বাজেটে আসছে করের খড়গ


৩০ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:১২

করহার বৃদ্ধির প্রধান শিকার হবে দরিদ্র, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ

॥ উসমান ফারুক ॥
টানা কয়েক বছর ধরেই নেওয়া উচ্চাভিলাষী বাজেট চাহিদা অনুযায়ী কর আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা দিচ্ছে সরকার, তা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পূরণ করতে পারছে না। চলতি অর্থবছরে ৯৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গত নির্বাচনে প্রশ্নবিদ্ধ ভোটগণনায় বিএনপি সরকার গঠন করেই খরচ বাড়িয়ে চলেছে। খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ডসহ কয়েকটি কার্ড বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয় কোনোরকম গবেষণা ও প্রস্তুতি ছাড়া। তাতে এখনই দুই লাখ কোটি টাকা খরচের ফর্দ পার হয়ে গেছে। উপায় না পেয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ৯ মাসেই বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ব্যাংক ঋণ ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকায় চলে গেছে। আওয়ামী সরকারের লুটপাটে ধ্বংস হওয়া অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। এখনো সবল হতে না পারা অর্থনীতির এমন দুঃসময়ে সরকার বাজেটের আকার বাড়াতে চলেছে। তাতে নতুন করে করহার বৃদ্ধির ছক আঁকতে শুরু করেছে সরকার। করহার বাড়ানোর প্রথম আঘাত আসবে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, দরিদ্র ও খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষের ওপর। করের বাড়তি বোঝার চাপে বেড়ে যাবে দরিদ্রের হার।
বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সামষ্টিক অর্থনীতি এমন অবস্থায় চলে যাচ্ছে, যে সরকারকে নতুন করে টাকা ছাপাতে হতে পারে। এখনই কিছু ছাপিয়েছে। তাতে মূল্যস্ফীতি ফের লাগামহীন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে কর বাড়ালে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি নতুন করে কাঠামোগত সংকটে পড়বে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। কর না বাড়িয়ে খরচে লাগাম দেওয়া, অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধ ও আমলাদের সক্ষমতা বাড়িয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলে বিদ্যমান আয় দিয়েই সরকার চালানো সম্ভব।
সংস্কারে নয়, সরকারের মনোযোগ খরচে : ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার বিপ্লবে স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের পতন হলে দেশের হাল ধরে অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আর্থিক ও প্রশাসনিক সংস্কার কার্যক্রম শুরু করে। তাতে ভঙ্গুর দশা থেকে অর্থনীতি ফিরতে শুরু করে। নানাবিধ উদ্যোগ ও সংস্কারের মধ্যে যাওয়ার ফলে ১৮ মাসেই অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে।
রিজার্ভ বেড়ে যায়, ঘাটতি মিটিয়ে আর্থিক হিসাব ইতিবাচক হয়, বৈদেশিক বাণিজ্যে অর্থ পাচার বন্ধ হয় ও রেমিট্যান্স বাড়তে শুরু করে। এতেই স্বস্তিতে যেতে থাকে অর্র্থনীতি। একইসঙ্গে পাচার হওয়া অর্থ শনাক্ত ও ফিরেয়ে আনতে দাপ্তরিক কাজ শুরু করে।
কিন্তু বিএনপি সরকারের দায়িত্ব নিয়েই সেই সংস্কারের ধারাবাহিকতা না রেখে উল্টো খরচ বাড়ানোর নতুন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এখন পর্যন্ত এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে সেই খরচ। এতে সরকারের তহবিল শূন্য হয়ে যাওয়ায় দৈনিক খরচ চালাতে এখনই ব্যাংক ঋণে চলে গেছে সরকার। তাতে অর্থবছরের তিন মাস বাকি থাকতে ঋণের পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, এখনই সরকারকে আর্থিক নীতির বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। পরিস্থিতি এমন একপর্যায়ে যাচ্ছে, যেখানে রাজস্ব হিসাব-নিকাশ আর কার্যকর নাও থাকতে পারে। একদিকে আমরা বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে খরচ বাড়াচ্ছি। অন্যদিকে জ্বালানি ও সারের ওপর ভর্তুকি বাড়ছে। কিন্তু রাজস্ব বাড়ছে না, অথচ সরকার বলছে তারা ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায়। এই তিনটির মধ্যে কীভাবে সামঞ্জস্য বিধান করবেন।
সাধারণত অর্থবছরের শেষ দুই মাসে সরকারের ব্যাংক ঋণ চাহিদা বেড়ে যায়। কারণ হলো দ্রুত সময়ে অনেক বিল পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু এবার এক মাস আগেই বেড়ে যাওয়াটা উদ্বেগজনক মন্তব্য করে তিনি বলেন, সাধারণত মে ও জুন মাসে ঋণের চাহিদা বাড়ে। এপ্রিল মাসেই এমন চাপ দেখাটা উদ্বেগজনক। এই অবস্থা চলতে থাকলে বেসরকারি খাত শুধু নতুন বিনিয়োগের জন্যই নয়; এমনকি কার্যকরী মূলধনের জন্যও সমস্যায় পড়তে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি জনগণকে ভোগাবে কি না, প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এটা নির্ভর করছে, সরকার যে ব্যয় করবে তা কোথা থেকে আসছে ও ভবিষ্যতে তা থেকে কী আয় হবে, তার ওপর। ব্যয়ের অর্থায়ন যদি ঋণের মাধ্যমেও করা হয়, সেই টাকা তো পরিশোধ করতেই হবে। মূল প্রশ্ন হলো, তা ভবিষ্যতে আয় তৈরি করতে পারে কি না।
ঋণ নেওয়া মানেই সরকারে সুদ ব্যয় বেড়ে যাওয়া। সরকারের নীতিই হলো কম সুদ ব্যয় ও কম খরচে প্রকল্প শেষ করা। যাতে উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মাহমুদ ওসমান বলেন, সরকারি সুদ ব্যয় বেড়ে যাওয়া ও মানুষের হাতে নগদ টাকা ধরে রাখায় মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ হলো, জ্বালানি তেল সংকটে পণ্য পরিবহন কমে যেতে পারে। পণ্য পরিবহন না হলে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী এই সুযোগটি নেবেন। পণ্য আছে, কিন্তু হাতের নাগালে নেই। কারণ তা আসতে পারছে না।
ঋণ বাড়াচ্ছে সরকার
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সরকার নিয়ে ফেলেছে ১ লাখ ১২ হাজার ৭১১ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের ব্যাংক ঋণ ছিল ৫৩ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা। অবশিষ্ট ৫৯ হাজার ৩২২ কোটি টাকা নিয়েছে গত তিন মাসে। এর মধ্যে সর্বশেষ মাসটি হচ্ছে বিএনপি সরকারের মেয়াদে ও আগের দুই মাস অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে।
সরকারের ঋণ নেওয়ার কারণ উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক প্রতিবেদন মেজর ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস বলছে, রাজস্ব আদায় ঘাটতি পূরণ, ঋণ সুদ ব্যয় পরিশোধের অঙ্ক বেড়ে যাওয়া ও পণ্য আমদানিতে বাড়তি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার খরচ জোগাতে সরকার ঋণ নেওয়া বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে। বর্তমান পরিসংখ্যান বলছে, অর্থবছরের শেষে তা ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
কর বাড়ানোর পথে সরকার
ঋণের চাপ সামাল দিতে ব্যক্তি পর্যায়ে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কর হার আগামী বাজেটে বাড়িয়ে দিতে যাচ্ছে সরকার। তাতে পরোক্ষ কর হিসেবে বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের পণ্যের ওপর কর বাড়ানো হবে। সেই পণ্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হচ্ছে সাধারণ ও খেটে খাওয়া মানুষ। এর ফলে নিত্যপণ্যসহ সব ধরনের জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
বিভিন্ন খাতে কর হার বাড়িয়ে রাজস্ব আদায় দ্বিগুণের পরিকল্পনা করার পাশাপাশি কর ছাড় বন্ধ করার চিন্তা করছে সরকার। কর ছাড় বন্ধ করা মানেই পণ্যের মূল্য বেড়ে যাওয়া। আগে ব্যবসায়ীরা যে দামে পণ্য আনতে পারতো, এখন তার চেয়ে বেশি খরচে আনবে। তাতে সবার শেষে সেই বাড়তি খরচের বোঝা গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, ব্যবসায়ীদের টার্নওভার করও ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে আড়াই শতাংশ করতে যাচ্ছে সরকার। বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে নিত্যপণ্য চাল, ডাল, চিনি, তেল বা ওষুধের মতো পণ্যে শুল্ক বেড়ে যাবে। কারণ সরকার একটি পণ্যর দাম বাড়ালে ব্যবসায়ীরা সব পণ্যের ওপর চাপিয়ে দেবে। জ্বালানি তেলের মতো কিছু কিছু পণ্য রয়েছে, তার দাম বাড়লে সকল পর্যায়ে প্রভাব পড়ে। তাতে নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের আয়ের বড় অংশ মৌলিক চাহিদা ও নিত্যপণ্যে ব্যয় করে বলে তাদের ওপর এই করের বোঝা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি হয়। চাকরিজীবী বা যারা মাস শেষে নির্দিষ্ট বেতন পান, তারা কর বৃদ্ধির প্রথম ধাক্কা সহ্য করেন। তাতে সংসার চালানোই দুর্বিষহ হয়ে পড়বে বেশিরভাগ মানুষের।
বাংলাদেশের সর্বশেষ জনশুমারি ও গৃহগণনার তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালে জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত বিবিএস তথ্য মোতাবেক এই হার বেড়ে ১৯ দশমিক ২ শতাংশ পার হয়ে গেছে।
যদিও সরকারের এই তথ্য মানছে না বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২১ দশমিক ২ শতাংশ পার হয়ে গেছে। সংস্থাটির মতে, প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ বর্তমানে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে।
আর বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এক তথ্য প্রকাশ করেছে গত বছরের আগস্টে। সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশে বর্তমানে দারিদ্র্যের হার প্রায় ২৮ শতাংশ। এর মানে হলো প্রতি চারজনে একজনের বেশি মানুষ এখন দরিদ্র।
এখন আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে পরোক্ষ করের বোঝা ১ শতাংশ বাড়লে দারিদ্র্য শূন্য দশমিক ৪২ শতাংশ বেড়ে যায়। কর বৃদ্ধির প্রথম ও প্রধান শিকার হয় দরিদ্র ও সাধারণ মানুষ।