পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মধ্যে পদ-পদবি নিয়ে বাড়ছে হাতাহাতি-দ্বন্দ্ব

সোনার বাংলা অনলাইন
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৩:১৬

এ ঘটনায় অন্তত ছয়জন আহত হন বলে জানা যায়। কেবল সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, দেশের বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সমাজে পদ-পদবি, নিয়োগ-সংক্রান্ত বিষয়ে দ্বন্দ্ব বেড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মধ্যে প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর শিক্ষকদের একাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাব বিস্তার ও দাবি-দাওয়া আদায়ে, অপরপক্ষ নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে তৎপর হয়ে উঠেছেন। তাদের মতে, আগামী কয়েক মাসে এ ধরনের দ্বন্দ্ব আরো বাড়তে পারে।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের সহসভাপতি মোজাম্মেল হকের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আলিমুল ইসলাম বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি করছেন। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সুযোগ না দেয়ায় শিক্ষার্থীদের স্পৃহা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষকরা বহুবার এ নিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তিনি এড়িয়ে গেছেন। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। এছাড়া ফ্যাসিবাদের দোহাই দিয়ে কয়েকজন শিক্ষকের পদোন্নতি আটকে রাখা হয়েছে। এসব অভিযোগ নিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে শিক্ষকরা ১৫ ফেব্রুয়ারি তার কক্ষে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে উপাচার্য তাদের কথা না শুনে উল্টো নিজের পক্ষের লোকজন দিয়ে হামলা চালান।

ঘটনার বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আলিমুল ইসলাম দাবি করেন, শিক্ষকরা তার কক্ষে গিয়েছিলেন মূলত ‘মব’ তৈরি করে প্রশাসনে পরিবর্তন আনতে। বর্তমান প্রশাসন নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছে বলেই একটি স্বার্থান্বেষী মহল ক্ষিপ্ত উল্লেখ করে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এখানে (সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) দুটি গ্রুপ আছে সাদা দলের। যে গ্রুপটি এসেছিল তারা সংখ্যায় কম। তারা কেবল আমাকে অপদস্থই করেনি, আমার সামনেই সিনিয়র শিক্ষকদের গায়ে হাত তুলেছে এবং প্রক্টরকেও আক্রমণ করেছে। এমনকি পরিস্থিতি রেকর্ড করতে গেলে আমার ফোনটি কেড়ে নেয়। তাদের আক্রমণে আমিসহ তিনজন শিক্ষক আহত হয়েছেন। ঘটনার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সবকিছু অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া প্রমাণ করে যে তারা প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিল।’

সিলেটের ঘটনার এক সপ্তাহ পরই গত ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ্যে হাতাহাতিতে জড়ান পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) দুই শিক্ষক। অ্যানিমেল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের জেনারেল অ্যানিমেল সায়েন্স অ্যান্ড অ্যানিমেল নিউট্রিশন বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ শাহবুবুল আলম ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর প্রফেসর ড. আলী আজগরের মধ্যে এ ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, কম্বাইন্ড ডিগ্রি-সংক্রান্ত আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে অ্যানিমেল হাজবেন্ড্রি (এএইচ) ডিসিপ্লিনের শিক্ষকরা অনুষদের লেভেল-৪ সেমিস্টার-১ ও লেভেল-১ সেমিস্টার-২-এর শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা ডিন ভবন ঘেরাও করেন এবং পরীক্ষা নেয়ার জন্য ডিন বরাবর লিখিত আবেদন দেন। পরবর্তী সময়ে অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. খোন্দকার জাহাঙ্গীর আলমসহ শিক্ষার্থীরা এবং সহকারী প্রক্টর প্রফেসর ড. আলী আজগর ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। একপর্যায়ে প্রফেসর মোহাম্মদ শাহবুবুল আলম ও প্রফেসর ড. আলী আজগরের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। পরে বিষয়টি হাতাহাতিতে রূপ নেয়।

দুই শিক্ষকই অবশ্য জানান, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালে প্রফেসর মোহাম্মদ শাহবুবুল আলমের ফোনকল সহকারী প্রক্টর প্রফেসর ড. আলী আজগর রিসিভ না করায় তাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি থেকে কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়। বিষয়টি পরবর্তী সময়ে নিজেরা সমাধান করে নিয়েছেন।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) উপাচার্য মুহাম্মদ ইসমাইলের বিরুদ্ধেও গত এক সপ্তাহ ধরে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সরব হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির সাদা দলের শিক্ষকরা। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, বর্তমান উপাচার্যের মেয়াদকালে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়ম করা হয়েছে। আর এসব নিয়োগে জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রাধান্য দেয়ারও অভিযোগ তোলা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করে সাদা দলের সভাপতি অধ্যাপক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম সাতদিনের মধ্যে উপাচার্য, সহউপাচার্য ও ট্রেজারারের অপসারণের দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, নিয়মবহির্ভূতভাবে সহযোগী অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে একমাত্র প্রার্থী নিয়ে নিয়োগ বোর্ড বসানো হয়। তড়িৎ প্রকৌশল (ইইই) বিভাগে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হওয়া এক নারী প্রার্থীকে বাদ দিয়ে নিয়োগ দেয়া হয়েছে অন্য একজনকে।

সাদা দলের এ সংবাদ সম্মেলনের একদিন পরই পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেন নোবিপ্রবি উপাচার্য মুহাম্মদ ইসমাইল। তিনি বলেন, ‘আমরা মেধা ও যোগ্যতাকে প্রায়োরিটি দিয়ে নিয়োগ দিয়েছি। এর মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা আমি আবার বলছি আমরা কোনো জাত, গোষ্ঠী, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র—কোনোটাকেই আমরা বিবেচনায় নিইনি।’

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাম্প্রতিক শিক্ষক দ্বন্দ্বের ঘটনাকে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি সংস্কৃতির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এসএম হাফিজুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান এ ধরনের দ্বন্দ্বকে একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা প্রয়োজন। বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি সংস্কৃতি থেকে হঠাৎ করেই পুরোপুরি শুদ্ধ ও সুশাসিত ব্যবস্থায় চলে যাওয়া সম্ভব নয়। এটি সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।’

অধ্যাপক এসএম হাফিজুর রহমানের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় উপাচার্য নিয়োগের প্রক্রিয়াই অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তবে যদি সুশৃঙ্খল ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উপাচার্য নিয়োগ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে পরবর্তী সময়ে তাকে অপসারণ বা বিভিন্ন ধরনের চাপ প্রয়োগ করা কঠিন হবে। ফলে সমস্যাটি কোনো একক ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; বরং পুরো ব্যবস্থার সঙ্গেই এটি গভীরভাবে সম্পর্কিত।

এখনই হয়তো কাঙ্ক্ষিত মাত্রার পরিবর্তন সম্ভব নয় উল্লেখ করে এ শিক্ষাবিদ বলেন, ‘(২০২৪ সালের) ৫ আগস্টের পর একটি বিশেষ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অনেক নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। বিষয়টি অনেকটা “আমেরিকান কনসেপ্ট”-এর মতো, যেখানে সরকার নিজের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য পছন্দ অনুযায়ী লোকজনকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসাতে চায়। এ বাস্তবতাও বর্তমানে আমাদের ব্যবস্থার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

শিক্ষকদের প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব বা হাতাহাতির মতো ঘটনা সরাসরি শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে জানিয়ে অধ্যাপক এসএম হাফিজুর রহমান বলেন, ‘কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান যখন অস্থির অবস্থায় থাকেন, তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। শিক্ষা কার্যক্রম শুধু ক্লাসরুমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ক্লাসের বাইরে পরীক্ষা, একাডেমিক ক্যালেন্ডার, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং ক্যাম্পাসের সামগ্রিক পরিবেশ—সবকিছুতেই এর প্রভাব পড়ে। অতীতেও দেখা গেছে, এ ধরনের অস্থিরতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ হয়ে গেছে, যা সরাসরি শিক্ষার্থীদের ক্ষতির কারণ হয়েছে।’ শিক্ষকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকলেও তা কখনই প্রকাশ্য হাতাহাতির পর্যায়ে পৌঁছানো কাম্য নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও মূল্যবোধ তৈরির প্রধান কেন্দ্র। সেখানে যদি প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব, বিশৃঙ্খলা বা উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে তা সরাসরি শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মানসিক নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখেই যে কোনো মতপার্থক্য সমাধান করা প্রয়োজন।

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষকদের প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব, উত্তেজনা ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এসএমএ ফায়েজ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আমরাও অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি। এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তবে আশা করছি পরিস্থিতি শিগগিরই স্বাভাবিক হবে এবং সরকার কঠোর নির্দেশনা প্রদান করবে, যাতে কেউ এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর সুযোগ না পায়।’ উৎস: বণিকবার্তা

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হাতাহাতি