আ’লীগ পুনর্বাসনের পথে হাঁটছে বিএনপি?
৭ মে ২০২৬ ০৯:৩২
॥ ফারাহ মাসুম ॥
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন ক্রমে জোরালো হয়ে উঠছে- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কি অনিচ্ছাকৃতভাবে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ও নীতিগত পুনর্বাসনের পথে এগোচ্ছে? আর যদি এমনটি হয়ে থাকে, তবে এর পেছনে কি সত্যিই তথাকথিত ‘ভারতীয় প্রভাব’ কাজ করছে, নাকি এটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার অনিবার্য ফল?
প্রথমেই ‘ভারতীয় প্রভাব’ বা ‘ভারতীয় লবি’ ধারণাটিকে বিশ্লেষণাত্মকভাবে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। এটি কোনো একক, কেন্দ্রীভূত বা দৃশ্যমান শক্তি নয়; বরং ভারতের রাষ্ট্রীয় কৌশল, কূটনৈতিক অগ্রাধিকার, নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের সম্মিলিত প্রতিফলন। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের নীতির মূল ভিত্তি তিনটি- আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং সংযোগভিত্তিক অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ। এ প্রেক্ষাপটে দিল্লি এমন একটি বাংলাদেশ চায়, যেখানে নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং আকস্মিক ভূরাজনৈতিক বিচ্যুতি ঘটবে না।
সাম্প্রতিক আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিবর্তনও এ বাস্তবতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বাংলাদেশের চারপাশের ভারতীয় রাজ্যগুলোর অধিকাংশে বিজেপি-ঘনিষ্ঠ সরকার প্রতিষ্ঠা একটি সমন্বিত কৌশলগত বলয় তৈরি করেছে, যা দিল্লির জন্য বাংলাদেশকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
এ প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে ভারতের কাছে একটি ‘অনুমেয় অংশীদার’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন, ট্রানজিট সুবিধা এবং জ্বালানি সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোয় ধারাবাহিক সহযোগিতা দিল্লির নীতিনির্ধারকদের কাছে আওয়ামী লীগকে একটি পরীক্ষিত সহযোগী শক্তিতে পরিণত করেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ভারত এমন কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন চায় না, যা এ ধারাবাহিকতাকে ভেঙে দিতে পারে বা আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণভাবে প্রান্তিক করে ফেলতে পারে।
এখানেই প্রশ্ন ওঠে- বিএনপি কোথায় দাঁড়িয়ে? ঐতিহাসিকভাবে দলটির রাজনৈতিক আখ্যানের একটি বড় অংশ ছিল ভারতবিরোধী অবস্থান। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে; বিশেষ করে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর বিএনপির কৌশলগত অবস্থানে একটি লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর আস্থা বজায় রাখা এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার বাস্তবতা- এ তিনটি লক্ষ্য এখন দলটির নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে ভারতের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না জড়ানোর একটি বাস্তববাদী অবস্থান গ্রহণ করছে বিএনপি। তবে এ অবস্থান অনুগত না ভারসাম্যপূর্ণ- সেই প্রশ্নটি এখনো উন্মুক্ত।
এ দ্বৈত অবস্থান থেকেই তৈরি হচ্ছে একটি জটিল রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। একদিকে বিএনপি নিজেকে আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়; অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা তাকে বাধ্য করে বিদ্যমান অনেক নীতি বজায় রাখতে। বিদ্যুৎ আমদানি, ট্রানজিট ব্যবস্থা, সীমান্ত সহযোগিতা- এসব ক্ষেত্রে আকস্মিক পরিবর্তন শুধু কূটনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। ফলে আওয়ামী আমলের নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অনেক ক্ষেত্রে একটি বাস্তব বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটি এমন একটি ধারণা তৈরি করে- বিএনপি যেন আওয়ামী লীগের নীতিকেই পরোক্ষভাবে পুনর্বাসন করছে। ভারতের ভূমিকা এখানে সরাসরি চাপ প্রয়োগের চেয়ে অনেক বেশি সূক্ষ্ম। এটি মূলত ‘পরোক্ষ প্রত্যাশা’ তৈরির মাধ্যমে কাজ করে। দিল্লি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিতে চায়- বাংলাদেশে যে-ই ক্ষমতায় থাকুক, তাকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। এ বার্তা কখনো কূটনৈতিক সংলাপে, কখনো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে, আবার কখনো নীরব কৌশলগত সংকেতের মাধ্যমে প্রেরিত হয়। ফলে বিএনপি ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাইলে এ বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার সুযোগ কম বলে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে।
তবে পুরো বিষয়টিকে শুধুমাত্র ‘ভারতীয় চাপ’ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উপেক্ষিত হয়- বিএনপির নিজস্ব রাজনৈতিক কৌশল। দলটি এখন এমন একটি অবস্থান তৈরি করতে চায়, যেখানে তারা একদিকে জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক চেতনার প্রতিনিধিত্ব করবে; অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি ‘দায়িত্বশীল ও গ্রহণযোগ্য বিকল্প শক্তি’ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করবে। এ দ্বৈত কৌশলই তাদের বক্তব্য ও নীতিতে একটি নমনীয়তায় কখনো কখনো দ্বিমুখিতা তৈরি করছে।
ক্ষমতায় আসার পর এ দ্বৈত বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। গণভোট ইস্যুতে অনীহা, জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার কিছু মৌলিক অধ্যাদেশ অকার্যকর করা- এসব পদক্ষেপ এমন একটি ধারণা তৈরি করেছে যে, বিএনপি হয়তো কিছু অঘোষিত প্রতিশ্রুতি বা কাঠামোগত বাধ্যবাধকতার মধ্যে কাজ করছে। এর ফলে রাজনৈতিকভাবে একটি বয়ান শক্তিশালী হচ্ছে- বিএনপি অনিচ্ছাকৃতভাবেই আওয়ামী লীগের নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করছে।
তবে মূল প্রশ্নটি ‘কে কাকে ঠেলে দিচ্ছে’ এতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ‘রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা কাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে’- এ বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিষয়টি বোঝা প্রয়োজন। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, ভারতের আঞ্চলিক কৌশল, বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রত্যাশা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ-সব মিলিয়ে একটি চাপের বলয় তৈরি হয়েছে। এ বলয়ের ভেতরে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তাকে নির্দিষ্ট কিছু কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হতে হয়।
সুতরাং বিএনপিকে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে- এ বক্তব্য পুরোপুরি ভিত্তিহীন নয়, তবে এটি অসম্পূর্ণ। বাস্তবে এটি একটি বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া, যেখানে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হলেও একমাত্র নিয়ামক নয়। বরং বলা যায়, ক্ষমতার রাজনীতিতে টিকে থাকতে গিয়ে বিএনপি নিজেই এমন এক বাস্তবতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে প্রতিপক্ষের অনেক নীতিই পরোক্ষভাবে পুনর্বাসিত হয়ে যাচ্ছে। এখন মূল প্রশ্ন- এ নীতিগত ধারাবাহিকতা দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে কি না।
বিএনপির জন্য বিকল্প নীতি : ‘বিপরীত নয়, ভারসাম্যপূর্ণ পুনর্গঠন’
একটি বাস্তবতা স্পষ্ট, ‘সবকিছু উল্টে দেওয়া’ কোনো কার্যকর বা টেকসই কৌশল নয়। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর ধারাবাহিকতা উপেক্ষা করে কোনো দল দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না। ফলে বিকল্প মানে বিপরীত নয়; বরং একটি কৌশলগত ‘স্মার্ট রিব্যালান্সিং’।
১. সামঞ্জস্যপূর্ণ সার্বভৌমত্ব নীতি : ভারতবিরোধিতা বা ভারতনির্ভরতা- এ দুই চরম অবস্থানের বাইরে গিয়ে একটি মধ্যপন্থা গ্রহণ জরুরি। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রেখে দুই দেশের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিগুলোর পুনঃআলোচনা, সংসদীয় তদারকি এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চালু করা যেতে পারে।
২. চুক্তির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি : দুই দেশের সব আন্তর্জাতিক চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ, বড় প্রকল্পে স্বতন্ত্র নিরীক্ষা এবং সংসদীয় অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা- এ একটি পদক্ষেপই বিএনপিকে একটি স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করতে সহায়তা করতে পারে।
৩. বহুমুখী কূটনীতি : ভারতকে বাদ না দিয়ে বিকল্প শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য তৈরি: চীন (অবকাঠামো), যুক্তরাষ্ট্র (বাণিজ্য ও কৌশল), ইউরোপীয় ইউনিয়ন (রপ্তানি ও মানবাধিকার), মধ্যপ্রাচ্য (শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স)। এতে নির্ভরতা কমবে, কিন্তু সংঘাত বাড়বে না।
৪. পানি ও সীমান্তে জাতীয় স্বার্থ কাঠামো : যৌথ নদী ব্যবস্থাপনায় কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া, সীমান্তে ‘শূন্য মৃত্যু’ নীতির আন্তর্জাতিকীকরণ এবং পরিবেশভিত্তিক আঞ্চলিক কূটনীতি জোরদার করা প্রয়োজন।
৫. অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ : স্থানীয় শিল্প সুরক্ষা, প্রতিযোগিতামূলক বিডিং এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের বৈচিত্র্য- এ তিনটি স্তম্ভের মাধ্যমে ‘অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব’ বাড়ানো সম্ভব, বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত না করেই।
৬. নিরাপত্তা মতবাদ পুনর্গঠন : ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে পুরোপুরি অস্বীকার না করে শর্তসাপেক্ষ সহযোগিতা, পারস্পরিকতাভিত্তিক ইন্টেলিজেন্স শেয়ারিং এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে অরাজনৈতিক রাখা।
৭. রাজনৈতিক আখ্যানের পুনঃব্র্যান্ডিং : ‘ভারতবিরোধিতা’ থেকে সরে এসে ‘জাতীয় স্বার্থ প্রথম’- এ নতুন বয়ান গঠন। আবেগ নয়, তথ্য ও নীতিভিত্তিক রাজনীতি তরুণ ভোটারদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হবে।
উপসংহার : তৃতীয় পথের অনিবার্যতা : বিএনপির সামনে মূলত তিনটি পথ খোলা- ১. পুরনো সংঘাতনির্ভর রাজনীতি (উচ্চঝুঁকি), ২. আওয়ামী লীগের নীতির সরাসরি ধারাবাহিকতা (রাজনৈতিক আত্মঘাতী) এবং ৩. ভারসাম্যপূর্ণ, স্বচ্ছ ও বহুমাত্রিক নীতি (সবচেয়ে বাস্তবসম্মত)।
এই তৃতীয় পথই হতে পারে কার্যকর- যেখানে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু শর্তহীন নয়; উন্নয়ন হবে, কিন্তু স্বচ্ছতার সঙ্গে; কূটনীতি চলবে, কিন্তু আত্মসম্মান বজায় রেখে।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির জন্য এটি কেবল একটি কৌশলগত বিকল্প নয়- বরং একটি অস্তিত্বগত প্রয়োজন। কারণ শেষ পর্যন্ত রাজনীতিতে টিকে থাকে সেই পথই, যা আবেগ নয়, বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ও আস্থা তৈরি করতে সক্ষম হয়।