সাংবিধানিক কাঠামো সংস্কারের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়তে হবে
১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:১৮
স্টাফ রিপোর্টার : জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জুলাইয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সরকার পার পাবে না। সংসদে কারো জমিদারি মানবো না, কারো কাছে সংসদ বন্ধকও দেবো না। ফ্যাসিবাদের কালো ছায়া সংসদে দেখতে পাচ্ছি। সংসদে যাদের নাড়াচাড়া দেখা যায়, তাদের কে নাড়াচ্ছে- জাতি এটা বুঝে। তারা একসময় বলে গণভোট বৈধ, আবার বলে অবৈধ। জনগণ আমাদের সংসদে পাঠিয়েছে জনগণের পক্ষে কথা বলতে। সংসদে বসে টেলিভিশনের পর্দায় চেহারা দেখানোর জন্য জনগণ আমাদের সংসদে পাঠায়নি।
গত ১৩ এপ্রিল সোমবার সকালে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা হলরুমে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে ‘গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার : সংকটের মুখোমুখি দেশ’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। খেলাফত মজলিসের আমীর মামুনুল হকের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান, এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ বীরবিক্রম, রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ডা. দিলারা চৌধুরী প্রমুখ।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১৪শ’ শহীদের মধ্যে ১২শ’ শহীদের বাসায় যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। এসব শহীদ সবাই শিক্ষিত ছাত্র বা রাজনীতিবিদ নয়; তারা খেটে-খাওয়া সাধারণ মানুষ। তারা রাজপথে নেমেছে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক কাঠামো সংস্কারের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্নে। তাদের সেই স্বপ্ন বৃথা যেতে দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য অনেকেই আন্দোলন শুরু করতে বলছে। আন্দোলন শুরু করতে হবে না, আন্দোলন ইতোমধ্যে শুরু হয়েই গেছে। এই আন্দোলনে আমরা শুধু সাথে থাকবো না, বরং সামনের সারিতে থাকবো।
সরকারকে সতর্ক করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অপকর্ম করলে আগের চেয়ে পরের পরিণতি আরও বেশি ভয়ংকর হয়। আওয়ামী লীগ যেসব অপকর্ম করে দেশছাড়া হয়েছে, সেই অপকর্ম করে আপনারাও পার পাবেন না; বরং আরও ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।
প্রশাসনে দলীয়করণ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংককে যেভাবে দলীয়করণ করা হয়েছে, একইভাবে দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করতে সরকার একের পর এক ব্যাংক দখলের চেষ্টা করছে। এখনো সময় আছে সাবধান হয়ে যান। জনগণ রাজপথে নেমে এলে রক্ষা পাওয়া যাবে না- হুঁশিয়ারি দেন আমীরে জামায়াত।
কি-নোট স্পিকার বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির বলেন, অতীতে সপ্তম, অষ্টম, ত্রয়োদশ, পঞ্চদশ এবং ষোড়শ সংশোধনী অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়েছে। এগুলো তো সংসদেই পাস হয়েছিল। তাহলে সুপ্রিম কোর্ট কেন এগুলো অসাংবিধানিক বললো- এ প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, এর অর্থ সংসদে যা ইচ্ছা তা করা যায় না।
তিনি আরও বলেন, গণভোট হচ্ছে জনগণের ইচ্ছার সরাসরি বহিঃপ্রকাশ। ১৯৭২ সালের সংবিধানে গণভোট ছিল না; ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান এটি সংযোজন করেন। কিন্তু ১৯৭৭ সালেই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
তিনি বলেন, ২০২৬ সালের গণভোট ছিল স্পষ্ট প্রশ্নভিত্তিক, যেখানে জনগণ পড়ে বুঝে ভোট দিয়েছে। অথচ আগের গণভোটগুলোয় প্রশ্ন অস্পষ্ট ছিল।
বিশেষ অতিথি বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপি দ্রুত নির্বাচন চেয়েছিল। আমরা বলেছি আগে বিচার, সংস্কার ও নতুন সংবিধান।
তিনি বলেন, গণভোটে ৭০ শতাংশ জনগণ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে জুলাই সনদকে বৈধতা দিয়েছে। কিন্তু সরকার গঠনের পর বিএনপি সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে, যার ফলে আজকের সংকট তৈরি হয়েছে।
এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ বীরবিক্রম বলেন, জুলাই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল সাংবিধানিক সংস্কার ও বৈষম্য দূর করা। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে দলীয়করণ বন্ধ করতে হবে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার আগে বলেছে গণভোট অবৈধ, এখন আবার বৈধ বলছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন সরকারের এমপি-মন্ত্রীরা কি গণভোটে ‘না’ ভোট দিয়েছেন? গণভোটের মাধ্যমে তা আরও শক্তিশালী হয়েছে। এখন তা বাস্তবায়ন করা জরুরি।
দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, আমি গণভোটকে আইনগত কিংবা সাংবিধানিক তর্ক হিসেবে দেখতে চাই না। গণভোট ও জুলাই সনদকে জুলাই বিপ্লবের স্পিরিটে দেখে এসেছি। বিপ্লবের আগে থেকেই আমি বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে এসেছি। বিপ্লবের পরও আমি বিপ্লবের স্পিরিটকে একশত ভাগ ধারণ করার চেষ্টা করেছি। জুলাই বিপ্লবকে যদি আমরা অস্বীকার করি, তাহলে আমরা গণভোটকে অস্বীকার করব। যারা আজকে গণভোটকে দুর্বল করার চেষ্টা করছেন, গণভোটের আইনি তর্ক তুলছেন, তারা আসলে কতটা জুলাই বিপ্লবকে ধারণ করেন সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ডা. দিলারা চৌধুরী বলেন, জনগণের রায়ের ঊর্ধ্বে কিছু নেই। গণভোটের রায়ই চূড়ান্ত হওয়া উচিত।
বর্তমান সংকট রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অঙ্গীকার ভঙ্গের ফল। তারা সবাই গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আহ্বান জানান বক্তারা।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক বলেন, জনগণকে উপেক্ষা ও অপমান করার প্রবণতাই আজকের সংকটের মূল কারণ। জনগণের রায় অমান্য করলে রাজপথেই এর সমাধান হবে, সতর্ক করেন তিনি।