তরুণদের ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা

পাল্টে যেতে পারে ভোটের হিসাব-নিকাশ


১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:০৪

তরুণদের অধিকাংশই চায় দুর্নীতিমুক্ত কর্মসংস্থানবান্ধব পরিকল্পনা
দাঁড়িপাল্লার কাছে তরুণদের বেশি প্রত্যাশা

॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
এবারের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ দেড় দশক পর আওয়ামী লীগের হরণ করা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে বলে সকলের মাঝে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, তরুণ এবং নারীদের ভোট দাঁড়িপাল্লার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। তাই বিশ্লেষকরা বলছেন, তরুণ ও নারী ভোটাররাই হবেন এবারের নির্বাচনের চেঞ্জ মেকার।
নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, দেশে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। মোট ভোটারের মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার ১ হাজার ২৩৪ জন। গত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে ভোটার ছিল ১১ কোটি ৯৬ লাখ ৯১ হাজার ৯৩৭ জন। এদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৭ লাখ ৭১ হাজার ৭২০ জন এবং নারী ভোটার ছিল ৫ কোটি ৮৯ লাখ ১৯ হাজার ৩৬৯ জন। আর হিজড়া ভোটার ছিলেন ৮৪৮ জন।
হালনাগাদ ভোটার তালিকার ভোটারদের বয়স বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ভোটারের মধ্যে ১৮-২৯ বছর বয়সের (তরুণ) ভোটার রয়েছেন ৩ কোটি ৫ লাখ। ৩০-৩৩ বছরের মধ্যে ভোটার রয়েছেন ১ কোটি ৫১ হাজার। আর ৩৪-৪১ বছরের মধ্যে ভোটার হলেন ২ কোটি ৫৩ লাখ ভোটার। এছাড়া ৪২-৬০ বছর পর্যন্ত ভোটার রয়েছেন ৪ কোটি। ৬০ বছরের ওপরে রয়েছেন মাত্র ১ কোটি ৮৬ লাখ ভোটার। তাই সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, তরুণ ভোটারগণ যেদিকে ঝুঁকে পড়বেন, সেদিকেই পাল্লা ভারী হবে।
বিভিন্ন জরিপেও প্রকাশ পাচ্ছে যে, তরুণরা ভোট দিতে মুখিয়ে আছে। আর তরুণদের মাঝে প্রধান দলগুলোর মাঝে জামায়াতে ইসলামীর দিকেই সবার ঝোঁক বিদ্যমান।
তরুণদের প্রধান পছন্দ দাঁড়িপাল্লা
এবারের নির্বাচনে নতুন ও তরুণ ভোটারদের প্রথম পছন্দ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপে এবং সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন চিত্রে তাই ইতোমধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে।
গত ৪ ফেব্রুয়ারি কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজের (বিইপিওএস) যৌথভাবে প্রকাশিত এক জরিপে দেখা যায়, এবার ৩৭.৪ শতাংশ তরুণ ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দিতে চায়। এরপর রয়েছে বিএনপি (২৭ শতাংশ) ও এনসিপি (১৭ শতাংশ)। আর ১৮.৬ শতাংশ তরুণ ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছেন। ‘আনকাভারিং দ্য পাবলিক পালস : এ নেশনওয়াইড সার্ভে’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে তারা এসব তথ্য জানায়।
২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই ধাপে দেশের ৬৪ জেলার ১৮০টি আসনের ১১ হাজার ৩৮ জন ভোটারের ওপর পরিচালিত এ জরিপে দেখা যায়, ৯০ শতাংশের বেশি ভোটার ভোট দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও আট শতাংশ ভোটার এখনো অংশগ্রহণের বিষয়ে নিশ্চিত নন। ভোটারদের ৩০.২ শতাংশ প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিতে চান এবং ৩৩.২ শতাংশ দল ও প্রার্থী উভয়কেই বিবেচনা করবেন বলে জানিয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তরুণ ভোটাররা এখন ধর্মীয় ইস্যুর চেয়ে সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। ৬৭.৩ শতাংশ ভোটারের কাছে আগামী নির্বাচনের প্রধান ইস্যু ‘দুর্নীতি’। এছাড়া ৬৩ শতাংশ ভোটার দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ৫৫.৪ শতাংশ উন্নয়ন এবং ৫১ শতাংশ নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিপরীতে ধর্মীয় বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন ৩৫.৯ শতাংশ ভোটার।
তরুণ ভোট ফ্যাক্টর
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে তরুণ ভোট জয়-পরাজয়ে বড় ফ্যাক্টর হবে বলে অনেকেই মনে করছেন। এ তরুণ ভোটারদের ভাবনায় কী আছে, সেটি নির্বাচন ছাড়া বোঝা অসম্ভব। কারণ বিগত তিনটি নির্বাচনে ভোটের প্রকৃত চিত্র সামনে আসেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ তরুণ ভোট নিয়ে বলেন, ‘এই ভোট নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে প্রধান নিয়ামক হবে। তারা বিপুল সংখ্যায়, তারা প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাচ্ছে এবং তাদের মনে কী আছে, আমরা জানি না। বিএনপির মধ্যে অনেক তরুণ আছে, জামায়াতের মধ্যেও অনেক তরুণ আছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোয় আমরা এক ধরনের প্রবণতা আমরা দেখেছি। মাদরাসাগুলোয় এক ধরনের প্রবণতা আছে। কাজে তরুণ ভোটাররা তাদের টার্ন আউটটা বেশি হবে।’
এ বিষয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. রওনক জাহান বলেন, ‘তারা তো (তরুণ ভোটার) আগে ভোট দেন নাই। অতএব তাদের ভোটিং প্যাটার্ন নিয়ে কোনো ধারণা কারো নেই। সেজন্যই এবারের নির্বাচনটা সবচেয়ে বেশি আনসার্টন সবার কাছে মনে হচ্ছে। কারণ তারা হচ্ছে থার্টি পার্সেন্ট অব ভোটারস, এবং তাদের ভোটিং পার্সেন্টেজ অনেক বেশি হবে, তাদের ভোটিং রেকর্ডজ কিছু নাই কোনদিকে তারা ভোট দেবে। এছাড়া তাদের খুবই হাই এক্সপেকটেশন আছে এবং তারা নতুন বাংলাদেশ করতে চান।’
আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রথম ভোট দেবেন রাজধানীর একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. নাসির হোসেন। তিনি বলেন, জীবনের প্রথম সবকিছুর অভিজ্ঞতা অন্যরকম। প্রথমবার ভোট দেওয়ার অপেক্ষায় আছি। নতুন এক অভিজ্ঞতা অর্জনের তীব্র উত্তেজনা কাজ করছে। দল নয়, প্রথম ভোট যোগ্য ব্যক্তি দেখে দেব। যার হাতে দেশ নিরাপদ এবং জুলাই আন্দোলনের উদ্দেশ্য হাসিল হবে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন, তরুণ ভোটার হিসেবে আমি খুবই উচ্ছ্বসিত। তরুণ প্রজন্ম ও দেশের জন্য যে দল ভালো কাজ করবে আমরা তাকে ভোট দেব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, প্রথমবার ভোটার হয়েছি। আমি আমার গণতান্ত্রিক অধিকারের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে চাই। আমার ভোট আমি দিতে চাই, কেন্দ্রে গিয়ে যেন না দেখি যে আমার ভোট অন্য কেউ দিয়ে গেছে।
এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের বিষয়ে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জুলাই-আগস্টে তরুণরা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জন্য এক নতুন ইতিহাস গড়েছেন। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিলেন তারা। একইসঙ্গে আন্দোলনে নেমে যারা মারা গেছেন ও আহত হয়েছেন, তাদের বেশিরভাগই তরুণ। সুতরাং আগামীতে বাংলাদেশে ফের যেন কোনো ফ্যাসিস্ট সরকারের উত্থান না ঘটে, সেজন্য তরুণদের ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে সংস্কার ও রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনে তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে। এজন্য আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তরুণ ভোটার ভোট প্রয়োগে ভালো-মন্দের বিচার করবেন। আগের অবস্থান এখন পুরো উল্টো। এখন আর আগের মতো ভোট হবে না। তরুণরাই হবেন আগামীর বাংলাদেশ পরিচালনার মূল চাবিকাঠি।
তরুণ প্রকৌশলী সাব্বির আহমেদ সোনার বাংলাকে বলেন, এবারের নির্বাচনে তরুণ ও নারী ভোটাররা কেবল সংখ্যাগত নয়, গুণগতভাবেও একটি নির্ধারক শক্তি। তাঁরা সংস্কার, উন্নয়ন, ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তাকে ভোটের কেন্দ্রে আনছেন। এই ভোটারদের সচেতন অংশগ্রহণ রাজনীতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক করতে পারে। তারা শুধু ভোটার নন, তারা পরিবর্তনের চালিকাশক্তি, একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল শাসনের জন্য অটল প্রত্যাশার প্রতীক। জুলাইয়ের স্পিরিটের মতো, যেখানে গণমানুষের শক্তি ও ঐক্য উজ্জ্বলভাবে ফুটে ওঠে, এই ভোটাররা আগামী দিনের সুযোগ, সমতা ও ন্যায়বিচারের স্বপ্ন বাস্তবায়নের আকাক্সক্ষা নিয়ে দেশের ভবিষ্যৎকে আরও প্রগতিশীল, স্বচ্ছ ও জনগণমুখী করার পথে এক অনুপ্রেরণামূলক শক্তি হিসেবে দাঁড়াচ্ছেন।
নারী ও নিরাপত্তা
বাংলাদেশের ভোটারদের মধ্যে অর্ধেকই হলো নারী। এই ভোট বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হবে। তবে এর সঙ্গে নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। মহিউদ্দিন আহমদের কথায়, নারীরাও কিন্তু একটা সমীকরণ পাল্টে দিতে পারে। ‘তাদের বিপুল উপস্থিতি যদি হয় এবং সেভাবে যদি একটা অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা যায়, তাহলে এটা নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে। এখন নারীদের উপস্থিতি অনেকটা নির্ভর করবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরে। গোলমালের আশঙ্কা থাকলে তারা অনেকেই যাবেন না। হ্যারাসড হতে চান না কেউ।’
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী লিপি কাজী সোনার বাংলাকে বলেন, আইনজীবী ও সোশ্যাল এক্টিভিস্ট হিসেবে আমি বিষয়টি এভাবে দেখি যে, এবারের নির্বাচনে তরুণ ও নারী ভোটাররা নিঃসন্দেহে একটি নির্ধারক শক্তি। তরুণরা পরিবর্তন, কর্মসংস্থান ও জবাবদিহিমূলক রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে। অন্যদিকে নারী ভোটাররা নিরাপত্তা, অধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে সচেতন অবস্থান নিচ্ছেন। এ দুটি শ্রেণি আবেগ নয়, বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী। যেহেতু একান্ন পারসেন্ট নারী ভোটার, তাই যে রাজনৈতিক শক্তি তরুণ ও নারীদের বাস্তব চাহিদা বুঝতে পারবে, তারাই নির্বাচনে এগিয়ে থাকবে।