জাতীয় সংসদ হোক দেশ ও জাতির আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক
১৭ মার্চ ২০২৬ ১১:০০
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
অতীতের সংসদে দেশের জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার আশ্রয়স্থল হতে পারেনি। মরহুম শেখ মুজিবের বাকশাল, শহীদ জিয়াউর রহমানের অপ্রত্যাশিত মৃত্যু, এরশাদের স্বৈরাচারী কায়দায় দীর্ঘদিন দেশে চালানো, আর স্বৈরাচার হাসিনার ১৭ বছরের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে একদলীয় বা একপেশে গৃহপালিত বিরোধীদল নিয়ে যাচ্ছেতাইভাবে দলীয়করণ, আত্মীয়করণ, ব্যাংক খালি করা, প্রশাসনে একপেশে নিয়মনীতির কারণে দেশে আইনের শাসনের কোনো বালাই ছিল না। যাকে তাকে হত্যা, গুম, আয়নাঘরে বছরের পর বছর নির্যাতন, বিনা দোষে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ফাঁসি দেয়া, বৈষম্যের পাহাড় গড়ে তোলা, দেশের মানুষের নাভিশ্বাস হয়ে উঠেছিল। ছাত্রদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন তাই হঠাৎ করেই শেখ হাসিনার স্বৈরাচারের পতনের আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। ৩৬ জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা দিশা হারিয়ে তার দাদার দেশ ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
দেশে আশার আলো দেখা দেয়। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়- দেশের সব দলের মতামতের ভিত্তিতে। আশা করা হচ্ছিল, দেশে এবার জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। এনজিও মার্কা লোকদের নিয়ে সরকার গঠন করে জনগণের চাওয়া-পাওয়া মেটাতে নজর দিতে পারেনি ড. ইউনূস সরকার। অনেক ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টাকা লুটকারীদের লুট বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো আবার চালু রাখার কাজ সীমিত আকারে হলেও লাইনে আনতে পেরেছিল।
অন্যদিকে বিএনপির মতো বড় দল বলে পরিচিতরা সরকারকে সহযোগিতা করার পরিবর্তে বাধার সৃষ্টি করছিল। স্বৈরাচারের দোসর প্রেসিডেন্ট চুপ্পুকে সরাতে তারা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে আজকে সেই চুপ্পুই দেশের জন্য কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ড. ইউনূস সরকার তাদের ওয়াদা অনুযায়ী ফেয়ার নির্বাচনের আয়োজন করলেও, দেশের মানুষ উৎসবমুখরভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও ফলের দিক থেকে রাতে ভোট গণনায় কারচুপির আশ্রয় নিয়ে জামায়াত জোটের নিশ্চিত বিজয় ছিনিয়ে নেয়। যেখানে জামায়াত মোট ২০০ আসনে জেতার কথা, সেখানে ড. ইউনূস সরকারের উপদেষ্টারা কেউ কেউ সাথে আমলাদের সহযোগিতায় নির্বাচন কমিশনের লোকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ভোট কারচুপির কাজ সহজেই করে ফেলে। জামায়াত জোটের লোকেরা সারা দিন ভোটকেন্দ্রে থাকলেও ভোটের উপস্থিতি দেখে অনেকটা আশান্বিত হয়ে রাতে ভোটকেন্দ্রে গণনায় তারা প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়। ফলে বিএনপির ঋণখেলাপি, মাস্তান, চাঁদাবাজ প্রার্থীরা অবৈধ ক্ষমতা খাটিয়ে ভোট এলোমেলো করে জামায়াত জোটের পাওয়া ভোট তাদের দিকে নিয়ে যায় এবং বিজয়ী ঘোষণা করে ২১২ সিটে তাদের ফল প্রকাশ করে। জামায়াতকে দেখানো হয় ৭৭ সিটে বিজয়ী। এ অপ্রত্যাশিত ফলের জন্য জনগণ হতাশ হয়ে পড়ে।
দীর্ঘদিন সরকারি দল ও বিরোধীদল ঠিকভাবে কাজ করতে না পেরে দেশের প্রত্যাশিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়। তাই জামায়াত জোট দুঃখে-ক্ষোভে বিমোহিত হলেও ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে অপ্রত্যাশিত ফল মেনে নিয়ে দায়িত্বশীল বিরোধীদল হিসেবে দেশের ও দশের কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা ঘোষণা করে সরকারের ভালো কাজে সহযোগিতা করবে। জনগণের ক্ষতির কারণ হয় এমন কাজে সরকারকে সংসদের ভেতরে এবং রাজপথে বিরোধিতা করবে। গত ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার নিয়োগে বিএনপির প্রস্তাব বিরোধীদল মেনে নেয়, জনগণের ভালো ফল এনে দেয়ার স্বার্থে। যদিও বিএনপি বিতর্কিত লোকদের এই পদে নিয়োগ দিয়েছে। স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ প্রকাশ্যে বিকল্প বিএনপি করতে উদ্যোগ নিলেও তারা ভুলে যায় তার কর্মকাণ্ড। বিএনপিতে অনেক ঝানু লোক থাকলেও কোন জাদুর বলে এদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ দেয়। সরকারকে মনে রাখতে হবে, কেউ দেশের বা দেশের বাইরের কোনো শক্তি তাদের ক্ষমতায় রাখতে পারবে না। যেমন স্পিকার শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখতে পারেনি। পারেনি আমাদের প্রতিবেশী ছোট দেশ মালদ্বীপের সরকারকে। মুহাম্মদ মইজ্জু ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন করেছেন যে, তিনি ক্ষমতায় এলে ভারতীয় সৈন্য সে দেশ থেকে বিদায় করে দেবেন। ঠিকই জনগণ মুহাম্মদ মইজ্জুকে নির্বাচিত করেছে এবং তিনি ক্ষমতায় এসেই ভারতীয় সৈন্য তাড়িয়ে দিয়েছেন। ভারত তাদের প্রতিবেশীদের সাথে বন্ধুত্বসুলভ আচরণ না করে প্রভুত্বসুলভ আচরণ করতে গিয়েই প্রতিবেশী সব দেশের সাথে সম্পর্ক খারাপ করে ফেলেছে। এই তো কয়েকদিন পূর্বে নেপালে বিরোধীদল বিপুল ভোটে জয়লাভ করল। তাই আমাদের সরকারকেও, বিশেষ করে তারেক রহমানকে মনে রাখতে হবে তার পিতা শহীদ জিয়াউর রহমান ও মাতা বেগম খালেদা জিয়ার কথা। তারা কিন্তু দেশের স্বার্থে কারো সাথে মাত্রাতিরিক্ত প্রভুত্ব মেনে নিয়ে দেশশাসন করেননি। তাই তো জনগণের ভালোবাসা নিয়ে দুজনই পরপারে চলে গেছেন। প্রমাণ তাদের জানাজায় লাখো লোকের উপস্থিত। আমরাও দলবলে দুই জানাজায়ই উপস্থিত ছিলাম।
বিএনপিতে ভালো লোকের অভাব নেই। দেশের প্রতি যাদের দরদ আছে, অভিজ্ঞতা আছে এমন লোকদের পদায়ন করলে এবং বিরোধীদলকে বিরোধী মনে না করে সবাইকে নিয়ে দেশ চালানোর উদ্যোগ নিলে তারেক জিয়া ভালো করবেন। ইতোমধ্যেই ৫ আগস্টের কথা সরকারের ভারতপন্থিদের ঘুরপাক খাচ্ছে। জুলাই সনদের কথাও তারা এলেমেলোভাবে অগোছালো পদক্ষেপ নেয়ার পাঁয়তারা করছে। সালাহউদ্দিনদের মনে রাখতে হবে, ছাত্র-জনতার বিপ্লব না ঘটলে তারা দেশে আসতে পারতেন না। ফখরুল সাহেব তো প্রকাশ্যে বলেছিলেন, তারা ছাত্রদের আন্দোলনের সাথে নেই। শুধু তাই না, দীর্ঘদিন দেশের সব দলের উপস্থিতিতে জুলাই সনদ তৈরি করে প্রকাশ্যে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ঘটা করে স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে সব দল জুলাই সনদ স্বাক্ষর করেছে। অথচ আজ জুলাই সনদের আলোকে বিএনপি সংসদ চালাতে গড়িমসি করছে। তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেরেব শপথ নেয়নি। আবার তাদেরই প্রস্তাবে গণভোট জাতীয় নির্বাচনের দিন একই সাথে করার। সেই ভোটে জনগণ শতকরা ৬৯ ভাগ ভোট হ্যাঁর পক্ষে দিয়েছে। এখানে কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের মতো কারচুপি করা হয়নি। তাই হ্যাঁ ভোটের ব্যাপারে জাতীয় সংসদে আলোচনার বিষয় নেই। এটা জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত। তাই টালবাহানা না করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জুলাই সনদ কার্যকর করতে হবে। এতেই জনগণের প্রত্যাশার সাথে সাথে দেশে আর কোনো স্বৈরাচার যাতে গজাতে না পারে, তার উত্তম ব্যবস্থা নেয়া। দেশের ছাত্র-জনতা অধির আগ্রহে বিএনপির ভারতপন্থিদের কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করছে এবং সজাগ আছে তাদের কোনো প্রকার দেশদ্রোহী কার্যক্রম বরদাশত করবে না। সংসদে এবং সংসদের বাইরে রাজপথে আবার সোচ্চার হবে যদি জুলাই সনদের কোনো হেরফের করা হয়। কেউ তাদের রক্ষা করতে পারবে না, যেমন পারেনি দুর্নীতির রানি শেখ হাসিনাকে রক্ষা করতে। দেশের সরকারি ও বেসরকারি, সামরিক-বেসামরিক বাহিনী দেশের জনগণের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিলে তারাও মেনে নেবে না। কারণ ছোট দেশ আমাদের। সবাইকে আমরা চিনি ও জানি। কারো বিরুদ্ধে আমরা অন্যায় আচরণ মেনে নেব না।
সরকারি ও বিরোধীদলের ভালো সম্পর্ক রেখেই দেশ চালাতে হবে। পূর্বের সরকারের মতো কোনোভাবেই আচরণ করা যাবে না। আমরা দেখেছি ইতোমধ্যে বিরোধীদল সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে দেশের স্বার্থে সহযোগিতামূলক ভূমিকা রাখার জন্য। আমরা আশা করব, আর স্বৈরাচার যাতে মাথাচাড়া না দিতে পারে, তা লক্ষ্য রেখেই দেশ চালাতে হবে।
জাতীয় সংসদের মোট আসন ৩০০। এসব এমপি যদি তাদের এলাকার জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার কথা চিন্তা করে এলাকার খোঁজখবর নিয়ে সংসদে এবং সংসদের বাইরে সরকারের সব বিভাগে যোগাযোগ করে এলাকার সব কাজকর্ম করতে পারলে দেশ ও জাতি এগিয়ে যাবে। কারো প্রতি প্রভুত্ব নয়, গোটা দুনিয়া আমরা স্বাধীনভাবে চলতে চাই। দেশের উন্নয়ন চাই। জনগণের উন্নয়ন চাই।
বাংলাদেশে গত ৫৪ বছরের যত সংসদ নির্বাচন হয়েছে, সবই প্রায় পূর্বনির্ধারিত দলের আলোকে হয়েছে। ফলে কোনো সদস্য তাদের যাথযথ ভূমিকা পালন করেনি বা করতে পারেনি। আমরা বর্তমানের সংসদকে পূর্বের মতো দেখতে চাই না। সকারি ও বেসরকারি সব সদস্যরা দেশের জন্য দশের জন্য সংসদে কথা বলবেন আবার সংসদের বাইরের যেখানে যা দরকার, তা করতে হবে। যাচাই-বাছাই করে যার যার এলাকার উন্নয়নের জন্য যদি সবাই তৎপর থাকেন, তবে দেশের সব এলাকার উন্নয়ন সম্ভব হবে।
সংসদ যেন শুধুমাত্র ব্যক্তির দোষ ও গুণ আলোচনার জন্য সময় কাটানো না হয়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের টাকায় সংসদ চলে। তাই এই টাকার মূল্যায়ন করতে হবে। কোনোভাবেই যেন খামোখা সময় নষ্ট না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। মহান আল্লাহ সময় ও সম্পদ নষ্ট না করার উল্লেখ করে বলেছেন, ‘অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই’। আমরা আমাদের সীমিত আয়ের দেশ হিসেবে সবসময়ই ব্যয়ের ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। এবারের সংসদে আমরা লক্ষ্য করছি সরকারি ও বিরোধীদলের সদস্যরা বেশিরভাগই নতুন মুখ। তাই যারা পুরনো আছেন, তারা এবং সংসদ নেতা ও বিরোধীদল নেতা ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেশের জন্য কাজ পরিচালনা করবেন। ভুল-ভ্রান্তিকে বেশি গুরুত্ব না দিয়ে বা আইনের রক্ষায় বেশি গুরুত্ব না দিয়ে জনগণের স্বার্থে জনগণের জন্য আলোচনা চালাতে পারলে আমাদের এই ছোট দেশ, জনবহুল দেশ তাই জনগণের স্বার্থকেই গুরুত্ব দিতে হবে। ৩০০ সংসদ সদস্য ভবিষ্যতে আরো ৫০ জন মহিলা সদস্য যোগ হলে তারা যদি সবাই শুধু জনগণের ভালোর চিন্তা করলে দেশ অবশ্যই ভালোর দিকে যাবে। কারো চরিত্র হননের জন্য নয়, ভালোর দিকেই আমরা দৃষ্টি আকর্ষণ করব। সাথে সাথে আপনারা যারা এলাকার প্রতিনিধিত্ব করছেন, তাদের জনগণে স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়ে তারা কাজ করেন তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আপনাদের মনে রাখতে হবে প্রত্যেককেই তাদের নিজের কাজের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। আবার কাল কিয়ামতে মহান আল্লাহর কাছেও জবাবদিহি করতে হবে।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।