বগুড়া ও শেরপুরে বিএনপির জয় মাগুরামার্কা নির্বাচনের উদাহরণ
১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৫৯
এজেন্টদের প্রবেশে বাধা, জালিয়াতি, কারচুপি, হামলার অভিযোগ জামায়াতের
সোনার বাংলা ডেস্ক : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরবর্তী সংসদ গঠনের পর তারেক রহমানের বগুড়া-৬ আসন ও শেরপুরে-৩ আসনে উপনির্বাচনে ভোট জালিয়াতি, কারচুপি, অনিয়ম ও হামলার মধ্য দিয়ে জয় পেয়েছে বিএনপি। এমনকি শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে ভোট বর্জন করেছে জামায়াতের প্রার্থী। এই নির্বাচনকে জামায়াত মাগুরামার্কা নির্বাচন বলেও অভিহিত করেছে জামায়াত।
গত ৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবার আসন দুটিতে ভোট গ্রহণ শুরু হয় সকাল সাড়ে ৭টায়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনের নানা অনিয়ম ও কারচুপির খবর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বগুড়া-৬ আসনে জামায়াতের প্রার্থী আবিদুর রহমান সোহেল একটি কেন্দ্র পরিদর্শন করে জালিয়াতির অভিযোগ করছেন। দেখা যাচ্ছে, একাধিক ব্যালটে আগাম স্বাক্ষর করেছেন পোলিং অফিসার। এছাড়া ভোট গ্রহণের আগেই ফলাফল শিটে এজেন্টদের স্বাক্ষর নেয়া হয়েছে, যা নির্বাচনী বিধিবহির্ভূত।
এদিন বেলা সোয়া ৩টার দিকে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ এনে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মাসুদুর রহমান।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের প্রার্থী মাসুদুর রহমান অভিযোগ করেন, বিভিন্ন কেন্দ্রে তাদের এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রভাব বিস্তার করে জোরপূর্বক সিল মারা এবং এসবের প্রতিবাদ করায় অনেক কর্মীকে মারধরের ঘটনাও ঘটেছে। সরকারি দলের অধীন নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।
এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার নির্বাচনের নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একটি নির্বাচিত সরকারের অধীনে বগুড়া এবং শেরপুর দুটি আসনের উপনির্বাচনে কিছু গুরুতর অনিয়ম, ভোট কারচুপি, জাল ভোট, এজেন্টদের বের করে দেয়া, সকালেই শিটে স্বাক্ষর নিয়ে নেয়ার মতোই অনেক আপত্তিকর ঘটনা ঘটছে, যা খুবই দুঃখজনক।
গোলাম পরওয়ার বলেন, শেরপুরে শ্রীবরদীতে আমাদের প্রার্থী ইন্তেকাল করেছেন। তার আগে শ্রীবরদী উপজেলার সেক্রেটারি রেজাউল করিমকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিলো।
গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা বিগত ৪, ৫ ও ৬ তারিখ ৩ দিন কেন্দ্রের পক্ষ থেকে আমি নিজেই সফর করেছি। সফরেও আমরা যে তথ্য পেয়েছি সে বিষয় উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। আমরা শুনেছি ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে এবং কেন্দ্রে ঢুকতে দেবে না, আমাদের প্রার্থীর নেতা-কর্মীদের এমন হুমকি দিয়েছিলো। আমরা সেই ধরনের আলামত দেখতে পেলাম।
বগুড়ায় নির্বাচনে অনিয়মের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, সকালেই বিভিন্ন কেন্দ্রে এজেন্টদের আগেই প্রিসাইডিং অফিসার জোর করে রেজাল্ট শিটে স্বাক্ষর করে নিয়েছেন। যেটা নির্বাচনের আচরণবিধির খেলাপ। যার নিয়ম হলো ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর ফলাফল তৈরি হবে তখন রেজাল্ট শিটে সব প্রার্থীরা স্বাক্ষর করবে। মালতিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র নম্বর-১। এই কেন্দ্রে যারা আমাদের এজেন্ট ছিলেন তাদের সকালেই রেজাল্ট শিটে স্বাক্ষর নিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং প্রিসাইডিং অফিসারের স্বাক্ষরের জায়গাটা ফাঁকা রয়েছে। এরপরে জালভোট দিয়ে সিল মারা হচ্ছে এবং এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দুপুর ১২টা পর্যন্ত শেরপুর নির্বাচনী এলাকায় ১৩টা ভোট কেন্দ্রে জোর করে এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে এবং জাল ভোট দেয়া হয়েছে। ইসলামিয়া কামিল মাদরাসায় একটি ভোট কেন্দ্রে জাল ভোট ঠেকাতে গেলে শ্রীবরদী পৌর বিএনপির সেক্রেটারি আব্দুল্লাহ মো. দুলাল এবং পৌর আহ্বায়ক অপুর নেতৃত্বে সেই কেন্দ্রে ঢুকে আমাদের এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে। এটার প্রতিবাদ করায় ঐ উপজেলার জামায়াতে ইসলামীর যুব কমিটির আমীর হামজাকে মারধর করা হয়েছে। এছাড়া আরো অনেক নেতাকর্মীকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছে।
গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও রিটার্নিং অফিসারকে আমাদের নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা নেতৃবৃন্দ বারবার অনুরোধ করার পরও কোনো প্রতিকার হয়নি। এখানে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষ থেকে নিযুক্ত বিভিন্ন পেটোয়া বাহিনীর হামলা করছে। মহিলাদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দিচ্ছে, অপমানিত ও লাঞ্ছিত করছে। মনে হচ্ছে প্রশাসন অসহায়। কোনো এক জায়গা থেকে নির্দেশিত হয়ে মনে হচ্ছে।
তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, কেবলই এক মাস দেড় মাস হলো অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের কথা বলে আন্দোলন করা সংগ্রাম করা জীবন দেয়া ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের দলগুলোর একটি বড় দল ক্ষমতায়। তাদের হাতে প্রথম দুটি উপনির্বাচনে এই যদি চিত্র হয়, তাহলে সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আর যেসব নির্বাচন হবে, সেগুলোয় আমরা কি করে ভোটারদের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন আশা করতে পারি?
সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশনারের উদ্দেশে গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা অনিয়মগুলো প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দৃষ্টিতে আনছি, যাতে যেসব কেন্দ্রে অনিয়মের কথা আমরা বলছি, যেসব কেন্দ্র থেকে জাল ভোট দিয়ে এজেন্টদের বের করে দিয়েছে, আগে স্বাক্ষর নেয়া হচ্ছে, সেসব প্রিসাইডিং অফিসারদের প্রতি যেন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে ব্যাপক অনিয়ম যেখানে হয়েছে, সেখানে ভোটগ্রহণ স্থগিত করেন এবং পুনরায় ভোটের ব্যবস্থা করেন। নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা না নিলে জনগণ এরকম একতরফা নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেবে না।
তিনি আরও বলেন, দুটি নির্বাচনী আসনে প্রায় ৩০০ কেন্দ্র হবে। এর মধ্যে যেসব কেন্দ্রে জাল ভোট ও এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে। ঘটনা ঘটবার জন্য এখনো অনেক সময় বাকি আছে। আমরা ১২টা পর্যন্ত যে তথ্য সংগ্রহ করেছি। সবাই গণমাধ্যমের সাথে যুক্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় নজর রাখলে দেখতে পাবেন এই দুটি আসনে কি হচ্ছে। সেজন্য আমি আপনাদের মাধ্যমে গুরুতর অনিয়ম হওয়া কেন্দ্রগুলোয় ভোটগ্রহণ স্থগিত করার দাবি জানাচ্ছি।
অনিয়মের সাথে জড়িত প্রিসাইডিং অফিসারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য রিটার্নিং অফিসারের মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনে হস্তক্ষেপ কামনা করেন গোলাম পরওয়ার। তিনি সন্ত্রাসী পেটোয়া বাহিনীরা এজেন্টদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে, ভোট কেন্দ্র থেকে বের করে দিচ্ছে, ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতে সাহস পাচ্ছে না এমন সব গুরুতর অভিযোগ জানিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুর কারণে এই আসনে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছিল। পরে তার ছোট ভাই মাসুদুর রহমানকে প্রার্থী করেছিল জামায়াত। আর এ আসনে বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক (রুবেল)।
বগুড়া-৬ আসনের (সদর) উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী রেজাউল করিম (বাদশা) জয়ী হয়েছেন। তিনি ৭৬ হাজার ৭৭২ ভোটের ব্যবধানে জামায়াতের প্রার্থী আবিদুর রহমানকে (সোহেল) পরাজিত করেন।
একই দিন অনুষ্ঠিত শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের নির্বাচনে জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক (রুবেল)। তিনি ১ লাখ ১৯ হাজার ৬৬ ভোটের ব্যবধানে জামায়াতের প্রার্থী মাসুদুর রহমানকে পরাজিত করেন।
শেরপুর ও বগুড়ায় ভোট ডাকাতির প্রতিবাদে রাজধানীতে জামায়াতের বিক্ষোভ
শেরপুর-৩ ও বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে নজিরবিহীন ভোট ডাকাতি, ভোটকেন্দ্র দখল, জামায়াত নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও হত্যাচেষ্টার প্রতিবাদে গত ১০ এপ্রিল শুক্রবার বিক্ষোভ সমাবেশ ও প্রতিবাদ মিছিল করেছে ঢাকা মহানগর জামায়াতে ইসলামী।
সমাবেশে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘বিএনপির আমলের প্রথম নির্বাচনে নজিরবিহীন ভোট ডাকাতি, কেন্দ্র দখল, জাল ভোট ও প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা আওয়ামী লীগকেও হার মানিয়েছে।’
তিনি বলেন, বিএনপি আগের শাসনামলের মাগুরা মার্কা নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছে শেরপুর ও বগুড়ার উপনির্বাচনে। তিনি বলেন, নির্বাচনে জাল ভোট, কেন্দ্র দখল, প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর নেতাকর্মীদের ওপর হামলার চিত্র মিডিয়ায় প্রকাশ হওয়ার পরও সিইসি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে দাবি করে জাতির সঙ্গে তামাশা করেছেন। তিনি প্রহসনের এই নির্বাচনের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে শেরপুর-৩ ও বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনের ফলাফল বাতিলের দাবি জানান।