এডভোকেট নজরুল ইসলাম : বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী
১৭ জুলাই ২০২৫ ১৪:০০
॥ মো. আলমগীর হোসেন ॥
এডভোকেট নজরুল ইসলাম একজন নিভৃতচারী আইনজীবী, আলেম, রাজনীতিক; সর্বোপরি এক অনন্য দাঈ ইলাল্লাহ। এ দেশের কয়েক দশকের রাজনীতির প্রত্যক্ষদর্শী এ রাজনীতিক যেমন দেখেছেন পাকিস্তান আমলের আইয়ুব খানের শাসনামল, তেমনি দেখেছেন শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার শাসনামল। রাজনীতি করতে গিয়ে তিনি যেমন স্বৈরশাসক এরশাদের আমলে জেল খেটেছেন, তেমনিভাবে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার কারাগারেও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
ক্ষণজন্মা এ আইনজীবী ১৯৪০ সালে বৃহত্তর পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমার অন্তর্গত বর্তমান চৌহালী উপজেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ২০২১ সালের ১৫ জুলাই ৮১ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। মাদরাসা শিক্ষার পাশাপাশি তিনি স্কুল ও পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে লেখাপড়া করেন এবং ওই কলেজের ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। তিনি উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি বিশ্বদ্যিালয়ে স্নাতকোত্তর ও আইনশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৫-৬৬ সালে দেশে ফিরে তিনি পাবনাতেই আইন পেশায় নিয়োজিত হওয়ার পাশাপাশি রাজনীতিতেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে সিরাজগঞ্জের একটি আসন থেকে অংশগ্রহণ করেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি নারায়ণগঞ্জে ইসলামী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা পালন শুরু করেন। প্রথম দিকে তমুদ্দুন একাডেমির মাধ্যমে ইসলামপ্রিয় মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। ইসলামী শিক্ষার প্রসারে ইসলামিক সোসাইটি অব নারায়ণগঞ্জের অধীনে নারায়ণগঞ্জে আদর্শ স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এক সময় তিনি জামায়াতে ইসলামীর বৃহত্তর নারায়ণগঞ্জের জেলা আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৫ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে মরহুম আব্বাস আলী খান (রহ.) ও শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা (রহ.)-এর সঙ্গে গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকেন। ১৯৮৮ সালে পুনরায় গ্রেফতার হওয়ার পরও দুই মাসের বেশি সময় কারাবন্দি ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়ন নিয়ে ১৯৮৬ ও ১৯৯১ সালে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন (সদর ও বন্দর থানা) থেকে এবং ১৯৯৬ সালে রাজধানীর ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুর আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি সুদীর্ঘকাল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ও মজলিসে শূরা সদস্য ছিলেন। ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে গঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের শীর্ষনেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় তিনি অন্যতম প্রধান আইনজীবী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এডভোকেট মাওলানা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম (রহ.) সুপ্রিম কোর্টের খ্যাতিমান সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে ছিলেন পরিচিত মুখ। আইনবিদদের মধ্যে ঐক্য প্রচেষ্টায় তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। তিনি ইসলামী মনোভাবাপন্ন অন্য আইনবিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠন করেছিলেন বাংলাদেশ ইসলামিক ল’ ইয়ার্স কাউন্সিল। তাঁর ধ্যান-জ্ঞান ছিল ইসলামাইজেশন অব ল’। বাংলাদেশের আইনের যতটুকু ইসলামের চিরকল্যাণকর আইনের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, সেটুকুকে ইসলামী আইনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন “বাংলাদেশ ইসলামিক ল’ রিসার্চ এন্ড লিগ্যাল এইড সেন্টার”। বাংলাদেশের একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান, যেটি ইসলামাইজেশন অব ল’ নিয়ে কাজ করে। ইতোমধ্যে ল’ রিসার্চ সেন্টার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে ।
আদালত প্রাঙ্গণে তাঁর অবদান ছিল ঈর্ষণীয়। ইসলামের অপার সৌন্দর্যকে যারা কলুষিত করতে চেয়েছিল, তিনি তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন কখনো স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আবার কখনো মজলুমের পক্ষের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে। বাংলাদেশ ইসলামিক ল’ রিসার্চ এন্ড লিগ্যাল এইড সেন্টারের ব্যানারে তিনি মামলা লড়েছেন ফাতওয়া নিষিদ্ধকরণের বিপক্ষে। তাঁরই একান্ত প্রচেষ্টায় আদালত ফাতওয়া সম্পর্কে একটি ভারসাম্যপূর্ণ রায় প্রদান করেন। অধিকার আদায় করে দেন তালাকপ্রাপ্ত নারীর খোরপোষের। আইনি লড়াই করেছেন ‘ইউনিফাইড ম্যারেজ অ্যাক্টে’র বিরুদ্ধেও। ফাতওয়া, খোরপোষ, তালাক শীর্ষক ইসলামী শরিয়া সংক্রান্ত মামলার সফল আইনজীবী ছিলেন তিনি।
এডভোকেট মাওলানা নজরুল ইসলাম (রহ.) আজীবন একজন নিবেদিত দাঈ ইলাল্লাহর দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে ইসলামপন্থীদের মধ্যে ঐক্য প্রয়াসে আজীবন সদা সচেষ্ট ছিলেন। বৃহত্তর ঐক্যের দাওয়াত নিয়ে তিনি হাজির হয়েছেন দেশের বড় বড় কওমি ও আলিয়া মাদরাসায়, পীর-মাশায়েখগণের দরবারে; বিশেষ করে ছারছীনা, চরমোনাই, ফুরফুরা দরবারসহ হাটহাজারী মাদরাসার ওলামায়ে কেরামদের সাথে মতবিনিময় করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি দেশবিখ্যাত আলেম জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা ওবায়দুল হক (রহ.), শায়খুল হাদীস আল্লামা এ.কে.এম. ইউসুফ (রহ.), মুফতি আহমদ শফী (রহ.), শায়খুল হাদীস আল্লামা আজীজুল হক, মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস (রহ.), মাওলানা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ, মুফতি ফজলুল হক আমিনী (রহ.), মাসিক মদিনার সম্পাদক মাওলানা মুহীউদ্দীন খান (রহ.), মাওলানা কামাল উদ্দিন জাফরী (রহ.), বায়তুশ শরফের পীর মাওলানা আব্দুল জব্বার (রাহি.), সাবেক সংসদ সদস্য শহীদ মাওলানা আবদুস সুবহান (রহ.) ও সাবেক সংসদ সদস্য বিশিষ্ট মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রাহি.) প্রমুখের সাথে একাধিক বৈঠকে মিলিত হয়েছেন।
তিনি প্রচণ্ড শিক্ষানুরাগীও ছিলেন। দেশের বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা ও স্কুল প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনার সাথে আজীবন সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। এক্ষেত্রে তিনি মরহুম শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ আব্দুর রব (সাবেক চেয়ারম্যান, ইসলামিক এডুকেশন সোসাইটি), বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক এ.কে.এম. নাজির আহমদ, বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক আব্দুল মান্নান তালিবসহ দেশ বিখ্যাত শিক্ষাবিদদের সাথে কাজ করেছেন।
এডভোকেট মাওলানা নজরুল ইসলাম (রাহি.) বাংলাদেশের উচ্চ আদালত ও নিম্ন আদালতসমূহে ইসলামী ব্যাংকিং ও শরিয়া আইনসংক্রান্ত বিধিবিধান নিয়েও কাজ করেছেন। তিনি ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন শরিয়াভিত্তিক এবং অন্যান্য ব্যাংকসমূহের জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো উচ্চ আদালত ও নিম্ন আদালতসমূহে দক্ষতার সাথে পরিচালনা করেছেন। ব্যাংক কোম্পানি আইন ও ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ে আইন ও বিধি প্রণয়নেও অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন এ ক্ষণজন্মা আইনজীবী। শুরু থেকেই ইসলামী ব্যাংকের লিগ্যাল এডভাইজারের ভূমিকা পালন করেছেন এবং প্রথম দিকে তিনিসহ অনেকেই ব্যাংকের বিভিন্ন আইনি কাজে কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করেননি।
এডভোকেট মাওলানা নজরুল ইসলাম (রাহি.) বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ইসলামী ব্যাংকিং ও শরিয়াসংক্রান্ত নিয়মাবলী ও পরিপালনের ক্ষেত্রে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন সভা-সমাবেশ, সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণ করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
সর্বোপরি তিনি শুধু একজন আইনজীবীই নন, একজন বড় মাপের আলেমও বটে। তাই দেশবিখ্যাত আলেমদের সাথে বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন সভা, সমাবেশ, সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম আয়োজন ও তাতে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।