যাকাত প্রদান ও পরিকল্পিত দায়িত্ববোধই করতে পারে বিশ্বকে দারিদ্র্য মুক্ত!!
১৫ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৩১
। জাহাঙ্গীর আলম ।
প্রতি বছর ১৭ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হয়। ( International Day for the Eradication of Poverty.) আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস। ১৯৮৭ সালের ১৭ অক্টোবর ফ্রান্সের প্যারিসে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে ১ লাখের বেশি মানুষ জড়ো হয়েছিলেন দরিদ্র মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও সংহতি প্রকাশ করতে।
এই আন্দোলনের ভিত্তিতেই ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি ঘোষণা করে। দিবসের মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য ছিল: —
* বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুরবস্থা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা,
* দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করা,
* এবং সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে দারিদ্র্য দূরীকরণের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করা।
১৯৯৩ সাল থেকে প্রতি বছর ১৭ অক্টোবর দিনটি পালিত হয়ে আসছে। কিন্তুু আজও দারিদ্র্য বিমোচন করা সম্ভব হয়নি। অথচ ইসলামী অর্থব্যাবস্থা ( যাকাত ভিত্তিক অর্থব্যাবস্থা ) ১৪০০ শত বছর পূর্বে দারিদ্র্য বিমোচনের সঠিক সমাধান দিয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচন করতে ও ইসলামী অর্থ ব্যাবস্থার চাকা সচল করতে আল্লাহ তায়ালা যাকাত ব্যাবস্থাকে ফরজ করেছেন। এবং অর্থ ব্যাবস্থাকে ভারসাম্য পূর্ণ করতে যাকাতের সম্পদ ব্যায় করার সুনির্দিষ্ট খাতও দিয়েছে। এ বিষয় আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ। তার আগে বিশ্বের দারিদ্র্য বিমোচনের অবস্থা সম্পর্কে কিছু জানি।
জাতিসংঘ সাধারণত প্রতি বছর একটি থিম ঘোষণা করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে থিম ছিল দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক ন্যায়বিচার, এবং টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক।
২০২৫ সালের আনুষ্ঠানিক থিম হলো—“Ending social and institutional maltreatment by ensuring respect and effective support for families”
বাংলায় বলা যেতে পারে: “ সামাজিক ও প্রতিষ্ঠানগত নির্যাতন বন্ধ করা — পরিবারের প্রতি সম্মান ও কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা ” তবে 2024 সালের থিম ছিল: “Decent Work and Social Protection: Putting dignity in practice for all.” “সম্মানজনক কাজ ও সামাজিক সুরক্ষা — সবার জন্য মর্যাদা নিশ্চিত করা দরকার। অথচ ইসলামী অর্থ ব্যাবস্থা না মানা, তথা যাকাত ভিত্তিক অর্থ ব্যাবস্থা না থাকা , জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ- বিগ্রহ , বৈষম্য ও দুর্নীতি এই সমস্যাকে আরও গভীর করে তুলেছে ।
## ইসলামের দৃষ্টিতে দারিদ্র্য বিমোচনের সহজ উপায় : বর্তমান বিশ্বে দারিদ্র্য একটি বৈশ্বিক সংকট। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৭০০ মিলিয়ন মানুষ আজও চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে। তারা দিনে গড়ে ১.৯০ ডলার বা তার কম আয়ে জীবনযাপন করে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব এবং সম্পদের অসম বণ্টন দারিদ্র্যের অন্যতম কারণ। এই পরিস্থিতিতে ইসলামী অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি যাকাত ব্যবস্থা। যা দারিদ্র্য বিমোচনে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখতে পারে। যাকাতের অর্থনৈতিক দর্শণ
‘যাকাত’ শব্দের অর্থ পবিত্রতা ও বৃদ্ধি। ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি ধনী মুসলমানদের ওপর একটি ফরজ আর্থিক দায়িত্ব। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন— “ তাদের ( নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক ) সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ করো, যার মাধ্যমে তুমি তাদের পবিত্র করবে ও পরিশুদ্ধ করবে।”
(সূরা আত-তাওবা: আয়াত ১০৩)
যাকাত কেবল ধর্মীয় কর্তব্য নয় , এটি একটি সামাজিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করে।
জাতীয় পর্যায়ে যাকাতের ভূমিকা
বাংলাদেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, যদি দেশের সক্ষম মুসলমানরা নিয়মিতভাবে যাকাত আদায় করে, তাহলে বছরে আনুমানিক ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যবহার করা সম্ভব।
এই অর্থ দিয়ে—দরিদ্র পরিবারকে কর্মসংস্থানে সহায়তা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি , শিক্ষা ও চিকিৎসা সহায়তা, বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব।পাকিস্তান ও মালয়েশিয়ার মতো দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত ফান্ড পরিচালিত হয়। যার মাধ্যমে হাজার হাজার পরিবার আত্মনির্ভরশীল হয়েছে। বাংলাদেশেও সরকারি পর্যায়ে যদি যাকাতভিত্তিক একটি শক্তিশালী ফান্ড গঠন করা যায় , তবে তা সামাজিক সুরক্ষার বিকল্প হতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যাকাতের সম্ভাবনা বিশ্বে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় ২০০ কোটির বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, মুসলিম দেশগুলো থেকে প্রতি বছর আনুমানিক ৬০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যাকাত আদায়ের সম্ভাবনা রয়েছে। যদি এটি সমন্বিতভাবে ব্যবস্থাপিত হয়, তাহলে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য বিমোচনে এক বিশাল তহবিল গঠন করা সম্ভব।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়ায় রাষ্ট্রীয় যাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে ইতিমধ্যেই সামাজিক উন্নয়নে বিপুল সাফল্য এসেছে। যেমন—
ইন্দোনেশিয়ার BAZNAS (National Zakat Agency) ২০২৩ সালে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার যাকাত সংগ্রহ করে, যা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা হয়।
মালয়েশিয়ার Zakat Selangor সংস্থা বছরে প্রায় ১০ লাখের বেশি পরিবারকে অর্থনৈতিক সহায়তা দেয়। যাকাতের অর্থ, ইসলামী অর্থব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। দারিদ্র্য বিমোচনের মডেল। মাসারিফুস যাকাত (مَصَارِفُ الزَّكَاةِ) অর্থাৎ “যাকাতের খরচের ক্ষেত্রসমূহ” বা “যারা যাকাত পাওয়ার অধিকারী”— এগুলো আল্লাহ তাআলা কুরআনে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছেন।
আল-কুরআন:
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۖ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
অর্থ:
“যাকাত তো কেবল ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়ের কাজে নিয়োজিতদের জন্য, যাদের মন ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা উদ্দেশ্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে (জিহাদ ও দ্বীনি কাজ বাস্তবায়ন করার জন্য) এবং মুসাফিরদের জন্য — এটাই আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”
(সূরা আত-তাওবা: আয়াত ৬০) এখানে
যাকাতের ৮টি খাত (মাসারিফ) উল্লেখ রয়েছে। যেমন-
১. الفقراء (আল-ফুকারা) — যারা একেবারে গরিব, মৌলিক চাহিদা পূরণে অক্ষম।
২. المساكين (আল-মাসাকিন) — যারা কিছুটা উপার্জন করে, কিন্তু তাতে পুরো প্রয়োজন মেটে না।
৩. العاملين عليها (আমিলিন ‘আলাইহা) — যাকাত সংগ্রহ ও বিতরণের কাজে নিয়োজিত কর্মচারী।
৪. المؤلفة قلوبهم (মুআল্লাফাতুল কুলুব) — যারা সদ্য ইসলাম গ্রহণ করেছে বা যাদের হৃদয় ইসলামমুখী করার প্রয়াস নেওয়া হচ্ছে।
৫. في الرقاب (ফি রিকাব) — দাস-মুক্তির জন্য (বর্তমানে দাসপ্রথা না থাকায় বন্দি মুক্তি বা মানবিক দাসত্বের অনুরূপ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়)।
৬. الغارمين (আল-গারিমিন) — ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, যিনি নিজের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে ঋণ নিয়েছেন এবং তা পরিশোধে অক্ষম।
৭. في سبيل الله (ফি সাবিলিল্লাহ) — আল্লাহর পথে ব্যয়, যেমন: জিহাদ, দাওয়াত, ইসলাম প্রচার, দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মানবসেবা ইত্যাদি।
৮. ابن السبيل (ইবনুস সাবিল) — মুসাফির (পথিক), যিনি ভ্রমণের কারণে অর্থহীন হয়ে পড়েছেন এবং গন্তব্যে পৌঁছাতে সাহায্য প্রয়োজন। এই আট শ্রেণির বাইরে যাকাত দেওয়া জায়েয নয়। রাষ্ট্র বা ব্যক্তি উভয়েই যাকাত এই নির্ধারিত খাতে বিতরণ করবে, যাতে সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন ও দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব হয়।
যদি সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো একত্রে যাকাত তহবিলকে নিম্নোক্তভাবে পরিচালনা করে, তবে দারিদ্র্য বিমোচন করা সম্ভব। যেমন কিছু করণীয় কাজ তুলে ধরা যাক –
* কেন্দ্রীয় যাকাত বোর্ড গঠন
* স্বচ্ছ তথ্যভিত্তিক দরিদ্র তালিকা তৈরি
* বিনিয়োগমুখী যাকাত বিতরণ (যেমন ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য ঋণ প্রদান করে কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া।
* ডিজিটাল যাকাত প্ল্যাটফর্ম চালু করা
* যাকাত তহবিল থেকে অসহায়দের জন্য শিক্ষা, চিকিৎসা ও আবাসন খাতে ব্যয় করা।
এক কথায়, ইসলামে দারিদ্র্য বিমোচনের কাজ করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কোরআনে আল্লাহ বলেন: “তোমরা সালাত কায়েম করো এবং যাকাত দাও।”
(সূরা আল-বাকারা: ৪৩) রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “উপরের হাত (দানকারী) নিচের হাতের (গ্রহণকারী) চেয়ে উত্তম।”
(সহিহ বুখারি)
অর্থাৎ ইসলামে ধনীদের সম্পদের একটি অংশ দরিদ্রদের অধিকার হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
যাকাত কেবল ধর্মীয় দায়িত্ব নয়—এটি একটি মানবিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার ব্যবস্থা। বিশ্বব্যাপী মুসলমানরা যদি সঠিকভাবে যাকাত আদায় করে এবং সরকার তা সুশাসনের মাধ্যমে পরিচালনা করে, তবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবে দারিদ্র্য বিমোচন করা সম্ভব। যাকাত ভিত্তিক অর্থব্যবস্থা বাস্তবায়ন করলে, দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ গঠন আর কল্পনা নয়, বাস্তবতা রুপ নিতে পারে।
লেখক : প্রভাষক জাহাঙ্গীর আলম, কলামিস্ট, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।