মুসলিম ও কাফিরের মাঝে পার্থক্য
২২ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:২৭
॥ প্রফেসর তোহুর আহমদ হিলালী ॥
ইসলাম আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা (নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট একমাত্র দীন হলো ইসলাম। -আলে ইমরান : ১৯। এবং আল্লাহপাকের দাবি, তাঁর বান্দারা জীবনের সকল ক্ষেত্রে পরিপূর্ণভাবে ইসলাম মেনে চলবে। তাঁর বাণী, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা পুরোপুরি ইসলামে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না; নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন’। -সূরা বাকারা : ২০৮। কুরআন আল্লাহপাকের শেষ নাজিলকৃত কিতাব এবং মানবজীবনের সকল সমস্যার সমাধান রয়েছে এই কুরআনে। মানুষের সমগ্র জীবনে যেখানে কুরআনকে এড়িয়ে চলা হয়, আল্লাহর ভাষায় সেখানে মানা হয় শয়তানকে। আর শয়তান তার অনুসারীদের সাথে নিয়ে চিরস্থায়ী জাহান্নামে যাবে।
আল্লাহপাক প্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ দীন ইসলামকে তাঁর বান্দারা খণ্ড-বিখণ্ড করেছে। ব্যক্তিগত জীবনে নামাজ-রোজা-হজ-যাকাত পালনকারী অনেককেই দেখা যায় তারা রাজনীতি ও অর্থনৈতিক জীবনে ধর্মনিরপেক্ষ। এদের উদ্দেশ্যে আল্লাহপাক বলেছেন, ‘তোমরা কি দীনের কিছু অংশ মানবে এবং কিছু অংশ অমান্য করবে, তাহলে দুনিয়ার জীবনে রয়েছে জিল্লতি ও আখিরাতে রয়েছে ভয়াবহ আজাব’। -সূরা বাকারা : ৮৫। আজ মুসলমানদের জীবনে জিল্লতির পেছনে মূল কারণ জমিনে দীন প্রতিষ্ঠিত না থাকা। দীন কায়েমের চেষ্টা-প্রচেষ্টাকে আল্লাহপাক সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর বাণী, ‘তিনি তোমাদের জন্য দীনের সেসব নিয়মকানুন নির্ধারিত করেছেন, যার নির্দেশ তিনি নূহকে দিয়েছিলেন এবং (হে মুহাম্মদ) যা এখন আমি তোমার কাছে অহির মাধ্যমে পাঠিয়েছি। আর যার আদেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহিম, মূসা ও ইসাকে। তার সাথে তাগিদ করেছিলাম এই বলে যে, দীন কায়েম করো এবং এ ব্যাপারে মতপার্থক্য সৃষ্টি করো না’। -সূরা শুরা : ১৩। দীন কায়েমের প্রশ্নে মতপার্থক্য করার সুযোগ নেই। তবে দীন কায়েমের প্রক্রিয়া-পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু দীন কায়েমের চেষ্টা-প্রচেষ্টা ছাড়া যে জীবন সে জীবন মুসলিমের জীবন নয়। দীন কায়েমের চেষ্টা-প্রচেষ্টাকে কুরআনের ভাষায় বলা হয়েছে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে লোক মারা গেল অথচ না জিহাদ করলো আর না জিহাদের বাসনা অন্তরে পোষণ করলো, তার মৃত্যু হলো মুনাফিকের মৃত্যু।
অতীতকালের নবী-রাসূলদের যে দায়িত্ব আমাদের প্রিয়তম নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপরও একই দায়িত্ব। আল্লাহ তায়ালার স্পষ্ট উক্তি, ‘তিনি আপন রাসূলকে হেদায়াত ও সঠিক জীবনব্যবস্থা (দীনে হক) দিয়ে পাঠিয়েছেন- যাতে সকল জীবনব্যবস্থার ওপর একে বিজয়ী করতে পারেন, মুশরিকদের কাছে তা যতই অসহনীয় হোক’। -সূরা সফ : ৯। একই কথা তিনি কুরআন মজিদের আরো দুই জায়গায় সূরা তাওবা (৩৩ নং) ও সূরা ফাতাহ্ (২৮ নং) উল্লেখ করেছেন। সূরা ফাতাহর ২৮নং আয়াতে বলেছেন, আল্লাহর সাক্ষ্যই যথেষ্ট। দুনিয়ার মানুষ কে কী বললো, সেটা আদৌ বিবেচ্য নয়, বিবেচ্য কেবল আল্লাহর বাণীর। মানুষ আল্লাহপাকের বান্দা হওয়ার সাথে সাথে তাঁর খলিফা (প্রতিনিধি) এবং এটিই তার বড় পরিচয়। এ পরিচয় তাকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন করেছে। সরকারের কর্মকতা ও কর্মচারীরা সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেরা যেমন সরকারের বিধিবিধান মেনে চলে সাথে সাথে তাদের দায়িত্ব হলো নিজেদের আওতাধীন সকলকে মেনে চলতে বাধ্য করা। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াত কেউ মেনে নিলে তার দায়িত্ব হয়ে পড়ে অন্যদের নিকট পৌঁছে দেয়া। আল্লাহর দীন ইসলামকে সকল জীবনব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব যেমন নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর তেমনি সকল মুসলমানের ওপরও একই দায়িত্ব। ঈমানের দাবিদার কারো দীন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা-প্রচেষ্টা থেকে নিজেকে বিরত রাখার সুযোগ নেই। আল্লাহর বাণী, ‘যারা ঈমানের পথ অবলম্বন করেছে তারা লড়াই করে আল্লাহর পথে। আর যারা কুফরির পথ অবলম্বন করেছে তারা লড়াই করে তাগুতের পথে। কাজেই শয়তানের সঙ্গী-সাথীদের বিরুদ্ধে লড়াই করো আর বিশ্বাস রেখো, শয়তানের ষড়যন্ত্র আসলেই দুর্বল’। -সূরা নিসা : ৭৬। এ আয়াতে ঈমান ও কুফরের পার্থক্য স্পষ্ট করা হয়েছে। ইসলামই কেবল আল্লাহপাকের একমাত্র দীন এবং এর বাইরে যা কিছু, তা সবই তাগুতের দীন বা ব্যবস্থা।
সকল নবী ও রাসূলের দাওয়াত ছিল অভিন্ন- ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। ভিন্নভাবে বলা যায়, ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং তাগুতকে অস্বীকার করো’। -সূরা নাহল : ৩৬। আল্লাহকে মেনে চলার পাশাপাশি তাগুতকে মেনে চলার নাম শিরক। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ-নিষেধ শোনার সাথে সাথে একজন মুসলমানের কথা হবে, ‘আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম’। -সূরা বাকারা : ২৮৫। কোনো প্রশ্ন নেই এবং প্রশ্ন করার সুযোগও নেই। শরিয়া আইন মানি না- এ কথা কেউ প্রকাশ্যে বললে বা তা মেনে নিলে তার আর মুসলিম থাকার অধিকার নেই।
ইসলাম আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে একমাত্র দীন বা জীবনব্যবস্থা। ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুর দিকে আহ্বান জানানো শিরক এবং তেমন হলে জাহান্নামে প্রবেশ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এ প্রসঙ্গে হজরত হারেস আল আশয়ারী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি তোমাদের পাঁচটি কাজের আদেশ করছি (অন্য রেওয়াতে আছে, আমার আল্লাহ আমাকে পাঁচটি বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন) (১) জামাতবদ্ধ হওয়া, (২) নেতার আদেশ মন দিয়ে শোনা, (৩) নেতার আদেশ মেনে চলা, (৪) আল্লাহর পথে হিজরত করা (আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজ বর্জন করা) ও (৫) আল্লাহর পথে জিহাদ করা। আর তোমাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি সংগঠন থেকে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরে যাবে, সে নিজের গর্দান থেকে ইসলামের রশি খুলে ফেলবে, তবে যদি সংগঠনে প্রত্যাবর্তন করে তো স্বতন্ত্র কথা। আর যে ব্যক্তি জাহেলিয়াতের দিকে লোকদের আহ্বান জানাবে সে জাহান্নামে যাবে। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.), সালাত কায়েম ও ছিয়াম পালন করা সত্ত্বেও? আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, সালাত কায়েম ও সিয়াম পালন এবং নিজেকে মুসলিম দাবি করা সত্ত্বেও’।আহমদ ও তিরমিযী। তিনি আরো বলেছেন, ‘জামায়াতের ওপর রয়েছে আল্লাহর রহমত। যে ব্যক্তি জামাত ছাড়া একা চলে, সে তো একাকী দোযখের পথেই ধাবিত হয়’। তিরমিজি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বড়ো শক্ত কথা বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আনুগত্য পরিত্যাগ করে এবং জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তার মৃত্যু হবে জাহেলিয়াতের মৃত্যু’। -মুসলিম।
আল্লাহপাক মুসলমানদের সর্বোত্তম উম্মাহ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, ‘তোমরা সর্বোত্তম দল। তোমাদের সৃষ্টিই করা হয়েছে মানব জাতির কল্যাণ সাধনের জন্য। ভালো কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজে নিষেধ করবে’। -সূরা আলে ইমরান : ১১০। এই যে ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার ক্ষমতা রয়েছে রাষ্ট্রশক্তির। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালানো সকল মুসলিমের ওপর অপরিহার্য। ইসলামী রাষ্ট্র বলতে বোঝায় কল্যাণমূলক সমাজ, এক ইনসাফপূর্ণ সমাজ যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না, থাকবে না শোষণ-বঞ্চনা। প্রতি জুমায় খতিব ময়োদয় তেলাওয়াত করেন, আল্লাহ ন্যায়-নীতি, পরোপকার ও আত্মীয়-স্বজনদের দান করার হুকুম দেন এবং অশ্লীল-নির্লজ্জতা ও দুষ্কৃত এবং অত্যাচার-বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন, যাতে তোমরা শিক্ষালাভ করতে পারো’। -সূরা নাহল : ৯০।
ইসলামী রাষ্ট্র আল্লাহপাকের নেয়ামত। আল্লাহপাক এটি তখনই দান করেন, যখন একদল যোগ্য লোক তৈরি হয় এবং সমাজের অধিকাংশ মানুষ তা কামনা করে। তাঁর বাণী, ‘বলো, হে আল্লাহ! তুমি রাজত্বের মালিক, যাকে চাও রাজত্ব দান করো, আর যার থেকে চাও রাজত্ব কেড়ে নাও এবং যাকে চাও সম্মান দান করো। আর যাকে চাও অপমানিত করো, তোমার হাতেই কল্যাণ, নিশ্চয়ই তুমি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান’। -সূরা আলে ইমরান : ২৬। জমিনে মুমিন ও কাফির উভয়ের উপস্থিতি থাকলে আল্লাহপাক চান জমিনে তাঁর মুমিন বান্দারা প্রতিষ্ঠিত হোক। আল্লাহপাকের এ চাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু আল্লাহর এ চাওয়াটা পূরণ হবে তাঁরই দেয়া নিয়মানুসারে। তাঁর বাণী, ‘আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনবে ও সৎকাজ করবে তাদেরকে তিনি পৃথিবীতে ঠিক তেমনিভাবে খিলাফত দান করবেন, যেমন তাদের পূর্বে অতিক্রান্ত লোকদের দান করেছিলেন, তাদের জন্য তাদের দীনকে মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন, যে দীনটি আল্লাহ তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়ভীতির অবস্থাকে নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করে দেবেন। তারা যেন শুধু আমার ইবাদত করে এবং আমার সাথে কাউকে শরিক না করে। আর যারা এরপরও কুফরি করবে তারাই ফাসেক’। -সূরা নূর : ৫৫।
কোনো ব্যক্তি যদি নিজেকে মুসলিম দাবি করে- তাহলে তাকে অবশ্যই আল্লাহর পথে চেষ্টা-প্রচেষ্টাকারী (জিহাদকারী) হতে হবে। ভীরু ও কাপুরুষের জন্য ইসলাম নয়। সূরা নিসার ৭৪নং আয়াতে আল্লাহপাক বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে সংগ্রাম করার যোগ্য কেবল তারাই যারা পরকালের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবন বিক্রয় করে দিতে পারে। যে কেউ আল্লাহর পথে লড়াই করবে, সে নিহত হোক বা বিজয়ী হোক তাকে অবশ্যই আমি মহাপুরস্কার দান করবো।’ জান্নাত কোনো সহজলভ্য জিনিস নয়। দুনিয়ার আরাম-আয়েশ, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য যে হাসিমুখে বিসর্জন করতে পারে তার পক্ষেই সম্ভব আল্লাহর পথে সংগ্রাম করা। জান্নাত প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আল্লাহপাকের সাথে মুমিনের একটি কেনাবেচার চুক্তি রয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ জান্নাতের বিনিময়ে মুমিনদের জানমাল খরিদ করে নিয়েছেন, তারা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করে, মারে ও মরে। তাদের প্রতি (জান্নাত দানের ওয়াদা) তাওরাত, ইনজিল ও কুরআনে আল্লাহর জিম্মায় একটি পাকাপোক্ত ওয়াদা। আল্লাহর চাইতে বেশি ওয়াদা পালনকারী আর কে আছে? কাজেই তোমরা আল্লাহর সাথে যে কেনা-বেচা করছো, সেজন্য আনন্দ করো। এটিই সবচেয়ে বড়ো সাফল্য।’ -সূরা তওবা : ১১০। ইদানীং কেউ কেউ বলেন, একটি বিশেষ দল জান্নাতের টিকিট বিক্রি করছে। এমন কথা স্রেফ অজ্ঞতার কারণেই বলে থাকেন। আসলে জান্নাতের ক্রয়-বিক্রয় করেন স্বয়ং আল্লাহপাক। কারণ জান্নাতের মালিক আল্লাহ। আল্লাহর বান্দারা জান্নাতে যাওয়ার পথ বলে দেন। তা মঞ্জুর করার ক্ষমতা একান্তভাবে আল্লাহর।
আমরা আমাদের আলোচনার সারসংক্ষেপ টানতে পারি এভাবে, যে ব্যক্তি ইসলামকে আল্লাহপাকের একমাত্র দীন হিসেবে বিশ্বাস করে, বাস্তব জীবনে মেনে চলে, ইসলামকে সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা চালায় এবং দীনের বিজয় কামনা করে সেই প্রকৃত মুসলিম এবং তার জন্য রয়েছে আল্লাহর ক্ষমা ও মহাপুরস্কার জান্নাত। পক্ষান্তরে যে অমান্য করে ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিরোধিতা করে সে কাফির। কুরআন মজিদে স্পষ্ট বলা হয়েছে, আল্লাহর দেয়া বিধান অনুসারে যারা ফয়সালা করেনা তারা কাফির, তারা জালিম, তারা ফাসিক। -সূরা মায়েদা-৪৪, ৪৫, ৪৭। আল্লাহপাক আমাদের সঠিক উপলব্ধি দান করুন এবং মুসলিম অবস্থায় তাঁর কাছে ফিরে যাওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : উপাধ্যক্ষ (অব.), কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ।