মোবারক ড্রাইভার ও অচেনা ছেলে
৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:১৩
সাঈদুর রহমান লিটন : লোকটার কাঁচা-পাকা দাড়ি। বয়স আন্দাজ করলে আটত্রিশ না চল্লিশ, ঠিক বোঝা যায় না। চোখে-মুখে একটা অদ্ভুত কৌতূহল, যেন কাউকে খুঁজছেন। বেলেশ্বর বাজার থেকে আধা কিলোমিটার দূরের সেই চিরচেনা মোড়ে এসে দাঁড়ালেন তিনি। মোড়ের মাথায় আক্কাস আলীর মনিহারির দোকান, যেখানে সাবান, চিরুনি, বিস্কুটের পাশাপাশি চা-পানও মেলে। বাজারে এ দোকানটার আলাদা কদর আছে, কারণ এখানকার চা নাকি দুশ্চিন্তাও গলিয়ে দেয়।
লোকটি দোকানে ঢুকে জিজ্ঞেস করল,
ভাই, মোবারক ড্রাইভারের বাড়ি যাবো কোন পথে?
আক্কাস আলী তখন চা ঢালছিল। প্রশ্ন শুনে একটু হকচকিয়ে গেল। কারণ দৈবক্রমে দোকানের বেঞ্চে বসে ঠিক তখনই চা খাচ্ছিলেন স্বয়ং মোবারক ড্রাইভার। মোবারক ড্রাইভার মধুখালী চিনিকলের ট্রলি ড্রাইভার। চিনির মৌসুম এলেই মাঠ থেকে আখ টেনে আনেন ট্রলিতে। ড্রাইভারের পেশার কারণেই নামের সঙ্গে ড্রাইভার জুড়ে গেছে। এলাকায় কেউ তাকে শুধু মোবারক বলে ডাকে না, ড্রাইভার না বললে যেন নামটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আক্কাস আলী প্রশ্নটা শুনে বেঞ্চের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
আপনি মোবারক ড্রাইভারকে চেনেন না?
লোকটি মাথা চুলকে বলল,
না, ঠিক চিনি না। ছোটবেলায় একবার দেখেছিলাম।
এ উত্তর শুনে আক্কাস আলীর কৌতূহল বেড়ে গেল। দোকানদারের স্বভাবই এমন, কার কী সম্পর্ক না জানলে তার চা হজম হয় না। সে আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করল,
তা মোবারক ড্রাইভার আপনার কী হয়?
লোকটি এক সেকেন্ডও না ভেবে বলল,
সে আমার আব্বা হয়।
এ কথা শুনে দোকানের ভেতর যেন একসঙ্গে বাতাস থেমে গেল। মোবারক ড্রাইভারসহ দোকানে থাকা সবাই অবাক চোখে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে সবাই ভাবল, কী আজব কথা! বাবা পাশে বসে চা খাচ্ছে, অথচ ছেলে বাবাকে চিনতেই পারছে না! মোবারক ড্রাইভার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। চায়ের কাপটা বেঞ্চে রেখে হেঁটে গেলেন আগন্তুকের সামনে। চোখ কুঁচকে ভালো করে দেখলেন। বয়সে দুজন প্রায় সমান সমান। বরং মোবারক ড্রাইভারই একটু বেশি বয়স্ক মনে হচ্ছে।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
আপনি মোবারক ড্রাইভারের ছেলে?
লোকটি শান্ত গলায় বলল,
হ্যাঁ, আমি মোবারক ড্রাইভারের ছেলে।
মোবারক ড্রাইভার মনে মনে একটু হিসাব করলেন। হিসাব করা তার অভ্যাস, যদিও সেটা মূলত বিয়ের সংখ্যার হিসাব। কারণ মোবারক ড্রাইভারের একটা বিখ্যাত বদাভ্যাস আছে, তিনি প্রায় প্রতি বছরই বিয়ে করেন। বিয়ে করতে করতে এ পর্যন্ত করেছেন একুশটা। কয়টা বিয়ে করেছেন, সেটা তিনি নির্ভুলভাবে বলতে পারেন, কিন্তু কোন স্ত্রীর কয়টা সন্তান, কার নাম কীÑ এ হিসাবটা মাঝেমধ্যে গুলিয়ে ফেলেন।
কিছু বিয়ে ডিভোর্সে শেষ হয়েছে, কিছু স্ত্রী আবার নিজে নিজেই আর ফেরেনি। বর্তমানে তার বাড়িতে আট-নয়জন স্ত্রী বাস করেন। বউপাগল মানুষটি আবার বউ রসিকও বটে। সব স্ত্রীকে একই রঙের ব্লাউজ, একই রঙের স্যান্ডেল কিনে দেন, যাতে কেউ আলাদা কিছু চাইতে না পারে।
মোবারক ড্রাইভার এবার জিজ্ঞেস করলেন,
তুমি জানলে কীভাবে যে মোবারক ড্রাইভার তোমার বাবা?
লোকটি বলল,
আমার মা বলেছে।
তোমার মার নাম কী?
সখিনা বানু।
নামটা শুনেই মোবারক ড্রাইভারের চোখে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। তিনি চুপচাপ বললেন,
সখিনা বানু, আমার প্রথম স্ত্রীর নাম। আমি ওকে সখী বলে ডাকতাম।
দোকানের সবাই নিঃশব্দে গল্প শুনছে। মোবারক ড্রাইভার বলতে লাগলেন,
বিয়ের পর দুই বছর শ্বশুরবাড়িতে ছিলাম। তখন যশোর সুগার মিলে চাকরি করতাম। পরে মধুখালীতে ট্রান্সফার হলে বলেছিলাম এখানে আসতে। ও আর আসে নাই, আমিও যাই নাই।
তিনি একদৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকিয়ে বললেন,
তুমি তাহলে আমার সখীর ছেলে।
লোকটার চোখ ভিজে উঠল।
হ্যাঁ, আব্বু। আমি শাখাওয়াত। অনেক খুঁজে আপনাকে বের করেছি। আমার মা এখনো আপনার জন্য কাঁদে।
আর দেরি হয়নি। বাপ-ছেলে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। আক্কাস আলীর দোকানের বেঞ্চ সেদিন সাক্ষী থাকল এক অদ্ভুত মিলনের, যেখানে বাবা-ছেলের বয়স প্রায় সমান, কিন্তু সম্পর্কের গভীরতা অগাধ।
চা ঠাণ্ডা হয়ে গেল, দোকান বন্ধ হওয়ার সময় পেরিয়ে গেল, কিন্তু সেই মোড়ে দাঁড়িয়ে বাপ-বেটা অফুরন্ত গল্পে মেতে রইল।