গণঅভ্যুত্থান : তিউনিসিয়া থেকে বাংলাদেশ
৩১ জুলাই ২০২৫ ১৪:৪২
॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া॥
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশে একটি গণঅভ্যুত্থান ঘটে। এ অভ্যুত্থান ছিল এক অভাবনীয় ও অকল্পনীয় ঘটনা। যখন বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ আশাহত হয়ে পড়েছিল, তখন মাত্র ৩৬ দিনের এক গণআন্দোলনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রদের নেতৃত্বে এ গণঅভ্যুত্থান ঘটে। ভেঙে পড়ে স্বৈরশাসকের তখতে-তাউস। পতন ঘটে ১৬ বছরের একটি দুর্নীতিবাজ স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট সরকারের। শুধু ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন নয়, ফ্যাসিস্টদের আইকন শেখ হাসিনাও দেশ থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এককথায় ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে গিয়ে তার জীবন রক্ষা করেছেন। অবশ্য যুগ যুগ ধরে ফ্যাসিস্টরা শেষ পর্যন্ত পালিয়েই নিজেদের জীবন রক্ষা করেছেন। আর শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট হিসেবে গড়ে তোলা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ভারতই তাকে আশ্রয় দিয়েছে।
বাংলাদেশে যে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে নিকট ও দূর অতীতে বিশ্বের অনেক দেশেই এমন গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। নিকট অতীতে তথা একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশকে আফ্রিকা মহাদেশের দুটি মুসলিম দেশ তিউনিসিয়া ও মিশরে এবং এশিয়ার দ্বীপ রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায় গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসকদের পতন ঘটে। সব শেষে পতন ঘটে বাংলাদেশের এক ফ্যাসিস্ট স্বৈরশাসকের। সাধারণ জনগণ জীবন দিয়ে রক্ত দিয়ে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তাদের দেশ স্বৈরাচার ও ফ্যাসিস্টমুক্ত করে, কিন্তু আখেরে তাদের কতটুকু প্রাপ্তিযোগ তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
শ্রীলঙ্কায় গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তন আশানুরূপ নয় : শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালের জুলাই মাসে এক গণঅভ্যুত্থানে শাসকশ্রেণির পতন ঘটে। ২০২২ সালের মার্চ মাস থেকে শুরু হয়ে প্রায় পাঁচ মাসব্যাপী এক আন্দোলনে জুলাই মাসে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ে রাজাপাকসে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক বিপর্যয় যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছে, তখন থেকেই দেশটির জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং মনে করে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ছাড়া তাদের মুক্তি আসবে না। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের জন্য তারা ক্ষমতাসীন নেতাদেরই দায়ী করেন। জনগণ দেখেছে, তাদের দুরবস্থার জন্য গোতাবায়ে রাজাপাকসের পরিবারের সদস্যদের বিলাসিতা ও স্বেচ্ছাচারিতাই দায়ী।
২০২২ সালের মার্চ মাসে প্রধান বিরোধীদল এসজেবির প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের দাবিতে রাষ্ট্রপতির ভবনের সামনে বিক্ষোভের মাধ্যমে এ আন্দোলন শুরু হয়। সরকার বিক্ষোভকারীদের দমন করতে অনেক অত্যাচার-নির্যাতন চালায়। একপর্যায়ে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে। রাজনৈতিক দল ও ট্রেড ইউনিয়নগুলোর সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করে। মে মাসের দিকে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে এবং গুলি করার নির্দেশ দেয়। জুলাই মাসে আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে। ৯ জুলাই লাখ লাখ লোক রাজপথে নেমে আসে এবং গণঅভ্যুত্থান ঘটে। জনগণ প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ে রাজাপাকসের পদত্যাগের দাবিতে তার বাসভবনে সমবেত হন। বিক্ষুব্ধ জনতা নিরাপত্তা বেষ্টনী গুঁড়িয়ে দিয়ে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে প্রবেশ করে। গোতাবায়ার ছোট ভাই ও দেশটির সাবেক অর্থমন্ত্রী বাসিল রাজাপাকসেও গোপনে দেশ ছেড়ে পালাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিক্ষোভকারীদের বাধার মুখে পালাতে পারেননি। জনগণ বাসভবন ঘেরাওয়ের আগেই প্রেসিডেন্ট তার প্রাসাদ থেকে পালিয়ে যান। তিনদিন শ্রীলঙ্কায় আত্মগোপনে থাকার পর ১২ জুলাই বিমান বাহিনীর একটি বিমানে করে তিনি মালদ্বীপ পালিয়ে যান। ১৪ জুলাই তিনি মালদ্বীপ থেকে সিঙ্গাপুরে যান। ইমেইলে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান। এভাবেই শ্রীলঙ্কায় এক দুর্নীতিবাজ স্বৈরশাসকের শাসনের অবসান ঘটে। ২০ জুলাই শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্ট রনিল বিক্রমসিংহকে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে। হরিণী অমরসূর্য হলেন শ্রীলঙ্কার বর্তমান এবং ১৬তম প্রধানমন্ত্রী, যিনি ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সাল থেকে এ দায়িত্বে আছেন।
অর্থনৈতিক সংকটের কারণে জনরোষ চরমে ওঠে এবং গণরোষের মুখে দেশটির শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়। তারপর দেশটির দায়িত্ব গ্রহণ করেন রনিল বিক্রমাসিংহ। রনিল বিক্রমাসিংহের নেতৃত্বে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন শুরু করে শ্রীলঙ্কা। বেশকিছু নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এক বছরের মধ্যে এর ফল পেতে শুরু করে দেশটি। সুনির্দিষ্টভাবে বললে, শ্রীলঙ্কা সরকার ব্যয় কমিয়ে রাজস্ব বাড়িয়েছে আর সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করে করজাল বিস্তৃত করেছে। মূলত এ দুটি নীতি-পদক্ষেপের ফলেই ঘুরতে শুরু করে দেশটির অর্থনীতির চাকা। কারণ গণতন্ত্রের নামে যেসব স্বৈরশাসকরা রাষ্ট্রে পরিবারতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্র চালু করে উন্নয়নের পরিবর্তে দেশকে শাসন ও শোষণই করে থাকে। তার পরিণাম ভোগ করতে হয় দেশ ও দেশের সাধারণ জনগণকে। জনগণ আশা করছে, ঘুরে দাঁড়াবে শ্রীলঙ্কা, তবে রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামোর পরিবর্তন আশানুরূপ নয়। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শ্রীলঙ্কাকাকে তার দেশকে যথাযথ গতিতে আনতে এখনো লম্বা পথ পাড়ি দিতে হবে।
জেসমিন বিপ্লব ও তিউনিসিয়ার অনিশ্চিত যাত্রা
তিউনিসিয়ার গণঅভ্যুত্থান, যা জেসমিন বিপ্লব বা মর্যাদার বিপ্লব নামেও পরিচিত। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে এ বিপ্লব সংঘটিত হয়। এটি ছিল একটি ব্যাপক নাগরিক প্রতিরোধ আন্দোলন, যার ফলস্বরূপ দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক জইন এল আবেদিন বেন আলীর পতন ঘটে। এই বিপ্লবে আরব বসন্তের সূচনা করে এবং গণতন্ত্রের জন্য একটি নতুন পথ খুলে দেয়। তিউনিসিয়ার গণঅভ্যুত্থানের মূল কারণগুলো হলো- দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসন, অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব এবং দুর্নীতি তিউনিসিয়ানদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে।
মোহাম্মদ বুয়াজিজি নামে এক ফল বিক্রেতা আর্থিক সংকটের কারণে আত্মহত্যা করে। তার এ আত্মহত্যা পুরো তিউনিসিয়ার জনগণের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং দেশব্যাপী আন্দোলনের সূচনা হয়। এ ঘটনা তিউনিসিয়ার জনগণের মধ্যে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। গণআন্দোলনের প্রেক্ষিতে জইন এল আবেদিন বেন আলী দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। মুহাম্মদ রশিদ আল ঘানুচি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এভাবে আরব বিশ্বের একমাত্র দেশ তিউনিসিয়ায় গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্রের কারণে রশিদ আল ঘানুচি খুব বেশিদিন তিউনিসিয়ার দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। নির্বাচনের মাধ্যমেই তিউনিসিয়ায় ক্ষমতায় এসেছিলেন তিউনিসিয়ার রশিদ ঘানুচির দল আন নাহদা। রশিদ ঘানুচি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নেতা। তিনি সেক্যুলারিজমসহ অন্য সব মতামতকে সঙ্গে নিতে কীভাবে সবার অন্তর্ভুক্তিসহ একটি সমাজ গঠন করা যায়, সে বিষয়ে নানান মতামত প্রকাশ করে আসছিলেন কয়েক বছর ধরেই।
কিন্তু ঘানুচির শেষ রক্ষা হয়নি। করোনা মহামারির অব্যবস্থাপনাসহ নানা অজুহাত তুলে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইদ ২০২১ সালের গ্রীষ্মে ভেঙে দেন জাতীয় সংসদ এবং স্থগিত করেন সংবিধান। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গ্রেফতার হন রশিদ ঘানুচি।
অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি
২০১১ সালের ‘আরব বসন্ত’ এর পর থেকে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করলেও সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট কায়েস সাইয়েদ কিছু বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করেছেন এবং পার্লামেন্ট স্থগিত করেছেন, যা অনেকের মতে অভ্যুত্থান এবং গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ।
প্রেসিডেন্ট কায়েস সাইয়েদ সংবিধান সংশোধন করে নিজের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা নিয়েছে। যা ইতোপূর্বেকার স্বৈরাচারী শাসকদের মতো একটি পদক্ষেপ। প্রধানমন্ত্রীর অপসারণ এবং পার্লামেন্টের স্থগিতাদেশ তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর অস্থিরতা তৈরি করেছে।
তিউনিসিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারি পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে। গণঅভ্যুত্থানে একটি বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পরও অর্থনৈতিক সংকটের অবসান হয়নি।
কায়েস সাইয়েদের পদক্ষেপগুলো গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, দেশটি হয়তো আবার স্বৈরাচারী শাসনের দিকে ফিরে যাচ্ছে। তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে বেশ উদ্বেগজনক। গণতন্ত্রের পথে যাত্রা কতটা সফল হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
একটি গণঅভ্যুত্থান ও বিপ্লবের পরও দেশটিতে এখনো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসেনি। তিনি ২০২৫ সালের ২১ মার্চ থেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
মিশরের গণঅভ্যুত্থান রুখতে পারেনি স্বৈরশাসকদের
তিউনিসিয়ার এ বিপ্লব আরব দেশগুলোয় প্রভাব ফেলে। আরব দেশগুলোয়ও গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম শুরু করতে সাধারণ জনগণকে উদ্ধুদ্ধ করে, যা ‘আরব বসন্ত’ নামে পরিচিত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আরব বিপ্লব সফল হয়নি।
তিউনিসিয়ার পরপরই ২০১১ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে আরব রাষ্ট্র মিশরেও গণঅভ্যুত্থান ঘটে। গণঅভ্যুত্থানে মিশরের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হোসনি মুবারকের শাসনের অবসান ঘটে। এ আন্দোলনে মিশরের রাজধানী কায়রোর তাহরির স্কোয়ারে লাখ লাখ মানুষ সমবেত হয়েছিল এবং তাদের বিক্ষোভে সামরিক বাহিনী হস্তক্ষেপ করে।
মিশরে ছাত্র ও যুবকরা বিক্ষোভ শুরু করে। এ বিক্ষোভ রাজধানী কায়রো থেকে দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারককে অবিলম্বে পদত্যাগ করার আহ্বান জানায়। সারা দেশে হোসনি মুবারকের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। হোসনি মুবারক সরকার বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংস নির্যাতন চালায়, যার ফলে শত শত ছাত্র-যুবক হতাহত হয়। মুবারক মেয়াদ শেষে পদত্যাগ করার প্রতিশ্রুতি এবং কিছু ছাড় দিয়ে বিক্ষোভকারীদের শান্ত করার অপচেষ্টা চালিয়ে শেষ রক্ষা করতে পারেনি। তিন সপ্তাহ ধরে গণবিক্ষোভের মুখে হোসনি মুবারক রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
তারপর কয়েক দশক পর ২০১২ সালে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত একটি নির্বাচনে ইখওয়ানুল মুসলিমিন নেতা মুহাম্মদ মুরসি মিশরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কিন্তু মিশরের পশ্চিমা প্রভাবিত সেনাবাহিনী এক সামরিক অভ্যুত্থান করে ২০১৩ সালে মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা দখল করে । সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ সিসি অগণতান্তিকভাবে মিশরের ক্ষমতা দখল করে আছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিযোগ একটি সফল গণঅভ্যুত্থানের পরও পশ্চিমাদের কারণে মিশরে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টেকসই হলো না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পশ্চিমারা মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও যেখানে তাদের স্বার্থের আঘাত ঘটে, সেখানে তারা গণতন্ত্রকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিস্টদের ক্ষমতায় আসীন করে।
তিউনিসিয়া, মিশর, শ্রীলঙ্কা ও সর্বশেষ বাংলাদেশে স্বৈরশাসক ও রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণ বিদ্রোহ করেছে এবং গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। স্বৈরশাসক, ফ্যাসিস্ট ও রাজতন্ত্রের পতন ঘটেছে। স্বৈরশাসকরা পালিয়ে গেছে। কিন্তু এসব গণঅভ্যুত্থান ও বিগত শাসকদের পতনের পর ক্ষমতা গ্রহণ নিয়ে বড় ধরনের গরমিল তথা পার্থক্য আছে। গণঅভ্যুত্থানের পর তিউনিসিয়া, মিশর, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের সমর্থিত বিপ্লবীরা ক্ষমতা গ্রহণ করেছে বা জনগণ ক্ষমতা অর্পণ করেছে। অপরদিকে তিউনিসিয়া মিশর ও বাংলাদেশে গণঅভুত্থানে স্বৈরশাসক ও ফ্যাসিস্টদের পতনের পর বিপ্লবীরা ক্ষমতা নিতে পারেনি। তিউনিসিয়া ও মিশরে বিপ্লবীরা ক্ষমতা গ্রহণ ও সংহত করতে পারেনি। বরং বিপ্লবীদের হটিয়ে দিয়ে স্বৈরশাসকদের উত্তরসূরিরাই আবার ক্ষমতায় বসেছে।
আশাবাদী বাংলাদেশ
বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় ঘাটতি ছিল এটার নেতৃত্বে প্রকাশ্যে বড় কোনো নেতা ছিলেন না। কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল না। যারা প্রকাশ্যে ও সামনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের সবাই ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্র। তারাও বড় কোনো ছাত্র সংগঠনের নেতা ছিলেন না। তাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তীতে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনায় ক্ষমতা অর্পিত হয়েছে পুরনো ব্যবস্থার মাধ্যমে তৈরি নেতৃত্বের ওপর। তবে বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী গণপ্রত্যাশা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত পর্যালোচনার সময় আসেনি। বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের স্টেকহোল্ডার ও সাধারণ জনগণ এখনো আশাবাদী এবার দেশে বড় ধরনের সংস্কার হবে এবং পুরনো ব্যবস্থার বদলে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মাধ্যমে দেশ এগিয়ে যাবে। গড়ে উঠবে একটি নতুন বাংলাদেশ। এ প্রত্যশায় গণঅভ্যুত্থানের নেতারা মাঠে ময়দানে কাজ করে যাচ্ছে।
স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় পশ্চিমাদের ভূমিকা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিযোগ, বিভিন্ন অভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারগুলোর উৎখাতে পশ্চিমাদের ইন্ধন রয়েছে। বিভিন্ন সময় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারগুলোকে উৎখাতের এ পশ্চিমা নীতি শুধুই মধ্যপ্রাচ্য কিংবা দক্ষিণ এশিয়ায় থেমে থাকেনি; ঠাণ্ডাযুদ্ধের সময় সমাজতন্ত্রকে বিদায় করার জন্য পশ্চিমারা; বিশেষ করে মার্কিনিরা লাতিন আমেরিকার নানা দেশে সেনাশাসন চাপিয়ে দিয়েছিল। সেই তালিকা অনেক দীর্ঘ এবং রক্তাক্ত।
গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মুরসি, ঘানুচি কিংবা ইমরানের ঘটনার সঙ্গে চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দের অনেক মিল। ঠাণ্ডাযুদ্ধের সময় আলেন্দে নির্বাচিত হয়েছিলেন গণতান্ত্রিকভাবে। স্বপ্ন দেখেছিলেন চিলিসহ লাতিন আমেরিকার সম্পদ; বিশেষ করে কৃষিজমিতে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার। কিন্তু পশ্চিমারা সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে যেমন জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতাদের ভিন্ন ভিন্ন কায়দায় ক্ষমতা থেকে হয় সরিয়ে দিয়েছে অথবা সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে হত্যা করেছে বা কারাবন্দির ব্যবস্থা করেছে। ঠিক তেমনিভাবে পশ্চিমারা তিউনিসিয়ায় ঘানুচি ও মিশরে মুরসির সাথে এমন আচরণই করেছে।
দরকার পুরনো ব্যবস্থার বদল ও নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্ত
একটি দেশে শুধু গণঅভ্যুত্থান করলেই জনগণের ভাগ্যের চাকা ঘুরে না। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তীতে প্রয়োজন হয় পুরনো ব্যবস্থার বদল ও নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্ত। আর তার জন্য জরুরি প্রয়োজন হচ্ছে অভ্যুত্থান-পরবর্তীতে বিপ্লবী রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও শক্তি। তিউনিসিয়া, মিশর, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশে যে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, এ গণঅভ্যুত্থানগুলো সাধারণ জনগণের ক্ষোভ ও অসন্তোষ থেকে বিস্ফোরণ ঘটেছে। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ঘাটতি ছিল। যে নেতৃত্ব শক্ত হাতে পুরনো ব্যবস্থার বদল করে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত চালু করতে পারবে। বাংলাদেশেও গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তীতে পুরনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যেই থাকতে চাচ্ছে, স্টেকহোল্ডারদের একটি অংশ। অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী অংশটি নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্ত চাচ্ছে কিন্তু তার বিরোধিতা আসছে পুরনো বন্দোবস্তের ধ্বজাধারীদের পক্ষ থেকে। সব মিলিয়ে সাধারণ জনগণের মধ্যে সাফল্য ও ব্যর্থতার মিশেলে একটি হতাশা কাজ করছে।