গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম সোপান ১৯৭৯ সালের নির্বাচন


১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৪:১৩

॥ সরদার আবদুর রহমান ॥
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু স্বাধীনতার অঙ্গীকার অনুযায়ী গণতন্ত্রের পথে দেশকে পরিচালিত করতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। এমনকি ক্ষমতা লাভের প্রধান প্রক্রিয়া যে নির্বাচনব্যবস্থা, তাকে ব্যবহার করে সে ব্যবস্থাকেই আ’লীগ ভীষণভাবে কলুষিত করে ফেলে। ফলে ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনও ‘পোকায় খাওয়া ফল’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। এ কারণে প্রকৃতই গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রথম সোপান হিসেবে ১৯৭৯ সালের নির্বাচন জাতির কাছে গৃহীত হয়। কিন্তু মাত্র কিছুকাল পরই স্বৈরশাসক এরশাদ এ প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করে ফেলে। তার অবিমৃশ্যকারিতার কুফল দীর্ঘদিন যাবত ভোগ করতে হয় জাতিকে।
এ কথা সকলের জানা যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হলে দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও সেই মুজিব সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী খোন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। ২০ আগস্ট তিনি ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা (রেট্রোস্পেকটিভ ইফেক্ট) দিয়ে সামরিক আইন জারি করেন। আর ২৪ আগস্ট কেএম সফিউল্লাহকে সরিয়ে জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করেন।
কুখ্যাত চতুর্থ সংশোধনী
১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি শেখ মুজিব বাংলাদেশের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী বিল পেশ করে দেশের বিদ্যমান সংকট থেকে উত্তরণের (?) উদ্যোগ নেন। মওদুদ আহমদের মতে, এক নজিরবিহীন ন্যূনতম সময়ের মধ্যে বিলটি সংসদে গৃহীত হয় এবং তা আইনে পরিণত হয়। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিলটি নিয়ে সংসদে কোনো আলোচনা ও বিতর্কই অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রশাসন ব্যবস্থায় এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধন করে এ বিলের মাধ্যমে একদলীয় সরকার ব্যবস্থা কায়েম করে রাষ্ট্রপতির ওপর নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধিকার ন্যস্ত করা হয়। একই সংশোধনীবলে শেখ মুজিব দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতায় অভিষিক্ত হন। বিল পাস হবার অব্যবহিত পরই পদত্যাগ করার সুযোগ পর্যন্ত না দিয়ে নিরীহ, শান্ত মোহাম্মদ উল্লাহকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারণ করা হয় এবং শেখ মুজিব তৎক্ষণাৎ স্পিকারের কাছে নয়া রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এভাবে একটি সাংবিধানিক বিলের মধ্য দিয়ে মোহাম্মদ উল্লাহ্র পরিবর্তে শেখ মুজিব রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতার উচ্চতম আসনে আরোহণ করেন।
চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতির সমস্ত স্বীকৃত ক্ষমতা বিলীন করে দেয়া হয়। এতে কেবল নির্বাহী কর্মকাণ্ডের ওপর সংসদের ক্ষমতাই রহিত করা হয়নি, সংসদে গৃহীত যেকোনো বিলের ওপর ভেটো জারির ব্যাপারে রাষ্ট্রপতির হাতে ক্ষমতাও অর্পণ করা হয়। ফলে এ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদের সকল গুরুত্ব বিলীন হয়ে যায় এবং তা নতুন রাজনৈতিক পদ্ধতিতে একটি রাবার স্ট্যাম্প প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
সংবিধানের সংশোধনীতে জাতীয় সংসদের অধিবেশন সংক্রান্ত বিষয়েও এক তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন সাধন করা হয়। এর আগে নিয়ম ছিল যে, সংসদের দুটি অধিবেশন অনুষ্ঠানের মধ্যবর্তী সময়সীমা ৬০ দিনের বেশি হবে না। নয়া সংশোধনীতে বলা হয়, প্রতি বছর সংসদের কমপক্ষে দুটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। এভাবে প্রশাসনে জাতীয় সংসদের ভূমিকা নিদারুণভাবে সংকুচিত করে ফেলা হয়।
মওদুদ আহমদ বিশ্লেষণ করে বলেন, মূল সংবিধানের ৭০নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল যে, কোনো ব্যক্তি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সংসদে উক্ত দলের বিরুদ্ধে ভোটদান করলে বা সেই দল থেকে পদত্যাগ করলে জাতীয় সংসদে তার আসন শূন্য হয়ে যাবে। কিন্তু সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীতে দলের বিপক্ষে এ ভোটদানের একটি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়। এতে বলা হয় যে, কোনো সদস্য সংসদ অধিবেশনে অনুপস্থিত থাকলে বা সংসদে উপস্থিত থেকে ভোটদানে বিরত থাকলেও তিনি উক্ত দলের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন বলে মনে করা হবে।
একইভাবে মূল সংবিধানের ৭৬নং অনুচ্ছেদবলে অধিবেশনের প্রথম দিনে কয়েকটি স্ট্যান্ডিং কমিটি গঠনের বিধানটি সংশোধনীবলে অবলুপ্ত করে দিয়ে জাতীয় সংসদের গুরুত্ব আরো কমিয়ে আনা হয়। এভাবে আসে একদলীয় বাকশাল গঠন। একটিমাত্র জাতীয় দলের অবকাঠামোকে বৈধতা প্রদান করা হয়। মাত্র চারটি সংবাদপত্র সরকারের হাতে রেখে বাকিগুলোর ডিক্লারেশন বাতিল করে দেয়া হয়। দেশের প্রতিটি মহকুমায় একজন করে গভর্নর বসিয়ে শাসনক্ষমতা আরো কুক্ষিগত করা হয়। এতে এদেশের প্রতিটি কোণায় এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
পঁচাত্তর-পরবর্তী পরিস্থিতি
অতঃপর বাকশাল পদ্ধতি পূর্ণভাবে কার্যকর হওয়ার আগেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বাসভবনে সপরিবারে নিহত হন। তবে ১৯৭৯ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত বাকশাল পদ্ধতি যেমন কার্যকর হয়নি, তেমনি রহিত করাও হয়নি। এরপর বহুদলীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে সংবিধান থেকে বাকশাল পদ্ধতি অপসারণ করা হয়।
শেখ মুজিবকে দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দেয়ার পর ৭ নভেম্বর পর্যন্ত সময়টা ছিল ব্যাপক ঘটনাবহুল। এ সময় সামরিক বাহিনীর উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটে এবং জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন। বিচারপতি সায়েম রাষ্ট্রপতি হলেও ৭ নভেম্বরের পর জিয়াই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন।
জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর সেই বছরের ৩০ মে গণভোট হয়। জিয়ার ওপর জনগণের আস্থা আছে কি না, সেটি জানাই ছিল এর উদ্দেশ্য। গণভোটে তিনি প্রায় ৯৯ শতাংশ ভোট পেয়েছেন বলে সরকারিভাবে উল্লেখ করা হয়। পরে ১৯৭৮ সালের ৩ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে জিয়া তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এমএজি ওসমানীকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের নেতৃত্বে আসেন। কারো কারো মতে, ডান, বাম ও ইসলামপন্থীদের এক প্ল্যাটফর্মে এনে জিয়া ‘ভারসাম্যের রাজনীতি’ চালু করেছিলেন। তিনি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ নামে নতুন একটি ধারা তৈরি করেন। এটি ছিল তাঁর অন্যতম নির্বাচনী ইস্যু।
১৯৭৯ সালের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত সময়টিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একদলীয় থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রে উত্তরণের কাল হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁরা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বহুদলীয় সংসদীয় সরকার পদ্ধতি বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি। নতুন এ ব্যবস্থায় আমলাতন্ত্র, সেনাবাহিনী ও সুশীল সমাজের মধ্যে বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি হয়। জনগণের যে উল্লেখযোগ্য অংশ দীর্ঘদিন শেখ মুজিবকে ‘গণতন্ত্রবাদী’ হিসেবে তাঁর প্রতি সমর্থন দিয়ে আসছিল, কর্তৃত্ববাদী একদলীয় শাসনব্যবস্থার প্রধান হিসেবে তিনি সেই মর্যাদা হারিয়ে ফেলেন। বহুল আলোচিত ও নিন্দিত ‘বাকশাল’ কায়েম করে তিনি ইতিহাসের অন্যতম একনায়ক হিসেবে তকমা লাভ করেন। এতেই শেষ নয়, প্রতিপক্ষকে নিপীড়নের মাধ্যমে ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার উপায় অবলম্বন করতে থাকেন। কিন্তু বিধিবাম। সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি।
এদিকে বাংলাদেশের সংবিধানে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ধর্মীয় রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল। ১৯৭৭ সালের প্রোক্লেমেশন অর্ডার নম্বর ১-এর মাধ্যমে সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদ সম্পূর্ণভাবে ও ৩৮ অনুচ্ছেদের অংশবিশেষ বিলোপ করা হয়। জিয়াউর রহমান এ প্রোক্লেমেশনের মাধ্যমে অনুচ্ছেদ ৩৮-এর ওই শর্তাংশটুকু বাতিল করে দেন, যেখানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বন্ধের কথা ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৯ সালে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এটি সাংবিধানিক বৈধতা পায়। অর্থাৎ পঞ্চম সংশোধনীর পর অনুচ্ছেদ ৩৮ আর ইসলামী রাজনীতির প্রতিকূলে ছিল না। এ সংশোধনীর পর সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞাটি উঠে যাওয়ায় ইসলামী দলগুলো তাদের কার্যক্রম আবারো শুরু করে।
নির্বাচনী ফলাফল
১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনের আগেই আওয়ামী লীগ দুই ভাগ হয়ে গিয়েছিল। এর এক অংশের নেতৃত্বে ছিলেন আবদুল মালেক উকিল। আরেক অংশের নেতৃত্ব দেন মিজানুর রহমান চৌধুরী। নবগঠিত বিএনপি, আওয়ামী লীগের দুই অংশ, ইসলামিক ডেমোক্রেটি লীগ, ন্যাপ (মোজাফফর), সিপিবি, জাসদসহ মোট ২৯টি দল নির্বাচনে অংশ নেয়। নির্বাচনে মোট প্রার্থী ছিলেন ২ হাজার ১২৫ জন। নির্ধারিত দিনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। শান্তিপূর্ণভাবে ভোট পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ৫০.৯৫ ভাগ ভোট পড়ে।
নির্বাচনের ফলাফলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২০৭টি, আওয়ামী লীগ ৩৯টি এবং আইডিএল-মুসলিম লীগ জোট ২০টি আসনে বিজয়ী হয়। এর মধ্যে ইসলামিক ডেমোক্রেটি লীগ থেকে মনোনীত জামায়াতে ইসলামীর ৬ জন সদস্য জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর এটিই প্রথম উপস্থিতি।
মজার ব্যাপার হলো- সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে বিএনপি ২০৭টি লাভ করেও বিএনপি প্রার্থীদের অনেকে অভিযোগ করেন, সরকার তাদের ইচ্ছাকৃতভাবে পরাজিত করে বিরোধীদলকে আসন দিয়েছে। সব মিলিয়ে এটাই ছিল প্রথম বড় বিরোধীদল সজ্জিত সংসদ। সামরিক শাসনের অধীনে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও নির্বাচিত জাতীয় সংসদে বিজয়ী সকলের অংশগ্রহণে বেসামরিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দরজা খুলে যায়। নবনির্বাচিত জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসে ১৯৭৯ সালের ৫ এপ্রিল। এরই ধারাবাহিকতায় ৯ এপ্রিল থেকে সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হয়।
এ সংসদের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ছিল সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী গ্রহণ। ১৯৭৯ সালের ৫ এপ্রিল জাতীয় সংসদে গৃহীত হয় সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বিল। ৬ এপ্রিল থেকে এটি কার্যকর হয়। এ সংশোধনীতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে তখন পর্যন্ত প্রণীত সকল আদেশ, বিধান ও ফরমান এবং সংবিধানে যা কিছু সংশোধন, সংযোজন, পরিবর্তন, বিলোপ সাধন এবং প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো বৈধভাবে প্রণীত ও গৃহীত হয়েছে বলে ঘোষিত হয়। এ সংশোধনী গৃহীত হওয়ার পর বাংলাদেশের মানুষ তাঁদের স্বকীয়তা খুঁজে পায় এবং স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার হিম্মত লাভ করে।
ইসলামী রাজনীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা
এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে কোনো দলের জন্যই কোনো প্রতিবন্ধকতা দেখা যায়নি। ফলে এটি বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য মাত্রার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। এর মধ্যে ১৯৭৩ সালের নির্বাচন ছিল একপ্রকার পক্ষপাতমূলক। কেননা কেবল ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ও সমাজতন্ত্রের ঝান্ডাবাহী অংশটিই এতে অংশ নেয়ার সুযোগ পায়। আর ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা সকলের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। একজন বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ইসলামী গণতান্ত্রিক লীগ (আইডিএল)-এর ব্যানারে প্রকাশ্য রাজনীতিতে আবির্ভূত হওয়ার সুযোগ লাভ করে। এই দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইডিএল বাংলাদেশ মুসলিম লীগের (বিএমএল) সাথে জোটবদ্ধ হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং আইডিএল-বিএমএল জোট শতকরা ১০.০৮ ভাগ ভোটসহ মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২০টি আসন লাভ করে। এর কিছুদিন পর আইডিএল ত্যাগ করে ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’ নামে পুনঃপ্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং স্বল্পসময়ের মধ্যে দেশের বৃহৎ ইসলামী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। জামায়াত ছাড়াও মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন প্রভৃতি ইসলামী দলসমূহ রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রাখে। মাওলানা আশরাফ আলী থানভির খলিফা মাওলানা মোহাম্মদুল্লাহÑ যিনি ‘হাফেজ্জী হুজুর’ নামে সমধিক পরিচিত, খেলাফত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন গঠন করেন। এর মধ্য দিয়ে কওমি অঙ্গনে ‘ইসলামে রাজনীতি’ থাকা বা না থাকাজনিত দীর্ঘদিনের বহাসের অবসান ঘটার পথ খুলে যায়। বলা যেতে পারে, এর পর থেকে অন্তত ইসলামী ঘরানায় এ বিষয়টি আর বিতর্কের বিষয় হয়ে থাকেনি।
সব মিলিয়ে ১৯৭৯ সালের এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাকশালী ধ্বংসস্তূপের চূড়ায় বহুদলীয় গণতন্ত্রের বীজ প্রোথিত হয়। আওয়ামী শাসন ব্যবস্থাকে উল্টে দিয়ে গণতন্ত্রের পথে দেশ তার অভিযাত্রা শুরু করে। ফলে একে স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রকৃত গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম সোপান হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।