আত্মপরিশুদ্ধ ও চরিত্র গঠনে রোজা


২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪৯

॥ মাসুম সায়ীদ ॥
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হলো রোজা। হাদিসে কুদসিতে এসেছে রোজা আল্লাহর জন্য তাই এর প্রতিদান তিনি নিজেই দেবেন। রোজাদারগণ জান্নাতের ‘রাইয়্যান’ নামক এক বিশেষ দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবেন। রোজার আরও অনেক ফজিলতের কথা হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে। এর কারণ রোজার উদ্দেশ্য ও বিশেষত্ব।
রোজার উদ্দেশ্য: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন করা হয়েছিল তোমাদের পূর্বসূরিদের ওপর, যাতে তোমরা আল্লাহর ওপর তাকওয়া অবলম্বন করদে পারো।’- সূরা বাকারা : ১৮৩।
এখানে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়- এক রোজা শুধু শেষ নবীর অনুসারী হিসেবে মুসলমানদের ওপরই নয়, সকল নবীর অনুসারীদের জন্য রোজা পালনের নির্দেশ ছিল। তার প্রমাণ বর্তমানে প্রচলিত প্রতিটি ধর্মের অনুসারীরা কোনো না কোনো নিয়মে এই বিশেষ ইবাদতটি করে থাকে। আর দ্বিতীয় বিষয়টি হলো এর উদ্দেশ্য- রোজা পালনের মাধ্যমে তাকওয়া বা আল্লাহ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি। অর্থাৎ এটা স্মরণ রাখা যে, মানুষের প্রতিপালক আল্লাহ। মানুষের বেঁচে থাকার যাবতীয় উপকরণের ব্যবস্থা তিনিই করেন এবং তিনিই মৃত্যুর পর প্রতিটি কর্মের হিসাব নেবেন।
এখন প্রশ্ন হলো তাকওয়া কী?
এ প্রসঙ্গে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) আর উবাই ইবনে কাব (রা.) এর মধ্যকার কথোপকথন উল্লেখযোগ্য। একবার হজরত ওমর (রা.) হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন তাকওয়া কী? উত্তরে উবাই (রা.) বললেন, হে ওমর, আপনি কি কখনো পাহাড়ে কাঁটা বিছানো পথে হেঁটেছেন? ওমর (রা) বললেন-হ্যাঁ হেঁটেছি। উবাহ (রা) আবার জিজ্ঞেস করলেন ওই অবস্থায় আপনি কী করেছেন? ওমর (রা.) বললেন, আমি খুব সতর্কতার সাথে কাপড় গুছিয়ে, সাবধানে পা ফেলে হেঁটেছিÑ যাতে কাঁটা না ফোটে। উবাই (রা.) এবার বললেন, ‘এটাই তাকওয়া।’ যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদেরকে বলা হয় মুত্তাকি।
মুত্তাকিদের পরিচয় সম্পর্কে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন, “যারা সত্যের বাণীবাহক আর যারা সত্যের অনুসারী তারাই আল্লাহ-সচেতন।”- সূরা যুমার : ৩৩।
এখানে আরও একটা প্রশ্ন এসে যায়- সত্য কী? আল্লাহ পাক বলেন, “হে নবী! আমি তোমার ওপর সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্যে সত্যপথ প্রদর্শনকারী কিতাব নাজিল করেছি। এখন যে এই সত্যপথ বেছে নেবে এবং সত্যপথে চলবে, সে তার নিজেরই কল্যাণ করবে। আর যে ভ্রান্ত পথ বেছে নেবে এবং বিপথে চলবে, সে তার নিজেরই ধ্বংস ডেকে আনবে। তুমি তো তাদের কর্মনিয়ন্ত্রক নও।”- সূরা যুমার : ৪১।
আল্লাহ প্রদত্ত কিতাব আল কুরআনের বাণীই হচ্ছে শাশ্বত সত্য। আর কুরআনে বর্ণিত পথই হচ্ছে সত্যের পথ ও মানবজাতির পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। “আজ তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মবিধানকে পূর্ণাঙ্গ করলাম। তোমাদের ওপর আমার নেয়ামতকে পরিপূর্ণ করে দিলাম। ইসলাম অর্থাৎ আল্লাহতে পরিপূর্ণ সমর্পণকেই তোমাদের ধর্ম হিসেবে মনোনীত করলাম।” [ সূরা মায়েদা : ৩]। যারা এই বাণী ধারণ করবে ও পালন করবে আল কুরআনের ভাষ্যমতে তারই প্রকৃত মুত্তাকি বা তাকওয়াবান।
মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য ও পরিণতি সম্পর্কে উল্লেখ আছে সূরা বাকারার প্রথম সাতটি আয়াতে। সেখানে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আলিফ-লাম-মীম। ২. এ সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই কিতাব আল্লাহ-সচেতনদের পথপ্রদর্শক। ৩. আল্লাহ-সচেতনরা গায়েবে (মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞানে বোধগম্য না হওয়া সত্ত্বেও অদৃশ্য বাস্তবতায়) বিশ্বাস করে, নামাজ কায়েম করে, প্রাপ্ত রিজিক থেকে অন্যের জন্যে ব্যয় করে (অর্থাৎ নিয়মিত দান করে)। ৪-৫. আর (হে নবী!) তোমার ও তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি যা নাজিল হয়েছে, তা তারা বিশ্বাস করে। সেইসাথে বিশ্বাস করে আখিরাতে (প্রতিটি কাজের জবাবদিহি)। তারাই তাদের প্রতিপালকের নির্দেশিত সঠিক পথের অনুসারী এবং তারাই সফলকাম।”
মুত্তাকি বা আল্লাহ সচেতন হওয়ার ব্যাপারে রোজার ভূমিকা ব্যাপক ও জীবনব্যাপী।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক মানবীয় স্বভাব সম্পর্কে বলেন, “তাকওয়া মানবীয় প্রকৃতি ও সত্তার দিকে (মন ও প্রবৃত্তির দিকে), যাকে প্রয়োজনীয় সবকিছু দিয়ে সুবিন্যস্ত করা হয়েছে। তারপর তাকে ভালো ও মন্দ কাজের (পাপ-পুণ্যের) সমস্ত জ্ঞান দান করা হয়েছে।”- [সূরা শামস : ৭-৮]।
বিশ্ব প্রকৃতি যেমন বৈপ্যরিত্য নিয়ে সৃষ্টি তেমনি মানবসত্তার মধ্যেও রয়েছে ভালো ও মন্দের সমাহার। মন্দ স্বভাব প্রবণতাকে ইসলামী পরিভাষায় বলা হয় নফসে আম্মার কা কুপ্রবৃত্তি তাড়িত আত্মা। প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিকেরা যাকে আখ্যায়িত করেছেন ষড়রিপু বলে। ষড় মানে ছয় আর রিপু হচ্ছে প্রবৃত্তি। যেমন : কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ (উন্মাদনা), মাৎসর্য বা হিংসা। ষড়রিপুকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তারা উদ্ভাবন করেছিলেন জটিল কঠিন ও দীর্ঘ সাধনার পথ, যা সাধারণ বা সংসারী মানুষের জন্য ছিল অসাধ্য ব্যাপার। কিন্তু রোজা পালনের মাধ্যমে খুব সহজেই সম্ভব এই কুপ্রবৃত্তির সংযম সাধন।
১. প্রথমে আসা যাক কাম বা যৌনতার কথা। শুধু যৌনতা নয় অন্যান্য জৌবিক চাহিদা; যেমন খাদ্য ও পানীয় গ্রহণের মতো ব্যাপারগুলোও রোজার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার অভ্যাস ঘটে। রোজা রেখে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এসব থেকে বিরত থাকতে হয়। এর ফলে এই প্রবণতাকে নিজের বশে আনার অভ্যাস গঠন করা সহজ হয়।
২. ক্রোধ: রোজা রাখা অবস্থায় মনে একটা পবিত্র ভাব বিরাজ করে। তাছাড়া রোজা রাখা অবস্থায় ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত না হওয়ার ব্যাপারে হাদিস শরিফে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। কেউ যেচে ঝগড়ায় লিপ্ত হতে চাইলে তার সাথে ঝগড়া না করে আমি রোজাদার বলে নিজেকে গুটিয়ে নেয়ার উপদেশ দিয়েছেন রাসূল (সা.)। পুরো রমজান মাস জুড়ে কেউ এই অভ্যাস ধরে রাখলে ক্রোধ নিয়ন্ত্রণের স্বভাব গড়ে উঠবে।
৩. লোভ: মানুষের মধ্যে নানা ধরনের লোভ কাজ করে। লোভের সূত্রপাত ঘটে ভোগলিপ্সা আর দৃষ্টির অসংযম থেকে। রোজা মানুষকে সব ব্যাপারেই সংযমী হতে শেখায়। শুধু খাওয়া পড়া আর যৌন সম্পর্ক স্থাপন থেকেই বিরত থাকা নয়, দৃষ্টিকেও হেফাজত করার তাগিদ রয়েছে। রোজা রেখে পর্দা লঙ্ঘন করলে, অশ্লীল ছবি-সিনেমা বা গান শুনলে রোজা নষ্ট বা হালকা হয়ে যায়। রোজাকে পূর্ণতা দেয়ার জন্য রোজাদারের চেষ্টা থাকে এইসব থেকে নিজেকে বিরত রাখার। লোভ মানে বেশি বেশি পাওয়ার প্রবণতা। দানের মাধ্যমে তা কমে আসে। রমজান মাসে বেশি বেশি দান-সাদকা ও যাকাত আদায়ের ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। এ সময়ে এক টাকার দান অন্য সময়ের সত্তর টাকার সমান। রোজা রাখতে গিয়ে সম্পদশালী মানুষেরা অনাহারী মানুষের কষ্ট উপলব্ধি করে তাদের দানের হাত প্রসারিত করে। আর যাকাত, দান-সাদকা যেমন সম্পদকে পবিত্র করে, বরকতময় করে, তেমনি মানুষের মধ্যে লোভের প্রবণতা কমায়।
৪. মোহ: মোহ মানে অবিদ্যা বা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন থাকা। মানুষের অজ্ঞতা কুসংস্কার দূর করে সত্যের পথ দেখানোর জন্য রমজান মাসেই নাজিল হয়েছে আল কুরআন। তাই ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই রমজান মাসে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কুরআন চর্চা করা হয়ে থাকে। আল কুরআন হচ্ছে গোটা মানব জাতির জন্য হেদায়েত, সত্য পথের নির্দেশ আর পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। আল্লাহ বলেন, “আজ তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মবিধানকে পূর্ণাঙ্গ করলাম। তোমাদের ওপর আমার নেয়ামতকে পরিপূর্ণ করে দিলাম। ইসলাম অর্থাৎ আল্লাহতে পরিপূর্ণ সমর্পণকেই তোমাদের ধর্ম হিসেবে মনোনীত করলাম।” [সূরা মায়েদা : ৩]।
সুতরাং কুরআন চর্চার মধ্য দিয়ে মোহ বা অবিদ্যার অমানিশা থেকে রক্ষা পাওয়া যায় সহজেই। ব্যক্তিগতভাবে অধ্যয়ন ছাড়াও কিয়ামুল লাইল ও তারাবিহ নামাযের মধ্য দিয়েও সৃষ্টি হয় কুরআন চর্চার সুযোগ।
এরপর বাকি থাকে মদ বা উন্মাদনা আর মাৎসর্য বা হিংসা। এ দুটি প্রবণতাই জন্ম নেয় অবিদ্যা, অজ্ঞতা এবং কুসংস্কার থেকে। রমজান মাসের সিয়ম সাধনা ও কুরআনের সংস্পর্শে আসা এবং রোজা সম্পর্কিত মসজিদের খুতবা ও আলোচনা শোনার ফলে অজ্ঞতা দূর হয়। মানুষের জীবন সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করার সুযোগ ঘটে। তারাবির নামাযসহ ওয়াক্তিয়া নামাজেও মুসল্লিদের সমাবেশ ঘটে বেশি। ফলে পারস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পায়। যার ফলে অজ্ঞতা যেমন দূর হয় তেমনি সামজিক সম্পর্কও বৃদ্ধি পায়, যা অবিদ্যা আর হিংসা কমিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নেতিবাচক এসব বিষয় দূর করার সাথে সাথে রোজা সমাজ ও ব্যক্তি মানসে ইতিবাচক গুণাবলির বিকাশ ঘটায়। যেমন:
ধৈর্য: পৃথিবীতে মানুষের জীবন মানেই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। আল্লাহ পাক বলেন, “নিশ্চয়ই আমি মানুষকে কষ্ট ও পরিশ্রমনির্ভর করে সৃষ্টি করেছি।” [সূরা বালাদ : ৪]। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষকে করতে হয় না বৈরিতার সাথে সংগ্রাম। শিখে নিতে হয় জীবন যাপনের মৌলিক দক্ষতা। এর সকল কাজই কষ্ট ও শ্রমসাধ্য ব্যাপার। তাছাড়া বান্দাকে পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকেও ক্ষুধা-তৃষ্ণা, দুঃখ-কষ্ট জীবন ও সম্পদের ওপর আসে ক্ষতি। ঝঞ্ঝামুখর এই জীবন-সাগর পাড়ি দিতে দরকার হয় ধৈর্যের। রমজান মাসে রোজার দীর্ঘ অনাহার আর প্রবৃত্তির সংযমের চেষ্টায় মানুষ ধৈর্যশীল হয়ে ওঠে। আর ধৈর্য্যশীল মানুষ পায় আল্লাহর সান্নিধ্য। আল্লাহপাক বলেন, “হে বিশ্বাসীগণ! ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে তোমরা সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথেই থাকেন। (হে বিশ্বাসীগণ!) যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তাদের মৃত বলো না। প্রকৃতপক্ষে তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা বোঝো না। নিশ্চয়ই আমি তোমাদের অনেককে ভয়, ক্ষুধা, জানমাল ও শ্রমের ফল বিনষ্ট করে অর্থাৎ বিপদ-আপদ দিয়ে পরীক্ষা করব। তবে এ বিপদের মধ্যে যারা ধৈর্যধারণ করে তাদের সুসংবাদ দাও। ধৈর্যশীলরা বিপদে পড়লে বলে, ‘আমরা আল্লাহর। তাঁর কাছ থেকে এসেছি। তাঁর কাছেই ফিরে যাব।’ এদের ওপর তাদের প্রতিপালকের বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমত বর্ষিত হয়। বস্তুত এরাই সৎপথে পরিচালিত। [সূরা বাকারা : ১৫৩-১৫৭]।
পরিশ্রমপ্রিয়তা: রোজার মাসে সাহরি খেতে উঠতে হয় ভোর রাতে। সাহরি শেষ করে ফজরের নামায। সারা দিনের ফরজ নামাজের সাথে সাথে উৎসাহিত করা হয়েছে বেশি বেশি নফল নামাযের। ইফতারের পরই মাগরিবের নামায। সারাদিনের ক্ষুধা-তৃষ্ণা মেটানোর পর শরীরে একটু ক্লান্তি বা শিথিলতা আসা স্বাভাবিক। কিন্তু খানিক পরেই এশার নামায সাথে লম্বা সময় নিয়ে তারাবি। এরপর মধ্য রাতে কিয়ামুল লাইল বা রাতের ইবাদত আর ভোর রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ। মোট কথা রাতের দীর্ঘ একটা সময় কাটে ইবাদতে। ফলে আরামপ্রিয়তার পরিবর্তে মানুষ হয়ে ওঠে পরিশ্রমী।
ঐকান্তিকতা বা একাগ্রতা: একাগ্রতা মানে হচ্ছে একমুখী হয়ে বা অন্য দিকে মন না দিয়ে আন্তরিকতার সাথে কিছু করা। রমজান মাসের রোজা ও এর সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য কাজ মানুষের মনে একাগ্রতা এনে দেয়। মানুষ হয়ে উঠে মানসিকভাবে শক্তিশালী।
নিয়তের পরিশুদ্ধতা: নামায, জাকাত, হজ দান-সাদকা ইত্যাদি ইবাদতের মধ্যে একটা প্রকাশমান্যতা থাকে। যার ফলে অনেক সময় নিজের অজান্তেই মনের মধ্যে রিয়া বা প্রদর্শন-ইচ্ছার অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে। নামাযে অনেক সময় অন্যমনষ্কতা এসে যায়। লোকদেখানো ব্যাপারও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু রোজা রেখে সারাটা দিন মানুষ পানাহার, যৌনকর্ম ইত্যাদি থেকে নিজেকে স্বেচ্ছায় দূরে রাখে। ঘরের ভিতর কিংবা পর্দার আড়ালে লুকিয়ে একান্তে এসব করলেও তো দেখার কেউ নেই। কিন্তু রোজা রেখে কেউ তা করে না। করে না এ কারণেই তার চেতনায় কাজ করে- লোকে না দেখলেও সর্বজ্ঞ-সর্বদ্রষ্টা আল্লাহ পাকের কাছে তা অজানা থাকবে না। রোজা কবুল হবে না। তাই সারা দিনের অনাহার-তৃষ্ণার কষ্ট তাকে টলাতে পারে না। এভাবেই গড়ে ওঠে আত্মিক পরিশুদ্ধি। আর আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্ব সচেতনভাবে স্মরণে রাখার নামই তাকওয়া।
এ কারণেই সম্ভবত- প্রকৃত সত্য আল্লাহ পাকই ভালো জানেন- আল্লাহ পাক ঘোষণা দিয়েছে, “রোজা আমার জন্য আর আমিই এর প্রতিদান দেব।” কুরআন নাযিলের জন্য আল্লাহ বেছে নিয়েছেন রমজান মাস। শুধু কুরআন কেন- পৃথিবীর সকল আসমানি কিতাবই নাযিল হয়েছে রমজান মাসে। মুসা (আ.) সহিফা পেয়েছিলেন রোযা রাখা অবস্থায়। রোযার মাসে মৃত ব্যক্তিদের কবরের আজাব স্থগিত রাখা হয়। খুলে রাখা হয় বেহেস্তের দরজা। শয়তানকে করা হয় শৃঙ্খলবন্দী। আর জীবিতদের জন্য রাখা হয়েছে তওবা কবুল আর গুনাহ মাফের দরজা উন্মুক্ত।
রোজার মাসের এই যে সংযম, এই যে সাধনা, এই যে আল্লাহ তায়ালাকে সচেতনভাবে স্মরণে রাখা এটা শুধুই রমজান মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা নয়। বরং এই অভ্যাস ও সাধনা বছরের বাকি মাসগুলোয়ও ধরে রাখার চেষ্টা চালাতে হবে। এভাবে বছরের পর বছর সাধানার ফলে মানুষের আত্মা, স্বভার-চরিত্র, কর্ম পরিশুদ্ধ হবে। এই পরিশুদ্ধ মানুষই পবিত্র কুরআনের ভাষায় মুত্তাকি। যারা কুরআনের সত্যকে ধারণ করবে, পালন করবে এবং সৎ কাজ করবে তাদের পুরস্কার হবে জান্নাত। আর এটাই মানুষের চূড়ান্ত সফলতা।
“আর যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে তাদের জন্যে রয়েছে জান্নাত, যার পাদদেশে থাকবে প্রবহমান ঝর্ণাধারা। আর আসল সাফল্য এটাই। [সূরা বুরুজ : ১১]।
আল্লাহপাক আমাদের রমজান মাসের রোজা পালনের মাধ্যমে জীবনের চূড়ান্ত সফলতা অর্জনের তৌফিক দান করুন।