প্রকাশ্যে ঘটছে খুনোখুনি আতঙ্কে নাগরিকরা
৩০ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:২৫
স্টাফ রিপোর্টার : হত্যাকাণ্ড অনেকটা সহজ ও স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো স্থানে খুন-খারাবি হচ্ছে। কুমিল্লায় কাস্টমস কর্মকর্তা নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়েছে কয়েকদিন আগে। পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান তিনি। তারও আছে একটি ছোট্ট অবুঝ শিশুসন্তান। স্বামীকে হারিয়ে পাগলপ্রায় স্ত্রী। ছিনতাইকারীদের হামলায় একটি পরিবার একেবারেই নিঃশেষ হয়ে গেল। গত ২৮ এপ্রিল মঙ্গলবার রাতে এ রিপোর্ট যখন লেখা হচ্ছে, ঠিক তখনই রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে এক যুবক নিহত হয়েছেন। রাত ৮টার দিকে নিউমার্কেটের পশ্চিম পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে বটতলায় এ ঘটনা ঘটে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত পৌনে ৮টার দিকে মোটরসাইকেলে এসে কয়েকজন দুর্বৃত্ত ওই যুবককে লক্ষ করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। খুব কাছ থেকে তার মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে পাঁচ থেকে ছয়টি গুলি করে। এরপর দ্রুততম সময়ে পালিয়ে যায় তারা। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত ৮টা ২৭ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এভাবেই প্রতিদিন ঘটছে হত্যাকাণ্ড।
শুধু ঢাকায় নয়, তার আশপাশের জেলাগুলোয় সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় জনজীবন ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে। এমনকি দিন-দুপুরেও গণপরিবহনে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে, যেখানে আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় ধারালো অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিস্থিতির অবনতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের অভিযোগ, থানায় গিয়ে কাক্সিক্ষত সেবা না পাওয়ায় তারা হতাশ। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি কোর কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা পর্যাপ্ত নয়। কিছু ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে থাকা অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে সমন্বয় ঘাটতি ও চেইন অব কমান্ড দুর্বল হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
পুলিশ সদর দফতরের তথ্যমতে, গত মার্চ মাসে সারা দেশে ৩১৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে রাজধানীতে ২৪টি। একই সময়ে অপহরণ, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ নানা অপরাধের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারহীনতা ও সামাজিক কাঠামোর অস্থিরতা অপরাধ প্রবণতা বাড়ার অন্যতম কারণ। অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টহল, বিশেষ অভিযান ও ব্লক রেইড পরিচালনা করা হচ্ছে। ঘটনার ভিত্তিতে তদন্ত ও গ্রেফতার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
গত ২৮ এপ্রিল মঙ্গলবার সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর (১৭ ফেব্রুয়ারি) সারা দেশে ৪৬৪টি হত্যা মামলা এবং ৬৬৬টি ধর্ষণের মামলা করা হয়েছে। হত্যা মামলায় ৬০৪ জন ও ধর্ষণ মামলায় ৫৩০ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলায় ১১ জন এবং ধর্ষণ মামলায় ৭১ আসামি জামিনে মুক্তি পেয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, দেশের গড়ে প্রায় সাতটি হত্যা মামলা হয়েছে। আর গড়ে ধর্ষণ মামলা হয়েছে প্রায় ১০টি। যারা মামলায় যায়নি সেই পরিসংখ্যান কারো কাছে নেই।
জামায়াতের এমপি মো. মুজিবুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জমি দখল, চাঁদাবাজি ও অবৈধ কর্মকাণ্ড ঘৃণ্য অপরাধ, যা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। দেশের উন্নয়নে সুষ্ঠু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অপরাধমুক্ত সমাজ ব্যবস্থার বিকল্প নেই। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার একটানা ১৫ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকাকালে তাদের অনুগত সন্ত্রাসী বাহিনী ভূমি দখল, জল, বালু মহাল দখল, বিভিন্ন সেক্টরে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডের কারণে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। বর্তমান সরকার এ সকল অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করায় অল্প সময়ের মধ্যে ভূমি দখল, চাঁদাবাজি এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় আনার ফলে এ সকল অপরাধ অনেকাংশ হ্রাস পেয়েছে।