রণোদনা অব্যাহত রাখলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ স্থিতিশীল হতে পারে। পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক কাঠামোর দিকে নেওয়া; যেমন ক্রলিং পেগ বা সম্পূর্ণ বাজারভিত্তিক রেট বৈদেশিক বাজারে স্বচ্ছতা ও ভারসাম্য আনতে সহায়ক হতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা আরও টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে স্বল্প মেয়াদে চাপ সৃষ্টি করবে।
৪. ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও খেলাপি ঋণ : তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশের ওপরে পৌঁছেছে, যা একটি আর্থিক ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক সংকেত। এ ধরনের উচ্চ খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিট দুর্বল করে, মূলধন ঘাটতি তৈরি করে এবং নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা সীমিত করে দেয়। এর ফলে পুরো আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো তারল্য সংকট। ব্যাংকগুলোয় পর্যাপ্ত তারল্য না থাকায় সরকার বাজেট ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস; বিশেষ করে ব্যাংক ঋণের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এর ফলে ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ সৃষ্টি হয়, যেখানে সরকারি ঋণ চাহিদা বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দেয়। এতে উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি ধীর হয়ে যেতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। দুর্বল ও অকার্যকর ব্যাংকগুলোকে একীভূতকরণ করে আর্থিক স্থিতিশীলতা পুনর্গঠন করা যেতে পারে। পাশাপাশি ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। ঋণ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করা এবং ব্যাংকিং শাসন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ছাড়া এই সংকট থেকে টেকসই উত্তরণ সম্ভব নয়।
৫. বৈদেশিক ঋণের দায় পরিশোধ : আগামী অর্থবছরে মেগা প্রকল্পসমূহের বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে, যা সামষ্টিক বাজেট ব্যবস্থাপনার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর জন্য নেওয়া ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় হয়ে যাবে, ফলে রাজস্ব ব্যয়ের কাঠামোয় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো উন্নয়ন ব্যয়ের সংকোচন। ঋণ পরিশোধে অধিক বরাদ্দ দিতে গিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য সামাজিক খাতে বিনিয়োগ সীমিত হয়ে পড়তে পারে। একইসঙ্গে নতুন অবকাঠামো প্রকল্পেও অর্থায়নের ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যয় ব্যবস্থাপনায় কঠোর শৃঙ্খলা জরুরি। অনুৎপাদনশীল ও কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতে সরকারি ব্যয় সংকোচন করে সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে কঠিন শর্তযুক্ত বৈদেশিক ঋণ গ্রহণে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। পরিবর্তে স্বল্পসুদ ও টেকসই অর্থায়নের উৎস অনুসন্ধান এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব শক্তিশালী করা হলে ঋণনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব হবে।
৬. জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত : ভর্তুকির ফাঁদ ও আমদানিনির্ভরতা : জ্বালানি খাত বর্তমানে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যায়, পেট্রোলিয়াম আমদানির এলসি সেটেলমেন্ট ৪.৫১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি মূল্যের অস্থিরতা এবং ডলারের উচ্চ চাহিদা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
ভর্তুকি ও মূল্যবৃদ্ধির দ্বন্দ্ব এই খাতের অন্যতম প্রধান নীতি-চ্যালেঞ্জ। আইএমএফের শর্তানুযায়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হচ্ছে। এর ফলে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও এতে সরকারের আর্থিক ভর্তুকি চাপ কিছুটা কমবে, কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে সেচ, শিল্প উৎপাদন এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পেতে পারে, যা পরোক্ষভাবে মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।
অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি না থাকায় জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই আমদানিনির্ভর এলএনজির মাধ্যমে পূরণ করতে হচ্ছে। ডলারের বিনিময় হার প্রায় ১২৩ টাকার কাছাকাছি থাকায় এই আমদানির ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
দীর্ঘমেয়াদে এই নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি; বিশেষ করে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ অর্থবছরের বাজেটে এসব খাতে বিশেষ করছাড় ও প্রণোদনা দিলে আমদানিনির্ভরতা হ্রাস পেয়ে জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।
৭. শিক্ষা ও মানবসম্পদ : মানসম্মত শিক্ষার সংকট: অর্থনৈতিক মন্দার সময় শিক্ষা খাতে বরাদ্দ সংকোচন একটি সাধারণ প্রবণতা হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে পরিণত হতে পারে। কারণ শিক্ষা খাতই মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল ভিত্তি, যা ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা নির্ধারণ করে।
দক্ষতার অভাব ও বেকারত্ব বর্তমানে একটি ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যায়, শিল্প খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক থাকলেও এসএমই খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬.১৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে বড় শিল্পে অটোমেশন বৃদ্ধি পেলেও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি ও সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বাজেটে কারিগরি শিক্ষা এবং আইটি ফ্রিল্যান্সিং খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকলে শিক্ষিত বেকারত্ব আরও বাড়তে পারে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে গবেষণা ও উদ্ভাবনে বাংলাদেশের বরাদ্দ দক্ষিণ এশিয়ায় এখনো তুলনামূলকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি না করলে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তিনির্ভর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়বে। উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি উন্নয়ন ছাড়া বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে মেধা পাচার একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ। উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, সীমিত গবেষণা সুযোগ এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা মেধাবীদের বিদেশমুখী করছে। এই প্রবণতা রোধে বাজেটে স্টার্টআপ ফান্ড সম্প্রসারণ, তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য করছাড়ের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং উদ্ভাবন সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। এতে দেশেই মেধা ধরে রাখা এবং নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি সম্ভব হবে।
নীতিগত সুপারিশ : স্থিতিশীলতার চারটি স্তম্ভ
১. রিজার্ভ সংরক্ষণ ও বৈদেশিক স্থিতিশীলতা : বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্ত ভিত্তিতে ফেরাতে ডলারের একক ও স্বচ্ছ বিনিময় হার ব্যবস্থা কার্যকর করা জরুরি। হুন্ডি ও অবৈধ অর্থপ্রবাহ দমন করলে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়বে। একইসঙ্গে রেমিট্যান্স প্রণোদনা অব্যাহত রাখা এবং রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ; বিশেষ করে উচ্চমূল্য সংযোজিত খাতে দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক আয় স্থিতিশীল করতে সহায়ক হবে।
২. খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যাংকিং সংস্কার : উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতের মূলধন ঘাটতি ও তারল্য সংকট বাড়ায়। তাই বড় ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে ঋণ পুনর্গঠন, সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণের মাধ্যমে আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা গেলে খাতটির প্রতি আস্থা পুনর্গঠিত হবে।
৩. মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সমন্বিত কৌশল : শুধু সুদের হার বৃদ্ধি করে মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব নয়। সরবরাহ শৃঙ্খল সচল রাখা, পরিবহন ও জ্বালানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। সিন্ডিকেটভিত্তিক মূল্য নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে প্রশাসনিক তদারকি ও তথ্যভিত্তিক বাজার পর্যবেক্ষণ জোরদার করা দরকার।
৪. রাজস্ব সংস্কার ও কর সম্প্রসারণ : করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল অটোমেশন বাড়ানো উচিত। এতে রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি পাবে এবং ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমবে। ফলস্বরূপ বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক থাকবে এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হবে।
সমন্বিত সংস্কার ছাড়া সামষ্টিক স্থিতিশীলতা টেকসই হবে না। তাই নীতিগত ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা এবং বাস্তবায়ন দক্ষতাই আগামী অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন। সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো নির্দেশ করছে যে, কেবল জোড়াতালি দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার, সুশাসন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে আগামী দিনের মূল চ্যালেঞ্জ। বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরে এলে এবং খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হলে ২০২৭ সাল নাগাদ অর্থনীতি পুনরায় ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করা যায়।
নতুন অর্থবছরের বাজেটে সরকারকে একটি ‘সুইং’ পজিশন নিতে হবে। একদিকে আইএমএফের সংস্কারমূলক শর্ত মেনে ভর্তুকি কমানো; অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ওপর সেই খরচের বোঝা যাতে অসহনীয় না হয়,সেদিকে খেয়াল রাখা। জ্বালানি খাতে সাশ্রয় এবং শিক্ষা খাতে উদ্ভাবনই হতে পারে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ।