দিগন্ত বিস্তৃত স্বপ্নের কবি ফররুখ আহমদ
১৯ জুন ২০২৫ ১২:১৮
॥ তৌহিদুর রহমান ॥
বর্তমান বিশ্বজুড়ে মানবতার লেবাসধারী জালেম শাসকের সংখ্যা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। অন্যদিকে বিশ্বাসী প্রতিবাদী মজলুম মানুষের সংখ্যার ক্ষেত্রেও এসেছে অনেক পরিবর্তন। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা বিশ্বাসী মানুষকে নতুন এক ক্রুসেডের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী চিহ্নিত করে বিভেদ-সংঘাত বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। যেন বর্ণবাদের নতুন এক ভয়ঙ্কর খেলায় মেতে উঠেছে বিশ্ব। মানুষে মানুষে হানাহানির এ যেন নতুন এক নীলনকশা। এ যেন নমরূদ-ফেরাউনের যুগের আবির্ভাব। সন্ত্রাসবিরোধী, জঙ্গিবিরোধী যুদ্ধ আখ্যা দিয়ে প্রকারান্তরে বিশ্বব্যাপী নতুন একটি ক্রুসেড চালানো হচ্ছে শুধুই মুসলমানদের বিরুদ্ধে। একদিকে আইএস, তালেবান ও জঙ্গি; অন্যদিকে জঙ্গিবিরোধী জালেম-বিশ্ব সবারই একমাত্র টার্গেট মুসলিম দেশ ধ্বংস করা ও মুসলমানদের হত্যা করা। ধনতন্ত্র বা পুঁজিবাদ বর্তমান বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে। বস্তুবাদী, সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদীদের শ্যেন দৃষ্টি পড়েছে প্রধানত মুসলিম বিশ্বের ওপর। মানবতার নামে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধবাজরা মুখে বলছে, সন্ত্রাসীদের কোনো ধর্ম নেই। তাদের কোনো আদর্শ নেই, দেশ নেই। সন্ত্রাস নিন্দনীয়। আমরা ইহুদি সন্ত্রাসী চাই না। ইহুদিবাদ পছন্দ করি না। হিন্দু সন্ত্রাসী চাই না। খ্রিস্টান আর মুসলমান সন্ত্রাসীও চাই না। কিন্তু তারা কার্যক্ষেত্রে গোপনে-প্রকাশ্যে ইহুদি সন্ত্রাসীসহ অন্য ধর্মের সন্ত্রাসীদের অস্ত্র-শস্ত্রসহ সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে শুধু মুসলমানদের হত্যা করার জন্য এবং নিজেরা সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের অংশ হিসেবে টনকে টন বোমা ফেলে হত্যা করছে নিরীহ মুসলমানদের। ফিলিস্তিন, সিরিয়া, কাশ্মীর, ইরাক, আফগানিস্তান এর জ¦লজ্যান্ত উদাহরণ। ধ্বংস করছে একটার পর একটা মুসলিম দেশ। এর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে আদর্শ হিসেবে ইসলাম, জাতি হিসেবে মুসলমান, রাষ্ট্র হিসেবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। আমরা মনে করি, তারপরও কালজয়ী আদর্শ ও বিশ্বাসের নিজস্ব একটা প্রাণশক্তি থাকে। বেছে বেছে বিশ্বাসী সব মানুষকে নির্মূল করে দেয়া সম্ভব হলেও আদর্শের কারণে নতুন করে আরো বেশি প্রবল প্রাণশক্তিসম্পন্ন বিশ্বাসী মানুষ জন্ম নেয়। আমরা বলতে চাই আদর্শের কখনো মৃত্যু ঘটে না। আদর্শ কখনো মরে না। আদর্শকে কখনো হত্যা করা যায় না। একজন আদর্শিক ব্যক্তিকে হত্যা করা খুবই সহজ কাজ। এর মধ্যে কোনো বাহাদুরি নেই। পৃথিবীতে বিভিন্ন আদর্শের কোটি কোটি লোককে নানা কারণে হত্যা করা হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু তাদের অনুসৃত আদর্শকে পৃথিবীর বুক থেকে নিচিহ্ন করে ফেলা সম্ভব হয়নি। যদি মহান আল্লাহ না চান, তাহলে কোনো আদর্শ কখনো ধ্বংস হয়ে যায় না।
কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন মহান এক আদর্শের ঝান্ডাবাহী একজন শিরউঁচু করা মুসলমান। তাই ফররুখ আহমদদের মতো আদর্শবাদীদের কখনো মৃত্যু হয় না। ফররুখ আছে, ছিল, থাকবে অনন্তকাল। ফররুখদের কখনো হত্যা করা যায় না, যাবে না। অনেকেই আক্ষেপ করে বলে থাকেন ফররুখ আহমদের যথাযথ মুল্যায়ন হয়নি, হচ্ছে না। আমরা মনে করি রবীন্দ্র-নজরুলের পরে বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে অধিক মূল্যায়িত হয়েছেন ফররুখ আহমদ। বিশিষ্ট সাহিত্য সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দ প্রায়ই বলতেন, ‘যিনি যত বেশি সমালোচিত হন, তিনি তত বেশি মূল্যায়িত হন।’ বাংলা সাহিত্যে ফররুখ আহমদ অত্যন্ত সমালোচিত একজন কবি। তাঁকে ইসলামী আদর্শের বা ইসলামী রেনেসাঁর কবি বলা হয়ে থাকে। এতে করে তাঁর সমালোচকের সংখ্যাও অনেক। দুনিয়ায় শুধুমাত্র আদর্শ টিকে থাকবে আর অন্য সবকিছু কালের পরিক্রমায় একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই আমরা মনে করি, কবি ফররুখ আহমদ ততদিন বেঁচে থাকবেন, যতদিন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বেঁচে থাকবে।
বাংলা সাহিত্যের একজন শক্তিমান কবি ফররুখ আহমদ। বাংলা সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায় তাঁর শক্তিশালী পদচারণা মুগ্ধ করার মতো। ইসলামী সাহিত্যের ‘হেরার রাজ তোরণ’ উন্মোচনে মুসলিম জাতীয়তার স্বপ্ন পূরণে একটি ভিন্নমাত্রিক জগৎ তার কাব্য-সাহিত্যে সুস্পষ্ট। কবি ফররুখ আহমদ এ ক্ষেত্রে এক সম্পূর্ণ নতুন কল্পনা জগৎ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। নতুন আঙ্গিকের বিষয়-চিন্তা, ভাব-কল্পনা, শিল্প-সুষমা, কাব্যরীতি ইত্যাদি পাঠককে মুহূর্তের জন্যে হলেও স্তম্ভিত ও পুলকিত করে। সবকিছুর মধ্যেই এক ধরনের স্বাপ্নিক আবেশ তৈরি হয়, যা সবার থেকে ফররুখ আহমদকে একটি একক ব্যতক্রমী উজ্জ্বলতা দিয়েছে। মাইকেল, রবীন্দ্র, নজরুল থেকে যা সম্পূর্ণ স্বাতন্ত্র্য ও অসাধারণ। মাইকেল, রবীন্দ্র, নজরুল, শেলি, কিটস, বাইরন, ইকবালসহ সকল বড় কবিরই স্বাতন্ত্র্য মৌলিকত্ব তাদেরকে উজ্জ্বল মহিমায় ভাস্বর করে রেখেছে। ফররুখ আহমদের স্বপ্নচারিতা যে কোনো সচেতন পাঠককে অভিভূত করে। এজন্যই এটা কবির মৌলিকত্বের ভিন্নমাত্রিক স্বাক্ষর বহন করে।
একজন বড় কবি হিসেবে খ্যাতিমান হবেন এমন কোনো আকাক্সক্ষা ফররুখ আহমদের মধ্যে কখনো ছিল না। মূলত তিনি ছিলেন ঘুম ভাঙানোর মাঝি। মুসলিম সমাজের একটি বড় রকমের বিপ্লব সাধনের স্বপ্ন তিনি দেখেছেন। তাই তো দেখা যায় তিনি আদর্শ মানুষ গড়ার কাজেও সমানভাবে সময় ব্যয় করেছেন। কবিরা বেখয়ালী হয়ে থাকে এমন অভিযোগ তার ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। তিনি কলম ধরেছিলেন ইসলামকে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রত্যয় নিয়েই। সেজন্যই তিনি আদর্শ ও কবিতাকে সমানতালে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি নিজের বিশ্বাসের ওপর অটল ছিলেন সবসময়। কখনো তিনি নিজের বিশ্বাসের সাথে অন্য কোনো কিছুর আপস করেননি। জানা যায় ধর্মীয় বিধিবিধান পালনে স্থান-কাল-পাত্র ভেদাভেদ করতেন না। কবির নামাযের একাগ্রতা সম্পর্কে আবদুল মান্নান তালিব বলেন, ‘ফররুখ আহমদ ছিলেন খাঁটি নামাযী মুসলমান। কবিতার আসরে, গানের মজলিসে অনেকেই যখন নামায কাজা পড়ার জন্য মন স্থির করে রাখতেন, তখন তিনি কোনোরকম একটা সুযোগ পেলেই নামাযটা আদায় করে নিতেন।’ তবে ধর্ম নিয়ে তার মধ্যে কখনো কোনো ধর্মান্ধতা ছিল না। ফররুখ আহমদের কাব্য সাধনা ছিল ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার গভীরতম চেতনাকে ঘিরেই।
ফররুখ আহমদের কাব্য সুষমা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে আমার এ ক্ষুদ্র লেখা এক্ষেত্রে অনেকের কাছে খুবই দৃষ্টিকটু মনে হতে পারে। ফররুখ আহমদ সনেট নিয়ে ব্যাপক পরীক্ষ-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। এখানে কেবলমাত্র তাঁর ‘মুহূর্তের কবিতা’ নিয়ে সামান্য দৃষ্টিপাত করা হলো। কবির ‘মুহূর্তের কবিতা’ এক মুহূর্তের জন্য হলেও পাঠককে ভাবিত করে। কবি ‘মুহূর্ত’ শব্দটির অপরূপ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তা জানার জন্য পুরো কবিতাটি উদ্ধৃত করা প্রয়োজন। কবিতাটি নিচে দেওয়া হলো-
‘সময়Ñ শাশ্বত, স্থির। শুধু এই খঞ্জন চপল
গতিমান মুহূর্তেরা খরস্রোতে উদ্দাম, অধীর
মৌসুমী পাখীর মতো দেখে এসে সমুদ্রের তীর,
সফেদ, জরদ, নীল বর্ণালিতে ভরে পৃথ্বীতল।
সন্ধ্যা গোধূলির রঙে জান্নাতের এই পাখী দল
জীবনের তপ্ত শ্বাসে, হৃদয়ের সান্নিধ্যে নিবিড়,
অচেনা আকাশ ছেড়ে পৃথিবীতে করে আসে ভিড়;
গেয়ে যায় মুক্তকণ্ঠে মৃত্যুহীন সঙ্গীত উচ্ছল।
মুহূর্তের এ কবিতা, মুহূর্তের এই কলতান
হয়তো পাবে না কণ্ঠে পরিপূর্ণ সে সুর সম্ভার
হয়তো পাবে না খুঁজে সাফল্যের, পথের সন্ধান,-
সামান্য সঞ্চয় নিয়ে যে চেয়েছে সমুদ্রের পার;
তবু মনে রেখো তুমি নগণ্য এ ক্ষণিকের গান
মিনারের দম্ভ ছেড়ে মূল্য চায় ধূলিকণিকার॥’
ফররুখ আহমদের এ সনেটটি আঠারো মাত্রাবিশিষ্ট চৌদ্দ লাইনে সমাপ্ত একটি কবিতা। তবে তিনি সব সময় আঠারো মাত্রার নিয়ম মেনে কবিতা লেখেননি। নিরীক্ষা প্রবণ কবি এখানে নতুন ধারা পেশ করেছেন। মাইকেলের মতো ফররুখ আহমদও ইতালীয় পেত্রার্কান রীতির অনুসারী ছিলেন। এই কবিতাটিতে তিনি ‘মুহূর্ত’ শব্দটির বিশ্লেষণ করেছেন। আসলে মুহূর্ত সামান্য একটু সময় হলেও এটি মহাকালেরই একটি অংশ। ছোট ছোট বালু কণা, বিন্দু বিন্দু জল/গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল। সাধারণত পদার্থের অণু-পরমাণু মিলেই সৃষ্টি হয় মৌলিক পদার্থ। তেমনিভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুহূর্ত বা সময়ের অণু মিলেই সৃষ্টি হয় মহাকালের। একটি অসীম সময়ের নাম হচ্ছে মহাকাল, যা সীমাহীন এবং যা কখনো শেষ হবে না। তবে মুহূর্তের এ সময়গুলো মিলে যে মহকালের সৃষ্টি তা সর্বদা গতিশীল। বিজ্ঞানীদের কাছে যেমন পদার্থের অণু-পরমাণু মহামূল্যবান সেভাবে কবির কাছেও মহাকালের প্রতিটি ক্ষণ মহামূল্যবান। কবি বলতে চেয়েছেন অনন্তকালের অসীম সময়ের মাঝে পৃথিবীর মানুষের অস্তিত্ব খুবই সামান্য। আসলে মহাকালের গর্ভে মানুষের এ জীবনকাল অতি ক্ষুদ্র। আর মানুষ এ ক্ষুদ্রাতি-ক্ষুদ্র সময়ের মাঝেই বেঁচে থাকে। এ অণু-পরমাণু সময়ের মধ্যেই মানুষের জীবনের অস্তিত্ব, কৃতিত্ব ও বাহাদরীর প্রকাশ ঘটে। তাই প্রতিটি মুহূর্তের মূল্য আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
মুসলমানের মনে আজ জোর নেই, দেহে নেই বল। দূর অতীতে মুসলমানরা রাজা-বাদশাহ ছিলেন। তাদের হাতে ছিল পৃথিবী পরিচালনার চাবিকাঠি। কিন্তু আমাদের হাতে যেন আজ কিছু নেই। আমরা এখন অসহায়, পড়ে পড়ে মার খাচ্ছি অমুসলিমদের হাতে, কাফেরদের হাতে, স্বৈরাচারী শাসকদের হাতে। আমরা এখন শোষিতের কাতারে। তাইতো কবি আশা দেখিয়েছেন, যদি আমরা জেগে উঠি, তাহলে সামনে ‘হেরার রাজ তোরণ’ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
মহান আল্লাহর প্রতি অবিচলভাবে আস্থাশীল ছিলেন ফররুখ আহমদ। এই ধৈর্যশীল কবি কখনো কারো কাছে কোনো কিছুর আশা করতেন না। তাই অনেক কষ্ট ও অভাব-অনটনের মধ্যেও তিনি কারো দয়া বা সাহায্য-সহযোগিতা নিতে চাননি। সমাজ, দেশ-জাতি, ভাষা ও ইসলামী আদর্শের প্রতি তাঁর প্রত্যয় ছিল দৃঢ়। তাই কবি ফররুখ আহমদকে অবজ্ঞা করা অনেকের পক্ষেই সহজ ছিল না। আমাদের সাহিত্যে তিনি ছিলেন একজন দীপ্তিময়, জীবন্ত আদর্শ ও ঐতিহ্যের ধারক। তাঁর কবিতা মহান সেই আদর্শের চিরন্তন রূপ পরিগ্রহ করে আজও টিকে আছে এবং আমাদের বিশ্বাস ততদিন টিকে থাকবে দুনিয়াতে বাংলাভাষী মুসলমান যতদিন থাকবে।
কবি ফররুখ আহমদ অসংখ্য প্রেমের কবিতা লিখেছেন কিন্তু কখনো একটিও অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ করেননি। তিনি মানতেন আমাদের সাহিত্য হতে হবে শাশ্বত ঐতিহ্যের অনুসারী। সেজন্য তিনি যৌনতা, অশ্লীলতা, মিথ্যাচার ও আজগুবি কথামালা সাজিয়ে কাব্য মননশীল পাঠকদের বিভ্রান্ত করতে চাননি। বিভ্রান্ত কবিদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে সতর্ক বাণী উচ্চারিত হয়েছে। তিনি ছিলেন অসৎ কাজে বাধাদানকারী ও সৎকাজের আদেশদাতা একজন কবি। বিশ্বাসী ও সদা সত্য পথের পথিক ছিলেন তিনি। বিশ্বাসী ও সৎ কবি সাহিত্যিকদের জন্য মহান আল্লাহর নিকট অবশ্যই উত্তম প্রতিদান রয়েছে। অশ্লীল কবিতা সম্পর্কে মহানবী সা. বলেন, ‘কারো পেট পচে যদি পুঁজ জমে, তবে সেই পুঁজ জমা পেট অশ্লীল কবিতার চেয়ে উত্তম।’ কবি ফররুখ আহমদ এসব বিবেচনায় রেখেই কাব্যজগতে অগ্রসর হয়েছিলেন।
ফররুখ আহমদের প্রেমের কবিতার একটি নমুনা এখানে পেশ করা হলো:
রাত্রির অরণ্যতলে হে বিচিত্রা! দ্বার খুলে দাও,
মুখর দৃষ্টিতে তব, গ্রীবাভঙ্গে রহস্য অশেষ!
অজ্ঞাত জগতে মোর আবিষ্কৃত হয়নি যে দেশ
সুকঠিন রহস্যের বক্ষবাস সেথা তুলে নাও।
যদি কোন ভুল থাকে তবে আজ সব ভুলে যাও।
যে অনাবিষ্কৃত লোকে রাখিয়াছো স্বপ্নের আবেশ,
দুচোখে, চিবুকে, বক্ষে সৃজিয়া বিচিত্র পরিবেশ
গানের পাখীরা মোর বহু দিন সেখানে উধাও।
কবি ফররুখ আহমদ সম্পর্কে কবি আবদুস সাত্তার বলেন, ‘বাংলা সাহিত্যে নজরুল যেমন এক যুগান্তকারী এবং অনন্য প্রতিভা তেমনি এক ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিভা কবি ফররুখ আহমদ। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি যেমন ছিলেন সত্যনিষ্ঠ এবং বিশ্বাসী, সেই ব্যক্তিস্বভাব তিনি ব্যক্ত করেছেন তাঁর সমগ্র সাহিত্যে। তাঁর ‘সাত সাগরের মাঝি’ ‘সিরাজুম মুনিরা’ ইত্যাদি প্রত্যেকটি মুসলিম জনগণকে ‘হেরার রাজ তোরণে’র দিকেই আহ্বান করে।’
মানবতার প্রতি কতটা দরদি হলে ‘লাশ’ কবিতার মতো এমন হৃদয়স্পর্শী কবিতা লেখা যায়। একজন কবির হৃদয়ে মানুষের প্রতি কতটা ভালোবাসা থাকলে, সে ভালোবাসা মানুষের জন্যে মনে ঝংকার তোলে, মানবতবাদী জাগরণের গান শোনায়, যা পাঠক মনে মানুষের প্রতি, মানবতার প্রতি এক সূপ্রসারী সমবেদনা সৃষ্টি করে। তাঁর লাশ কবিতার অংশবিশেষ-
যেখানে প্রশস্ত পথ ঘুরে গেল মোড়,
কালো পিচ-ঢালা রঙে লাগে নাই ধূলির আঁচড়,
যেখানে পথের পাশে মুখ গুঁজে পড়ে আছে জমিনের পর;
সন্ধ্যার জনতা জানি কোনদিন রাখেনা সে মৃতের খবর।
জানি মানুষের লাশ মুখ গুঁজে পড়ে আছে জমিনের পর;
ক্ষুধিত অসাড় তনু বত্রিশ নাড়ীর তাপে পড়ে আছে নিসাড় নিথর,
পাশ দিয়ে চলে যায় সজ্জিত পিশাচ, নারী নর
-পাথরের ঘর,
মৃত্যু কারাগার,
সজ্জিতা নিপুণা নট বারাঙ্গনা খুলিয়াছে দ্বার
মধুর ভাষণে,
পৃথিবী চষিছে কারা শোষণে, শাসনে
সাক্ষ্য তার রাজপথে জমিনের’ পর
সাড়ে তিন হাত হাড় রচিতেছে মানুষের অন্তিম কবর।
(লাশ : সাত সাগরের মাঝি)
সাহিত্যের এক শক্তশালী অনুষঙ্গ হচ্ছে গান। তাই দেখা যায় তিনি অনেক গানই লিখেছেন জাতির প্রয়োজনে। তিনি জানতেন গানের মাধ্যমে খুব সহজে মানুষের কাছে আবেদন পৌঁছানো সম্ভব। তাইতো তিনি লিখেছেন, ‘শোন মৃত্যুর তুর্য নিনাদ/ফারাক্কা বাঁধ।… তোরা চাসনে কিছু কারো কাছে খোদার মদদ ছাড়া/তোরা পরের উপর ভরসা ছেড়ে নিজের পায়ে দাঁড়া।’ ইত্যাদি জনপ্রিয় গান।
বাংলা সাহিত্যে ফররুখ আহমদের অবদান কম নয়। আলোচনা-পর্যালোচনা করলে দেখা যায় কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন একজন অনন্য সাধারণ প্রতিভা। একাধারে কবিতা, গান, গীতিকাব্য, গল্প, প্রবন্ধ, গীতিনাট্য ইত্যাদি সাহিত্যের সকল শাখায় তাঁর বলিষ্ঠ পদচারণা আমরা লক্ষ করে থাকি। এসব তিনি লিখেছেন সম্পূর্ণ আদর্শিক ও ঐতিহ্য চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে। এ কথা আজ স্বীকার্য যে, তিনি ছিলেন একজন বৈচিত্র্যময় কবি প্রতিভা। তাঁর কলমে যে বৈচিত্র্যময়তা ও ভেরিয়েশান তা অনেক বড় কবির মধ্যে লক্ষ করা যায় না। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তাঁর ভেতরে ছিল অপরিসীম মানবপ্রেম। একজন খাঁটি মুসলমান হিসেবে ইসলামী রেনেসাঁ ও মুসলিম আদর্শ-ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর ছিল দৃঢ় বিশ্বাস। এই স্বপ্ল পরিসরে তাঁর মতো এ বিশাল প্রতিভার সার্বিক মূল্যায়ন সম্ভব নয়।
কবি ফররুখ আহমদের যে কাব্য প্রতিভা আমাদের জাতীয় প্রয়োজনে তা টিকিয়ে রাখা দরকার। আর এটা হতে পারে তাঁর কবিতা ও গানের চর্চা জারি রাখার মধ্য দিয়ে। কিন্তু দুঃখের বিষয় বাংলা একাডেমিসহ অনেক নামি-দামি প্রতিষ্ঠান এদিকে ভ্রুক্ষেপহীন। বহু অখ্যাত কবির কবিতার বই বাজারে থাকলেও হাতে গোনা দু-একটি বই ছাড়া কবি ফররুখ আহমদের কোনো বই এখন খুঁজে পাওয়া যায় না। আমাদের সকলের উচিত মানবতাবাদী এ মহৎ কবির রচনাসমগ্র প্রকাশ করা। তা না হলে এ বিরাট প্রতিভা কাল ক্রমে আড়াল হয়ে যাবে, যা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অনেক বড় ক্ষতি।
দুয়ারে তোমার সাত-সাগরের জোয়ার এনেছে ফেনা।
তবু জাগলে না? তবু তুমি জাগলে না?
সাত-সাগরের মাঝি চেয়ে দেখো দুয়ারে ডাকে জাহাজ,
অচল ছবি সে, তস্বির যে দাঁড়ায়ে রয়েছে আজ।
হালে পানি নাই, পাল তার ওড়ে নাকো,
হে নাবিক! তুমি মিনতি আমার রাখো :
তুমি উঠে এসো, তুমি উঠে এসো মাঝিমাল্লার দলে
দেখবে তোমার কিসতী আবার ভেসেছে সাগর জলে,
নীল দরিয়ায় যেন সে পূর্ণ চাঁদ,
মেঘ-তরঙ্গ কেটে কেটে চলে ভেঙে চলে সব বাঁধ।
তবে তুমি জাগো, কখন সকালে ঝরেছে হাস্নাহেনা
এখনো তোমার ঘুম ভাঙলো না? তবু তুমি জাগলে না?
(ফররুখ আহমদ ঃ সাত সাগরের মাঝি)
কবি ফররুখ আহমদের প্রকাশিত গ্রন্থ
কবি ফররুখ আহমদের লেখা সমস্ত কিছু এখনো সম্পূর্ণভাবে পাঠকের সামনে উপস্থাপিত হয়নি। কবি পুত্র আহমদ আখতার ও বিশিষ্ট লেখক গবেষক, ফররুখ ফাউন্ডেশনের একমাত্র কর্ণধার অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান ফররুখ আহমদের সাহিত্য নিয়ে যিনি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন- তাঁর ‘ফররুখ প্রতিভা’ গ্রন্থ থেকে যে তালিকা পাওয়া গেছে তা পাঠকের সামনে তুলে ধরা হলো।
(কবিতা)
১. সাত সাগরের মাঝি। প্রথম প্রকাশ : ১৯৪৪। দ্বিতীয় সংস্করণ: ১৯৫২। তৃতীয় সংস্করণ : ১৯৭৫। চতুর্থ সংস্করণ: ১৯৯০। ২. আজাদ করো পাকিস্তান। প্রথম প্রকাশ: ১৯৪৬। ৩. সিরাজাম মুনীরা। প্রথম প্রকাশ: ১৯৫২। ৪. নৌফেল ও হাতেম। প্রথম প্রকাশ: ১৯৬১। দ্বিতীয় সংস্করণ: ১৯৬৫। তৃতীয় সংস্করণ : ১৯৬৭। চতুর্থ সংস্করণ: ১৯৬৯। ৫. মুহূর্তের কবিতা। প্রথম প্রকাশ: ১৯৬৩। দ্বিতীয় সংস্করণ: ১৯৭৮। ৬. হাতেম তা’য়ী। প্রথম প্রকাশ: ১৯৬৬।
(শিশুসাহিত্য)
৭. পাখীর বাসা। প্রথম প্রকাশ : ১৯৬৫। ৮. হরফের ছড়া। প্রথম প্রকাশ : ১৯৬৮। দ্বিতীয় সংস্করণ : ১৯৭৬। ৯. নতুন লেখা। প্রথম প্রকাশ : ১৯৬৯। ১০. ছড়ার আসর (১)। প্রথম প্রকাশ : ১৯৭০।
(পাঠ্যবই)
১১. নয়া জামাত (প্রথম ভাগ)। প্রথম প্রকাশ : ১৯৫০। ১২. নয়া জামাত (দ্বিতীয় ভাগ)। প্রথম প্রকাশ : ১৯৫০। ১৩. নয়া জামাত (তৃতীয় ভাগ)। প্রথম প্রকাশ : ১৯৫০। ১৪. নয়া জামাত (চতুর্থ ভাগ)। প্রথম প্রকাশ : ১৯৫০।
(১৯৭৫-৯৪)
১৫. ফররুখ আহমদের শ্রেষ্ঠ কবিতা। প্রথম প্রকাশ : ১৯৭৫। ১৬. হে বন্য স্বপ্নেরা। প্রথম প্রকাশ : ১৯৭৬। ১৭. নয়া জামাত। প্রথম প্রকাশ : ১৯৭৯। ১৮. ফররুখ-রচনাবলী (প্রথম খণ্ড)। প্রথম প্রকাশ : ১৯৭৯। ১৯. ইকবালের নির্বাচিত কবিতা। প্রথম প্রকাশ : ১৯৮০। ২০. চিড়িয়াখানা। প্রথম প্রকাশ : ১৯৮০। ২১. কাফেলা। প্রথম প্রকাশ : ১৯৮০। দ্বিতীয় সংস্করণ : ১৯৮৭। ২২. হাবেদা মরুর কাহিনী। প্রথম প্রকাশ : ১৯৮১। ২৩. সিন্দাবাদ। প্রথম প্রকাশ : ১৯৮৩। ২৪. কিস্সা কাহিনী। প্রথম প্রকাশ : ১৯৮৪। ২৫. ফুলের জলসা। প্রথম প্রকাশ : ১৯৮৫। ২৬. তসবিরনামা। প্রথম প্রকাশ : ১৯৮৬। ২৭. মাহফিল (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড)। প্রথম প্রকাশ : ১৯৯০। ২৮. ফররুখ আহমদের গল্প। প্রথম প্রকাশ : ১৯৯০। ২৯. ঐতিহাসিক-অনৈতিহাসিক কাব্য। প্রথম প্রকাশ : ১৯৯১। ৩০. নির্বাচিত কবিতা। প্রথম প্রকাশ : ১৯৯২।