প্রসঙ্গ : বাংলাদেশের ওপরতলা
১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:২০
॥ মাহবুবুল হক ॥
বাংলাদেশের কিছু ঐতিহ্যগত সমস্যা রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো সরকারের আমলা ও শীর্ষস্তরের কর্মচারী। তারা নিজেদের জনগণের সেবক মনে করে না। মনে করে জনগণের শাসক। ব্রিটিশ আমল থেকেই এদেশের জনগণ দেখেছে বা উপলব্ধি করেছে, মোটাদাগে এদেশে দুই শ্রেণির মানুষ রয়েছে এক শ্রেণি শাসক, অপর শ্রেণি শোষিত। শাসকের দ্বারা সংশ্লিষ্ট জনগণ যদি শোষিত না হতো অর্থাৎ শাসক ব্রিটিশরা যদি শোষণ না করতো বা শোষক না হতো, তাহলে হয়তো আরও অনেকদিন তারা এদেশে অবস্থান করতে পারতো। তবে ইতিহাস সাক্ষী, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া মুুসলিম খলিফা শাসক বা বাদশাহরা অন্যদের শাসন করলেও কোনো দেশ বা জাতিকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করেনি। অর্থাৎ মুসলমানরা গড়ে উপনিবেশ কায়েম করেনি। আজ পৃথিবীতে ৫৭টি মুসলিম দেশ আছে। অর্থাৎ ৪ ভাগের ২ ভাগ মুসলিম দেশ। এদেশগুলো রাসূল (সা.)-এর জমানায় মুসলিম দেশ ছিল না। ছিল নানা ধর্ম ও জাতির দেশ। কিন্তু খোলাফায়ে রাশেদীনের সময় মুসলিম দেশের সংখ্যা বেড়েছে। খলিফা ওমর (রা.)-কে উদ্দেশ করে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন-
অর্ধ পৃথিবী করেছ শাসন
ধুলার তক্তে বসি।
খেজুর পাতার প্রাসাদ তোমার
বারে বারে গেছে খসি।
শুধু এ চার লাইন যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখবো মুসলিম খলিফারা শাসক ছিলেন, কিন্তু শোষক ছিলেন না। শোষক হলে তো খেজুর পাতার প্রাসাদ তৈরি হতো না। প্রাসাদ তৈরি হতো মণিমুক্তায়। যাহোক এটা ইতিহাসের একটা গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। সেদিকে আমরা যাচ্ছি না।
প্রমাণিত হয়েছে ইংরেজরা, ফরাসিরা, রাশিয়ান রাজারা সবাই ছিলেন কমবেশি শোষক। তারা উপনিবেশ কায়েম করে সংশ্লিষ্ট জনগণকে শোষণ করেছে। তাদের প্রজা বানিয়েছে। আর নিজেরা হয়েছে রাজা। সেই রাজা থেকেই রাজতন্ত্র। আর প্রজা থেকেই প্রজাতন্ত্র। আমরা রাজতন্ত্র ভেঙে প্রজাতন্ত্র সৃষ্টি করেছি। যদিও ১৯৪৭ সালে প্রজাতন্ত্র শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। আবেগের কারণে ভূ-ভারতকে বিভক্ত করে যে এক ভাগকে পাকিস্তান নামে অভিহিত করা হলো, তখন তাকে বলা হলো ইসলামী রাষ্ট্র। কিন্তু সেই ইসলামী রাষ্ট্র সত্যিকার অর্থে ইসলামী রাষ্ট্র হলো না। এমনকি মুসলিম রাষ্ট্রও হলো না। যা হলো, তাকে বড়জোর বলা যায় মুসলমানের রাষ্ট্র বা মুসলমানদের রাষ্ট্র। ভূ-ভারত বিভক্ত হয়ে এক বিভক্ত রাষ্ট্র হলো মুসলমানের রাষ্ট্র। কিন্তু অন্য রাষ্ট্রটি নামে হিন্দু রাষ্ট্র হলো না। কিন্তু কাজে তারা সত্যি সত্যি হিন্দু রাষ্ট্র হয়ে গেল। নামে তারা হলো ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এ চালাকিটা করলো ব্রিটিশ রাজতন্ত্র। তারা হিন্দুদের বোঝাতে সক্ষম হলো যে, নেপাল হিন্দু রাষ্ট্র হওয়ার কারণে শক্তিশালী দেশগুলোকে আকর্ষণ করতে পারেনি। সে কারণে তারা শুরু থেকেই বৈদেশিক সাহায্য খুব একটা পায়নি।
মুসলিমরা তাদের দেশকে ইসলামী রাষ্ট্র বলায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে কিছু সাহায্য-সহযোগিতা হয়তো পাবে। কিন্তু বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো থেকে ভবিষ্যতে হয়তো প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা পাবে না। রাষ্ট্র-শাসিত ধর্ম বা ইসলাম-শাসিত রাষ্ট্র কোনোদিনই তথাকথিত সেক্যুলার বিশ্ব থেকে সাহায্য-সহযোগিতা পাবে না। যাহোক এসব পুরনো কথা। মোটামুটি সবাই জানে।
ইতিহাস স্বাক্ষী পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে শুধু যে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বিতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছিল, তা নয়। পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু কিছু অঞ্চলও প্রথমে অস্থির এবং ধীরে ধীরে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। এর কারণ শুধু পাকিস্তানিরা নয়, কারণ ইহুদি ও নাসারা ষড়যন্ত্র। পাকিস্তান ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট স্বাধীনতা পেলেও পুরোপুরি স্বাধীনতা পেতে বেশ কয়েক বছর লেগেছিল।
পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল ছিলেন ব্রিটিশ। পাঞ্জাব ও সীমান্ত (ভারত) ঘেঁষা সীমান্ত গান্ধী ছিলেন ব্রিটিশদের বন্ধু। ব্রিটিশরা বহু পূর্ব থেকেই তাদের শাসনে ও প্রশাসনে পাঞ্জাবের হঠকারী মানুষকে আমলা-কামলা বানিয়ে রেখেছিল। এ স্থানীয় আমলারা ছিল সাদা চামড়ার ব্রিটিশদের বশংবদ। স্বাধীনতা পেলেও পাকিস্তানিরা যাতে ব্রিটিশদের অনুকরণে ও অনুসরণে দেশ পরিচালনা করে- এটাই ছিল তাদের লক্ষ্য। এ বিশ্বাসঘাতকতায় তারা পরিপূর্ণভাবে সফল ও সার্থক হয়েছিল। বড় কারণ, পাকিস্তানে মূলত শাসন-প্রশাসনে নিয়োজিত ছিল ব্রিটিশদের পক্ষপুষ্ট দেশীয় আমলা ও তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট ও সংযুক্ত ভূস্বামী, রাজা, জমিদার, তালুকদার ইত্যাদি। এদের নিজস্ব ও পারিবারিক কৃষ্টি ছিল পাশ্চাত্য সভ্যতা। এদের খানাপিনা, পোশাক-আশাক, লাইফ স্টাইল, জীবনাচরণ সবই ছিল ব্রিটিশদের মতো। ব্রিটিশরা উন্নত সভ্যতার অধিকারীÑ এটা তারা দর্শনগতভাবে মানতো এবং সে অনুযায়ী তাদের জীবন ও জগৎ সাজিয়ে নিয়েছিল। এ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তারা পাকিস্তানকে সবল ও শক্তিশালী হতে দেয়নি। এ পটভূমি ও প্রেক্ষাপটে তারা শুধু পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে দুর্বল করেনি, দুর্বল করেছে পাঞ্জাব ছাড়া সকল অঞ্চল।
পাকিস্তান যখন সৃষ্টি হলো, তখনই তো ইন্ডিয়ার রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কেউ কেউ বলেছিলেন, পাকিস্তান তো অল্প দিনের দেশ। এটাকে আমরা ম্যানেজ করে আমাদের সাথে সংযুক্ত করে ফেলবো। এ কথার বিরোধিতা হয়েছিল, সরব কথা উঠেছিল, কিন্তু কার্যত কোনো কিছু হয়নি।
এসব যখন ভাবি, তখন বার বারই মনে পড়ে লর্ড ম্যাকলের সেই বিখ্যাত কথাগুলো। তিনি তাদের উপনিবেশের স্বার্থে ও আধিপত্যবাদের স্বার্থে বলেছিলেন, আমরা ‘শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে এমন একটি জাতি (ভারতের) গড়ে তুলবো, যারা রক্তে-বর্ণে-ধর্মে, জাতীয়তায়, আচার-আচরণে, ঐতিহ্যে-ইতিহাসে, চলনে-বলনে, যাপিত জীবনে হবে ভারতীয়, কিন্তু দর্শনে, মননে, চিন্তা-চেতনায়, দৃষ্টিভঙ্গিতে, আদর্শে, সভ্যতায়, কৃষ্টি ও সাংস্কৃতিতে, পোশাকে-পরিচ্ছদে, বোধেবিবেচনায়, আইন-কানুনে, ব্যবস্থাপনায়, পরিকল্পনায় হবে ব্রিটিশ। লর্ড ম্যাকলের এ অভিজ্ঞা ব্রিটিশ সরকার গ্রহণ করে নিয়ে সে অনুযায়ী শিক্ষা-দীক্ষায়, অফিসে-আদালতে, লেনদেনে, ভূমি সংস্কারে, নীল চাষে, আমদানি-রফতানিতে, আইন-বিধিতে, ভাষায়, বিনোদনে, সংস্কৃতিতে স্থানীয় ব্রিটিশ নাগরিক গড়ে তুলেছিল।
এর বিপরীতে সাধারণ মুসলিমরা গড়ে তুললো কওমি মাদরাসা, আর সাধারণ হিন্দুরা গড়ে তুলেছিল টোল। কোনোটাই উপযোগী ভারতীয় গড়তে ব্যর্থ হলো। ইংরেজরা ইহুদি আলেমদের সাহায্য নিয়ে গড়ে তুললো আলিয়া মাদরাসা। শুরুতে যেখানে ছিল ইংরেজ অধ্যক্ষ বা অধ্যাপক, সেখানে খুব সূক্ষ্মভাবে গড়ে তোলা হলো ইংরেজসদৃশ আলেম। জানা যায়, ব্রিটিশরা মুসলিম নাম পর্যন্ত বিকৃত করেছে তাদের স্বার্থে। মুসলিম ছাড়া অন্য কোনো জাতি ভারতে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এত আন্দোলন-সংগ্রাম করেনি। সে কারণে মুসলিমদের নাম রাখা হয়েছিল গঁংপষবসধহ. মাংসপেশির মাধ্যমে যারা মারামারি করে, তাদের ইংরেজিতে মাসলম্যান বলে। সাধারণত গুণ্ডা-পাণ্ডারা এ ধরনের নিকৃষ্ট কাজ করে। তারা ক্ষুব্ধ বা নিষ্ঠুর হলে হাত চালায়। হাতের ব্যবহারের মাধ্যমে শত্রুকে আহত করে। এ মাসলম্যান শব্দটি কালক্রমে ‘মোসলমান’ শব্দে পরিণত হয়, যা এখনো নানা অবস্থা বা ব্যবস্থায় চালু আছে। প্রথমে ছিল মোছলমান। পরে হলো মোসলমান, আর এখন হয়েছে মুসলমান। অথচ কুরআনে আছে এ শব্দটি মুসলিম হিসেবে।
জানা যায়, ব্রিটিশরা ৭০০০ ইহুদি আলেমের মাধ্যমে আমাদের হাদিস শাস্ত্রকে বিকৃত করেছে। জাল হাদিস তৈরি করেছে। অপ্রমাণিত হাদিস বানিয়েছে। ভুয়া হাদিস সৃষ্টি করেছে। শুধু তাই নয়, মুসলিম ছাত্ররা যাতে মাদরাসায় কুরআন পড়তে না পারে, তারও ব্যবস্থা করেছে। সে কারণে আমাদের মাদরাসাগুলোয় কুরআন খুব বেশি একটা পড়ানো হয় না। পড়ানো হয় অশুদ্ধ ও জাল হাদিস। ফলে মাজহাবের পর মাজহাব তৈরি হচ্ছে। গোষ্ঠীর পর গোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে। দলের পর দল তৈরি হচ্ছে। ঐক্য বিনষ্ট হচ্ছে। মুসলিমদের এককাতারে থাকার কথা। কিন্তু হয়ে গেছে শত শত কাতার। এসব বিষয় এখন শুধু মুসলিম নয়, বিশ্বের সবাই জানে।
ইতিহাসের এসব নানা কারণে পাকিস্তানের পাঞ্জাবী আমলাদের কারণেই মূলত পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যা ছিল পূর্বপরিকল্পনার বিরাট অংশ।
১৯৭১ সালে দ্বিতীয় স্বাধীনতা আমরা অর্জন করলাম। কিন্তু যে যে কারণে আমরা বিচ্ছিন্ন হলাম, সেসব কারণ বা ত্রুটি আমরা দূর করার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করলাম না। ওঈঝ থেকে ঈঝচ, ঈঝচ থেকে ইঈঝ করা হলো, কিন্তু আদর্শগত, জাতিসত্তাগত, আত্মপরিচয়গত কোনো রূপরেখা আমরা প্রণয়ন করলাম না। জাতির মূল ভিত্তি আমরা তৈরি করলাম না। বীজতলা থেকে বীজ আহরণ করলাম না। চারাগাছ তো শত শত এদিক-সেদিক পড়েছিল, সেসব তো আহরণ করলাম না।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে আবোল-তাবোল নানা বুলি আমরা আওড়ালাম। মুজিববাদ থেকে শুরু করে পৃথিবীতে দেশে দেশে যত মতবাদ ও তথাকথিত আদর্শ তখন বিদ্যমান ছিল, সবকিছু আমরা না জেনে না বুঝে গ্রহণ করে নিলাম। সবকিছুই আমাদের ধার করা। কমিউনিজম তখন যায় যায় অবস্থায়! লাইফসাপোর্ট দিয়ে রাখা হয়েছে। গর্বাচেভ ক্যাপিটালিজমের বাঘা বাঘা বোয়াল থেকে ডোনেশন সংগ্রহ করে কমিউনিজম রক্ষা করার শেষ চেষ্টা করেছেন। সুতরাং কমিউনিজম শব্দটি স্ট্র্যাটেজির জন্য বাদ দিয়ে বাদবাকি সকল মতবাদ তথা আদর্শ গ্রহণ করা হয়। যেমন গণতন্ত্র (অর্থাৎ পুঁজিবাদ), সমাজতন্ত্র (অর্থাৎ সাম্যবাদ), ধর্মনিরপেক্ষতা (অর্থাৎ ধর্মহীনতা বা সেক্যুলারিজম), জাতীয়তাবাদ অর্থাৎ গুড অর ব্যাড, উই আর দি বেস্ট। ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি, চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি, আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’ অথবা ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি, সকল দেশের রানি তুমি আমার জন্মভূমি, সে যে আমার জন্মভূমি।’
পূর্বেই উল্লেখ করেছি, ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ সাল থেকে ইন্ডিয়া স্বাধীনভাবে নিজের দেশ ও দশকে গড়তে পেরেছিল। অর্থাৎ আপনভাবে গড়ার সুযোগ পেয়েছিল। ব্রিটিশরা লোকদেখানোর জন্য হলেও স্বাধীনতা ঘোষণার সাথে সাথে ইন্ডিয়া ছেড়ে চলে গিয়েছিল, কিন্তু পাকিস্তানের বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল যে, একটু সময় লাগবে, পাকিস্তানের স্থপতি অসুস্থ। সুস্থ হওয়া পর্যন্ত ব্রিটিশদের অবস্থান এখানে জরুরি। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ইন্তেকাল করলেন। ইন্তেকালের পূর্বে তিনি পাকিস্তানকে সেক্যুলার দেশ বানানোর কথা বললেন, পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসির কথা বললেন। পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল তখনো ব্রিটিশ। রাজ্য ও সীমান্তের ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে তখন ইন্ডিয়ার সাথে ঝগড়া-বিবাদ। শুধু ঝগড়া-বিবাদ নয়, যুক্তি-তর্কের লড়াই, শক্তির লড়াই, সাপোর্টারের লড়াই। ব্রিটিশদের সার্বিক অবস্থা তখন আইসিইউ। তারা ইন্ডিয়ার পক্ষে থাকলো। বাধ্য হয়ে পাকিস্তান মার্কিন যক্তরাষ্ট্রকে আহ্বান জানালো তাদের সামরিক বাহিনী গড়ে দিতে। সেই গড়ার কাজ এখনো চলছে। মাঝখান দিয়ে ইঙ্গ-মার্কিন ষড়যন্ত্রে পাকিস্তান হায়দরাবাদ, কাশ্মীর, জুনাগড়, মানভেদর হারালো। পশ্চিম বাংলার বিষয়টি আমরা হারালাম অনেক পূর্বে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ষড়যন্ত্রে।
পাকিস্তানের নাম বা পরিচয় ছিল ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তান। এটা বলবৎ বা কার্যকর করার বিষয়ে পাকিস্তানের আলেমরা ছাড়া অন্য কোনো পক্ষ রাজি বা খুশি ছিল না। অন্যসব পক্ষ; বিশেষ করে পাঞ্জাবী আমলারা মোটেও চাচ্ছিল না সব পক্ষ বা চিন্তা-চেতনা অব্যাহত থাক। তারা এতটাই সক্রিয় ছিল যে, এ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইন্ডিয়া, ব্রিটিশ সরকারও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তারা নানাভাবে যোগাযোগ রক্ষা করেছিল। এরই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের আলেম সমাজ আদর্শ প্রস্তাবের দাবি উত্থাপন করেন। পাকিস্তানে যখন আদর্শ প্রস্তাব নিয়ে দড়ি টানাটানি চলছে, পূর্ব পাকিস্তানে তখন মুসলিম লীগ ভাঙার অপচেষ্টা শুরু হয়েছে। এর নেতৃত্বে ছিলেন শেরেবাংলা একে ফজলুল হক ও আল্লামা আবুল হাসেম ছাড়া অন্য সবাই। মুসলিম লীগ শব্দটি সাম্প্রদায়িক। সুতরাং সাম্প্রদায়িক শব্দ রাখা যাবে না। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গড়ে উঠলো ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ।’ নির্বাচনের উদ্যোগ ও আয়োজন চলল। ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’-এর সক্রিয় উদ্যোগে নির্বাচনের জন্য ‘যুক্তফ্রন্ট’ গড়ে তোলা হলো। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিজয় লাভ করলো, মুসলিম লীগ পরাভূত হলো। সেই যে পরাজিত বা পরাভূত হওয়া, আর মুসলিম লীগ সামনে এসে দাঁড়াতে পারেনি।
যে ঢাকায় ১৯০৬ সালে মুসিলম লীগের জন্ম, সে ঢাকায় মুসলিম লীগের মৃত্যু হলো ১৯৫৪ সালে। অর্থাৎ মুসলিম লীগের হায়াত ছিল মাত্র ৪৮ বছর। এরপর এ লীগের নামে কত দল সৃষ্টি হলো, যেমন কনভেনশন মুসলিম লীগ, কাউন্সিল মুসলিম লীগ, প্রগ্রেসিভ মুসলিম লীগ। কিন্তু কোনোটাতেই কোনো কাজ হলো না। মুসলিম লীগের আর পুনর্জাগরণ হলো না।
আদর্শ প্রস্তাব পাকিস্তানে গৃহীত হলো, ততদিনে পাকিস্তানের পূর্বাংশ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বিশেষ করে রাজনীতির ময়দান থেকে উধাও হয়ে গেল। ‘আওয়ামী মুসলিম লীগে’র নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বিলীন হয়ে গেল। এ প্রক্রিয়ায় বা ষড়যন্ত্রে ‘ইসলাম ও মুসলিম’ পূর্ব পাকিস্তান থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। ইতিহাস সাক্ষী শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে পাকিস্তানের আমলা ভূ-স্বামী ও ব্যবসায়ীদের গভীর সম্পর্ক ছিল। তাদের মধ্যে আমলারাই তাকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বানাতে চেয়েছিল। একসময় তিনি পাকিস্তানে হিজরত করা ভারতীয় ব্যবসায়ীদের চাকরিও করেছেন। যাহোক, পাঞ্জাবী আমলারা সুনিশ্চিতভাবে উপলব্ধি করেছিল, শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী করতে পারলে পাকিস্তানকে সেক্যুলার রাষ্ট্র বানানো যাবে। এ পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সে দেশের ভূ-স্বামী এবং রাজনীতিবিদরা।
এত কথা কেন বললাম। বললাম এ কারণে যে, বাংলাদেশের একট লেগাসি ছিল। বাংলায় পরম্পরা। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের আমলারা ও উচ্চপর্যায়ের কর্মচারীগণ একইভাবে গড়ে উঠেছেন বা বেড়ে উঠেছেন। তাদের অধিকাংশই ছিলেন সেক্যুলার। কারণ তারা ইংরেজিতে পড়ালেখা করেছেন, ব্রিটিশ আমলা, ইন্ডিয়ার ওঈঝ আমলা, পাকিস্তানের ঈঝচ আমলাদের সাথে একযোগে কাজ করেছেন, ট্রেনিং নিয়েছেন, কমনওয়েলথ বৃত্তি গ্রহণ করেছেন এবং আরও ডজন ডজন বৃত্তি গ্রহণ করে নিজেদের তথাকথিতভাবে উন্নতি বা সমৃদ্ধ করেছেন। রাজনীতিবিদরা তাদের কখনো বলেননি যে, তাদের ইসলামের জন্য সৈনিক হতে হবে, ইসলামের জন্য জীবন দিতে হবে, ইসলামের জন্য নিজেদের যাপিত জীবনকে সুন্দর ও পবিত্র করতে হবে।
মসজিদের ইমাম ও খতিব যদি ইসলামের জন্য বিশিষ্টজন না হন, তাহলে যে অবস্থা হয়, আমাদের আমলাদেরও সে একই অবস্থা। পোশাক-পরিচ্ছদে, চেহারা-সুরতে, কথা-বার্তায়, চলনে-বলনে, আদবে-লেহাজে, কাজে-কর্মে, শিক্ষা-দীক্ষায়, স্বাস্থ্য-সৌন্দর্যে, আহারে-বিহারে, সফরে-শয়নে, হজে-ওমরাহয়, নামাজে-কালামে, সালামে-আদাবে বিনয়ে-শ্রদ্ধায়, সৌজন্যে-উপহারে, পারস্পরিক লেনদেনে, শুভেচ্ছা-অভিনন্দনে, ব্যবহারে-কৌশলে, সুদ-ঘুষে, প্রেমে-ভালোবাসায়, দোয়া-আশীর্বাদে, চুরি-ডাকাতিতে, লুটপাট-সঞ্চয়ে, মানিলন্ডারিংয়ে তিনি যদি চৌকস হন, তাহলে কি শেষ কথা হবে? নিশ্চয়ই হবেন না!
এজন্য তারা সম্পূর্ণ দায়ী হবেন না। সম্পূর্ণ দায়ী হবেন রাজনীতিবিদগণ! হে আল্লাহ! আপনি আমাদের রাজনীতিজনকে হেদায়াত ও হেফাজত দান করুন।