যেসব এআই টুল আপনার পড়াশোনা ও গবেষণা সহজ করবে
১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৫৩
॥ মুহাম্মদ নূরে আলম ॥
শিক্ষা ও গবেষণার কাজকে এআই শুধু যে সহজ করেছে- তা নয়, অনেক ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার হয়তো আপনার কর্মজীবনের উপস্থাপনকেও করতে পারে আরও আধুনিক, যুগোপযোগী। কীভাবে পড়ালেখা বা কাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআই ব্যবহার করবেন? বর্তমান বৈশ্বিক উৎপাদনশীলতা ও সৃজনশীলতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। একসময় যেখানে এআই টুল কেবল লেখা বা ছবি তৈরিতে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে এখন এসব টুল একীভূত প্ল্যাটফর্মে রূপ নিয়ে লেখালেখি, কোডিং, ডিজাইন, অডিও-ভিডিও প্রোডাকশন, গবেষণা ও ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে ‘এআই’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) একটি বহুল আলোচিত বিষয়। এটি শুধুমাত্র প্রযুক্তিবিদদের মধ্যেই নয়, বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে শিক্ষা কেবল শ্রেণিকক্ষ কিংবা পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধ নেই। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (অও) শিক্ষার ধরনই বদলে দিচ্ছে। পড়াশোনার জগতে বিপ্লব ঘটাতে ইতোমধ্যেই সামনে এসেছে বেশকিছু শক্তিশালী এআই টুল, যা ছাত্রছাত্রীদের শেখা, গবেষণা ও অ্যাসাইনমেন্ট তৈরিকে আগের চেয়ে বহুগুণ সহজ করে তুলেছে। তবে প্রশ্ন হলো- আসলে এআই কী?
এআই কী? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই হলো এমন একটি প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে যন্ত্র বা কম্পিউটার এমনভাবে কাজ করতে পারে- যেন তারা মানুষের মতো চিন্তা-ভাবনা, শেখা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে সক্ষম। সহজভাবে বললে, এটি মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে অনুকরণ করতে সক্ষম একটি সফটওয়্যার সিস্টেম। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালে জেনারেটিভ এআই পেশাগত কর্মপরিবেশে মানবশ্রমের চাপ কমিয়ে দক্ষতা বাড়াচ্ছে। একইসঙ্গে কম ত্রুটিতে উচ্চমানের কনটেন্ট ও সমাধান নিশ্চিত করছে এসব এআই টুল। বহুমুখী সক্ষমতার কারণে এখনো সবচেয়ে জনপ্রিয় এআই টুলগুলোর একটি। লেখা, আইডিয়া তৈরি, কোডিং, ডিবাগিং ও দীর্ঘ আলোচনায় প্রাসঙ্গিক উত্তর দিতে দক্ষ। গবেষণা ও এন্টারপ্রাইজ পর্যায়ের কাজের জন্য শক্তিশালী মাল্টিমডাল এআই। টেক্সট, ছবি ও ডাটা বিশ্লেষণে পারদর্শী এবং গুগলের অন্যান্য টুলের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করে। মাইক্রোসফট অফিস, টিমস ও উইন্ডোজে সংযুক্ত এআই সহকারী। রিপোর্ট, ই-মেইল, প্রেজেন্টেশন ও ডাটা বিশ্লেষণকে আরও সহজ করে। উচ্চমানের ও বাস্তবসম্মত ছবি তৈরিতে শীর্ষস্থানীয়। ডিজাইনার, শিল্পী ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়। ফটোশপ, ইলাস্ট্রেটর ও প্রিমিয়ার প্রোতে সংযুক্ত এআই ডিজাইন টুল। ব্র্যান্ড-সেফ ও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য কনটেন্ট তৈরিতে গুরুত্ব দেয়। পেশাদার লেখালেখি ও ডকুমেন্টেশনের জন্য নির্ভরযোগ্য। দীর্ঘ ও সংবেদনশীল লেখায় যুক্তি ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সক্ষম। ভিডিও তৈরি ও অ্যানিমেশনের জন্য উন্নত এআই প্ল্যাটফর্ম। দ্রুত ও সৃজনশীল ভিডিও প্রোডাকশনে কার্যকর। এআই অ্যাভাটার ব্যবহার করে ভিডিও তৈরি করার প্ল্যাটফর্ম। কর্পোরেট ট্রেনিং, শিক্ষা ও মার্কেটিংয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। মার্কেটিং ও বিজ্ঞাপনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি। এসইও কনটেন্ট, বিজ্ঞাপন ও সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট তৈরিতে সহায়ক। তথ্যসূত্রভিত্তিক উত্তর দেওয়ার কারণে গবেষক ও সাংবাদিকদের কাছে জনপ্রিয়। মানুষের মতো স্বর তৈরি করতে সক্ষম শীর্ষ ভয়েস জেনারেশন প্ল্যাটফর্ম। অডিওবুক ও বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত হচ্ছে। সহজ ডিজাইন অটোমেশনের মাধ্যমে প্রেজেন্টেশন ও মার্কেটিং ম্যাটেরিয়াল তৈরিতে সহায়ক। ডকুমেন্টেশন, নোট সংক্ষেপণ ও প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টে কার্যকর এআই সহকারী। রিয়েল-টাইম কোডিং, ডিবাগিং ও অ্যাপ ডেভেলপমেন্টে সহায়ক প্ল্যাটফর্ম। টেক্সটের মাধ্যমে অডিও ও ভিডিও সম্পাদনার সুবিধা দেয়। টেক্সট থেকে দীর্ঘ ও বাস্তবসম্মত ভিডিও তৈরির সক্ষমতা নিয়ে আলোচিত এআই টুল। দ্রুত ও সহজ ভিডিও কনটেন্ট তৈরির জন্য জনপ্রিয়। গল্পভিত্তিক প্রেজেন্টেশন ও পিচ ডেক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। স্বল্পসময়ের মধ্যে ব্যবসার জন্য ওয়েবসাইট ও অটোমেশন সল্যুশন প্রদান করে। ডিজাইনার ও গেম ডেভেলপারদের জন্য চরিত্র, টেক্সচার ও পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর। এসব জেনারেটিভ এআই টুল ২০২৬ সালে সৃজনশীলতা ও ব্যবসায়িক দক্ষতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ভবিষ্যতে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এআইয়ের ব্যবহার করে আপনার জীবনকে করতে পারে আরও আধুনিক, যুগোপযোগী। তেমনই কিছু অ্যাপ নিয়ে কথা বলবো আজ।
কর্পোরেট প্রেজেন্টেশন তৈরি : প্রেজেন্টেশন তৈরি করতে এখন আর পাওয়ার পয়েন্ট কিংবা অন্য কোনো সফটওয়্যারের পেছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। গামা এআই টুল (gamma.com.ai) ব্যবহার করে আপনি কাজটা সহজেই করতে পারবেন। কী নিয়ে প্রেজেন্টেশন তৈরি করতে চান, ঠিকঠাক নির্দেশনা দিলেই এআই আপনাকে প্রেজেন্টেশন বানিয়ে দেবে। প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিষয়ের প্রভাষক জিনাত সানজিদা জানান, ‘নিজের আইডিয়া বা অভিজ্ঞতার সঙ্গে এআই যুক্ত করে প্রেজেন্টেশন তৈরি করা যেতেই পারে। তবে এআইকে সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করুন। পুরোপুরি এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাবেন না।’ ক্যানভার (canva.com) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করেও প্রেজেন্টেশন তৈরি করতে পারেন। ডিজাইন ও উপস্থাপনার বিষয়টি এআইয়ের হাতে ছেড়ে দিলে কনটেন্ট সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও গবেষণায় আপনি আরও বেশি সময় দিতে পারবেন। এসব সাইটে বিষয় লিখে দিলে বা কনটেন্ট দিলে এআই নিজেই স্লাইড ডিজাইন সাজিয়ে দেয়। আপনাকে শুধু টেক্সট ও ছবি নিজের মতো করে সম্পাদনা করে নিতে হবে।
প্রেজেন্টেশন তৈরিতে স্লাইডএআই (SlidesAI) হলো একটি শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত টুল, যা ব্যবহারকারীদের দ্রুত ও সহজে প্রেজেন্টেশন স্লাইড তৈরি করতে সাহায্য করে। এটি প্রধানত গুগল স্লাইডসের একটি অ্যাড-অন হিসেবে কাজ করে। এর মূল লক্ষ্য হলো প্রেজেন্টেশন তৈরির প্রক্রিয়াকে স্বয়ংক্রিয় করা এবং সময় বাঁচানো। স্লাইডএআই ব্যবহার করতে, আপনাকে শুধুমাত্র একটি টেক্সট বা আর্টিকেল এর বিষয়বস্তু ইনপুট দিতে হবে। এরপর টুলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই টেক্সট বিশ্লেষণ করে মূল পয়েন্টগুলো খুঁজে বের করে এবং সেগুলোকে পেশাদার ও আকর্ষণীয় স্লাইডে রূপান্তরিত করে। এটি বিভিন্ন স্লাইড লেআউট, ফন্ট এবং রং স্কিম ব্যবহার করে, যা আপনার প্রেজেন্টেশনকে আরও দৃষ্টিনন্দন করে তোলে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং পেশাদারদের জন্য স্লাইডএআই অত্যন্ত উপযোগী। এটি আপনাকে রিসার্চ পেপার, লেকচার নোট বা মিটিংয়ের থেকে মুহূর্তেই প্রেজেন্টেশন তৈরি করতে সাহায্য করে। হাতে সময় কম থাকলে, এটি একটি গেম-চেঞ্জার হিসেবে কাজ করতে পারে। স্লাইডএআই-এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর ব্যবহারের সহজলভ্যতা এবং দক্ষতা। এটি আপনাকে কনটেন্ট তৈরিতে মনোযোগ দিতে সাহায্য করে, আর স্লাইড ডিজাইন এবং ফরম্যাটিংয়ের কাজটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করে দেয়। এটি প্রযুক্তির একটি দুর্দান্ত উদাহরণ, যা আমাদের কাজকে আরও সহজ ও স্মার্ট করে তোলে।
ক্লাসওয়ার্ক, হোমওয়ার্ক ও অ্যাসাইনমেন্ট : এআই-চালিত চ্যাটবট, যা প্রশ্নোত্তর, প্রবন্ধ লেখা, কোডিং, সারসংক্ষেপ ও গবেষণায় সাহায্য করে। বাংলা ভাষাতেও সাবলীল। বিশেষ সুবিধা : ২৪ ঘণ্টা সহায়তা, প্রবন্ধের আউটলাইন তৈরি, বহুবিষয়ক সহায়তা। লেখা ঠিকঠাক সাজিয়ে নেওয়া, তথ্যানুসন্ধান কিংবা বিশ্লেষণের কাজে আপনি চ্যাটজিপিটি ChatGPT/Google Gemini জেমিনির মতো এআই টুল ব্যবহার করতেই পারেন। ‘ক্লাসওয়ার্ক ও অ্যাসাইনমেন্ট তৈরির জন্য এখন অনেক উন্নত এআই টুল আছে। এসব টুল শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল লেখায় সহায়তা করে। তবে কপি-পেস্ট কিংবা সরাসরি অনুলিপি করলে কিন্তু তা সহজেই ধরা পড়বে, ক্লাসে নম্বর কম পাওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে। বরং এসব টুলের সহায়তা নিয়ে নিজস্ব ভাষায় উপস্থাপন করা শিখতে হবে। চ্যাটজিপিটি বা জেমিনি কিন্তু অনেক সময় ভুল তথ্যও দেয়। তাই রেফারেন্স যাচাই করতে হবে।’ এক্সামএআই (examai.ai) টুলটিও শিক্ষার্থীদের সহায়ক হতে পারে। এটি একটি আধুনিক টেস্ট প্রিপারেশন টুল, যা নিজস্ব এআই দিয়ে কুইজ, ফ্ল্যাশকার্ড ও স্টাডি গাইড তৈরি করে। শিক্ষার্থীরা এতে নিজের মতো করে পড়ালেখার পরিকল্পনা (পার্সোনালাইজড স্টাডি প্ল্যান) সাজাতে পারেন, বিভিন্ন বিষয়ে পরীক্ষা দিতে পারেন, আছে আরও নানা সেবা। এআই-শিক্ষক হিসেবে ক্যাকটাস এআইও (caktus.ai) শিক্ষার্থীদের জন্য বেশ কাজের। এটি রচনা ও থিসিস লেখায় সাহায্য করে, লিখতে পারে কোড। তৈরি করে দেয় গবেষণাপত্রের সারাংশ ও রেফারেন্স। এমন এআই টুল পরীক্ষার সময় প্রস্তুতিতে বেশ সহায়ক। ELSA Speak ইংরেজি উচ্চারণ উন্নত করতে সাহায্য করে। IELTS বা TOEFL প্রস্তুতির জন্য কার্যকর। বিশেষ সুবিধা : রিয়েলটাইম ফিডব্যাক, ব্যক্তিগতকৃত অনুশীলন, গেম-ভিত্তিক শেখা। Coursera/edX বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনলাইন কোর্স এবং এআই-চালিত কোর্স সুপারিশ সিস্টেম। বিশেষ সুবিধা : দক্ষতা উন্নয়ন, ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষা, পেশাদার সনদ। Socratic by Google ছবি তুলে হোমওয়ার্কের প্রশ্ন স্ক্যান করে দ্রুত সমাধান ও ব্যাখ্যা দেয়। বিশেষ সুবিধা : সহজ ব্যবহার, ভিজুয়াল ব্যাখ্যা, সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
বানান ও ব্যাকরণ পরীক্ষা : ইংরেজি লেখার ব্যাকরণ ও বানান ঠিক করে। অ্যাসাইনমেন্ট বা ইমেইল লেখায় পেশাদারিত্ব বাড়ায়। বিশেষ সুবিধা : রিয়েলটাইম সংশোধন, লেখার সুর বিশ্লেষণ, প্লেজিয়ারিজম চেক। ইংরেজি ভাষায় লেখা অ্যাসাইনমেন্টের বানান ও ব্যাকরণ ঠিক করতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থীই হিমশিম খান। দ্বিধায় ভোগেন। এক্ষেত্রে সহায়তার জন্যও আছে একাধিক এআই টুল। যেমন Grammarly বা গ্রামারলি। এই এআই টুলটি বানান থেকে শুরু করে ফুলস্টপ, কমা, বাক্য গঠন সব যাচাই করে ও সেই অনুযায়ী পরামর্শ দেয়। একটি নিবন্ধ লিখে আপনি গ্রামারলির ‘হাতে’ (পড়ুন ওয়েবসাইটে) ছেড়ে দিলেই এটি সব ভুলত্রুটি শনাক্ত করে ফেলতে পারবে। এছাড়া আছে কুইলবট (quillbot.com)। এর মাধ্যমে একই লেখাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব। প্যারাফ্রেজিং ও সারসংক্ষেপ তৈরির অও টুল। প্লেজিয়ারিজম এড়াতে সাহায্য করে। এটি বিকল্প বাক্য (রিরাইট) ও শব্দ (সিনোনিম) খুঁজতে সাহায্য করে। আমাদের অনেক শিক্ষার্থীই ইংরেজি লেখার ক্ষেত্রে দুর্বলতা আছে। বিশেষ করে ব্যাকরণ, বানান ও বাক্য গঠনের ক্ষেত্রে। এআই টুল ব্যবহার করে এই ভুলত্রুটিগুলো সংশোধন করা যায়। তবে শুধু সংশোধন করলেই হবে না। শিখতে হবে কোথায়, কেন আমার ভুল হচ্ছে। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা একটা লেখা শেষ করার পর কারও সাজেশন নেওয়ার সুযোগ পায় না। কারণ দেখানোর কেউ নেই। এক্ষেত্রে এআই হতে পারে ভরসা।’ এসব টুল শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে। এসব টুল কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে নিজের লেখার মান বাড়ানোরও চর্চা করা উচিত।
পিডিএফ ব্যবস্থাপনা : বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক সময় বড় বড় পিডিএফ পড়তে হয়। অনেক সময় পুরোটা পড়া সম্ভব হয় না। চ্যাটপিডিএফ (chatpdf.com) ও Pexels বা পেক্সেলস এবং Perpexity ব্যবহার করে সহজেই কোনো গবেষণাপত্র বা বইয়ের সারাংশ জেনে নেওয়া যায়। এটি মূল বক্তব্য, গবেষণার ফলাফল ও উপসংহার আলাদা করে দেখায়। পিডিএফ ফাইল আপলোড করে দিলেই এআই আপনাকে সারাংশ তৈরি করে দেবে। পিডিএফের কোনো একটা অংশটা নির্দিষ্ট করে প্রশ্ন করলেও উত্তর মিলবে।
ভিডিওর ট্রান্সক্রিপ্ট ও বিশ্লেষণ : অনেক সময় ভিডিও লেকচার দেখে বা পডকাস্ট শুনে আমরা নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করি। এক্ষেত্রে ইংরেজি উচ্চারণ বুঝতে অনেকে সমস্যায় পড়েন। আবার ভিডিওর দৈর্ঘ্য বেশি লম্বা হলে পুরো ভিডিও দেখে নির্দিষ্ট তথ্যটা খুঁজে বের করাও কঠিন হতে পারে। এক্ষেত্রে আপনাকে সাহায্য করবে অটার ডটএআই। (otter.ai)। এই ওয়েবসাইটে ভিডিওর কনটেন্ট লিখিত আকারে পাওয়া যায়, নোট নেওয়া সহজ হয়। ভিডিওর লিংক বা ফাইল দিয়ে দিলে এটি নিজ দায়িত্বে পুরো ট্রান্সক্রিপ্ট তৈরি করে দেয়। একই ধরনের সেবা পেতে পারেন গুগলের নোটবুকএলএম (notebooklm.google) থেকেও। ধরা যাক, আপনি যে ভিডিওটির ট্রান্সক্রিপ্ট চাচ্ছেন, সেখানে একাধিক মানুষের কণ্ঠস্বর আছে। আপনি যদি আলাদা আলাদা কণ্ঠস্বর শনাক্ত করে সেই অনুযায়ী ট্রান্সক্রিপ্ট তৈরি করে দিতে বলেন, নোটবুকএলএম আপনাকে সেটাও দেবে।
জব সিভি তৈরি : এখন শুধু চাকরির জন্য নয়, বিশ্ববিদ্যালয়জীবন থেকেই সিভি তৈরি করে রাখতে হয়। সিভি তৈরির জন্যও আছে একাধিক এআই টুল। যেমন জেটি ডটকম (zety.com) বা রেজুমে ডটআইও (resume.io)। এসব ওয়েবসাইটে ভিন্ন ভিন্ন টেমপ্লেট আছে। আপনি আপনার শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও কাজের বর্ণনা দিলে এআই পেশাদার ফরম্যাটে তা সাজিয়ে দেবে। সেজন্য নির্ধারিত ফরমে কিছু তথ্য পূরণ করতে হবে। ‘অনেক শিক্ষার্থীই জানেন না, কীভাবে একটি ভালো সিভি তৈরি করতে হয়। এমনকি অনেকে সিভি তৈরির জন্যও অন্যের কাছে ধরনা দেন। অথচ এআই টুল ব্যবহার করে সহজেই সঠিক ফরম্যাটে সিভি তৈরি করা যায়। এসব টুল শুধু সিভির ভাষা ও বিন্যাসে সাহায্য করে না, বরং চাকরির বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী কী কী দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা তুলে ধরা প্রয়োজন, সেই নির্দেশনাও দেয়।’
একাডেমিক গবেষণা : বিভিন্ন গবেষণার জন্য আমাদের অনেক ‘রেফারেন্স’ পড়তে হয়। এ ধরনের কাজেও এআই সহায়ক হতে পারে। ‘প্রাসঙ্গিক লিটারেচার রিভিউ খোঁজা সবচেয়ে কঠিন কাজ। ইলিসিট (elicit.com) একটি এআই রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট (গবেষণা সহকারী), যা কোনো প্রশ্ন দিলে সংশ্লিষ্ট গবেষণাপত্র (রিসার্চ পেপার) বের করে দেয় খুব দ্রুত। রিসার্চর্যাবিট (researchrabbit.ai) দিয়ে গবেষণার রেফারেন্স ম্যাপ করা যায়, অর্থাৎ কোন পেপার কোনটি রেফার করেছে বা সাপোর্ট করছে দেখা যায়। এসব টুলসে গবেষণার প্রশ্ন টাইপ করে দিলে এটি প্রাসঙ্গিক পেপার সাজিয়ে দেয় ও সারাংশও দিয়ে দেয়।’ Wolfram Alpha কম্পিউটেশনাল ইঞ্জিন যা গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাসসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিশ্লেষণমূলক উত্তর দেয়। বিশেষ সুবিধা : নির্ভুল সমাধান, গ্রাফ ও ডেটা বিশ্লেষণ।
কথা থেকে লেখা তৈরি : ক্লাসে অনেক সময় বক্তৃতা বা লেকচার রেকর্ড করে রাখি আমরা। পরে তা লিখিত আকারে পেলে কাজ করতে সুবিধা হয়। এক্ষেত্রে স্পিচনোটস (speechnotes.com) ব্যবহার করতে পারেন। এটি মুখের কথা বা রেকর্ডকৃত অডিওকে লেখা আকারে সাজিয়ে দিতে পারে। অডিও ফাইল আপলোড করে দিলে এআই তা শব্দে রূপান্তর করে দেয়।
ছবি ও ইনফোগ্রাফ তৈরি : বিভিন্ন অ্যাসাইনমেন্ট ও প্রেজেন্টেশনের জন্য আমাদের অনেক সময় পোস্টার, চার্ট বা ইনফোগ্রাফিকস তৈরি করতে হয়। এক্ষেত্রে ক্যানভা সহজে ও দ্রুত সমাধান দেয়। Photomath মোবাইল ক্যামেরা দিয়ে ম্যাথ সমস্যার ছবি তুলে সমাধান ও ব্যাখ্যা দেখায়। অ্যাডোবি ফায়ারফ্লাই (firefly.adobe.com) দিয়ে ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরি বা ইমেজ পরিবর্তন করা যায়। টেমপ্লেট বেছে নিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য বসালেই একটি পেশাদার ডিজাইন তৈরি হয়ে যায়। সীমিত পরিসরে ছবি তৈরির জন্য আপনি চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করতে পারেন। এ ছাড়া মিডজার্নি দিয়েও অনেক ছবি, নকশা তৈরি করা যায়। বিশেষ সুবিধা : স্টেপ-বাই-স্টেপ সমাধান, হাতে লেখা সমস্যা স্ক্যান।
দলীয় কাজ : এখন পড়ালেখার বাইরেও আমাদের নানা প্রকল্প, কাজে যুক্ত থাকতে হয়। কখন কোন কাজ, তা ঠিকমতো সাজিয়ে রাখতে নোশন এআই (notion.com) বেশ কাজের। নোট, অ্যাসাইনমেন্ট, স্টাডি প্ল্যান, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের জন্য পারফেক্ট অল-ইন-ওয়ান প্ল্যাটফর্ম। শিক্ষার্থীরা এ প্রোডাকটিভিটি টুল ব্যবহার করে সহজে নোট নিতে পারেন। বিভিন্ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও দলীয় কাজকে সহজ করে এই এআই অ্যাপ। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেকচার ও স্টাডি ম্যাটেরিয়ালের সারাংশ তৈরি করে। রিসার্চ ও অ্যাসাইনমেন্ট সংরক্ষণের জন্য ডাটাবেজ তৈরিতে সহায়তা করে। সময়মতো বিভিন্ন কাজের কথা মনে করিয়ে (টাস্ক রিমাইন্ডার) দেয়। দল বেঁধে কোনো কাজ করা আরও সহজ হয়।
এআই টুলগুলো কেবল পড়াশোনাকে সহজ করে না, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রেও বড় সহায়ক। তবে এটি কখনোই নিজস্ব শ্রম, মনোযোগ ও বুদ্ধিমত্তার বিকল্প নয়। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে, AI হতে পারে আপনার একাডেমিক সফলতার সেরা সঙ্গী। প্রযুক্তিকে কাজে লাগান, কিন্তু নিজের চিন্তাশক্তিকে শাণিত করাই হোক মূল লক্ষ্য!
সূত্র: ১. সুইস স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট জেনেভা, ২. টেকটিউনস।