নির্বাচনে কে জিতবে? জনগণের রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা
১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:১৭
॥ জামশেদ মেহদী ॥
এই ভাষ্যটি লিখছি ১০ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার। আজ থেকেই অর্থাৎ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকেই সবরকম প্রকাশ্য নির্বাচনী তৎপরতা বন্ধ হয়ে গেছে। আর ঠিক ৪৮ ঘণ্টা পর অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হবে। ভোটারদের দেওয়া হবে ২টি ব্যালট পেপার। একটিতে ভোটার সিল মারবেন সেই মার্কায়, যে মার্কার প্রার্থীকে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে দেখতে চান। আরেকটিতে থাকবে হ্যাঁ এবং না’র ঘর। গণভোটে তিনি যদি সংস্কার চান, তাহলে হ্যাঁ-এর ঘরে সিল মারবেন আর না চাইলে না-এর ঘরে সিল মারবেন। তবে কঠিন বাস্তব হলো এই যে এবারের নির্বাচনী প্রচারে গণভোটের কোনো স্থানই নাই। অথচ এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যদি হ্যাঁ পরাজিত হয়, তা হলে সারা দেশের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে।
সপ্তাহজুড়ে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, যার সাথেই দেখা হয়েছে বা ফোনে কথা হয়েছে, তার প্রথম প্রশ্নটিই ছিল, এবারের নির্বাচনে কে জিতবে? বিএনপি না জামায়াত? এ প্রশ্নটির ওপরেই আজকে আলোচনা করবো। তবে তার আগে নির্বাচনী প্রচার সম্পর্কে আমার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে শেয়ার করছি।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি সোমবার সকাল ৯টার দিকে আমার বাসার কাজের দুই বুয়া ছুটি চাইলো। কারণ তাদের বস্তিতে নাকি ধানের শীষের প্রার্থী বস্তিবাসীকে একটি করে শাড়ি এবং নগদ ১৫শত টাকা দেবেন। একসাথে দুই কাজের বুয়াকে ছাড়লে কত বড় অসুবিধা হয়, সেটি আপনাদের আর বলে বোঝানোর দরকার নাই। কিন্তু না ছেড়ে কি কোনো উপায় আছে? অগত্যা ওদের দুজনকেই ছুটি দেওয়া হলো।
বিকাল ৩টার দিকে ওরা ফিরে এলো। ওদের জিজ্ঞাসা করা হলো, তোমরা কি কাপড় আর টাকা পেয়েছো? ওরা রাগান্বিত স্বরে বললো, কীসের টাকা? কীসের কাপড়? দেখি অনেক লোক। তারেক সাহেব এসেছেন। বস্তির সরদার বক্তৃতা করলেন। ধানের শীষের প্রার্থী বক্তৃতা করলেন। তারেক সাহেব চলে যাওয়ার পর যখন টাকা এবং শাড়ির কথা ওঠে, তখন সামনে বসা কয়েকজনকে কিছু টাকা এবং শাড়ি দেওয়া হলো। অবশিষ্ট দেড়-দুই হাজার মানুষ কিছুই পেলেন না। তার পর বলা হলো, তোমরা এখন যাও। ওরা রাগে গজরাতে গজরাতে ফিরে এলো। এটি একটি ফ্রেশ, টাটকা ঘটনা। ভোট আদায়ের সেই পুরনো ছলচাতুরী আর ধোঁকাবাজি আজও শেষ হয় নাই।
অনেক সুধী; বিশেষ করে বামপন্থীরা নির্বাচনে পেশিশক্তি এবং টাকা-পয়সা ছিটানোর কালচার বন্ধ করার জন্য অনেক গলাবাজি করেছেন। সেগুলো যে এতটুকু বন্ধ হয়নি, বরং বেড়েছে, তার ভূরি ভূরি নজির পাওয়া যাচ্ছে। আমি উত্তরবঙ্গের অন্তত ৩টি কেন্দ্রের খবর জানি, যেগুলোর ভিডিও আমি দেখেছি। গ্রামের সভা। একটি উপজেলার ঘটনা। ধানের শীষের প্রার্থীর তরফ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে যে, তার সভায় যোগদান করলে বিরানি খাওয়ানো হবে। এই খবর শুনে অনেকে সভায় যোগ দেন এবং সত্যি সত্যিই সকলকেই এক প্যাকেট করে বিরানি দেওয়া হয়।
অন্তত একটি বড় দলের ক্ষেত্রে এভাবেই রাজনীতি চলছে। জুলাই বিপ্লব তাদের মাঝে কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। জুলাই বিপ্লবে হাজার মানুষের কুরবানি তাদের এতটুকু স্পর্শ করতে পারেনি। এখন আসছি সেই প্রশ্নে- এবারের নির্বাচনে কে জিতবে?
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবার সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিদের জন্য অত্যন্ত কঠিন। কারণ শেখ হাসিনাকে বিতাড়িত করা হয়েছে কোনো সাংবিধানিক পথে নয়। কোটি কোটি মানুষ ছাত্রদের নেতৃত্বে রাস্তায় বেরিয়ে তাকে ধাওয়া দিয়েছিলেন এবং প্রাণভয়ে তিনি সপরিবারে আত্মীয়-স্বজন এবং দলবলসহ পালিয়ে গেছেন ভারতে। ১৯৮১ সালে তিনি ভারত থেকেই এসেছিলেন। আর ২০২৪ সালে তিনি ভারতেই ফিরে গেলেন।
১৫ বছর ধরে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলসমূহ আন্দোলন করেছিলেন। কিন্তু তারা হাসিনার পতন ঘটাতে পারেননি। অবশেষে জুলাই বিপ্লবে ১৪শত প্রাণ এবং ২৬ হাজার আহত হওয়ার বিনিময়ে শেখ হাসিনা পালাতে বাধ্য হন। যেসব তরতাজা তরুণের নেতৃত্বে এ বিপ্লব হয়, সেসব তরুণের সকলেই এর আগের ৩টি ইলেকশনে ভোট দিতে পারেননি। এদের অনেকেই আছেন, যারা, ফ্রি এবং ফেয়ার ইলেকশন বলতে কী বোঝায়, সেটি তারা সম্যকভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারেননি। কারণ আগের ১৫ বছরে তারা সুষ্ঠু এবং অবাধ নির্বাচন দেখেননি।
এর মধ্যে আমাদের পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপে অনেক বড় পরিবর্তন ঘটে গেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অনেক বড় এবং সুশৃঙ্খল দল হওয়া সত্ত্বেও জুলাই বিপ্লবের আগে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। তাদেরকে দাবিয়ে রাখা হয়েছিল। স্রোতের পানিকে যদি জোর করে আটকে রাখা হয়, তাহলে সে স্ফীত হতে থাকে। বেশ কিছুদিন পর যদি ঐ পানির বাঁধ খুলে দেওয়া হয়, তাহলে সে গলগল করে বইতে শুরু করে। ড. কামাল হোসেনের জামাতা ব্যারিস্টার সারা হোসেনের স্বামী সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান মনে করেন যে, ১৫ বছর ধরে শেখ হাসিনা জামায়াত এবং শিবিরকে দাবিয়ে রেখেছিলেন। জুলাই বিপ্লবে যখন হাসিনা পালিয়ে গেলেন, তখন বাঁধভাঙা বন্যার মতো জামায়াত এবং শিবির অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে স্রোতের পানির মতো গলগল করে বেরিয়ে আসে। বাংলাদেশের ৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টরি তারই জ¦লন্ত প্রমাণ।
কী শেখ মুজিব, কী শেখ হাসিনা কেউই জামায়াত এবং শিবিরের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট করে কোনো দোষ দেখাতে পারেনি। তাই তারা ১৯৭১ সালের সেসব কাহিনীর জাবর কেটেছে, যার শক্তিশালী জবাব জামায়াত অতীতে ৪ বার দিয়েছে এবং জনগণ সেই সব জবাবে সন্তুষ্ট হয়েছেন।
এবারের নির্বাচনে বিএনপিও জামায়াতের বিরুদ্ধে সলিড কোনো অভিযোগ আনতে পারেনি। তাই তারাও ৭১-এর পুরনো রেকর্ড বাজাচ্ছে। কিন্তু জনগণ আর বহুল চর্চিত, বহুল ব্যবহৃত চাপিয়ে দেওয়া অভিযোগে কর্ণপাত করছেন না। এছাড়া জামায়াতের ৫ জন সিনিয়র নেতাকে ফাঁসি এবং ২ জন নেতার কারাগারে মৃত্যুর পরও যখন একই সুরে বিএনপি গান ধরেছে, তখন জনগণ আর সেই অভিযোগে কর্ণপাত করছেন না।
জামায়াতের বর্তমান আমীর ডা. শফিকুর রহমান এবং সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পারওয়ার উভয়ের বর্তমান বয়স ৬৭ বছর। ১৯৭১ সালে তাদের বয়স ছিল ১২ বছর। এছাড়া আমীরে জামায়াত আগে জাসদে ছিলেন। আর যেসব সিনিয়র নেতা রয়েছেন, তাদের কারো বয়স ৭১-এ ছিল ৫ বছর, কারো ৬ বছর ইত্যাদি। আর ছাত্রশিবির? ৭১-এ এদের কারো তো জন্মই হয়নি।
দেশের মধ্যে শুধু মাত্র ডেভিড বার্গম্যানের মতো ব্যক্তিরাই নন, বিদেশেও অনেক পত্রপত্রিকায়ও লেখা হচ্ছে যে, জামায়াতের বিরুদ্ধে ইচ্ছামতো যত মনগড়া অভিযোগই দাঁড় করানো হোক না কেন, জামায়াতের শীর্ষনেতৃবৃন্দ এবং তৃণমূলের লাখ লাখ রুকনের একজনের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির একটি অভিযোগও কেউ দাঁড় করাতে পারেনি। এ কারণে জামায়াত এবং শিবিরের জনপ্রিয়তা দ্রুত গতিতে বেড়েছে।
অথচ ৫ অগাস্টের পর চাঁদাবাজি, দখলবাজি, প্রশাসনকে হুমকি-ধমকি ইত্যাদির কোনো পরিবর্তন হয়নি। শুধুমাত্র হাতবদল হয়েছে। আগে ঐসব অসৎ কাজ এবং অপকর্ম করতো আওয়ামী লীগের মাস্তানরা। আর এবার সেগুলো শুরু করেছে বিএনপির নেতা কর্মীরা। এসব অভিযোগ জামায়াত বা শিবির থেকে আসেনি। প্রায় সমস্ত জাতীয় বাংলা ও ইংরেজি দৈনিকে গত ১৮ মাস ধরে বিএনপির বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ লাগাতার উত্থাপিত হচ্ছে। বিএনপির হাইকমান্ড বলেছে যে, তারা এসব অপকর্মের কারণে এর আগে সাড়ে ৭ হাজার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করেছে। প্রকারান্তরে তারা স্বীকার করে নিলো যে তাদের দলে হাজার হাজার মাস্তান ও চাঁদাবাজ ছিল এবং আজও আছে। এর বিপরীতে জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগও না থাকায় জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।
জুলাই বিপ্লবের পর জামায়াত এবং শিবির রাজনীতির চেয়ে জনকল্যাণমূলক কাজে বেশি মনোনিবেশ করে। ১৪শত নিহত পরিবার এবং ২৬ হাজার আহত পরিবারকে আর্থিক সাহায্যসহ যতরকম সাহায্য ও সহযোগিতা তাদের সাধ্যে ছিল, সেটি তারা করেছে। ডেভিড বার্গম্যান তো লিখেছেন যে, জুলাই বিপ্লবের প্রতিটি শহীদ পরিবারকে জামায়াত ২ লাখ টাকা করে সাহায্য করেছে। অথচ এর জন্য তারা কোনো পাবলিসিটি দেয়নি।
দেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে জামায়াত যে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে, সেটি জনগণকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছে। ভারতীয় আধিপত্যবাদ যেভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি হুমকি হয়েছে তার বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লবে যারা আওয়াজ তুলেছিলো, তার মধ্যে যেমন বর্তমান এনসিপি নেতারা ছিলেন, তেমনি জামায়াত এবং শিবিরের নেতারাও ছিলেন। জুলাই বিপ্লবের ১৮ মাস পরেও ভারতীয় হেজিমনির ব্যাপারে জামায়াত কোনো ছাড় দেয়নি। এজন্য জনগণের মাঝে জামায়াত ও শিবিরের জনপ্রিয়তা শনৈ শনৈ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিগত ৫৪ বছর ধরে জামায়াতকে শুধুমাত্র কট্টর ধর্মবাদী দল হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে আওয়ামী লীগ। জুলাই বিপ্লবের পর বিগত ১৮ মাস আওয়ামী লীগের ঐ ন্যারেটিভ ধার করে চালাচ্ছে বিএনপি। কিন্তু জামায়াতের আমীর শুধু নির্বাচন উপলক্ষে নয়, নির্বাচনের আগেও উল্কার মতো সারা দেশে ঝটিকা সফর করেছেন। এসব সফরে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেসব বক্তব্য শুনে জনগণ, বিশেষ করে সমাজের সচেতন অংশ বুঝতে পেরেছেন যে, ইসলামী আদর্শের ব্যাপারে কোনোরকম আপস না করেও জামায়াত তার আদর্শের প্রায়োগিক দিক যেভাবে তুলে ধরেছেন, সেগুলো শুনে মানুষের ধারণা পাল্টে গেছে। তারা বুঝতে পেরেছেন ইসলামী জীবন দর্শন এই একবিংশ শতাব্দীতেও রাজনীতি এবং প্রযুক্তিকে ধারণ করে চলতে পারে। এ কারণে এবার শিক্ষিত লোকের মধ্যে জামায়াতের জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জুলাই বিপ্লব শুধুমাত্র আওয়ামী লীগকে সরিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় বসানোর বিপ্লব ছিলো না। জনগণ চেয়েছিলেন জীবন ও রাষ্ট্রের সবক্ষেত্রে একটি পরিবর্তন। এটিকে কেউ কেউ বলেছেন, জনগণের অভিপ্রায়, আবার কেউ কেউ বলেছেন নয়া বন্দোবস্ত। জামায়াতের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, জামায়াত এ অভিপ্রায় ধারণ করে এবং সুযোগ পেলে এই বন্দোবস্ত কায়েম করবে।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে সকলেই ধরে নিয়েছিলেন যে, আওয়ামী লীগ ইলেকশনে জিতবে। তখন বিএনপির সংগঠন মজবুত ছিলো না এবং ৩০০ আসনে শক্তিশালী প্রার্থীও ছিল না। তারপরেও নির্বাচনের পর দেখা গেল বিএনপির চমক। বিএনপি সেই বিজয়ে নিজেও বিস্মিত হয়েছিল।
১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার। জনগণ ভোট দেওয়ার জন্য এক পায়ে খাড়া। ভোট যদি সুষ্ঠু হয়, যদি অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়, যদি অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসন বিশেষ দিকে হেলে না পড়ে, তাহলে ভোট শেষ হলে এবং গণনা শেষ হলে যদি কোনো অপ্রত্যাশিত চমক দেখা যায়, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
Email: jamshedmehdi15@gmail.com