চাঁদ দেখা সাপেক্ষে পবিত্র হজ ২৬ মে, আনুষ্ঠানিক ফ্লাইট উদ্বোধন শুক্রবার


১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:০২

কোটা কমেছে প্রায় ৪৯ হাজার, খরচ কমেছে ১২ হাজার
মক্কায় প্রবেশে নিতে হবে ই-পারমিট
হজ ভিসা ছাড়া অন্য কোনো ভিসায় হজ করা যাবে না

স্টাফ রিপোর্টার : পবিত্র ইসলাম ধর্মের অন্যতম ফরজ ইবাদত হজ। বছরে একবার সামর্থ্যবান মুসলিমদের জন্য এ ইবাদত করার সুযোগ রয়েছে। এবারের পবিত্র হজ আগামী ২৬ মে পালিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হজের দিনকে বলা হয় ‘ইয়াওমুল আরাফাত’। এই ইয়াওমুল আরাফাতের দিনের পরদিনই পালিত হয় পবিত্র ঈদুল আজহা। সেই হিসাবে সৌদি আবর এবং মধ্যপ্রচ্যের দেশগুলোয় ২৭ মে এবং বাংলাদেশে ২৮ মে ঈদুল আজহা উদযাপিত হতে পারে। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে চাঁদ ওঠার ওপর। অর্থাৎ চাঁদ দেখা সাপেক্ষে পবিত্র হজ পালিত হতে পারে আগামী ২৬ মে। এ বছর বাংলাদেশ থেকে মোট ৭৮ হাজার ৫০০ জন হজযাত্রী সৌদি আরবে যাবেন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় নিবন্ধন করেছেন ৪ হাজার ২৬০ জন। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় নিবন্ধন করেছেন ৭২ হাজার ৩৪৪ জন। গত কয়েক বছর ধরে দেশে হজ কোটা পূরণ হচ্ছিল না। ফলে এবার সৌদি কর্তৃপক্ষ হজ কোটা কমিয়ে ৭৮ হাজার ৫০০ জন নির্ধারণ করেছে। এবারের হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হচ্ছে আজ ১৭ এপ্রিল শুক্রবার থেকে। আজ রাতেই হজের প্রথম ফ্লাইট ছাড়বে বাংলাদেশ থেকে। এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ইতোমধ্যেই সব প্রস্তুতি শেষ করেছে সরকারের ধর্ম মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো।
এবারের হজের সম্ভাব্য তারিখ : মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান ইবাদত পবিত্র হজ ২০২৬ নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত (টঅঊ) এবং মিশরের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নানা বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন। চাঁদের গতিপথ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের গণনা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে আগামী ২৭ মে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর নিয়ম অনুযায়ী ঈদের আগের দিন হজ পালিত হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বরাত দিয়ে ‘গালফ নিউজ’ জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ২৬ মে মঙ্গলবার পবিত্র আরাফাত দিবস (অৎধভধঃ উধু) পালিত হতে পারে। এর পরদিন অর্থাৎ ২৭ মে বুধবার দেশটিতে পবিত্র ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে মিশরের জাতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণা ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, হিজরি ১৪৪৭ সালের জিলহজ মাসের প্রথম দিন শুরু হতে পারে ১৮ মে সোমবার। ভৌগোলিক অবস্থান ও চাঁদ দেখা সাপেক্ষে বাংলাদেশে সাধারণত সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর একদিন পর ঈদ পালিত হয়। সেই হিসাবে বাংলাদেশে ২০২৬ সালের ২৮ মে বৃহস্পতিবার পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত তারিখ নির্ভর করবে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখার (গড়ড়হ ঝরমযঃরহম) ওপর, যা জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করবে।
হজ ফ্লাইট উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
আজ ১৭ এপ্রিল শুক্রবার রাতে বাংলাদেশ থেকে হজ ফ্লাইট শুরু হবে বলে জানিয়েছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ। তিনি বলেন, হজের কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ১২ এপ্রিল রোববার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত হজ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির সভা শেষে এ কথা জানান তিনি। কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন বলেন, সভায় এবারের হজ ব্যবস্থাপনা নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি সত্ত্বেও হজ ফ্লাইটের শিডিউলে বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় হবে না বলে আশা ধর্মমন্ত্রীর। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যাতে হজযাত্রীরা নির্বিঘ্নে সৌদি আরবে পৌঁছাতে পারেন।
হজযাত্রায় খরচ কমেছে ১২ হাজার টাকা
এবার হজযাত্রায় টিকিটপ্রতি ১২ হাজার টাকা খরচ কমানো হয়েছে। গত ১২ এপ্রিল রোববার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, কোনো চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনা ছাড়াই এবার ৭৮ হাজারের বেশি হাজী পরিবহন করা হচ্ছে।
হজ ভিসা নিয়ে সৌদির নতুন সিদ্ধান্ত
পবিত্র হজ পালনের ক্ষেত্রে একমাত্র ‘হজ ভিসা’ ছাড়া অন্য কোনো ভিসা বৈধ নয় বলে জানিয়েছে সৌদি আরব। সৌদি আরবের বাইরে থেকে আগত মুসল্লিদের জন্য এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে জানিয়েছে দেশটির হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়। গত ১২ এপ্রিল রোববার সৌদি গেজেটের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ভ্রমণের জন্য ব্যবহৃত ভিজিট ভিসা, ট্রানজিট ভিসা, ওমরাহ ভিসা কিংবা ট্যুরিস্ট ভিসা দিয়ে কেউ হজের আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিতে পারবেন না। তবে সৌদি আরবে বসবাসরত নাগরিক এবং প্রবাসীদের জন্য ‘নুসুক’ অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে বুকিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে হজের পারমিট সংগ্রহ করতে হবে।
মক্কায় প্রবেশে ই-পারমিট চালু
আগামী হজ মৌসুমকে সামনে রেখে পবিত্র মক্কা নগরীতে প্রবেশের জন্য ইলেকট্রনিক বা ই-পারমিট প্রদান প্রক্রিয়া শুরু করেছে সৌদি আরব। গত ১৩ এপ্রিল সোমবার থেকে এই নতুন নিয়ম কার্যকর করা হয়েছে বলে দেশটির পাসপোর্ট অধিদপ্তর নিশ্চিত করেছে। হজযাত্রীদের ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে এবার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। এখন থেকে মক্কায় প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় পারমিট সরাসরি ‘আবশির’ ও ‘মুকিম’ পোর্টালে গিয়ে অনলাইনেই আবেদন করা যাবে। এর ফলে আবেদনকারীদের সশরীরে পাসপোর্ট অফিসে যাওয়ার আর কোনো প্রয়োজন নেই। নতুন এই ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসিভুক্ত দেশের নাগরিক, প্রিমিয়াম রেসিডেন্সি কার্ডধারী, বিনিয়োগকারী, সৌদি নাগরিকদের বিদেশি মা, গৃহকর্মী এবং প্রবাসী পরিবারের সদস্যরা ‘আবশির’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তাদের আবেদনের কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন। অন্যদিকে যেসব প্রবাসী মক্কাভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন কিংবা হজের সময় বিশেষ চুক্তিতে কাজের জন্য সেখানে যাবেন, তাদের আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে ‘মুকিম’ পোর্টালের মাধ্যমে। পুরো প্রক্রিয়াটিকে হজ পারমিটের সমন্বিত ডিজিটাল সিস্টেম ‘তাসরিহ’র সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে যাতে করে দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে অনুমোদন দেওয়া সম্ভব হয়। পাবলিক সিকিউরিটি ডিরেক্টরেট থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বৈধ হজ পারমিট বা মক্কার ইকামাধারী নন এমন ব্যক্তিদের জন্য গত ১২ এপ্রিল সোমবার থেকেই শহরটিতে প্রবেশের ওপর বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। বিশেষ করে যেসব প্রবাসীর কাছে পবিত্র স্থানগুলোয় কাজ করার জন্য কোনো অনুমোদিত ওয়ার্ক পারমিট নেই, তারা এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বেন। মূলত হজের সময় যাতায়াত ব্যবস্থা সুশৃঙ্খল রাখা এবং অননুমোদিত প্রবেশ ঠেকাতেই সৌদি সরকার এই কঠোর ই-পারমিট ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে। কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, মৌসুমি শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আবেদন করা বাধ্যতামূলক, যা সরাসরি সরকারের কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। এসব তথ্য জানিয়েছে গালফ নিউজ।
প্রসঙ্গত, চলতি বছর হজে বাংলাদেশ থেকে মোট ৭৮ হাজার ৫০০ জন হজ পালনের সুযোগ পাচ্ছেন। গত বছর বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জনকে হজ করার সুযোগ দিয়েছিল সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ। তবে হজে যেতে নিবন্ধন করেন ৮৭ হাজার ১০০ জন। সে হিসাবে চলতি বছরের হজ চুক্তিতে গত বছরের চেয়ে ৪৮ হাজার ৬৯৮ জন কমানো হয়। খরচ বেড়ে যাওয়ায় ২০২৪ সালেও প্রায় ৩৩ শতাংশ কোটা পূরণ হয়নি, হজে গিয়েছিলেন ৮৫ হাজার ২৫৭ জন।