২০২৬ সংসদ নির্বাচনোত্তর ভাবনা
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:০৭
॥ মুহাম্মদ ওয়াছিয়ার রহমান ॥
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ সাধারণ নির্বাচন গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সম্পন্ন হয়েছে। নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে অনেক ঢাকঢোল পেটানো হলো। কিন্তু সারা রাত রামায়ণ পড়ে, সকাল বেলা প্রশ্ন হলো- সীতা কার বাপ? প্রফেসর ইউনূস সরকার ও নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত দুর্বল মার্কা। উপদেষ্টারা সেফ এক্সিট নিয়ে মাথাব্যথায় জর্জরিত। প্রফেসর ইউনূস কী করবে, তিনি অর্থনীতির শিক্ষক, তার চেয়ারটি ছিল রাজনৈতিক। বড় রাজনৈতিক দলগুলো তাকে সহায়তা না করলে তিনি অসহায় থাকবেন- এটাই স্বাভাবিক। দুই-চার উপদেষ্টার ভূমিকা তাকে আহত করেছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ঠিকমতো ফাংশন করেনি। করলে ইউনূস সরকার আরো অনেক কিছু উপহার দিতে পারতো। কিন্তু বিদায় বেলা তিনি ঝামেলায় জড়াতে চাননি।
নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনের দিনগত রাত ৯টার পর থেকে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের চেহারা প্রকাশ করতে থাকে। একটি জোটের এজেন্টদের ভয়ভীতি দেখানো, কোনো কোনো জোটের ভোট ৮০টির প্যাকেট, আর কোনো কোনো জোটের ১২০টির প্যাকেট করার অভিযোগ, এজেন্ট নিযুক্ত করেনি এমন ব্যক্তিকে এজেন্ট দেখানো, এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে না দেয়া অথবা কেন্দ্র থেকে গণনার আগে বের করে দেয়া। এক বুথে এক প্রার্থীর একাধিক এজেন্ট থাকা, তা নিয়ে প্রশ্ন করলে নির্বাচনী কর্মকর্তা ও এজেন্টদের পৃথক বক্তব্য প্রদান, রেজাল্ট শিটের কার্বন কপি ও এজেন্টের স্বাক্ষর ছাড়া রেজাল্ট শিট তৈরি, রেজাল্ট শিটে ঘষা-মাজা, অভার রাইটিং ও কাটাকাটিসহ নানা অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়। একাধিক সিলের ক্ষেত্রে একেক প্রার্থীর জন্য একেক রকম ফয়সালা। ভোটগণনাকালে কোনো কোনো প্রার্থীর স্ত্রী ও ভাই প্রভাব বিস্তার করে ভোট অনুকূলে গণনা এবং ফল আদায় করা।
নির্বাচন কমিশনের কর্তারা ভুলে গেছে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার নূরুল হুদা ও কাজী হাবিবুল আউয়াল এখনো কারাগারে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে নির্বাচনের দায়িত্ব পালনকারী রিটার্নিং অফিসারগণ কর্মজীবনের বর্তমান নানা বিড়ম্বনায় নিমজ্জিত। ২০২৪ সালের বিপ্লবে ২ হাজারের কাছে জীবনপাত ও ৩০ হাজারের বেশি আহত অথবা পঙ্গু হাওয়া কি বৃথা হতে যাচ্ছে? যে কারণে হাসিনা সরকার জয় বাংলা হলো, সে পথেই হাঁটছে বাংলাদেশ। এত রক্ত ও জীবনপাত সবই বৃথা হবে? কেউ কেউ বলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং তো আগেও হয়েছে, এখনো হলো, তাহলে কেন এই রক্তপাত আর জীবনপাত? বিএনপির সন্ত্রাস দমন, দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন কোন পথে? নির্বাচনে যা হলো, তা কি দুর্নীতি দমনের নমুনা, নির্বাচনের ৩ দিনের মধ্যে ৪টি রাজনৈতিক খুন কি সন্ত্রাস দমনের নমুনা? নির্বাচনী ত্রুটির অভিযোগ এখনো আমলে না নেয়া কি আইনের শাসনের নমুনা? নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার আগেই মুখ্য সচিবের অপসারণ, আইজিপিকে নিয়ে অপসারণ প্রোপাগান্ডা ও বিভিন্ন ভিসিকে তাড়ানোর পাঁয়তারা কি আইনের শাসনের উদাহরণ? আওয়ামী লীগ সরকার মেজর জেনারেল (অব.) আমান আযমীকে অপসারণ কি একই নমুনায় করে। ব্যারিস্টার আরমান আয়নাঘরের আটক কোন আইনে? যার খেসারত আওয়ামী লীগকে দিতে হয়েছে এবং আরো দিতে হবে।
নির্বাচন কমিশন বুঝতে চাইল না, নানাবিধ অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার পরও কেন সেগুলো তদন্ত না করে বা পুনর্গণনা না করে তড়িঘড়ি করে গেজেট প্রকাশ যে কত বড় অন্যায্য কাজ, তা বুঝতে তাদের আরো অপেক্ষা করতে হবে। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না, সময় দেয় সংশোধনের। তবে এত কিছুর পরও জামায়াত-বিএনপি ইতিবাচক রাজনীতির ধারা সূচনা করেছে। সূচনা যেমন শেষটাও যেন তেমনই হয়।
২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই বিপ্লবের পর মানুষের মধ্যে যে আশা সঞ্চার করেছিল, তা আজ সংকুচিত হতে চলেছে। এ বিপ্লব ব্যর্থ হলে আবারও একটা বিপ্লবের ডাক আসবে। তখন রাজনৈতিক দলগুলোকে এর চড়া মাশুল দিতে হবে। যেমন আওয়ামী লীগ এখন দিচ্ছে। নির্বাচন কমিশন ও সরকার যতই সত্য চাপা দিতে থাক, একদিন তা প্রকাশ হবে। তখন সকলে চড়া মূল্য আদায় করে নেবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের নামে অসত্যের অপলাপ চাপা থাকবে না। নির্বাচন কমিশন যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করতে পারে, তবে কেন তারা এই গুরুদায়িত্ব নিল? ইতিহাসের সেরা নির্বাচনের নামে কেন এ প্রহসন? ইতিহাসের কাছে এই প্রশ্ন রয়ে গেল।