মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে ঘিরে স্মৃতি, উন্নয়ন ও বিচার নিয়ে নতুন করে আলোচনায় সাঁথিয়া-বেড়া

মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর দশম শাহাদাত বার্ষিকী আজ

সোনার বাংলা অনলাইন
১১ মে ২০২৬ ১০:২৫

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলেমে দ্বীন, বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, সাবেক মন্ত্রী ও সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী

রফিকুল আলম রঞ্জু  , পাবনা সংবাদদাতা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত ব্যক্তিত্ব সাবেক আমিরে জামায়াতে ইসলামী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে ঘিরে তাঁর জন্মভূমি পাবনার সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলায় এখনো গভীর আবেগ, স্মৃতি ও রাজনৈতিক আলোচনা বিদ্যমান। এলাকার বহু মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন; বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের অগ্র সেনানী এবং শিক্ষা বিস্তার, সামাজিক উন্নয়ন, কৃষি ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত একজন সংগঠক হিসেবেও স্মরণীয়।
২০১৬ সালের ১১ মে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় অনুযায়ী তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। রাষ্ট্র ও আদালতের অবস্থান ছিল—এটি আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হওয়া একটি বিচারিক সিদ্ধান্ত। তবে তাঁর পরিবার, রাজনৈতিক সহকর্মী ও সমর্থকদের একটি বড় অংশ শুরু থেকেই এ বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে দাবি করে আসছে। তাদের ভাষায়, এটি ছিল “বিচারের নামে বিচারিক হত্যাকাণ্ড”। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর সমর্থকরা বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এনে এ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানাচ্ছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী ফলাফলে জনমতের প্রতিফলন সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে পুনর্গঠিত পাবনা-১ (সাঁথিয়া) আসনে তাঁর পুত্র ড. ব্যারিস্টার মাওলানা নাজিবুর রহমান মোমেনের বিজয়কে স্থানীয় অনেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, এটি শুধু একজন প্রার্থীর বিজয় নয়; বরং মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর প্রতি এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের ভালোবাসা, আস্থা ও আবেগের বহিঃপ্রকাশ।
সাঁথিয়া পৌরসভার ৬ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আবু দাউদ বলেন, নিজামী সাহেবের ছেলে ব্যারিস্টার মোমেন তার মতো সততা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়ে নিজামী সাহেবের অসমাপ্ত সমাপ্ত করবেন। তিনি আরো বলেন,
মানুষ ভোটের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা নিজামী সাহেবকে ভুলে যায়নি। তাঁর পরিবার ও আদর্শের প্রতি জনগণের যে শ্রদ্ধা ছিল, তা আজও অটুট রয়েছে।

উন্নয়নের স্মৃতিচারণ:

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মতিউর রহমান নিজামী তাঁর রাজনৈতিক জীবনে সাঁথিয়া-বেড়ায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, রাস্তা-ঘাট উন্নয়ন, মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক উদ্যোগে ভূমিকা রাখেন বলে এলাকাবাসীর অনেকেই মন্তব্য করেছেন।
সাঁথিয়ার এক প্রবীণ শিক্ষক বলেন, সাথিয়ার প্রবীণ শিক্ষক মোহাম্মদ আলী (৭২) জানান
নিজামি সাহেব নিয়মিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর খোঁজখবর নিতেন। মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তার ব্যাপারে আন্তরিক ছিলেন। কলেজ শিক্ষক ডক্টর ইদ্রিস আলম মন্তব্য করেন,
“রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও শিক্ষা বিস্তারে জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছেন।

শ্রমজীবী মানুষের চোখে নিজামী:

সাথিয়া উপজেলার মতিউর রহমান নিজামীর নিজ গ্রাম মনমথপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন,
“আমাদের এলাকার কৃষকের সমস্যা তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। সেচ, সার ও উৎপাদন ব্যয় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে কথা বলতেন।”
আরেকজন কৃষক আব্দুর রহমান মোল্লা (৭০)জানান,
তিনি ক্ষমতায় থাকুন বা বিরোধী রাজনীতিতে থাকুন, এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং খোঁজখবর নিতেন।
রিক্সা শ্রমিক মাহমুদ মোল্লা বলেন, অন্যায়ভাবে তাকে জোর করে ফাঁসি দিয়েছেন, যারা অন্যায়ভাবে তাকে ফাঁসি দিয়েছেন, তাদের আমরা ফাঁসি চাই ।
একজন ভ্যানচালক বলেন,“তিনি বড় নেতা ছিলেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহজভাবে কথা বলতেন। এই কারণেই অনেকে তাঁকে মনে রেখেছেন। তাকে অন্যায় ভাবে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে।
আলেমদের দৃষ্টিতে মাওলানা নিজামী : মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসাবে অভিহিত করেছেন স্থানীয় আলেম-ওলামারা। সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেম ও সাঁথিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা মোখলেছুর রহমান জানান, তার মত একজন বিদগ্ধ আলেম এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তি যিনি ইসলামী আন্দোলনের জন্য এবং দেশে বাস্তবায়নের তাগিদে সর্বোচ্চ ছুটে বেরিয়েছেন এবং দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছানো এবং আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দিনকে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে কাজ করেছেন এটাই ছিল তৎকালীন সরকারের মাথা ব্যথার কারণ। তৎকালীন সরকার ইসলামের প্রচার, প্রসার ও জনগণের ভালোবাসাকে সহজভাবে নিতে পারে নাই বিধায় তাকে অন্যায়ভাবে ফাঁসি দিয়েছেন। বর্তমান সময়ে গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে আমাদের দাবি অন্যায় ভাবে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তি কে ফাঁসি দেওয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে যারা তাকে অন্যায় ভাবে ফাঁসি দিয়েছেন তাদেরকে বিচারা আওতায় আনবেন এবং উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করবেন।

যুবসমাজের দৃষ্টিভঙ্গি:

স্থানীয় যুবকদের একাংশ মনে করেন, মতিউর রহমান নিজামীর জীবন ও বিচার নিয়ে ইতিহাসভিত্তিক গবেষণা হওয়া দরকার। এ বিষয়ে যুব উদ্যোক্তা মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, যারা একজন সৎ,যোগ্য , দক্ষ ইসলামী আন্দোলনের নেতা কে অবৈধভাবে ফাঁসি দিয়েছেন আমরা তাদের বিচার চাই।
সাঁথিয়ার এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বলেন,
“আমরা চাই তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন হোক। ইতিহাস, আদালতের রায় এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট—সব দিকই গবেষণার মাধ্যমে সামনে আসুক।এবং প্রকৃত বিচারিক ঘটনা সবার সামনে উন্মুক্ত করা হোক। অন্যায় ভাবে বিচারে বিচারকদের মুখোশ উম্মোচন করা হোক।
একজন তরুণ সংগঠক বলেন,
“ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেনের বিজয় দেখিয়েছে যে নতুন প্রজন্মও এ ইতিহাস সম্পর্কে জানতে আগ্রহী।”

মানবাধিকারকর্মীদের মতামত:

স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীদের মতে, যেকোনো বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা ও নথিভিত্তিক মূল্যায়ন হওয়া উচিত।
একজন মানবাধিকারকর্মী বলেন,
“বিচার হয়েছে—এটি রাষ্ট্রের অবস্থান। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে যেসব প্রশ্ন রয়েছে, সেগুলোও গবেষণা ও আলোচনার বিষয় হতে পারে। সত্য উদঘাটনই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।”
রাজনৈতিক সহকর্মীদের বক্তব্য
জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতারা বলেন, মতিউর রহমান নিজামী ছিলেন নীতিবান, সাদাসিধে জীবনযাপনে অভ্যস্ত এবং সংগঠনের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ একজন নেতা।
একজন প্রবীণ রাজনৈতিক কর্মী বলেন,
“তিনি দেশের রাজনীতিতে আদর্শভিত্তিক নেতৃত্বের প্রতীক ছিলেন। তাঁর মৃত্যু আমাদের জন্য গভীর বেদনার। বর্তমানে নিজামী সাহেবকে হত্যার পুনর্মূল্যায়ন করা হোক এবং প্রকৃত তথ্য জাতির কাছে উন্মুক্ত করা হোক ।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিক্রিয়া:

মতিউর রহমান নিজামীর বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন মতামত দেখা যায়। কিছু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা বিচার প্রক্রিয়ার কিছু দিক নিয়ে উদ্বেগ জানায়। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকার ও আদালত এটিকে আইনানুগ ও সংবিধানসম্মত বিচারিক প্রক্রিয়া বলে উল্লেখ করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ভিন্নমতই প্রমাণ করে যে বিষয়টি এখনও ইতিহাস ও রাজনীতির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
বর্তমান সরকারের প্রতি সমর্থকদের প্রত্যাশা
নিজামীর সমর্থকরা বর্তমান সরকারের কাছে তাঁর বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগসমূহ নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনার দাবি জানাচ্ছেন। তারা মনে করেন, যদি কোথাও অনিয়ম বা রাজনৈতিক প্রভাবের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তদন্তের মাধ্যমে জাতির সামনে তুলে ধরা উচিত।
একজন স্থানীয় সাবেক জনপ্রতিনিধি মোল্লা মোঃ ওমর আলী বলেন,
সত্য উদঘাটন হলে জাতি উপকৃত হবে। ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায়গুলো নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক। নিজামি সাহেবকে প্রহসনের বিচার করে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এই হত্যারকারীদের উপযুক্ত বিচার চাই।

পরিবারের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা:

স্থানীয়দের অনেকে মনে করেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিজামী পরিবার কঠিন সময় অতিক্রম করেছে। তাঁদের মতে, জনগণের ভোটে তাঁর পুত্রের বিজয় সেই পরিবারের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা ও আস্থার বহিঃপ্রকাশ।

ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়নের দাবি:

সাঁথিয়া-বেড়ার সাধারণ মানুষের অনেকেই মনে করেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও মতিউর রহমান নিজামীর অবদান, বিচার এবং উত্তরাধিকার নিয়ে গবেষণা ও আলোচনার সুযোগ থাকা উচিত।
একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বলেন,
“ইতিহাসকে সময়ই মূল্যায়ন করে। আবেগ নয়, তথ্য ও গবেষণার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সিদ্ধান্ত নেবে।”

উপসংহার

মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক আলোচিত অধ্যায়। তাঁর বিচার নিয়ে মতভেদ থাকলেও জন্মভূমি সাঁথিয়া-বেড়ায় তাঁর স্মৃতি আজও অনেকের কাছে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে উন্নয়ন, আদর্শ ও রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে তাঁর পরিবারের প্রতি জনসমর্থন সেই আবেগকেই নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
এলাকার মানুষ এখন চান—ইতিহাসের বিতর্কিত ঘটনাগুলো নিয়ে তথ্যভিত্তিক, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য মূল্যায়ন হোক। কারণ সত্যের অনুসন্ধান কেবল অতীতকে বোঝার জন্য নয়; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একটি দায়িত্বও বটে।

জামায়াতে ইসলামী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী

সম্পর্কিত খবর