পৃথিবীর অন্য শ্রেষ্ঠ ৩টির সমতুল্য
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:৪০
॥ জামশেদ মেহদী ॥
গত ১৯ জুলাই রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান প্রায় ৩০ লাখ লোকের বিশাল জনসমুদ্রে যে ৭ মিনিটের ভাষণ দেন, সেই ভাষণের ওপর সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় আমি একটি ভাষ্য লিখেছিলাম। গত ৮ আগস্ট শুক্রবার সোনার বাংলায় প্রকাশিত ঐ ভাষ্যের শিরোনাম ছিল, ‘আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস এবং দেশীয় ডাক্তারদের প্রতি আস্থা/স্যালুট আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান।’ আমি ঐ ভাষ্যে বলেছিলাম যে, আমীরে জামায়াতের সাথে আমার চাক্ষুষ পরিচয় নেই। কোনোদিন টেলিফোনেও তার সাথে আমার কথা হয়নি। তারপরও ঐ মাত্র ৭ মিনিটের ভাষণ শুনে তার প্রতি শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হয়ে আসে। সেদিন টেলিভিশনে তার দুবার পড়ে যাওয়ার ঘটনা দেখে আমার মনে আফসোস হয় যে, কেন তিনি অসুস্থ হয়ে গেলেন। যদি অসুস্থ না হতেন, তাহলে তো তার সুদীর্ঘ ভাষণ থেকে আমরা বঞ্চিত হতাম না।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঐ মঞ্চে তার দুবার পড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে অ্যাক্টিভিস্ট এবং ব্লগার পিনাকী ভট্টাচার্য তার ইউটিউব চ্যানেলে বলেছিলেন যে, অতিরিক্ত গরম এবং ঘামে আমীরের ডি-হাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা হয়েছিল। কিন্তু আমার সেটি মনে হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আমি আমার আত্মীয়-স্বজনদের সাথে কথা বলেছিলাম। তাদের মধ্যে একজন রয়েছেন হার্ট স্পেশালিস্ট। ঢাকার একটি বড় হাসপাতালে তিনি কার্ডিওলজিস্ট হিসেবে কর্তব্যরত। আমার মনে হয়েছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তার হয়েছিল হালকা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট।
ডা. শফিকুর রহমানের দেহে বাইপাস সার্জারির ৩৭ দিন পর তিনি গত ৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাজধানীর মণিপুর স্কুল এন্ড কলেজে জামায়াতের কাফরুল দক্ষিণ থানার উদ্যোগে আয়োজিত ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পে প্রধান অতিথির যে ভাষণ দেন, সেই ২৪ মিনিটের ভাষণ ইউটিউবে শোনার পর আমার মনে হয়েছে, ঐ ভাষণটি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ৩টি ভাষণ বলে বিবেচিত ভাষণের সমপর্যায়ের। এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পৃথিবীতে সর্বোৎকৃষ্ট ভাষণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের কালজয়ী ভাষণটি। ১৯৬৩ সালে মানবতার জয়গান গাইতে গিয়ে ড. মার্টিন লুথার কিং তার বক্তৃতায় বলেছিলেন, ও যধাব ধ ফৎবধস. অর্থাৎ আমার একটি স্বপ্ন আছে।
পৃথিবীর ২য় শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে ১৮৬৩ সালে প্রদত্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের ঐতিহাসিক ভাষণটি। ব্যক্তিগতভাবে একটি ভাষণের উল্লেখ করা হলেও আমার কাছে তার ২টি ভাষণকে কালজয়ী মনে হয়েছে। এই ২টি ভাষণের প্রথমটি হলো- Four score and seven years ago our fathers brought forth on this continent, a new nation, conceived in Liberty, and dedicated to the proposition that all men are created equal. অনুবাদ : ৪০৭ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষরা এ মহাদেশে একটি নতুন জাতির জন্ম দিয়েছিলেন। যে জাতির আকাক্সক্ষা ছিল স্বাধীনতা। এ স্বাধীনতার গূঢ় অর্থ ছিল যে, সব মানুষই সমান।
২য় ভাষণটি হলো, That these dead shall not have died in vain—that this nation, under God, shall have a new birth of freedom and that government of the people, by the people, for the people, shall not perish from the earth. অনুবাদ : এসব জীবন দান বৃথা যাবে না। ঈশ্বরের অধীন এ জাতির পুনর্জন্ম হবে, যেখানে থাকবে স্বাধীনতা এবং জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণ কর্তৃক গঠিত সরকার এ পৃথিবী থেকে মুছে যাবে না।
বিশ্বে তৃতীয় শ্রেষ্ঠ বক্তৃতা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার উইনস্টন চার্চিলের সেই ঐতিহাসিক বক্তৃতা। ১৯৪০ সালে সেই বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, ‘We shall fight on the beaches, we shall fight on the landing grounds, we shall fight in the fields and in the streets, we shall fight in the hills; we shall never surrender, and even if, which I do not for a moment believe, this island or a large part of it were subjugated and starving, then our Empire beyond the seas, armed and guarded by the British fleet, would carry on the struggle, until, in God’s good time, the new world, with all its power and might, steps forth to the rescue and the liberation of the old.’ অনুবাদ : আমরা সমুদ্রসৈকতে যুদ্ধ করবো, আমরা অবতরণ ক্ষেত্রে যুদ্ধ করবো, আমরা মাঠে-ঘাটে যুদ্ধ করবো, আমরা পাহাড়-পর্বতে যুদ্ধ করবো। তবুও আমরা আত্মসমর্পণ করবো না। আমি মুহূর্তের জন্যও যেটা কল্পনা করি না, সেটা যদি ঘটে, অর্থাৎ আমাদের এই ভূখণ্ড অথবা তার বৃহৎ অংশ যদি শত্রুর পদানত হয় অথবা এখানকার জনগণ অনাহারে থাকে, তাহলে আমাদের এই সাম্রাজ্য, যেটি সমুদ্র পেরিয়ে বিস্তৃত হয়েছে, যেটি ব্রিটিশ বাহিনী কর্তৃক যুদ্ধাস্ত্রে সজ্জিত রয়েছে, সেই যুদ্ধ আমরা চালিয়ে যাবো। যুদ্ধ চালিয়ে যাবো ততক্ষণ, যতক্ষণ পর্যন্ত না ঈশ্বর এই নতুন বিশ্ব এবং এর ক্ষমতাকে রক্ষা করা এবং প্রবীণদের মুক্তির জন্য এগিয়ে না আসেন।
এসব দুনিয়া কাঁপানো ভাষণের সাথে সেদিন মণিপুরে প্রদত্ত আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমানের ভাষণকে মিলিয়ে দেখছি।
আমীর সাহেবের বন্ধুরা বলেছেন, এক ঘণ্টার বক্তৃতায় যা বলার ছিল, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাত্র ৭ মিনিটের বক্তৃতায় তিনি তার চেয়েও বেশি বলেছেন। আমীর সাহেবের পড়ে যাওয়ার দৃশ্য টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কার্ডিওলজিস্ট ইউনাইটেড হাসপাতালের প্রফেসর মমিনুজ্জামান। আমীর সাহেব তার বক্তৃতায় বলেছেন, যে ডাক্তার মমিনুজ্জামানের একটা সিরিয়াল পেতে কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হয়, সেই ডাক্তার টেলিভিশন চিত্র দেখেই তৎক্ষণাৎ বলেছিলেন, এটা ব্রেইনের সমস্যা নয়, এটা হার্টের সমস্যা। আমার কাজ হলো দ্রুততম সময়ে ওনাকে দেখা।
তার কাছে নিয়ে যাওয়ার আগে ২২ জন চিকিৎসকের সমন্বয়ে একটি বোর্ড গঠিত হয়, যে বোর্ডে ছিলেন হৃদরোগ এবং স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ। আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমানের অসংখ্য সুহৃদ, শুভানুধ্যায়ী এবং আত্মীয়-স্বজন আছেন। তারা তাকে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল অথবা ব্যাংককের বামরুনগ্রাড হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। এ পরামর্শের উত্তরে আমীর সাহেব যা বলেন, সেটি শুনে যেমন মুগ্ধ হই, তেমনি হতভম্ব হই। তিনি বলেন, ‘আচ্ছা আপনারা বলুন তো, যে দেশগুলোর নাম বললেন, সেই সব দেশে আল্লাহ আছেন কিনা? বলে আল্লাহ তো আছে। বাংলাদেশে নেই? উত্তর এখানেও আছে, আলহামদুলিল্লাহ।’ অতঃপর পুনরায় তিনি প্রশ্ন করেন, ‘সুস্থতা-অসুস্থতা কার হাতে? একবাক্যে সবাই বললেন, আল্লাহ তায়ালার হাতে। আমি বললাম, যে আল্লাহ আমাকে ওই দেশগুলোয় নিয়ে সুস্থতা দিতে পারেন, আমি বিশ্বাস করি আমার সেই আল্লাহ আমার জন্মস্থান বাংলাদেশেও আমাকে সুস্থ করে দিতে পারেন।’
নাগরিক সমাজকে বাংলাদেশে ফেলে আল্লাহর কসম! আমার পক্ষে বিদেশের মাটিতে চিকিৎসার জন্য যাওয়া সম্ভব নয়। আমার পূর্ণ আস্থা আমার আল্লাহর ওপরে আছে। আমার দেশের চিকিৎসক সমাজের ওপরে আছে। বহু লোক উন্নত চিকিৎসার আশায় বিদেশে গিয়ে কফিন বাক্স হয়ে বাংলাদেশে ফেরে। আল্লাহ যদি আমার ওপর রহম করেন আর যদি আল্লাহ অপারেশন টেবিল পর্যন্ত আমার হায়াত রেখে থাকেন, আমি আমার মওলার দরবারে নতশির শুকরিয়া আদায় করি। আমার আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চাই।
অপারেশন টেবিলে তাকে শোয়ানো হলে তিনি সার্জন ডাক্তার জাহাঙ্গীর কবিরকে বলেন, ‘বাংলাদেশের চিকিৎসকদের ওপর জনগণের আস্থার ভিত্তি মজবুত করার জন্য আমি বাংলাদেশে চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ তিনি সার্জন জাহাঙ্গীর কবিরকে আরো বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি না, আমার সুস্থতা আপনাদের হাতে আছে। আমি বিশ্বাস করি, আমার সুস্থতা আছে আমার মাবুদের হাতে। আল্লাহ কারো না কারো উসিলায় মানুষকে সাহায্য করেন। আপনি ডা. জাহাঙ্গীর কবির হলেন সেই উসিলা।’
আমীরে জামায়াত আরো বলেছিলেন, আমার যদি এ অপারেশন টেবিলে শেষ নিশ্বাস আল্লাহ তায়ালা কবুল করেন, তাহলে আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি, কেউ আপনাদের দায়ী করবে না। কারণ সকলে বুঝবে, এতটুকুই আমার হায়াত ছিল, আলহামদুলিল্লাহ। আমি এও বলেছি, আমার মৃত্যুর খবর পেলে তারা কেউ যেন না কাঁদে। বরং প্রথমেই যেন পড়ে, আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। আল্লাহ! জীবন তুমি দিয়েছিলে, তুমিই সেটি নিয়ে গেছো। সকল প্রশংসা তোমার।
এরপর তিনি বলেন, ‘আমি যদি সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরি, আপনি মনে করবেন না যে আমার সুস্থতা ছিলো আপনার হাতে। এ সুস্থতা আমার আল্লাহর দান। আপনি উসিলা ছিলেন। এজন্য আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ এবং আপনার কাছেও কৃতজ্ঞ।’
এরপর আর মনে হয় না যে, আমীর সাহেবের এসব উক্তির আর কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে। ইংরেজিতে বলতে হয়, আমীর সাহেবের বক্তব্য, Self Explanatory. আমি নিজের কথা বলছি। আল্লাহর প্রতি এমন অন্ধ বিশ্বাস এবং সর্বাত্মক নির্ভরতা আমার এ সুদীর্ঘ জীবনে আর দেখিনি। ডা. শফিকুর রহমানের বর্তমান বয়স প্রায় ৬৭ বছর। আল্লাহর প্রতি ডা. শফিকুর রহমানের সর্বাত্মক নির্ভরতার কিছুটা হলেও যেন আমার এবং অন্যান্য মানুষের মাঝে সঞ্চালিত হয়। এখনো তো অনেক বৃদ্ধ নবতিপরও হচ্ছেন। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা যেন জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানকে আরো লম্বা নেক হায়াত দান করেন। এদেশের হতভাগ্য, নির্যাতিত, বঞ্চিত মানুষের জন্য ডা. শফিকুর রহমানের মতো সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ, আল্লাহ পরস্ত একজন সৎ নেতার বড়ই প্রয়োজন।
Email: jamshedmehdi@gmail.com