বার্ষিক পরীক্ষার আগে প্রাথমিক শিক্ষকদের কর্মবিরতি: অভিভাবকদের ক্ষোভ
৯ নভেম্বর ২০২৫ ০৮:৪৪
ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় বার্ষিক পরীক্ষা শুরুর কথা। এর আগেই অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ঘোষণা করেছেন প্রাথমিক শিক্ষকরা। শিক্ষকদের এমন ঘোষণায় ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিভাবকরা জানিয়েছেন, এমন আচরণ কোন প্রকৃত শিক্ষকদের মানায় না। দেশের লেখা-পড়ার যে অবস্থা তা কারো অজানা। এরমধ্যে পরীক্ষার আগে কর্মবিরতি ঘোষণায় তাদের আন্দোলন কোন বিবেকবান মানুষ সমর্থন করতে পারেন না।
আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার যৌক্তিক সমাধান খুঁজতে হবে। শিক্ষকতা জনগুরুত্বপূর্ণ পেশা; এ পেশায় কর্মবিরতি শাস্তিযোগ্য অপরাধ, কিন্তু সমস্যা হলো, রাজনৈতিক কারণে অনেকেই অনেক যৌক্তিক দাবির পক্ষে কথা বলেন,সমস্যার সমাধান করতে এগিয়ে আসেন না।
ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় বার্ষিক পরীক্ষা শুরুর কথা। এর আগেই আজ থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ঘোষণা করেছেন প্রাথমিক শিক্ষকরা। তিন দফা দাবিতে প্রাথমিক শিক্ষকদের আন্দোলনে পুলিশের লাঠিচার্জের জেরে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন তারা। শিক্ষকদের তিনটি দাবির মধ্যে রয়েছে সহকারী শিক্ষকদের বেতন দশম গ্রেড করা, শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি এবং চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড দেয়া।
গত শনিবার বিকালে রাজধানীর শাহবাগে শিক্ষকদের পদযাত্রায় কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড, জলকামান ও লাঠি নিয়ে চড়াও হয় পুলিশ। শিক্ষকরা জানান, শহীদ মিনার থেকে শাহবাগ চত্বর অভিমুখে পদযাত্রা ও প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষরের জন্য কর্তৃপক্ষের উদ্দেশে কলম সমর্পণের কর্মসূচি ছিল তাদের। গণগ্রন্থাগারের সামনে পুলিশ তাদের আটকে দিলে তারা ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করেন। পুলিশ প্রথমে কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। এরপর লাঠিপেটার পাশাপাশি জলকামান ব্যবহার করে। এতে শতাধিক শিক্ষক আহত হয়েছেন বলে দাবি তাদের। তবে পুলিশের দাবি, শিক্ষকরা বাধা উপেক্ষা করে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার দিকে এগোতে চাইলে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ সদস্যরা পদক্ষেপ নেন।
এদিকে এবারের কর্মসূচিসহ এ বছরে দ্বিতীয়বারের মতো কর্মবিরতিতে যাচ্ছেন প্রাথমিক শিক্ষকরা। এর আগে গত ২৬ মে কর্মবিরতি ঘোষণা করেছিলেন শিক্ষকরা। পরে সরকারের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ২৯ মে সেই কর্মবিরতি প্রত্যাহার করেন তারা। অভিভাবক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তুলনায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছুটির পরিমাণ বেশি। এছাড়া কয়েক মাস ধরে শিক্ষকরা বিভিন্ন দাবি আদায়ে কখনো অর্ধদিবস কর্মবিরতি, কখনো পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালন করছেন। এসব কারণে শিক্ষার্থীরা ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন। বিশেষত ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। তার আগে কর্মবিরতি শিক্ষার্থীদের চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে ঘাটতি তৈরির পাশাপাশি যথাসময়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
গোপালগঞ্জের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম ও চতুর্থ শ্রেণীতে অধ্যয়নরত আফসানা আক্তারের দুই সন্তান। আফসানা আক্তার বলেন, ‘এক বছরে তিন মাসও সঠিকভাবে ক্লাস হয় না। একের পর এক ছুটি, আন্দোলন এসব নিয়েই প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যস্ত। হয়তো দেখা যাবে কিছুদিন স্কুল বন্ধ থাকার পর বিষয়টি সমাধান হবে। শিক্ষকরা কোনোমতে সিলেবাস শেষ করে পরীক্ষা নিয়ে নিবেন। এভাবে প্রতিটি ক্লাসেই আমাদের সন্তানদের মধ্যে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। যত উপরের ক্লাসে উঠছে তাদের মধ্যে ঘাটতি আরো বাড়ছে। বাধ্য হয়েই আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে প্রাইভেটের প্রতি ঝুঁকতে হচ্ছে।’
প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান-২০২৪ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৭। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়নরত ১ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার ৯৬২ শিক্ষার্থী, যা মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ। এছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৬২৪ শিক্ষক।
সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের পণবন্দি করে দাবি আদায়ের কোনো ইচ্ছে আমাদের নেই। আমরা শিক্ষার্থীদের ক্ষতি না করেই দাবি আদায়ে সচেষ্ট ছিলাম। ১০ম গ্রেড আমাদের ন্যায্য দাবি, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ও ১১ গ্রেডের সুপারিশ করে যে চিঠি দিয়েছে সেখানে তারা স্বীকার করেছে আমরা ১০ম গ্রেড পাওয়ার যোগ্য। তাহলে যোগ্যতা অনুযায়ী কেন মূল্যায়ন করা হবে না। আমাদের আজকের কর্মসূচিও শান্তিপূর্ণ ছিল। সেখানে পুলিশ নৃশংস হামলা চালিয়েছে। শতাধিক শিক্ষক আহত হয়েছেন। আমরা কর্মবিরতিতে যেতে বাধ্য হয়েছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরাও চাই শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি হোক। এ জন্য সরকারের উচিত আমাদের দাবি বাস্তবায়ন করে শিক্ষকদের ক্লাসে ফিরিয়ে নিতে উদ্যোগ গ্রহণ করা।’
প্রাথমিকের শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরেই বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসছেন। বর্তমানে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা ১৩তম গ্রেডে বেতন পান। এ গ্রেড অনুযায়ী তাদের মূল বেতন ১১ হাজার টাকা। বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতাসহ সাকুল্যে পান সাড়ে ১৯ হাজার টাকার মতো। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন কাঠামোর সঙ্গে তুলনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতনই সর্বনিম্ন।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. মোস্তাফিজুর রহমান শাহিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষকরা যে বেতন পান তা দিয়ে একটি পরিবারের মানসম্মতভাবে চলা সম্ভব নয়। প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে হলে অবশ্যই শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। সরকার নিজেও স্বীকার করছে সহকারী শিক্ষকরা দশম গ্রেড পাওয়ার যোগ্য কিন্তু তারা বলছে এটি তাদের পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। এটি কোনো যৌক্তিক কথা হতে পারে না। তারা অন্যান্য সব সেক্টরে যদি একই যোগ্যতায় দশম গ্রেড দিতে পারে শিক্ষকতায় কেন পারবে না?’
চলতি বছর জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মোট কর্মদিবস ছিল ২১৮ দিন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছুটির তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত শুক্র-শনিবার ব্যতীত প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ ছিল ৬১ দিন। এছাড়া শিক্ষকদের কর্মবিরতি এবং অর্ধদিবস কর্মবিরতি বিবেচনা করলে শুক্র-শনিবার ব্যতীত প্রায় ৭০ দিন শ্রেণী কার্যক্রম বন্ধ ছিল। নতুন কর্মসূচির ফলে বন্ধ থাকা কর্মদিবসের সংখ্যা আরো বাড়বে।
শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে এ ধরনের কোনো কর্মসূচির আগে বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার চেষ্টা করা উচিত বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিক্ষা খাতের বর্তমানে যে অবস্থা সেটি বিবেচনা করে আলোচনার মাধ্যমে দাবি আদায়ে সচেষ্ট হওয়া উচিত ছিল। এক্ষেত্রে সরকার এবং শিক্ষক উভয়েরই আন্তরিকতা ও প্রচেষ্টা থাকা জরুরি। শিক্ষকদের দাবি যৌক্তিক কিন্তু একের পর এক আন্দোলনে শিক্ষা খাতে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে তাতে ক্ষতির শিকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। করোনাকালীন সময়ের শিখন ঘাটতি এখনো পুরোপুরি কাটেনি। জুলাই আন্দোলনসহ সাম্প্রতিক সময়েও বিভিন্ন কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘ ছুটি ছিল। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের প্রতি বাড়তি মনোযোগ প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেটি হচ্ছে না।’
শিক্ষকদের প্রতি আজ যেভাবে হামলা হলো সেটি কোনোভাবেই কাম্য নয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পুলিশের আরো সহনশীল হওয়া উচিত ছিল। আবার যমুনা অভিমুখে কর্মসূচির যে বিধিনিষেধ সেটি শিক্ষকদেরও বিবেচনা করা উচিত। তবে সামগ্রিকভাবে সরকারের প্রতি আমাদের আহ্বান শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবি যেন তারা পূরণ করে। ভালো শিক্ষক পেতে হলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষকদের অবশ্যই পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। দীর্ঘদিন ধরেই আমরা শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন স্কেলসহ সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসছি। সব সরকারি চাকরিজীবীদের যদি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যায় শিক্ষকদের কেনা দেওয়া যাবে না?
এদিকে শিক্ষকদের এ দাবি যৌক্তিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার। তিনি বলেন, সহকারী শিক্ষকদের বর্তমান অবস্থান ১৩তম গ্রেড। প্রধান শিক্ষকদের আমরা সবেমাত্র ১০ম গ্রেডে উন্নীত করেছি, তাহলে সহকারী শিক্ষকদের হঠাৎ করে ১৩তম গ্রেড থেকে কীভাবে দশম গ্রেডে উন্নীত করব? সহকারী শিক্ষকরা যাতে ১১তম গ্রেড পেতে পারেন, সে জন্য আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ে লিখেছি, বেতন কমিশনে লিখেছি। আমি কতটুকু পারব নিশ্চিত না। তবে আমি লেগে আছি। ফলে ১০ম গ্রেডের দাবি তুলে এই মুহূর্তে আন্দোলনে যাওয়া আমার কাছে খুব যৌক্তিক মনে হয় না।
তিনি আরো বলেন, ‘তারা স্বাধীন দেশের নাগরিক, তাদের কথা বলার সুযোগ আছে। তারা আন্দোলন করতে পারেন। কিন্তু আমরা যেটা দেখব, আমাদের পড়াশোনা যাতে বিঘ্নিত না হয়। এ ব্যাপারে আমরা সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা নেব। আমরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়াশোনার মানের উন্নয়নের বিষয়টাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। এই পর্যায়ে এসে যদি অযৌক্তিক দাবি দিয়ে কেউ পড়াশোনাকে বিঘ্নিত করে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব।’