পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বিজেপি সরকার
৬ মে ২০২৬ ১৮:১৩
বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে প্রভাব
॥ মাসুম খলিলী ॥
পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে একইসঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকার গঠন বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতিতে কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; বরং এটি নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এর মূল প্রভাবগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো-
১. সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভিবাসন সংকট
আসামে ‘জাতীয় নাগরিক পঞ্জি’ (ঘজঈ) ও ‘অবৈধ অভিবাসন’ ইস্যু নিয়ে আগে থেকেই কঠোর অবস্থান রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও একই রাজনৈতিক আদর্শের সরকার থাকলে দুই সীমান্ত দিয়েই ‘পুশব্যাক’ বা সন্দেহভাজন অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর চাপ বাড়তে পারে। এর ফলে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং মানবিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
২. নীতি সমন্বয় ও দিল্লির প্রভাব
দুই রাজ্যে একই দলের সরকার থাকায় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে নীতি-সমন্বয় অনেক সহজ হবে। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি ‘দ্বিমুখী তলোয়ার’-
সুযোগ : কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে টানাপড়েন কমলে ট্রানজিট বা সীমান্ত বাণিজ্যের মতো বিষয়গুলোয় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।
ঝুঁকি : যদি কেন্দ্রীয় সরকার কোনো কঠোর নীতি গ্রহণ করে, তবে রাজ্য পর্যায়ে কোনো বাধা না থাকায় তা বাংলাদেশের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করবে।
৩. তিস্তা ও অভিন্ন নদনদীর পানি কূটনীতি
তিস্তা চুক্তি ঝুলে থাকার প্রধান কারণ ছিল পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিনের আপত্তি। বিজেপি দুই রাজ্যে ক্ষমতায় থাকলে এর দুটি বিপরীতমুখী প্রভাব হতে পারে-
ইতিবাচক : কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে রাজ্য সরকারকে রাজি করানো সহজ হবে, যা চুক্তির পথ সুগম করতে পারে।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতির স্বার্থে যদি ‘আঞ্চলিক পানি নিরাপত্তা’কে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তবে এই অচলাবস্থা আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৪. নিরাপত্তা কূটনৈতিক ভারসাম্য ও আদর্শিক রাজনীতি
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনে বাংলাদেশ সবসময়ই ভারতকে সহযোগিতা করে আসছে। পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বিজেপি সরকার থাকলে সীমান্ত-পার উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমনে গোয়েন্দা বিনিময় এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে। এর ফলে সীমান্তে বিএসএফের কঠোরতা বৃদ্ধি ও সাধারণ নাগরিকদের চলাচলে কড়াকড়ি বাড়তে পারে।
বিজেপির রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রে পরিচয়ভিত্তিক এবং জাতীয়তাবাদী ইস্যুকে গুরুত্ব দেয়। এর প্রভাব বাংলাদেশের জনমতেও পড়ে। ফলে ঢাকাকে দিল্লির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ জনমতের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। এছাড়া ভারতের এই সংহত রাজনৈতিক অবস্থানের বিপরীতে চীন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে বাংলাদেশের কূটনীতিকে আরও কৌশলী হতে হবে।
৫. আঞ্চলিক সংযোগ ও বাণিজ্য
দুই রাজ্যে একই রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থাকলে বিবিআইএন বা অন্যান্য আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পগুলো (রেল, সড়ক ও নৌপথ) দ্রুত বাস্তবায়িত হতে পারে। এটি বাংলাদেশের জন্য উত্তর-পূর্ব ভারতের বিশাল বাজার উন্মুক্ত করবে। তবে অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও কৌশলগত নির্ভরতা বৃদ্ধির ঝুঁকিও থেকে যায়।
৬. ‘আলাদা ভূখণ্ড’ বা ‘বঙ্গভূমি’ আন্দোলন
বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিশ্লেষণে হিন্দুদের জন্য ‘আলাদা ভূখণ্ড’ বা ‘বঙ্গভূমি’ আন্দোলনের বিষয়টি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং জটিল আলোচনার বিষয়। বর্তমান প্রেক্ষাপট ও কৌশলগত দিক বিবেচনায় এ ধরনের দাবি চাঙ্গা হওয়ার সম্ভাবনা কতখানি, তা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন-
১. ঐতিহাসিক ও জনতাত্ত্বিক বাস্তবতা : বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি জেলা নিয়ে ‘বঙ্গভূমি’ বা ‘বীরবঙ্গ’ নামের আলাদা রাষ্ট্রের দাবি নব্বইয়ের দশকে বা তার আগে বিচ্ছিন্নভাবে শোনা গেলেও তা কখনো গণদাবিতে পরিণত হয়নি। বর্তমানে বাংলাদেশের হিন্দু জনসংখ্যার বিন্যাস সারা দেশে ছড়িয়ে ছিড়িয়ে রয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট বড় ভৌগোলিক এলাকায় তারা এমন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগুরু নয় যে, সেখানে একটি আলাদা ভূখণ্ডের দাবি জনভিত্তি পাবে।
২. রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থান : বাংলাদেশের মূলধারার সংখ্যালঘু সংগঠনগুলো প্রকাশ্যে (যেমন: হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ বা পূজা উদযাপন পরিষদ) বরাবরই পৃথক ভূখণ্ডের দাবির বিরোধিতা করে আসছে। তাদের মূল দাবি হলো- সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখা, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের বাস্তবায়ন এবং সাম্প্রদায়িক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তারা নিজেদের এই মাটির অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদের চেয়ে নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠাকেই গুরুত্ব দেয়।
৩. প্রতিবেশী ভারতের ভূমিকা ও নীতি : পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ফেললেও, ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কখনোই বাংলাদেশে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে সমর্থন দেয়নি। ভারতের জন্য একটি স্থিতিশীল ও অখণ্ড বাংলাদেশ তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের (ঝবাবহ ঝরংঃবৎং) নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। বাংলাদেশে কোনো ধরণের অস্থিরতা বা ভূখণ্ডগত বিভাজন ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যা দিল্লির বর্তমান নীতিমালার পরিপন্থী।
৪. উগ্রবাদী বয়ান ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ : সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন প্রান্তিক গোষ্ঠীর মাধ্যমে মাঝেমধ্যে এ ধরনের ‘আলাদা ভূখণ্ড’-এর বয়ান প্রচার করা হয়। অনেক সময় রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার উদ্দেশ্যে দুই পক্ষ থেকেই এই ধরনের উগ্র প্রচারণাকে উসকে দেওয়া হয়। তবে মাঠপর্যায়ে সাধারণ হিন্দুদের মধ্যে এ ধরনের দাবির কোনো বাস্তব প্রতিফলন বা সাংগঠনিক প্রস্তুতি দেখা যায় না।
৫. ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ : আলাদা ভূখণ্ডের দাবি চাঙ্গা হওয়া মানে একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত। বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনী এ ধরনের যেকোনো তৎপরতা কঠোরভাবে দমন করার সক্ষমতা রাখে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও আধুনিক যুগে জাতিগত ভিত্তিতে নতুন রাষ্ট্রের জন্ম দেওয়ার বিষয়টিকে সহজে সমর্থন দেয় না, যদি না সেখানে চরম পর্যায়ের কোনো মানবিক বিপর্যয় ঘটে।
৬. বর্তমান সম্ভাবনা বিশ্লেষণ : সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশে হিন্দুদের জন্য আলাদা ভূখণ্ড বা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চাঙ্গা হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। এর কারণগুলো হলো-
সংহতির অভাব : সংখ্যালঘুদের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো ঐকমত্য বা ইচ্ছা নেই।
ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা : কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় হিন্দুদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকা।
রাষ্ট্রীয় কাঠামো : বাংলাদেশের শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী ও প্রশাসনিক কাঠামো।
আলাদা ভূখণ্ডের দাবির চেয়ে বরং নাগরিক নিরাপত্তা, জানমালের সুরক্ষা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকটই বর্তমান সময়ে বড় আলোচনার বিষয়। যদি এ অধিকারগুলো নিশ্চিত করা না যায়, তবে বিচ্ছিন্নতাবাদের দাবি না উঠলেও দেশত্যাগের প্রবণতা বাড়তে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ডেমোগ্রাফিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তবে ‘আলাদা রাষ্ট্র’ তৈরির সম্ভাবনা বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় অবান্তর বলেই প্রতীয়মান হয়।
উপসংহার ও বাংলাদেশের করণীয়
পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে অভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান বাংলাদেশের জন্য একই সাথে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ বয়ে আনবে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কৌশল হওয়া উচিত-
প্রাগম্যাটিক কূটনীতি : ভাবাবেগের চেয়ে জাতীয় ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া।
বহুমাত্রিক যোগাযোগ : ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি রাজ্য পর্যায়ের নেতৃত্বের সাথেও কার্যকর যোগাযোগ রক্ষা করা।
সীমান্ত ব্যবস্থাপনা : আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সীমান্ত সুরক্ষা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।