শিক্ষাঙ্গনে অস্থিতিশীলতা কার স্বার্থে?
৩০ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:২৯
॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হবে জ্ঞানচর্চা, গবেষণা এবং মুক্তচিন্তার নিরাপদ স্থান। যেখানে শিক্ষার্থীরা ক্লাসের পড়াশোনা ছাড়াও টার্গেটভিত্তিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষণায় ব্যস্ত থাকবে। পারস্পরিক সহাবস্থানের পাশাপাশি দেশ ও জাতি গঠনে নিজেকে প্রস্তুত করবেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোয় সেই পরিবেশ তৈরি হয়নি। নতুন নির্বাচনের পরপরই ক্যাম্পাসগুলোয় সহাবস্থান থাকবেÑ এমনটাই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের সেই প্রত্যাশা ভেস্তে যাচ্ছে। কেননা সরকারের তিন মাস না যেতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোয় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দৃশ্যমান হচ্ছে। কখনো ছাত্ররাজনীতি, কখনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আবার কখনো বাহ্যিক প্রভাব বিস্তারে পরিকল্পিত অস্থিরতার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শিক্ষাঙ্গনগুলোকে। সম্প্রতি প্রকাশ্যে চট্টগ্রাম সিটি কলেজে শিক্ষার্থীদের অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করে ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা। এদিকে আইনি সহায়তা নিতে যাওয়া শিক্ষার্থীকে শাহবাগ থানার ভেতরে আটকে রাখা হয়। সেখানে ডাকসু নেতারা গেলে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। গত ২৪ এপ্রিল শুক্রবার পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে ইসলামী ছাত্রশিবিরের শান্তিপূর্ণ মিছিলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হামলা চালায়। গত ২৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার রাতে কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্রশিবিরের ওপর হামলা চালিয়ে অন্তত ২০ নেতাকর্মীকে আহত করা হয়। এসব ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, পরিকল্পিতভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। এই পরিস্থিতি কেবল শিক্ষার পরিবেশকেই ব্যাহত করছে না, বরং বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও প্রভাব ফেলছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই পরিকল্পিত অস্থিতিশীলতা আসলে কার স্বার্থে?
কেন শান্ত ক্যাম্পাস অশান্ত হয়?
ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে ছাত্র সংগঠনগুলো নিজেদের প্রভাব বিস্তার বা আধিপত্য বজায় রাখতে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, দলীয় আনুগত্য এবং কেন্দ্রীয় রাজনীতির প্রতিফলন ক্যাম্পাসে সংঘাত সৃষ্টি করে। এসব সংঘাত অনেক সময় স্বতঃস্ফূর্ত নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে উসকে দেওয়া হয়- যাতে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী লাভবান হয়। এর মাধ্যমে তারা ক্যাম্পাসে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, যা ভবিষ্যতে তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্যও সহায়ক হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অনেক সময় নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয় বা রাজনৈতিক চাপের কারণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে না। এতে করে ছোট একটি সমস্যা বড় আকার ধারণ করে। কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে যে প্রশাসনের ভেতর থেকেই বিভাজন সৃষ্টি করা হয়- যাতে একটি বিশেষ পক্ষ সুবিধা পায়। এই ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে।
অনেক সময় জাতীয় রাজনীতির উত্তাপ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে। কিছু রাজনৈতিক দল তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ছাত্র সংগঠনগুলোকে ব্যবহার করে থাকে। ফলে ক্যাম্পাস হয়ে ওঠে বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াইয়ের একটি ক্ষেত্র। এতে করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়। বিশ্লেষকের মতে, ইচ্ছাকৃতভাবে ক্যাম্পাসে অস্থিরতা তৈরি করে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হয় বা জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়। এই অস্থিরতা তৈরির পেছনে অনেক সময় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাদের অর্থনৈতিক স্বার্থও জড়িত থাকতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কার্যক্রম; যেমন- টেন্ডার, আবাসন, ক্যান্টিন, পরিবহন ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণে নিতে আধিপত্য বিস্তারের অপচেষ্টা হয়। এই খাতগুলোয় আধিপত্য বিস্তারের জন্য সংঘর্ষ বাধানো হয়। ফলে অস্থিতিশীলতা একটি ‘কৌশল’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যার মাধ্যমে একটি গোষ্ঠী তাদের অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে উল্লেখযোগ্য। গুজব, ভুয়া খবর বা উসকানিমূলক পোস্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অনেক সময় পরিকল্পিতভাবে এসব ভুয়া তথ্য বা গুজব ছড়ানো হয়- যাতে উত্তেজনা বাড়ে এবং সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। এর ফলে বাস্তব পরিস্থিতির চেয়ে অনেক বড় সংকট তৈরি হয়, যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ভুয়া কার্ড নিয়ে উত্তেজনা, যাচাই না করেই দোষারোপ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার একমাত্র কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে একটি ভুয়া স্ক্রিনশর্ট ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি সম্পাদক ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্র আব্দুল্লাহ আল মাহমুদকে দায়ী করে লিখিত অভিযোগ দেয় ছাত্রদল। কারণ ভুয়া ওই পোস্ট যে আইডি থেকে ছড়ানো হয়েছিল, ওই আইডির নাম ছিল আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ। আর ছাত্রদলের অভিযোগের প্রেক্ষিতে মাহমুদকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গত ২৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ফেসবুকে আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের নামে এআই ছবিযুক্ত ছড়িয়ে পড়া ওই ভুয়া স্ক্রিনশর্টটির বিষয়ে ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার জানিয়েছে, ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি এবং আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের নামে ভুয়া স্ক্রিনশর্ট বানানো হয়েছে। এছাড়া উদ্ভূত ঘটনায় তিন সদস্যের দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের এক শিক্ষার্থী ফেসবুকে অশালীন পোস্ট করেছেÑ এমন অভিযোগকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে শান্ত ও সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। কমিটি ইতোমধ্যে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে ধৈর্যধারণের আহ্বান জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এও বলেছে, বিষয়টি যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে। একই সঙ্গে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার জন্যও সকলের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতা প্রদর্শনের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার যখন স্পষ্ট করে জানায় যে, ওই পোস্টটি এআই দিয়ে করা এবং এটি ভুয়া আইডি দিয়ে করা। একই সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যখন তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিলেও ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতারা উত্তেজনা ছড়ানো, উসকানিমূলক স্লোগান দেওয়া থেকে শুরু করে পুরো ক্যাম্পাসকে অশান্ত করে তোলে। ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্বশীল এই অঙ্গ সংগঠনের নেতারা চিন্তাও করেননি যে, ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বিনিষ্ট কবে। তারা এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে অন্য কোনো ফায়দা লুটতে চেয়েছিল কিনা, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
থানার ভেতরেই ছাত্রনেতাদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা, জড়িতরা ধরাছোঁয়ার বাইরে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের নামে একটি ভুয়া আইডি থেকে গুজব ছড়ানো হয়। তিনি তা অস্বীকার করে নিজের পেজে পোস্ট দেওয়ার পরও তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। গত ২৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার নিরাপত্তার জন্য তিনি শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে জিডি গ্রহণ না করে তাকে আটকে রাখা হয়। খবর পেয়ে বিষয়টি সমাধানের জন্য এবি জুবায়ের ও মোসাদ্দেক আলী থানায় এলে ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা পুলিশের উপস্থিতিতে তাদের মারাত্মকভাবে আহত করে। ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বর্বরোচিত ও কাপুরুষোচিত এ হামলা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অনভিপ্রেত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভোটে নির্বাচিত জনপ্রিয় প্রতিনিধিদের ওপর এই ন্যক্কারজনক হামলা গণতান্ত্রিক সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া যায় না।
প্রকাশ্যে অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে শিবির নেতার পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন করলো ছাত্রদল সন্ত্রাসীরা
গত ২১ এপ্রিল বিকেল ৪টার দিকের ঘটনা। চট্টগ্রাম সিটি কলেজ সংলগ্ন রাস্তায় চট্টগ্রাম সিটি কলেজে স্থানীয় ছাত্রদলের নেতাকর্মী কর্তৃক ছাত্রশিবিরের এক নেতার পায়ের গোড়ালি কুপিয়ে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। আহত ছাত্রশিবির নেতার নাম আশরাফুল ইসলাম। তিনি স্থানীয় একটি ওয়ার্ডের ছাত্রশিবিরের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় অফিস সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ জানান, চট্টগ্রাম সিটি কলেজে কুপিয়ে শিবিরের একজনের পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন করার ঘটনা ঘটেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, দুপুরে হামলার প্রতিবাদে বিকেলে শিবির বিক্ষোভ মিছিল বের করলে উভয় পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির দুই পক্ষেরই কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে অবস্থান নেন। পরবর্তীতে ঘটনার পর এই সিটি কলেজ প্রাঙ্গণে ছাত্রদল এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরাও অবস্থান নেন। তারা প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে শিবিরের নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। অস্ত্র দিয়ে কোপানোর সেই দৃশ্য স্থিরচিত্র ও ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলেও সরকার কোনো সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করেনি। প্রসঙ্গত, ‘ছাত্র-রাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস’ শীর্ষক গ্রাফিতিতে ছাত্র মুছে ‘গুপ্ত’ লিখে দেন চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজ শাখা ছাত্রদলের একদল নেতাকর্মী। এ নিয়ে ক্যাম্পাসে উভয়পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়ালে ছাত্রদল হামলা চালায়, একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ দেয়।
‘গণরুম’ ও ‘গেস্টরুম’ কালচার ফেরানোর অপচেষ্টা চলছে
দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারও বিতর্কিত ‘গণরুম’ ও ‘গেস্টরুম’ কালচার ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চলছে। সেই পরিবেশ তৈরির পরিকল্পনা চলছে ক্যাম্পাসগুলোয়। যে পরিবেশ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ছিল। পূর্বের ন্যায় শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে ছাত্রদল অস্থিতিশীলতা তৈরি করে এই পুরনো সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হচ্ছে বলে মনে করছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সাধারণ শিক্ষার্থীরা মনে করেন, এ ধরনের চর্চা সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবাসনের নিরাপত্তা ও পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট করবে।
ছাত্রদলের ‘আদু ভাইদের’ দেওয়া হলো হলের সিট
প্রায় ২০ বছর আগে ভর্তি হওয়া বেশ কয়েকজনসহ ছাত্রদল ও যুবদলের অন্তত ৩৬ নেতাকর্মীকে ‘বিশেষ বিবেচনায়’ ঢাবির হলে সিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সদ্য ভর্তি হওয়া ২০২৫-২৬ সেশনের শিক্ষার্থীরা এখনো আবাসন সুবিধা না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন। অথচ দুই দশক আগে ভর্তি হওয়া ছাত্রদল ও যুবদলের আদু ভাইদের সিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাদের অভিযোগ, আবাসন সংকট নিরসনে স্পষ্ট নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করে রাজনৈতিক বিবেচনায় এ সিট বণ্টন করা হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকটকে আরো তীব্র করে তুলছে। তথাকথিত ‘বিশেষ বিবেচনায়’ সিট ছাত্রদল ও যুবদল নেতাকর্মীদের মধ্যে ২০০৮-০৯ থেকে শুরু করে ২০১৬-১৭ সেশনের শিক্ষার্থীরাও রয়েছেন। এমনকি কিছু শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন আগে শিক্ষাজীবন শেষ করার কথা থাকলেও পুনরায় বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় হলে অবস্থান করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, যেখানে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা সিট না পেয়ে ঢাকায় এসে কোথায় থাকবে তা নিয়ে দিশেহারা, সেখানে এত আগের সেশনের শিক্ষার্থীদের সিট দেওয়া সম্পূর্ণ অন্যায্য। এমন পরিস্থিতিতে আবাসন সংকট নিরসনের দাবিতে গত ২০ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন ডাকসু ও হল সংসদের নেতাকর্মীরা। নবীন শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসন করতে প্রশাসনকে আলটিমেটাম দিয়েছে ডাকসু। রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে বিক্ষোভ শেষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলাপকালে বিষয়টি তুলে ধরেন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এসএম ফরহাদ। তিনি বলেন, তিন সপ্তাহ আগে ভিসির কাছ থেকে আমরা আশ্বাস পেয়েছিলাম যে, দ্রুত সিট সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। কোনো কমিটি হয়নি, কোনো দৃশ্যমান পরিকল্পনাও নেই। ফরহাদ অভিযোগ করে বলেন, একটি রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আবারও হলে ‘গণরুম’ ও ‘আদু ভাই’ সংস্কৃতি চালুর চেষ্টা করছে। শিক্ষার্থীরা এমন অপচেষ্টা রুখে দেবে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার রাজধানীর শাহবাগ থানার ভেতরে ঢুকে ডাকসু নেতাদের ওপর ছাত্রদল নেতাকর্মীদের বর্বরোচিত হামলা এবং পাবনা ও কুমিল্লায় ছাত্রশিবিরের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানিয়েছেন। গত ২৪ এপ্রিল শুক্রবার এক বিবৃতিতে তিনি প্রতিবাদ জানান। বিবৃতিতে মিয়া গোলাম পরওয়ার পুলিশের ভূমিকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশের যেখানে নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, সেখানে পুলিশ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। জালিম শাসকগোষ্ঠীর লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে পুলিশের এ ভূমিকা অতীতের ফ্যাসিবাদী আচরণের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। পুলিশের এই ন্যক্কারজনক ভূমিকায় দেশবাসী খুবই উদ্বিগ্ন।
জাতীয় নাগরিক পার্টি মনোনীত ও ১১ দলীয় জোট সমর্থিত সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ সংসদে বক্তৃতায় বলেছেন, আবারও ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা হচ্ছে। পূর্বের কালচারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম, ফেসবুক পোস্টে লেখেন, চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে বর্বরোচিত হামলার মাধ্যমে নির্বাচনের পর প্রথম ক্যাম্পাস দখলের রাজনীতি শুরু করেছে সন্ত্রাসী ছাত্রদল। তিনি হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, পেশিশক্তির খেলায় মেতে উঠলে পরিণতি ভালো হবে না।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা বলেছেন, দেশের ক্যাম্পাসগুলোয় ছাত্রদলের মাধ্যমে আবারো ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে ‘গণরুম’ ও ‘ গেস্টরুম’ কালচার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তিনি দাবি করেন, অস্থিতিশীলতা তৈরি করে ছাত্রদল ক্যাম্পাসগুলোয় তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা করছে।
প্রসঙ্গত, এই অস্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়, সেশনজট তৈরি হয় এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী হতাশ হয়ে পড়ে এবং বিদেশমুখী হয়ে যায়, যা দেশের জন্য একটি বড় ক্ষতি। এছাড়া শিক্ষকদের গবেষণা কার্যক্রমও ব্যাহত হয়, ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, ছাত্ররাজনীতিকে সুস্থ ও গঠনমূলক ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত ক্যাম্পাসকে নিজেদের ক্ষমতার লড়াইয়ের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার না করা। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী ও স্বচ্ছ হতে হবে, যাতে তারা নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। তাদের বুঝতে হবে যে তারা কোনো গোষ্ঠীর হাতিয়ার নয়; বরং নিজের ভবিষ্যতের জন্যই তাদের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি, যাতে গুজব বা উসকানিমূলক তথ্য ছড়িয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ না হয়।