কবি ফররুখ আহমদ ও তার ভালোলাগা


১৯ জুন ২০২৫ ১৪:০৮

১০ জুন আমাদের প্রিয় কবি ফররুখ আহমদের জন্মদিন

॥ শরীফ আবদুল গোফরান ॥
আমরা সবাই জানি ১০ জুন আমাদের প্রিয় কবি ফররুখ আহমদের জন্মদিন। বারবার করে এ দিনটি আমাদের মাঝে আসে। আবার চলে যায়। কবির জন্ম-মৃত্যু এলেই তাকে স্মরণ করা হয়। আবার ভুলে যাই। যে কবি মানুষের কবি, মানবতার কবি, ফুল-পাখিদের কবি, ছোটবড় সবার কবি তাকে কি কখনো ভোলা যায়? যেসব গুন একজন মানুষকে কালের পটে অমর করে, মহৎ করে তার সবগুলোই তো ছিল কবি ফররুখ চরিত্রে। এজন্যই তো ফররুখ আহমদ একজন কবি, একজন আদর্শ মানুষ, একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠান। তাহলে এ বড় মানুষটি কেমন ছিলেন, তার ভালো লাগা কী ছিল তা জানার চেষ্টা করি। কবি ফররুখ আহমদের দেহের গড়ন ছিল লম্বা, হালকা-পাতলা। তার দীর্ঘ উন্নত নাক, তীব্র ও তীক্ষè দুটি চোখ মানুষকে মুগ্ধ করতো।
ছাত্রজীবনে তিনি খুব ভালো ছাত্র ছিলেন। সব সময় ক্লাসে প্রথম হতেন। তার স্মরণশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। দেশি-বিদেশি অনেক কবির কবিতা তিনি অনর্গল মুখস্থ আবৃত্তি করতে পারতেন। অসংখ্য কুরআনের আয়াত এবং হাদিস তার কণ্ঠস্থ ছিল।
অর্থের প্রতি কবি ফররুখের কখনোই লোভ ছিল না। জীবনে তার যা খ্যাতি ছিল তা নিয়ে ধনৈশ্বর্যের মালিক হওয়া অত্যন্ত সহজ ছিল, কিন্তু কবি সে পথকে ঘৃণাভরে বর্জন করেন। অর্থ কষ্টের কারণে অনেক সময় তিনি বন্ধুদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেননি। ফলে তিনি জুতা সেলাই, পট্টি করিয়ে, কাপড়ে তালি লাগিয়ে ব্যবহার করেছেন।
দারিদ্র্যকে কবি সাদরে গ্রহণ করেছেন। আভিজাত্য বা বিলাসিতার প্রতি তার সামান্য লোভও ছিল না। সংসারে অভাব-অনটন থাকা সত্ত্বেও তিনি কারো কাছে কখনো হাত পাতেননি। বরং তিনি সবাইকে কবিতার ভাষায় বলতেন-
তোরা চাসনে কিছু কারো কাছে
খোদার মদদ ছাড়া
তোরা পরের উপর ভরসা ছেড়ে
নিজের পায়ে দাঁড়া।
কবি ফররুখ আহমদ এ শিক্ষা কোথা থেকে নিয়েছেন? তিনি আমাদের প্রিয় নবী (সা.) থেকেই এই শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। যেমন রাসূল (সা.) একদিন নামাজ পড়ে খুব তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরছিলেন। তখন সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, প্রিয় নবী (সা.) আজকে এতো তাড়াতাড়ি কেন? রাসূল (সা.) বললেন, আমার ঘরে কিছু স্বর্ণ এসেছে, রাত হওয়ার আগেই এসব স্বর্ণ বিলিয়ে দিতে হবে। অর্থাৎ রাসূল (সা.) নিজের জন্য অর্থসম্পদ কিছুই রাখতে চান না। সব তিনি গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। আমাদের প্রিয় কবি ফররুখ আহমদ রাসূলের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে তা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করেন। কারণ তার নিজের সঞ্চয় বলতে কিছুই ছিল না। যা আয় করতেন তা থেকে নিজের পরিবারের জন্য খরচ করতেন, আবার গরিবদের মধ্যেও বিতরণ করতেন। ফলে মৃত্যুর পর তার জমানো কোনো ধন-সম্পদ বলতে কিছুই ছিল না- সারাটা জীবন আদর্শের সংগ্রামে নিয়োজিত থাকলেও সংসার সম্পর্কে কবি অত্যন্ত সচেতন ছিলেন।
গৃহকর্তা হিসেবে, পিতা হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের তুলনা করা যায় না। দুর্ভিক্ষ, জরা, মৃত্যু, দাঙ্গা, মহামারি এসব অস্থিরতার মাঝেই কেটেছে তার জীবন। কিন্তু তিনি কখনো নিরাশ হননি। অন্ধকার আর কুয়াশাভেদ করে তার চোখে ভেসে উঠতো আলোর রাজতোরণ।
কবি ফররুখ আহমদ সারা জীবন মানবতার পক্ষে কথা বলেছেন। পাপকে তিনি ঘৃণা করতেন। কেউ অভাব-অনটনের কথা জানালে, কবি যদ্দুর সম্ভব নিজে না খেয়ে তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করতেন। বেতন পেয়েছেন, এমন সময় রাস্তার কেউ এসে নিজের চিকিৎসা বা অন্য কোনো সমস্যার কথা বলেছেন, কবি তার বেতনের সবকয়টি টাকাই তাকে দিয়ে শূন্য পকেটে বাড়ি ফিরতেন। এ উদার কবি এদেরকে নিয়েই আবার কবিতা লিখতেন। কবি ফররুখ আহমদ পেট ভরে কখনো খেতেন না। অর্ধেকটা খেয়ে বাকিটা দিয়ে দিতেন কোনো অনাহারি মানুষকে।
অতিথি পরায়ণতায়ও তিনি ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। ওসব কথা তার পরিচিতজনদের কাছে এখনো এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। তার চা, মিষ্টি, শিঙাড়া খেতে হয়েছে পরিচিত সবাইকে। প্রাপ্ত বেতনের বেশিরভাগই ব্যয় হতো আতিথেয়তায়। রেডিও অফিসের পাশে আবুল মিয়ার চায়ের দোকানে বসে কবি ভক্তদের নিয়ে হাসি, রঙ্গরসে গল্প করে মাতিয়ে তুলতেন। আর তখন ফাঁকে ফাঁকে চলতো চা-নাশতা খাওয়া। মাস শেষ হলে বেতন পেতেই আবুলের টাকা পরিশোধ করতেন।
সত্যবাদিতায় কেমন ছিলেন কবি? তার সমস্ত জীবনে একবারও মিথ্যা বলেছেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় না। এমনকি তার নিন্দুকেরাও এর প্রমাণ দিতে পারবে না।
ছোটদের কবি কাছে পেলেই টেনে নিতেন। আদর করতেন, চুমো খেতেন। ছোটরা ছিল কবির প্রাণ। ছোটদের ভালো না বাসলে কবি তাদের জন্য এত গান, এত কবিতা লিখতে পারতেন না। কবি ছোটদের সাথে এবং তাদের সাথে শিশুদের মতো করে কথা বলতেন। পিতা-মাতা যেমন সন্তানদের সঙ্গে স্নেহের সঙ্গে আদরের সাথে কথা বলেন, মেলামেশা করেন, কবি ফররুখ আহমদও ঠিক তেমনি করে ছোটদের সাথে ব্যবহার করতেন। রেডিওতে ছোটদের জন্য তার পরিচালিত অনুষ্ঠানটিতে তিনি যে রকমভাবে কথা বলতেন, বুঝাতেন, সেটা যারা শুনেছেন তারাই জানেন যে, তিনি কেমন করে ছোটদের সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলতেন। ছোটদের জন্য কবির লেখাগুলো রঙ্গরসে ভরপুর ছিল। তিনি ছোটদের কথা ভেবেই অনেকগুলো ছড়া, কবিতা, বর্ণমালার বই, গান, নাটক লিখে গেছেন। পাখির বাসা, নতুন লেখা, চিড়িয়াখানা এমন অনেক বই আছে তার। তিনি ছোটদের উদ্দেশে তার লেখায় বলেন-
আমরা সকল দেশের শিশু যাবো
নবীর মদিনায়
তোরা সঙ্গে যাবি আয়
আয় আয় তোরা সঙ্গে যাবি আয়।
কবি ফররুখ আহমদের প্রিয় শখ ছিল ফুলের বাগান করা। তার শখ দামি কলম কেনা। তার প্রিয় খাবারের কথা বললে তো জিবে পানি চলে আসে। তার প্রিয় খাবার- শিক কাবাব, টিকিয়া, চাইনিজ, চালকুমড়ার মোরববা, ভালো নাশতা, রোজ সিরাপ, পনির, গোশতের কিমা, আরবীয় খেজুর ও আম।
কবির প্রিয় শিল্পী ছিলেন শচীন দেব বর্মণ, বেদার উদ্দিন আহমদ, সোহরাব হোসেন, আব্বাসউদ্দীন ও আবদুল আলীমের মতো খ্যাতিমান শিল্পীরা। তার পছন্দের গান-
‘পদ্মার ঢেউ রে-
মোর শূন্য হৃদয়- পদ্ম নিয়ে যা, যা রে।
তার প্রিয় পোশাক ছিল পায়জামা, পাঞ্জাবী, শেরওয়ানী। শীতে পুলওভার আলোয়ান।
১৯১৮ সালের ১০ জুন যশোরের মাঝআইলে কবি ফররুখ আহমদ জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সৈয়দ হাতেম আলী আর মাতা বেগম রওশন আখতার।
১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর কবি ফররুখ আহমদ ইন্তেকাল করেন। রমজান মাসে যে মানুষটির জন্ম হয়েছিল আবার রমজান মাসেই তিনি বিদায় নিয়েছেন অন্য জগতে।
কবি ফররুখ আহমদ দৃঢ় চরিত্রের আদর্শ মানুষ। আবার হৃদয়বানও। মানুষকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন তিনি। ফলে ইতিহাসে তিনি একজন বড় মানুষ হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।