নির্মূল তারাই হয়ে গেছে


৩০ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৪৮

এগিয়ে যাচ্ছে জামায়াত

রাজনৈতিক ভাষ্যকার : বাংলাদেশ এখন আর কোনো নতুন রাষ্ট্র নয় এবং তার জন্মও নতুন তাও বলা যাবে না। এ রাষ্ট্রটির জন্ম হয়েছে অর্ধশতকের বেশি সময় হয়েছে। জন্মের পর থেকেই রাষ্ট্রটি সংকট, সমস্যা, দুর্যোগ, গোলযোগ ইত্যাকার সমস্যা নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। শুধু তাই নয়, ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত, আঁতাত, ফন্দি আর দুরভিসন্ধি দিয়েই তার যাত্রা শুরু হয়েছিল। তেমনিভাবে আজও এসব ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত দুরভিসন্ধি কূটকৌশলের অবসান হয়নি। কিন্তু জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ থাকা দূরের কথা, দেশটির সংকট যেন কাটছেই না। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ আশা করেছিল এবার বোধ হয় দেশটি এগিয়ে যাবে। দেশটি ফ্যাসিস্টমুক্ত হয়েছে, এবার রাষ্ট্র, সরকার, জাতীয় সংসদ ও রাজনীতি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে চলবে। কিন্তু না, বিধিবাম। সরকারি দল ও নেতাদের কথাবার্তা ও আচরণ সুবিধার মনে হচ্ছে না। তারা যেন গায়ে পড়ে বিরোধীদলের সাথে বিবাদ শুরু করতে চাইছে। ইতোমধ্যে সরকারের উঁচু পর্যায়ের একজন জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধীদলকে নির্মূল করতে বলেছেন। আধুনিক সভ্যতার এ পর্যায়ে কি একটি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল প্রধান বিরোধীদলের ব্যাপারে এ ধরনের মন্তব্য করতে পারে। এটি একটি দেশের সুস্থ রাজনীতির জন্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না। সরকারের একজন শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রী ও নেতার মুখে এ ধরনের কথা কাম্য নয়। যিনি এ ধরনের মন্তব্য করেছেন, তিনি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ তথা মহাসচিবের দায়িত্বে আসীন এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীও বটে।
ক্ষমতাসীন দল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীকে নির্মূল করতে হবে। গত ২৫ এপ্রিল শনিবার দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যৌথ সভা শেষে এক ব্রিফিংয়ে মির্জা ফখরুল এ মন্তব্য করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সমগ্র জাতি অত্যন্ত সচেতনভাবে জামায়াতে ইসলামীকে প্রত্যাখ্যান করেছে বলে মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে আগামীতে যেন পুরোপুরি তাদের নির্মূল করা যায়। আমাদের কাজ করতে হবে সেভাবেই। কারণ জামায়াতে ইসলামী কখনোই সুস্থ চিন্তা করে না।’
মির্জা ফখরুল ইসলামের এ বক্তব্য রাজনৈতিক ময়দানে যেমন উত্তাপ ছড়িয়েছে, তেমনিভাবে জাতীয় সংসদেও আলোচিত হয়েছে। নির্মূল নিয়ে বিরোধীদলের সদস্যদের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালও বলেছেন, নির্মূল করার এই শব্দটা ইতিবাচক রাজনীতির সংস্কৃতি বহন করে না। সংসদে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির সদস্যরা তীব্র নিন্দা করেছেন ফখরুল ইসলামের বক্তব্যের।
নির্মূল শব্দটা ইতিবাচক রাজনীতি সংস্কৃতি বহন করে না : ডেপুটি স্পিকার
এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ (কুমিল্লা-৪) বলেন, ‘সরকারি দলের পক্ষ থেকে এভাবে আরেকটি দলকে নির্মূলের সংস্কৃতি চালু করা হলে তা আবারো ফ্যাসিবাদের পথ প্রশস্ত করবে। আমরা ১৭ বছর ধরে এই নিপীড়নের শিকার হয়েছি, এখন আবার একই ধারা শুরু হওয়া উদ্বেগজনক।’
গত ২৬ এপ্রিল রোববার জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. ইজ্জত উল্লাহ বলেন, জামায়াত আপনাদের (বিএনপি) সাথে দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছে, জোটগতভাবে ক্ষমতায় এসে তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছে, ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনও করেছে। এখন জামায়াত এত খারাপ হয়ে গেল? কারা কটাক্ষ করছেন তারা কী জানেন না? অনেকেই জামায়াতকে নির্মূলের কথা বলছেন, আমরা চাই আপনারা জনগণের আস্থা অর্জন করুন। আমরা দেশ ও জনগণের স্বার্থে সহযোগিতা করতে চাই।
এ সময় সভাপতির চেয়ারে বসা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, আপনার বক্তব্যে বলেছেন, আপনাদের দলকে নির্মূলের কথা কেউ কেউ বলেছেন। শুনিনি এসব কথা। তবে নির্মূল করার এই শব্দটা ইতিবাচক রাজনীতি সংস্কৃতি বহন করে না।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মন্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জামায়াতের
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত ২৫ এপ্রিল শনিবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে পুরোপুরি রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করার হুমকি দিয়ে যে অগণতান্ত্রিক ও অনভিপ্রেত বক্তব্য রেখেছেন, তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার গত ২৫ এপ্রিল এক বিবৃতি প্রদান করেছেন।
প্রদত্ত বিবৃতিতে তিনি বলেন, “বিএনপি মহাসচিব বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে পুরোপুরি রাজনৈতিভাবে নির্মূল করার হুমকি দিয়ে যে অসাংবিধানিক, অনাকাক্সিক্ষত এবং অশোভন বক্তব্য দিয়েছেন, আমি তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করার হুমকি দিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা গণতন্ত্রের ভাষা নয়। এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত বক্তব্য দিয়ে তিনি পতিত আওয়ামী ফ্যাসিবাদীদের ভাষায় কথা বলেছেন, যা মোটেই সমীচীন নয় এবং অত্যন্ত দুঃখজনকও বটে। তার মতো দায়িত্বশীল নেতার নিকট থেকে দেশবাসী এ ধরনের রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত বক্তব্য আশা করে না। তার এই বক্তব্য অতীতের মতো দেশকে সহিংসতা ও উসকানিমূলক নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দেবার ইঙ্গিত বহন করে।
যেই মুহূর্তে দেশের ১৮ কোটি মানুষ এক রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের মাধ্যমে একদলীয় ফ্যাসিবাদী শাসকদের দেশ থেকে বিতাড়িত করে দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে জাতীয় সংসদের বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে পুরোপুরি রাজনৈতিভাবে নির্মূলের হুমকি দিয়ে বিএনপি মহাসচিব একদলীয় আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সুরে কথা বলেছেন। তার এ বক্তব্যেই প্রমাণিত হচ্ছে যে, তারা জাতীয় সংসদের বিরোধীদলকে পুরোপুরি রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করে এ দেশে আবার একদলীয় কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েমের ষড়যন্ত্র করছেন।
বিবৃতিতে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, সচেতন দেশবাসী মনে করে কোনো দল বা ব্যক্তি যখন আদর্শ, যুক্তি ও নৈতিকতা দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়, কেবল তখনই এ ধরনের সন্ত্রাস ও সহিংসতার মতো উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বেরই পরিচয় দেয়।
তিনি বলেন, বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্যের জবাবে আমি স্পষ্ট ভাষায় জানাতে চাই, অতীতের আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শক্তি সাড়ে ১৭ বছর অন্যায়ভাবে অগণতান্ত্রিক ও সন্ত্রাসী তাণ্ডব চালিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নির্মূল করতে পারেনি। সুতরাং আমি আশা করি যে, এ ধরনের অপরিণামদর্শী বক্তব্য থেকে বিএনপি মহাসচিব বিরত থেকে গণতান্ত্রিক পরিবেশকে সমুন্নত রাখবেন। অতীতে জামায়াতে ইসলামীকে রাজনৈতিভাবে নির্মূল করতে গিয়ে আওয়ামী ফ্যাসিবাদীরাই প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। অনুরূপভাবে কেউ বা কোনো দল জামায়াতে ইসলামীকে নির্মূল করার ষড়যন্ত্র করলে এ দেশের জনগণ তাদেরও একইভাবে প্রত্যাখ্যান করবে।
কাজেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নির্মূল করার হুমকি দিয়ে, ভয় দেখিয়ে কাবু করা যাবে না। এ ধরনের অগণতান্ত্রিক ও উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহার করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে না দিয়ে নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক ভাষায় কথা বলার জন্য আমি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।”
বিএনপি মহাসচিবের এ ধরনের বক্তব্যে জাতীয় সংসদসহ রাজনৈতিক ময়দানে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। শুধু জামায়াতে ইসলামীই নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো ফখরুল ইসলামের বক্তব্যের তীব্র নিন্দা করেছেন।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না একটি দৈনিক পত্রিকার সাথে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, “মির্জা ফখরুলকে সজ্জন হিসেবে জানলেও তার মুখে এমন কথা বিশ্বাস করা কঠিন। অতীত থেকে শিক্ষা না নিয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে জড়ালে তারা আবার কোনো বিপর্যয়ে পড়তে পারেন।
১৯৯২ সালের নির্মূল কমিটিই এখন নিজেরাই নির্মূল
ফখরুল ইসলাম যে নির্মূলের কথা বলেছেন, সে নির্মূল কথাটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রথম শুরু করেছিল ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদী ও বামপন্থি কিছু লোকজন। জামায়াতে ইসলামীসহ এদেশের ইসলামী আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করতে বিগত কয়েক দশক ধরে ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারতীয় ইসলামবিরোধী শক্তি বিভিন্ন অপকৌশল করে আসছে। তাদেরই দোসর এক ঘৃণিত মহিলা জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ১৯৯২ সালে জানুয়ারি মাসে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি নামে একটি সংগঠন গঠন করা হয়েছিল। ভারতপন্থি একদল কথিত বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, চিকিৎসক, অধ্যাপক এবং সাংবাদিকদের নিয়ে গঠিত ১০১ সদস্যের একটি কমিটি অনেক অপপ্রচার ও প্রোপাগান্ডা করেছিল জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে। কিন্তু আজ সেই নির্মূল কমিটিই নিজেরা নির্মূল হয়ে গেছে।
স্বগৌরবে টিকে আছে জামায়াতে ইসলামী
বরং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে একটি জোট পৌনে একশত আসন নিয়ে জাতীয় সংসদে দেশ ও জাতি গঠনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছে। ইতিহাস এক বা দুই বছরে লেখা হয় না, ইতিহাস গড়ে উঠে যুগের পর যুগের কাজ ও ভূমিকার ওপর। জামায়াতে ইসলামী আজ বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসলামী আন্দোলন ও রাজনীতির আরেক জনপ্রিয় সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির আজকে দেশের শীর্ষস্থানীয় অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদের নেতৃত্ব দিচ্ছে। সর্বোপরি প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির। জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামী রাজনীতি ও আন্দোলনই সর্বস্তরের জনগণের কাছে প্রতিনিয়ত জনপ্রিয় হচ্ছে। আর তারই প্রমাণ এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের ৩৮ শতাংশ ভোটার তাদের সমর্থন জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও তার নেতৃত্বে জোটের প্রতি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত হচ্ছে দেশের অধিকাংশ জনগণের একটি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে যে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে একটি জোটই পারবে বাংলাদেশকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে।