কল্যাণমুখী সমাজ গঠনে ব্যক্তি সংস্কারে অগ্রাধিকার দিতে হবে


২৬ মার্চ ২০২৬ ১৮:১৯

॥ সরদার আবদুর রহমান ॥
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও আগস্ট বিপ্লবের পর থেকে আমরা ‘সংস্কার’ শব্দটির সঙ্গে খুব বেশি পরিচিত হতে থাকি। যদিও এটি বাংলা অভিধান কিংবা বাংলা ভাষায় নতুন কোনো শব্দ নয়।
বিগত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ‘সংস্কার’ বিষয়টি অনেক গুরুত্ব পায়। এই সরকার রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন খাতে অকার্যকর ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে ‘সংস্কার প্রক্রিয়া’ গ্রহণ করে, যা একটি কল্যাণমুখী ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের চলমান প্রক্রিয়া বলে দাবি করা হয়। সরকার যে বিষয়গুলো নিয়ে সংস্কার প্রক্রিয়া গ্রহণ করেছিল, সেগুলো ছিল- সংবিধান, নির্বাচন, বিচার বিভাগ, পুলিশ, জনপ্রশাসন, দুর্নীতি দমন ও গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাত। এসবের জন্য কমিশন গঠন করে এই প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। কিন্তু ছাব্বিশের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠার পর এসব সংস্কার ফাইল চাপা পড়ে যেতে বসেছে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সে যাই হোক, সময়ের প্রবাহে এই উপলব্ধি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে, রাষ্ট্রীয় সংস্কারের পূর্বে মনে হচ্ছে ব্যক্তি মানুষের সংস্কার হওয়াকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। মানুষ দিনে দিনে এমন সব কাজের সঙ্গে যুক্ত ও জড়িত হয়ে পড়ছে, যেগুলোর নৈতিক বা অনৈতিক দিক সম্পর্কে তার যেন কোনো ধারণাই নেই। আবার কিছু বিষয় সম্পর্কে ধারণা থাকলেও তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। মানুষ যেন প্রতিনিয়ত এক ঘোরলাগা চক্র ও বৃত্তের মধ্যে আটকে গেছে। এমন অপরাধমূলক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রকার ছত্রছায়া থাকলে সেটা বেপরোয়া আকার নেয়। একটা সময় আসে যখন এই কর্মকাণ্ডের আদৌ কোনো দণ্ড হয় না। আমরা সাধারণত সরকারি অফিসে ঘুষ-দুর্নীতির জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসের লোকদের দায়ী করে থাকি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, কাজ করে দেয়ার জন্য ঘুষ সেঁধে বশীভূত করার জন্য দায়ী কর্মপ্রত্যাশী ব্যক্তি। ঘুষ-দুর্নীতি বৃদ্ধির জন্য এই সুবিধাসন্ধানী ব্যক্তিরা কম দায়ী নয়।
লক্ষণীয় হলো, এমন একটা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ আছে, যারা বিপুল মাত্রায়; এককথায় যাকে অনৈতিক কাজ বলা যায়, এর সাথে নিত্য জড়িয়ে থাকে। এ নিয়ে তাদের কোনো উদ্বেগ বা অপরাধবোধ কাজ করে বলে মনেই হয় না। এর মধ্যে কিছু লোক আবার এই অনৈতিকভাবে অর্জিত অর্থ বা সম্পদ ‘নেকি’ অর্জন বাবদ খরচ করে পুষিয়ে নিতে চায়। সম্ভবত তার এমন মনস্তত্ত্ব কাজ করে যে, একদিকে সে পাপের পথে সম্পদ অর্জন করতে থাকবে; অন্যদিকে ‘দান’ করে পাপ কাটিয়ে নেবে।
ব্যক্তি মানুষের রোগসমূহ
ব্যক্তি মানুষের রোগসমূহের যদি তালিকা করতে হয়, তাহলে সেটি হবে এক অনির্দিষ্টসংখ্যক। তবে মোটামুটি প্রচলিত দিকগুলো হচ্ছে, নানা প্রকারের প্রতারণা, ব্যবসায়িক দুর্নীতি ও অসততা, ওজনে কম দেয়া ও বেশি নেয়া, দ্রব্যমূল্য ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়িয়ে দেয়া, পণ্যদ্রব্যে ভেজাল দেয়া, ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ তথা ঋণখেলাপি, বিদেশে টাকা পাচার, অন্যের জমি দখল, বাড়ি দখল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল, পুকুর দখল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদ দখল- এ ধরনের নানারকম দখলবাজি ব্যক্তির স্বার্থে ও উদ্যোগে নিত্যই ঘটে চলেছে। এমনকি মসজিদ-মাদরাসার কমিটিতে পদ পাওয়া এবং সামাজিক মর্যাদা হাসিলের জন্য মারামারি-খুনোখুনি করতে ছাড়ে না। স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিস্তর ঘাপলা ও ফাঁকিবাজির বিবরণ পাওয়া যায়। হাসপাতালের সরকারি ওষুধ বাইরের মার্কেটে বিক্রি হওয়া, রোগীদের নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করে টাকা মেরে দেয়া ইত্যাদি খুব সাধারণ বিষয়।
এখানেই শেষ নয়, ইভটিজিং নারী নিপীড়ন পরকীয়ার নামে অবৈধ সম্পর্ক, যৌতুক সম্পদের লোভে মিথ্যা মামলা ইত্যাদি বিষয়গুলো পরিবার ও সমাজকে বিপন্ন অবস্থায় ফেলে দিচ্ছে। অশ্লীল গালিগালাজ, অশ্লীল দৃশ্য, অশালীন আচরণ এখন যেন একটা স্টাইল ও ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আচরণ কারো কারো কাছে প্রগতির প্রতীক মনে হয়। ভেবে অবাক হতে হয় যে, এই দেশে কোনো ব্যবসায়ী কম মূল্যে পণ্য বিক্রি করতে চাইলে সেটা ‘অপরাধ’ বলে গণ্য হয়। সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে থাকতে হবে অথবা ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে।
ব্যক্তি মানুষের জন্য বর্তমান সময়ের সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে আচরণ ও মানুষের সাথে ব্যবহার। আদব, শ্রদ্ধা, সমীহ প্রভৃতি শব্দগুলো যেন দিনে দিনে সমাজ থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে। সেগুলোর স্থান দখল করেছে বেয়াদবি, উদ্ধত আচরণ, অসম্মান, অমার্জিত ব্যবহার। ভদ্রতা, সৌজন্যমূলক আচরণ, আদব-লেহাজের স্থান দখল করে নিচ্ছে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ও বেয়াদবি। আর এ ধরনের আচরণ কারো কারো কাছে প্রশংসিত হচ্ছে।
কিছু মানুষের এমন কিছু আচরণ আমরা লক্ষ করি, যেখানে দেখা যায় যে, মানুষ কোনো বিপদে পড়লে বা বেকায়দায় পড়লে তাকে জিম্মি করে সুবিধা আদায় করে নিতে তৎপর হয়ে ওঠে। যেমন দেখা যায়, কোনো বাস বা ট্রেন বা লঞ্চ দুর্ঘটনায় পতিত হলে, আগুন লাগলে বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে এই বিপদাপন্ন পরিস্থিতিতে কিছু মানুষ অবশ্যই উদ্ধার কাজে এগিয়ে আসে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এর মধ্যেও কিছু বদ লোক আছে যারা বিপদগ্রস্ত অবস্থার সুযোগ নিয়ে সম্পদ লুণ্ঠন করতে নেমে পড়ে। কোনো মৃতদেহ বহনের ঘটনা থাকলে অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়। রমজানের রোজায় দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেয়া আমাদের দেশে গা-সওয়া বিষয়।
সাধারণভাবেও দেখা যায়, পড়শীর জমির কিছু অংশ চেপে নিয়ে অবৈধ অধিকার প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা যেন আমাদের রক্ত-মজ্জায় মিশে আছে। প্রতিবেশীকে চলাচল করতে দেয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করার জন্য তার পথে দেয়াল তুলে দেয়া নিত্যই ঘটে চলেছে।
জাল দলিল করে জমি-বাড়ি দখল, লাইসেন্স না করে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া, অবৈধ সংযোগ নিয়ে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ইত্যাদি ব্যবহার করা, রাস্তার ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করাÑ এসব কাজকে আমরা অবলীলায় ও নির্বিকারচিত্তে হজম করে চলেছি। দৈনন্দিন জীবনে হালাল-হারাম, বৈধ-অবৈধ, জায়েজ-নাজায়েজ, ন্যায়-অন্যায় ইত্যাদি অতি সাধারণ অনেক কিছুই আমরা নিত্য উপেক্ষা করে চলতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এই সময়ে আমাদের ঈমান ও আমলের সমান্তরালে ঈমান বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডকে সঙ্গী করে নিয়েছি। এ নিয়ে কোনো চিন্তা বা কোনো চেতনা আছে বলে মনেই আসে না।
এমন অনেক বিষয়ই আছে, যেগুলো ইসলামী বিধান মতে হারাম, কিন্তু আমরা দিব্যি হালাল মনে করে হজম করে চলেছি। বিশেষত ব্যবসা ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি বিরাজমান রয়েছে।
কোনো জাতির ব্যক্তি মানুষের মন ও মগজে যদি অসততা, অনাচার, অন্যায় সম্পর্কে ন্যূনতম বোধ অবশিষ্ট না থাকে, তাহলে বুঝতে হবে সে জাতি পচে গেছে। তার ধ্বংস হওয়া কেউ ঠেকাতে পারবে না। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, দেশ ও সমাজ থেকে অনিয়ম, দুর্নীতি, অন্যায়, অনাচার, অপকর্ম প্রভৃতির প্রতিকার পাওয়ার জন্য যে সকল প্রতিষ্ঠান ও বিভাগ রয়েছে, সেগুলোয়ও একইভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতি জেঁকে বসে আছে। এর সঙ্গে অসংখ্য ব্যক্তি মানুষ জড়িয়ে আছে। তাহলে কীভাবে আশা করা যায় যে, আমরা এই অন্ধকার থেকে মুক্তি পাওয়ার আশা করতে পারি? এটি কি বেড়ায় ক্ষেত খাওয়ার সঙ্গে তুলনীয়, নাকি সমাজব্যবস্থার জন্য এক আত্মঘাতী ব্যবস্থা! এর প্রতিকার আসবে কোথা থেকে?
যেকোনো নেতিবাচক কাজের জন্য রাষ্ট্র বা সরকারকে দায়ী করা হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র বা সরকার চালায় ব্যক্তি মানুষের দল বা সংগঠন। ফলে এই দায়-দায়িত্ব মানুষের ওপরেই বর্তায়। তবে এ কথাও ঠিক যে, ব্যক্তি মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য রাষ্ট্র ও সরকারের ভূমিকা অপরিহার্য।
ন্যায়সঙ্গত আচরণের জায়গা নিয়েছে তেলবাজি। বিপরীতে রয়েছে ঘাড় ধাক্কা। পারস্পরিক সম্পর্কগুলো যেন একান্তই আত্ম স্বার্থকেন্দ্রিক হয়ে গেছে।
ভেজালের দীর্ঘ তালিকা
মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাপনের প্রধান উপাদান ও উপকরণ হলো তার খাদ্য। এসব খাদ্য পণ্যে ভেজাল দেয়ার প্রবণতা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। অথচ যারা ভেজাল দেয় তারাও যে সমভাবে ক্ষতির শিকার হয়ে চলেছে, সেই চেতনা যেন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ একটি তালিকা দেয়া যেতে পারে।
দুধে ফরমালিন, গরুর দুধ বৃদ্ধিতে পিটুইটারী গ্ল্যান্ড ইনজেকশন, মাছ তাজা দেখাতে ফরমালিন, শাকসবজি টাটকা রাখতে কপার সালফেট, আম, লিচু, জাম অসময়ে পাকা দেখাতে কারবাইড এবং সংরক্ষণ করতে ফরমালিন, ফল গাছে থাকতেই হরমোন ও কীটনাশক, তরমুজে সিরিঞ্জ দিয়ে পটাশিয়াম পার ম্যাঙ্গানেট প্রয়োগ, অপুষ্ট কলা পাকাতে ক্যালসিয়াম কারবাইড, কফি পাউডারে তেঁতুল বিচির গুঁড়া ব্যবহার, মসলায় ইটের গুঁড়া, হলুদে লেড ক্রোমেট বা লেড আয়োডাইড, মুড়ি ধবধবে সাদা ও বড় করতে হাইড্রোজ ও ইউরিয়া ব্যবহার, জিলাপি, চানাচুর দীর্ঘসময় মচমচে রাখতে পোড়া মবিল, আইসক্রিম, বিস্কুট, সেমাই, নুডলস ও মিষ্টি আকর্ষণীয় করতে কাপড় ও চামড়ায় ব্যবহৃত রং, ফলের রস তৈরিতে বিভিন্ন কেমিক্যাল, বিদেশি মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্য, ওষুধ ও কেমিক্যালসে নতুন মেয়াদের স্টিকার লাগিয়ে বিক্রি, চাল চকচকে করতে ইউরিয়া, পিঁয়াজু, জিলাপিতে অ্যামোনিয়া, সবুজ ফল ও শাকসবজিতে কাপড়ের সবুজ রং ব্যবহার, খামারের মুরগি ও চাষের মাছে বিষাক্ত ক্রোমিয়াম, লেড এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ, জুস, লাচ্ছিতে উচ্চমাত্রার প্রিজারভেটিভ, সরিষার তেলে ঝাঁঝালো কেমিক্যাল, সয়াবিনে পামওয়েল, শুটকিতে কীটনাশক, কসমেটিক্সে ক্যান্সারের উপাদান লেড, মারকারি ও ডাই ব্যবহার প্রভৃতি। এভাবে আমাদের জ্ঞাত কিংবা অজ্ঞাতসারে অসংখ্য পণ্যে এরকম ভেজাল ও কৃত্রিম উপকরণ মেশানো হয়ে থাকে। এর ফলে কেবল নানাবিধ রোগ-বালাই হওয়া ছাড়াও জীবন বিপন্ন হওয়ার মতো অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। এই সঙ্গে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পণ্য ক্রয়ের বেলায় স্বাভাবিক মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হয়।
সামাজিক বিভাজন
আমাদের সামাজিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিভাজন এমন পর্যায়ে উপনীত হয়েছে যে, আপনি নৈতিকতা ও চরিত্রগত দিক দিয়ে যতই উন্নত হোন না কেন আপনার রাজনৈতিক ট্যাগ অথবা আকিদার দোহাই দিয়ে আপনাকে সবচেয়ে জঘন্য ব্যক্তি হিসেবে ঘৃণা প্রচার করতে থাকবে। এ কথা তো সত্য যে, ব্যক্তি হোক বা দলীয় বক্তব্য হোকÑ কেউই চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, দুর্নীতি, ঘুষ, অবৈধ দখল প্রভৃতি কোনো প্রকার নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের পক্ষে থাকার কথা বলবে না। কিন্তু এসব আচরণ ও অভ্যাস তারা ত্যাগ করতেও রাজি নয়।
আমাদের বহু মসজিদে প্রতিনিয়ত ভালো কাজের পক্ষে এবং মন্দ কাজের বিপক্ষে বয়ান প্রদান করা হয়। প্রতি বছর গ্রামে-শহরে অসংখ্য ওয়াজ মাহফিল ও তাফসির মাহফিলে উপদেশ দেয়া হয়। এছাড়া ইসলামপন্থি দলগুলোর পক্ষ থেকে লাখ লাখ মানুষ ভালো কাজের প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকে। তথাপি কেন যে মন্দ কাজের প্রকোপ হ্রাস পাচ্ছে নাÑ এ যেন এক দুর্বোধ্য পরিস্থিতির শিকার আমরা।
কী আছে প্রতিকার!
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী? অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সর্বাঙ্গে ব্যথা মলম দেবো কোথাÑ এই প্রবাদ বাক্যের মতো। তবুও হাল ছেড়ে দেয়ার কথা মনে আনা চলবে না। অনেকেই অনেক উপদেশ দিতে পারেন। তবে বাস্তবোচিত উপায়ের কথা ভাবতে হবে।
কোনো কোনো চিন্তাবিদ মনে করেন, মানুষের সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সংস্কার হতে পারে। কেউ বলেন, পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে। পড়াশোনার মাধ্যমে মানুষ নিজের সংস্কার করতে পারে। শুধু সংস্কারের জন্য যা করা হয়, বাস্তবে তা কার্যকর হয় না। তাদের মতে, সংস্কারগুলো কার্যকর করে মানুষ। আধুনিক বিশ্ব যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। তাঁরা বলছেন, সরকার ও জনগণের মানসিক সংস্কার ব্যতিরেকে রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার সফল হবে না। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এভাবে গ্রহণ করে প্রতিদিন সংস্কারের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। একটি জনকল্যাণমুখী সংস্কার, একটি জনকল্যাণকর রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সমাজব্যবস্থা বিনির্মাণের জন্য কাজ করতে হবে। এই রাষ্ট্র ব্যবস্থাটা যারা পরিচালনা করবে, তাদের মানসিক সংস্কার হওয়া দরকার, জনগণের মানসিক সংস্কার হওয়া দরকার, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির সংস্কার হওয়া দরকার এবং এই সমাজের মানুষের, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দেরÑ যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন, তাদের সম্মিলিতভাবে সবার মানসিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলেই একটা কল্যাণমূলক মানবিক রাষ্ট্র পাবার সম্ভাবনা থাকবে। এর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো, ধর্মীয় বিধান ও মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেয়া। ইসলামের বিধানাবলী এজন্য অসংখ্য উপায় ও পথ বাতলে দিয়েছে।
এ কথা মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, ব্যক্তির নৈতিকতাবোধের উজ্জীবন ঘটলে, চিরকালীন সামাজিক মূল্যবোধসমূহ ফিরে এলে এবং ব্যক্তিগত আচরণে নমনীয়তা জায়গা করে নিতে পারলে আশা করা যায়, যেকোনো প্রকার ইতিবাচক সংস্কার সাফল্য পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
তাই বলা যায়, ব্যক্তি মানুষের সংস্কার না হলে, তার মন ও মনন পরিশীলিত না হলে, আত্মমর্যাদাবোধ বিলুপ্ত হলে, প্রকৃত অর্থেই শ্রদ্ধা ও স্নেহের প্রায় বিলুপ্ত আচরণের ঐতিহ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা না পেলে অন্য সকল প্রকার সংস্কারমূলক উদ্যোগ মাঠে মারা যাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।