দেশে দেশে রমাদানের বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩১
॥ মুহাম্মদ আল-হেলাল॥
‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছে- যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।’ (সূরা বাকারা : ১৮৩)।
মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার এ ঘোষণায় উজ্জীবিত হয়ে বিশ্বব্যাপী মুসলিমরা সিয়াম সাধনা করেন। সিয়াম সাধনা করতে মুসলিমদের রাতের শেষ ভাগে সাহরি খাওয়া, সংযমী জীবনযাপন করা, সূর্যাস্তে সবার সাথে ইফতার করা, তারাবি পড়া ইত্যাদি যেন এক অনন্য রমাদান সংস্কৃতি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা রমাদান সংস্কৃতি লক্ষণীয়।
মিশর, জর্ডান ও মরক্কো : মিশর ও জর্ডানে সাহরির আগে এলাকাভিত্তিক কিছু মানুষ প্রতিবেশীদের ঘুম থেকে ওঠানোর জন্য ডাকেন, যাদের বলা হয় মিসাহারাতি। মিসাহারাতির কাজ হচ্ছে আশেপাশের রাস্তায় ঘুরে ঘুরে মানুষকে জাগিয়ে তোলা।
এ ধরনের লোকদের মরক্কোয় ডাকা হয় ‘নাফারস’ নামে। এসময় তারা ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘গান্দোরা’, টুপি এবং একজোড়া চপ্পল পরে প্রার্থনার সুরে ধীর গতিতে হাঁটতে থাকে। সাধারণত শহরের লোকেরাই ‘নাফারস’ হিসেবে কয়েকজনকে নির্বাচন করেন। রমাদানের শেষ রাতে মরক্কোর এই দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহ্য বজায় রাখার জন্য এই ব্যক্তিদের সম্মানী দেওয়া হয়।
ধারণা করা হয় মিশরে রমাদান এলে ফানুস ওড়ানো ঐতিহ্যের উৎপত্তি ফাতেমীয় সাম্রাজ্য থেকে শুরু হয়েছিল, যখন খেলাফত আল-মুই লি-দিন আল্লাহ কায়রোতে আসার সময় তাকে রঙিন লণ্ঠন দিয়ে স্বাগত জানানো হয়। মিশরে রমাদানের ঐতিহ্যের অংশ হিসাবে রাস্তা, বাড়ি এবং পাড়া এই লণ্ঠন দিয়ে আলোকিত করা হয়। স্বতন্ত্র নকশা এবং বিচিত্র কারুকার্যের জন্য পরিচিত লণ্ঠন বৈশ্বিকভাবে মিশরীয় রমজানের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ইরান : ভূ-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান। দেশটিতে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হয় মাহে রমাদান। রমাদান উপলক্ষে ইরানের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। তবে ইরানের ফকিহদের মতে, কোনো ব্যক্তি রামাদানে মাত্র ১৭ কিলোমিটার ভ্রমণ করলেই সে মুসাফির হবে। আর মুসাফিরদের জন্য রোযা রাখা তাদের মতে হারাম। এদিকে অধিকাংশ ইরানিই মাসব্যাপী ইতিকাফ করে থাকেন। তারা সারা দিন অফিস করে মসজিদে রাতযাপন করাকেই ইতিকাফ হিসেবে গণ্য করেন। রাতে মসজিদ কর্তৃপক্ষই ইতিকাফকারীদের খাবার সরবরাহ করেন।
কাতার: প্রতি বছর রমাদান মাসের ১৪ তারিখ কাতারে শিশুদের নিয়ে পালন করা হয় ভিন্নধর্মী আয়োজন গারাংগাও। এই দিন শিশুরা কাতারের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে মাগরিবের নামাজের পর ব্যাগ নিয়ে গারাংগাও গান গায় এবং বাড়ির আশপাশে ঘুরে বেড়ায়। এই শিশুদের মিষ্টি ও চকলেট দিয়ে তাদের আনন্দের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়। মূলত শিশুদের রোজা রাখার প্রশংসা করতে ও তাদের উৎসাহী করতে এই আয়োজন করা হয়ে থাকে।
তুরস্ক : রমাদানজুড়ে বড় বড় মসজিদের পাশে বইমেলা এবং কুরআন প্রতিযোগিতা তুর্কিদের রমাদান সংস্কৃতির অংশ। রমাদান মাসে অফিস-আদালত ঠিক রেখেই তারা ইফতারের আগে ঘরে ফেরার চেষ্টা করেন। সাহরির সময় হলেই অটোম্যানদের মতো তুর্কিরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে ঢোল নিয়ে শহরজুড়ে ঘুরে ঘুরে বাজিয়ে, নাশিদ পরিবেশন করে মানুষজনকে জাগিয়ে তোলেন। এর বিনিময়ে বখশিশ পান তারা। আবার কামানের গোলার আওয়াজ শোনার মাধ্যমে সাহরি ও ইফতার শেষ করার সংস্কৃতিও রয়েছে তুরস্কে। দিনের বেলায় রেস্তোরাঁ এবং খাবারের দোকান বন্ধ থাকে। সাহরির সময় রেস্তোরাঁগুলো খোলা রাখা হয়। দেশটিতে সাহরি ও ইফতারের সময় অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষরাও মুসলিমদের সঙ্গে সৌহার্দ্য বজায় রেখে যোগ দিতে দেখা যায়। এছাড়া খেজুরের পরিবর্তে জলপাই দিয়ে ইফতারের সময় ইফতার করা তুর্কিদের অন্যতম একটি সংস্কৃতি।
অনেকটা একই চর্চা আছে আলবেনিয়ার রোমা মুসলিমদের মধ্যে। ভেড়া বা ছাগলের চামড়ায় আবৃত লোদ্রা নামের ঐতিহ্যবাহী ড্রামের সঙ্গে বিশেষ গীতিনাট্য দিয়ে তারা রমাদানে দিনের শুরু এবং শেষ করেন।
ওমান : উপসাগরীয় দেশ ওমানে রমাদান উপলক্ষে বিভিন্ন দ্রব্যমূল্যের থাকে বিশেষ ছাড়। রমাদান শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই ওমানের বিভিন্ন রাস্তার পাশে দেখা যায় সারি সারি তাঁবু। এসব তাঁবু রোজাদারদের ইফতার করানোর জন্য স্থানীয় মানুষ বিশেষভাবে তৈরি করেন। ওমানীয়রা এ সময় বেশি পরিমাণে দান-সাদকাহ করেন। দানের সময় শর্ত জুড়ে দেন, যেন তার নাম প্রকাশ না হয়। রসিদে লিখে দিতে হয় একজন দাতা কিংবা ‘আবদুল্লাহ’ [আল্লাহর বান্দা]।
সৌদি আরব : মুসলিম দেশগুলো নিয়ে আলোচনা করলে সৌদি আরবের কথা না বললেই নয়। মক্কা-মদিনার দেশ সৌদি আরবে রমাদানের চাঁদ উঠতেই শুরু হয় একে অন্যের কল্যাণ কামনা করে ক্ষুদেবার্তা বিনিময়। শহরগুলো সাজে নতুন সাজে। দান-সাদাকার নীরব প্রতিযোগিতা চলে বাসিন্দাদের মাঝে। রোজাদারকে ইফতার করানোর ঐতিহ্যবাহী সৌদি সংস্কৃতি রমাদান মাসের অন্যতম মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। রোজাদারকে ইফতার করানোর জন্য রাস্তার মোড়ে মোড়ে এবং মসজিদে মসজিদে স্থাপন করা হয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশেষ তাঁবু। বাঙালি, ইন্ডিয়ানসহ ভিনদেশী শ্রমিকরা এসব তাঁবুতে মেহমান হন। আর ইফতার বিতরণের কাজটি করেন সৌদিয়ানরা। এই নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখা যায় মদিনা মুনাওয়ারায়ও। বিশেষ করে মসজিদে নববীর আশপাশে। ক্ষুধার্ত মানুষ যেমন লোভনীয় খাবারের দিকে ছুটে বেড়ায়, মদিনার মানুষেরাও ঠিক সেভাবে ছুটোছুটি করেন রোজাদার নিজের দস্তরখানে বসানোর জন্য এক্ষেত্রে পাকিস্তানি দস্তরখানার বেশ সুনাম রয়েছে। সৌদি আরবে সালাতুত তারাবিহ ও কিয়ামুল লাইল চলে সাহরির পূর্ব পর্যন্ত। এ সময় মাইক থেকে ভেসে আসা সুমধুর কণ্ঠের তিলাওয়াতের সূরের মূর্ছনা আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলে।
৪. লেবানন : কামানে তোপধ্বনি দিয়ে ইফতারের সময় হবার বিষয়টি জানানো হয় লেবাননে। এটি সম্ভবত বিশ্বে প্রচলিত রমদানের প্রাচীনতম ঐতিহ্যের একটি। এটি শুরু হওয়ার প্রায় ২০০ বছর পরও লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ আজও এই চর্চা চালু রেখেছে, যা ‘মিদফা আল ইফতার’ নামে পরিচিত। এটি সবসময় লেবাননের রমাদানের ঐতিহ্যের অংশ ছিল না।
বলা হয়ে থাকে, মিশর থেকে এই প্রথার উদ্ভব। কোনো এক রমাদান মাসে তৎকালীন শাসক খোশ কদম ঘটনাক্রমে সূর্যাস্তের সময় কামানের একটি গোলা ছোড়েন। এর শব্দ কায়রো শহরজুড়ে প্রতিধ্বনিত হয় এবং জনগণ একে রোজা শেষ হবার সংকেত হিসাবে ভুল করে। তবে এই ভুলকেই সবাই খুব প্রশংসা করে এবং শেষমেশ কামানের তোপধ্বনি ঐতিহ্যে পরিণত হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ ‘মিদফা আল ইফতারকে’ ইফতারের সময় হবার আনুষ্ঠানিক সংকেত হিসেবে গ্রহণ করেছে। লেবাননে ১৯ শতকের বিশেষ এক কামানই রয়েছে, যা বর্তমানে কেবল এই উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হয়।
১৯৮৩ সালে লেবাননে ইসরাইল আক্রমণের পর কামানকে সেদেশে অস্ত্র হিসেবে বাজেয়াপ্ত করা হয়। ফলে ঐতিহ্যটি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের পর লেবানিজ সেনাবাহিনী এ প্রথা পুনরুজ্জীবিত করে যা আজও অব্যাহত রয়েছে।
পাকিস্তান : পাকিস্তানে; বিশেষত পেশোওয়ার ও কাশ্মীর অঞ্চলে সাহরির জন্য ‘সাহরি ডাক’ নামের একটি ঐতিহ্য প্রচলিত রয়েছে। যেখানে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত একদল ড্রাম বাজিয়ে সাহরি খাবারের জন্য মুসলিমদের ডেকে তোলেন। এটি শুধু একটি রীতিই নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক সেলিব্রেশন হিসেবে পবিত্র রমাদানকে স্বাগত জানানো হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাত : রমাদান শুরু হবার আগেই সংযুক্ত আরব আমিরাতে চালু হয় ‘হক আল লায়লা’ নামের এক বিশেষ আয়োজন। রমাদানের ঠিক আগের মাস অর্থাৎ শাবান মাসের ১৫ তারিখে। এই দিন শিশুরা রঙিন কাপড় পরে প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি যায়। এসময় তারা খারিতা ব্যাগে মিষ্টি সংগ্রহ করে এবং সুর করে বলে ‘আতোনা আল্লাহ ইউতিকোম, বাইত মক্কা ইউদিকুম’, যার অর্থ ‘আপনারা আমাদেরকে দিন, আল্লাহ আপনাদের পুরস্কৃত করবেন এবং মক্কা পরিদর্শনের তৌফিক দেবেন।’
বছরের পর বছর ধরে ধর্মীয়ভাবে চর্চা করা ‘হক আল লায়লা’ সংযুক্ত আরব আমিরাতে রমাদান পালনের ঐতিহ্য হয়ে উঠেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো কুয়েতেও এটি পালন করা হয়। তবে তা হয় রমাদানের মাঝামাঝি সময়ে তিন দিনের উদযাপন। এই ঐতিহ্যটিকে ‘গারগিয়ান’ বলা হয়। .
ফিলিস্তিন ও গাজা : বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রমাদান সংস্কৃতি পালন আর খাদ্য অপচয়ের হিড়িক চললেও চলমান তীব্র মানবিক সংকট ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গাজার মানুষ চরম খাদ্যসংকটে। রমাদানে তাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি পালনের স্থলে খাদ্য সংগ্রহ করাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের ইফতারের তালিকায় সুস্বাদু খাবারের বদলে প্রধানত শুকনো রুটি, সিদ্ধ ডাল, সামান্য সবজি, স্যুপ এবং ত্রাণ থেকে প্রাপ্ত খেজুর ও টিনজাত খাবার রয়েছে। অনেকের জন্য ইফতারের সময় পর্যাপ্ত খাবার জোগাড় করাও দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে, যা তীব্র ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষের ইঙ্গিত দেয়। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে ফাতিহ, মোলখিয়া, সুমাঘিয়াহ-এর মতো ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় খাবার ফিলিস্তিনিদের ইফতারে শোভা পায়।
ইরাক : ইরাকের মুসলমানরা তোপধ্বনির মাধ্যমে রমাদানকে বরণ করে নেয়। এ সংস্কৃতি তারা গ্রহণ করেছে তুর্কিদের কাছ থেকে। তুর্কিরা উসমানীয় শাসনামলে বাগদাদবাসীকে তোপধ্বনির মাধ্যমে ইফতার ও সাহরির সময় সম্পর্কে অবগত করাত। তোপধ্বনি কালের বিবর্তণে এখনো ইরাকে টিকে আছে একটি জনপ্রিয় রমাদান সংস্কৃতি হিসাবে। তবে হ্যাঁ, এখন আর উসমানি আমলের তোপগুলো ব্যবহার করা হয় না। এখন কম্পিউটারাইজড নিয়ন্ত্রিত তোপ ব্যবহার করা হয়।
রমাদানে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি বেড়াতে যাওয়া ইরাকের আরেকটি ঐতিহ্য। এ সময় তারা পরস্পরকে ধর্মীয় গ্রন্থাদি উপহার দেন। প্রতিবেশিদের বাড়িতে ইফতার সামগ্রী পাঠান। রমাদানে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে ইফতারের পর হালকা মজা করায় কোনো ক্ষতি নেই বলেই মনে করেন ইরাকিরা।
আর তাই এসময় তারা খেলেন দেশটির অন্যতম প্রধান একটি ঐতিহ্যবাহী খেলা ‘মিহাবেস’। একে আংটি খেলাও বলা হয়ে থাকে। ৪০ থেকে ২৫০ জন পর্যন্ত খেলাটিতে অংশ নিতে পারে। এ সময় অংশগ্রহণকারীরা দুটি দলে ভাগ হয়ে যায়। পালা করে একটি দল আংটি লুকিয়ে রাখে এবং অন্যদলের সদস্যদের ধারণা করতে হয় যে আংটিটি কার কাছে আছে।
বাড়ির বাইরে কেবল পুরুষরা অংশ নিলেও ঘরের ভেতর নারীরাও এই খেলায় অংশ নিয়ে থাকে। ইরাকিদের কাছে এই খেলা সবার একত্রিত হয়ে কিছুটা আনন্দে কাটানোর মাধ্যম।
যুদ্ধের কারণে অনেক বছর খেলাটি বন্ধ থাকলেও ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টায় আবার ফেরত আসছে।
৬. ইন্দোনেশিয়া : ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপের মুসলমানদের জন্য রমাদানের আগে নিজেদের শুদ্ধ করার একটি পদ্ধতি ‘পাদুসান’। এর অর্থ গোসল করা। রমাদান শুরুর আগে ইন্দোনেশিয়ার মুসলমানরা তাদের আশপাশের প্রাকৃতিক পুকুরে গোসল করে এবং নিজেদের পরিষ্কার করে। এই সাংস্কৃতিক চর্চা রমজান মাসে বিশ্বাসীদের শুদ্ধ করে বলে মনে করেন মুসলিমরা।
মালয়েশিয়া : সাইরেনের শব্দে রমাদানের আগমনী বার্তা পৌঁছে যায় সবার কানে কানে। ‘শাহরুন মুবারাকুন’ বলে অভিবাদন জানিয়ে এবং উপহার বিনিময় করে শুরুতেই ভ্রাতৃত্ব বন্ধনকে মজবুত করে নেয় মালয়েশিয়ানরা। এদেশে সরকার এবং ব্যবসায়ীরা রমাদান উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীতে দেয় বিশেষ ছাড়। রমাদানে মালয়েশিয়ার মসজিদগুলো কানায় কানায় পরিপূর্ণ থাকে। তারাবিহসহ অন্যান্য নামাজে নারী ও শিশুদের উপস্থিতি থাকে লক্ষণীয়। তারাবিহর শেষে বিশেষ শিক্ষামূলক আসর বসে মালয়েশিয়ার মসজিদগুলোয়। সাহরির পর ঘুমানোর অভ্যাস নেই দেশটির মুসলমানদের। স্থানীয় মসজিদে ধর্মীয় আলোচনা শুনে সূর্য উঠলে নিজ নিজ কাজে বেরিয়ে পড়েন মালয়েশিয়ানরা।
যুক্তরাষ্ট্র : রমাদান মাস যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিমদের নিকট প্রিয় মাসে পরিণত হয়েছ। সম্প্রতি নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানীর বক্তব্যেও এমনটি ফুটে উঠে। নিউইয়র্ক টাইমস স্কয়ারে বেশ কয়েকবছর ধরে রমাদান উৎসবের অংশ হিসাবে ইফতার ও তারাবির আয়োজন হয়। এছাড়া প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের আমল থেকে হোয়াইট হাউসে মুসলিমদের সম্মানে ইফতার আয়োজন করা হয়।
কানাডা : কানাডার অটোয়ায় প্রতি শনিবার রমাদানে ইফতার পার্টির আয়োজন চলে মহাসমারোহে এবং ইসলামিক সেন্টারের ইফতার পার্টিতে দেশ-বিদেশের অসংখ্য মুসলমান হাজির হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘দ্য মুসলিম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’ ইফতার পার্টির আয়োজন করে।
আইসল্যান্ড : ইউরোপের একটি প্রজাতান্ত্রিক দ্বীপরাষ্ট্র আইসল্যান্ড। ২৭ হাজার ৭৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এদেশে ৩ লক্ষাধিক জনসংখ্যার মধ্যে মুসলমান বাস করেন মাত্র ৭৭০ জন। ইফতারের মাত্র দুই ঘণ্টা পরই সাহরি শেষ করতে হয় তাদের। স্থানীয় সময় অনুযায়ী রাত ১২টায় ইফতার করে আবার ২টায় সাহরি খান তারা।
সুইডেন : ইউরোপের তৃতীয় সর্ববৃহৎ দেশ সুইডেনের মুসলমানদের অবস্থাও একই রকম। মোট জনসংখ্যার প্রায় পাঁচ লাখ মুসলমানের বসবাস এখানে। গ্রীষ্মের রোজা সুইডিসদের জন্য কঠিন। ইফতারের মাত্র চার ঘণ্টা পর সাহরি খেতে হয় তাদের।
জার্মান ও যুক্তরাজ্য : ১৯ ঘণ্টা রোজা রাখেন জার্মানের মুসলমানরা। রাত ৩ টায় সাহরি খেয়ে পরদিন রাত ১০টায় ইফতার করেন তারা। অন্যদিকে জার্মানের মুসলমানদের চেয়ে পাঁচ মিনিট কম অর্থাৎ প্রায় ১৮ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট রোযা রাখেন যুক্তরাজ্যের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। যুক্তরাজ্যে প্রায় ৩০ লাখ মুসলিমের বসবাস; যা মোট জনগোষ্ঠীর ৫ শতাংশ। দেশটিতে আছে প্রায় ১ হাজার ৭৫০টি মসজিদ। এখানকার অভিবাসী মুসলমানরা তাদের স্ব স্ব দেশের সংস্কৃতি অনুযায়ী রমাদান পালন করেন। মসজিদে মসজিদে রোজাদারদের জন্য ইফতারের আয়োজন হয়। ভিন্ন ধর্মের মানুষকে আমন্ত্রণও জানানো হয় এমন অনেক আয়োজনে। তবে যেসব দেশে এরকম দীর্ঘ রাতদিন, তিন মাস বা ছয়মাস রাতদিন হয় সেসব দেশের মুসলিমদের জন্য কাবা শরীফের সময় অনুসরণ করে ইবাদত করার মতামত রয়েছে।
বাংলাদেশ : বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ বাংলাদেশ কিন্তু দুঃখের বিষয় রমাদান এলেই এদেশে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া কিংবা মজুদদারী করা অসৎ ব্যবসায়ীদের একটি নেশা। ৮/২০ রাকাত তারাবি এটা নিয়েও চলে। রমাদানের সময় সাহরির আগে মসজিদের মাইক ব্যবহার করে মানুষজনকে জাগিয়ে তোলা বাংলাদেশে বেশ পরিচিত। কোনো কোনো এলাকায় তরুণদের নাশিদ গেয়ে মুসলিমদের জাগানোর প্রথাও বেশ পুরনো। ইফতার মাহফিল, আত্মীয়ের বাড়িতে ইফতার পাঠানো বাঙালির পুরোনো সংস্কৃতি। রমাদানে বাংলাদেশের মসজিদগুলো সরব হয়, জেগে ওঠে। মুসল্লি বেড়ে যায় কয়েক গুণ। রমাদানে ইফতার, তারাবি, সাহরি, দিনের বেলায় পাড়ায়-পাড়ায়, মসজিদ-মাদরাসা, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে কুরআন শিক্ষার আসর ইত্যাদি যেন বাংলাদেশের রমাদানকে ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করে। তবে নারীদের মসজিদে প্রবেশাধিকার সীমিত।
ইউনেস্কোর স্বীকৃতি : রমাদানে বিশ্বজুড়েই ইফতারের আয়োজন মানেই মুসলিমদের কাছে যেন উৎসব। যারা রোজা পালন করেন না তাদের অনেককেও ইফতারের আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। যেমন- শিশুদের জন্য রোজা রাখার বিধান না থাকলেও অনেক পরিবারেই দেখা যায় যে বড়দের পাশাপাশি তরুণরা; এমনকি শিশুরাও ইফতারের খাবার প্রস্তুত করতে এগিয়ে আসে। তবে পরিবারের সাথে ইফতার করার পাশাপাশি অনেক মুসলিম মসজিদে গিয়ে সবার সঙ্গে মিলেমিশে ইফতার করেন। এতে সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি মজবুত হয়।
ইফতারের এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে ২০২৩ সালে একে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো। ইফতারকে বিশ্বের ‘অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের’ স্বীকৃতি দিতে তুরস্ক, ইরান, উজবেকিস্তান ও আজারবাইজান ইউনেস্কোর কাছে যৌথভাবে আবেদন করেছিল।
বিশ্বব্যাপী রমজান ভিন্ন রীতিতে পালিত হলেও রমজানের নানা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি মুসলিমদের ঐক্যের প্রতীক। রমাদানের মূল উদ্দেশ্য আত্মশুদ্ধি, সহানুভূতি এবং মানবতার কল্যাণ।
সূত্র : আল-জাজিরা, আল-আরাবিয়া, আল-কুদস, বিবিসি ইত্যাদি।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।