রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রথমেই বৈষম্য দূর করতে হবে
১৯ জুন ২০২৫ ১২:১৩
॥ মাহবুবুল হক ॥
ভালো-মন্দ মিলিয়ে আমাদের জীবন। সৃষ্টির জীবন। কুরবানির ঈদের সময় বিলেতে এসেছি। বন্ধুরা হাসাহাসি করে বলতে লাগলো, এই যে আগাম পার্টি এসে গেছে। প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিলেতে আসার আগে সব দলের, সব মতের দায়িত্বশীল ব্যক্তিগণ নাকি লন্ডনে পৌঁছে গেছে। ‘কলার’ নাড়লাম। বললাম, এইবার বুঝেছ, আমি কে! এতকাল তো বুঝলে না! Any way, `better late than never.’
আসলে এসব ‘বাত-কী-বাত’। রসিকতা। আড্ডার ‘বাত-চিত’। বন্ধুরা জানে, আমি কিচ্ছু না। কখনো কিচ্ছু ছিলাম না। কোথাও কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট হওয়ার মতো যোগ্যতা আমার কখনো ছিল না, এখনো নেই। আর এখন তো Low of diminishing return-এর মধ্যে কালাতিপাত করছি। ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাওয়া একটা ডিঙিনৌকা। দমকে দমকে দুলতে দুলতে বন্ধুবর খন্দকার আবদুল মোমেনের মতো কোনো এক নিভৃত পাড়ে এসে নোঙর করবে।
প্রফেসর ড. ইউনূস বেশ কয়েক বছর ধরে থেমে থেমে বিশ্বের কোনো রাষ্ট্র, সরকার বা প্রতিষ্ঠান থেকে পদক বা পুরস্কার পেয়ে আসছেন, সে তো আমরা দেখছি। এতে ভিন্ন দেশ-বিদেশের মানুষ উল্লসিত হলেও বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ যে সবসময় উল্লসিত হয়েছে, তা কিন্তু নয়। এ নিয়ে সবসময় মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল, এখনো তাই আছে। বিশেষ করে রাজনীতিবিদ ও বিদগ্ধজনদের মধ্যে। রাজনীতিবিদের মধ্যে পতিত সরকারপ্রধান ও দলপ্রধান এবং তার চ্যালা-চামুন্ডারা এ নিয়ে দারুণভাবে ‘জেলাসিতে’ ভুগতো। এটা শুধু পরশ্রীকাতরতা বা মাৎসর্যের সংকীর্ণ বেড়াজালে আবদ্ধ ছিল না, ছিল হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ, মোহ, শত্রুতা ও ক্রোধের দুর্নিবার আতিসহ্যের নিকৃষ্ট বহিঃপ্রকাশ।
উল্লেখ্য, আমাদের সাধারণ মানুষ বা প্রফেসর ড. ইউনূসকে যারা নানা কারণে ভালোবাসতেন না, তারা তার এ নিয়মিত অর্জন নিয়ে কখনোই খুব মাথা ঘামাননি। মাথা ঘামিয়েছেন শুধু নয়, রীতিমতো মাতামাতি করেছেন পতিত সরকার ও দলের প্রধান এবং তার অনুগত দলীয় লোকজন ও দলীয় তথাকথিত বিদগ্ধজন ও বুদ্ধিজীবী।
প্রফেসর ইউনূস শান্তিতে নোবেল পুরস্কার অর্জনের পূর্বে পতিত সরকার ও দলের প্রধান ঐ পুরস্কারটি যেকোনো মূল্যে নিজে হস্তগত করার জন্য হেন ও হীন এমন চেষ্টা নেই যে করেননি। এতে আমাদের মাথা হেট হয়েছে, দুর্নাম হয়েছে, শুধু সরকারের দুর্নাম হয়েছে- এমনটি তো নয়, দেশ ও জাতি একসাথে খাটো হয়েছে, ক্ষুদ্র হয়েছে এবং নিন্দিতও হয়েছে।
জুলাই বিপ্লবের পর প্রফেসর ড. ইউনূস বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হলেন। এতে তার স্বাধীন জীবন ব্যাহত হয়। তিনি পূর্বের মতো আর যখন-তখন এদেশে-সেদেশে ভ্রমণ করতে বা উড়াল দিতে পারছিলেন না। তার যারা খয়ের খাঁ, তারা বা তার অনুরক্ত ভক্তরা বিশ্লেষণ করছিলেন, একদিকে তারও দেশ ও জাতির প্রভুত্ব লাভ হয়েছে। তিনি মাতৃভূমির জন্য অনবরত ও অবারিতভাবে কাজ করতে পারবেন। তার সারা জীবনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারবেন। নিজের সৌরভ ও গৌরবকে সমুন্নত ও সমুজ্জ্বল করতে পারবেন। জীবন সায়াহ্নে দেশের এক নম্বর ব্যক্তি হতে পেরেছেন, এর চেয়ে দুনিয়ায় আর বড় কী পাওনা আছে? অপরদিকে পচা দেশটা, নিন্দিত দেশটা, অধঃপতিত দেশটা তার কারণে মুখ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। নিচু মাথাটা ধীরে ধীরে উচ্চকিত করার প্রয়াস পাবে। সব দেশ বড় নয়। সব দেশ সৌরভে-গৌরবে বড় নয়। সব দেশ অনুকরণীয় বা অনুসরণীয় হয় না। উদাহরণ হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে যদি আমরা সামনে আনি, তাহলে কী দেখি? দেখি যে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভাইস চ্যান্সেলর কে বা কারা, তা আমরা সবাই বিলক্ষণ জানি না। জানার চেষ্টাও করি না। কিন্তু দুনিয়ার শিক্ষিত ও বিদগ্ধজন জানেন, কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয় শ্রেষ্ঠ, কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয় কোন কোন কারণে বিখ্যাত এবং কী কী কারণে সেসব যশস্বী হয়েছে। এই শ্রেষ্ঠ বা বিখ্যাত হতে তাদের অনেক প্রচেষ্টা, অনেক শ্রম, অনেক বুদ্ধি ও মেধা এবং অনেক গবেষণা করতে হয়েছে। বলতে গেলে শত শত বছরের মেধা, বুদ্ধি ও গবেষণার লড়াই করতে হয়েছে। একই ধরনের বিষয় বিরাজমান দেশের ক্ষেত্রেও বিবেচ্য।
ব্রিটিশরা কেন একা থাকতে চায়? কেন তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেয় না বা একীভূত হয় না। এর কারণ সবার জানা। অন্যরা স্বীকার করুক বা না করুক, ব্রিটিশরা জানে বা তাদের পূর্বপুরুষরা তাদের শিক্ষাক্রম বা সিলেবাসের মাধ্যমে জানিয়ে রেখেছে যে, পৃথিবীতে তারাই শ্রেষ্ঠ জাতি। তারাই মেধা, বুদ্ধি, কৌশল, লেখাপড়া, গবেষণা ইত্যাদির কারণে গোটা পৃথিবীকে শাসন করেছে। একসময় বেশিরভাগ মহাদেশ তাদের উপনিবেশ ছিল। তাদের শাসনের অধীন ছিল। যারা উপনিবেশ ছিল, তারা ব্রিটিশদের শুভ্র বয়ান স্বীকার না করলেও অন্যরা বলবে, এটাই এখনকার বাস্তবতা যে, তারা দুনিয়াকে হাজার বছর যাবত রুল করেছিল। সুতরাং আর কিছু না হোক, তাদের প্রাচীন ও মাথা উঁচু করা বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়নকামী দেশের ছাত্রদের অবশ্যই প্রবেশ করতে হবে।
সত্যের খাতিরে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, মহান আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্য করেন। দেশের নির্যাতিত, নিষ্পেষিত, মজলুম, আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা যখন কায়মনোবাক্যে ফ্যাসিবাদের পতন চেয়েছিল, ঠিক তখনই বা ক্ষাণিক পরে স্বৈরাচারের পতন হয়েছিল। এটা ছিল জাতির জন্য অচিন্তনীয় ও অভাবনীয় বিষয় (কারণ দুঃখের বিষয়, জাতির অধিকাংশ মানুষ প্রত্যাদিষ্ট জ্ঞান সম্পর্কে সম্যকভাবে অবগত নয়)। সে সময় কে জাতির কর্ণধার হবে, কে দেশের রাহবার হবেন, জাতি ঘুণাক্ষরেও কিছু জানতো না। হঠাৎ করে এ জায়গায় প্রফেসর ড. ইউনূসের আবির্ভাব ঘটলো। আর যায় কোথায়! দেশ-বিদেশের মানুষ কোনো ‘অলটারনেটিভ’ খুঁজলো না। সবাই বলতে লাগলো, ‘হেয়ার ইজ এ নাম্বার ওয়ান ম্যান হু ক্যান নাউ রান দ্যা বাংলাদেশ’। সবাই আমরা একে-অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। বিকল্প কোনো কিছু আমরা ভাবতেই পারলাম না। দেশ-বিদেশের মানুষ ভরসা পেল, আশ্বস্ত হলো। বাংলাদেশ চলতে শুরু করলো। এখনো চলমান। চলার পথ সবসময় মসৃণ থাকে না। সে কথা ভেবেই সবাই চলে। যারা অতি উৎসাহী, তারাই হয়তো কোনো চিন্তা-ভাবনা না করেই চলে বা চলতে শুরু করে এবং পরিণামে অসফল হয়, ব্যর্থ হয়।
লন্ডনে বসে ভাবছিলাম, প্রফেসর ড. ইউনূস রাজার হাত থেকে পুরস্কার নেবেন এবং দেশে ফিরে যাবেন। এটাই ছিল তার জন্য সহজ-সরল এবং স্বাভাবিক বিষয়। যারা চাণক্য, তাদের কথা আলাদা। কিন্তু যারা সম্মানিত ব্যক্তি, একটি দেশ ও জাতির কর্ণধার, একটি লাইফ সাপোর্টে রাখা জাতিকে যিনি দেখভাল করছেন, এ মুহূর্তে যার কোনো অলটারনেটিভ নেই, তিনি কেন এক ঢিলে অনেক পাখি মারতে চাইলেন? অন্যের মাথায় কাঁঠাল রেখে তো তিনি কাঁঠাল ভাঙতে পারেন না! তিনি লন্ডনে এসেছিলেন ব্যক্তিগত ট্যুরে। এত লট-বহর নিয়ে তাকে আসতে হলো কেন? এত হোটেল রুম ভাড়া করতে হলো কেন? যিনি, যে দল বা যে দেশ এসব ব্যবস্থা করেছে, নিঃসন্দেহে তারা ‘চাণক্য পার্টি’। পুরস্কারসহ যাবতীয় বিষয়ে খলিলুর রহমান সাহেবের অফিসিয়াল কী সম্পৃক্ততা ছিল? তার কাজ তো জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে! এখানে জাতীয় নিরাপত্তার কী বিষয় ছিল? ‘উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে।’ প্রয়োজনে খলিল সাহেব বলবেন, ‘আমার তো কোনো দোষ নেই, আমি সরকারি মানুষ, আমাকে যা নির্দেশ করা হয়েছে, আমি তাই করার চেষ্টা করেছি। বরং আমাকে আরো বড় অ্যাসাইনমেন্ট দেয়া হয়েছিল, আমি তা করিনি।’ এসব নাও হতে পারে। সবই অনুমান। সবই সন্দেহ বা ধারণা। সবই বাড়তি কথা। আল্লাহ না করুন- এসব না হোক।
তবে ‘ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়।’ খলিল সাহেবকে নিয়ে মিয়ানমারের সাথে সাময়িক করিডোর প্রতিষ্ঠার কথা উঠেছিল কিনা? একটি রাজনৈতিক দল বরাবর মিয়ানমার, রোহিঙ্গা, আরাকান, উপজাতি, খ্রিস্টান, উপনিবেশ, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, সমুদ্র, সমুদ্রে স্থল বৃদ্ধি- এসবের বিষয়ে সচেতন বলে এসব কোনো সরকারই একা ‘ডিল’ করতে ভয় পেয়েছে। সন্ত্রস্ত থেকেছে। এ সরকারও একটু এগিয়ে গিয়ে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিয়েছে। এসব খবর দুনিয়ার সবাই জানে। সুতরাং তড়িঘড়ি করবেন না। ধীরে-সুস্থে কাজ করুন। অনেক কাজ দেখানোর কোনো প্রয়োজন নেই। দেশবাসী এখন অনেক পরিপক্ব। তারা চালাকি-চতুরামী এখন সহজে ধরতে পারে। তারা জানে, দ্রুত কাজ করে শয়তান। শয়তান মানুষকে ভেলকি দেখায়। সার্কাস দেখায়। জাদু দেখায়। সবশেষে দেখা যায়, এসব জোনাকির আলোক।
জুলাই বিপ্লব বা অভ্যুত্থানের সূত্রপাত হয়েছিল বৈষম্য নিয়ে। অন্তত এ জায়গাটায় আমরা অবস্থান করি। এমনি এমনি নয়, দৃঢ়ভাবে অবস্থান করি। সর্বক্ষেত্র থেকে আমাদের বৈষম্য দূর করার চেষ্টা করতে হবে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বড় দল, ছোট দল বা বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী দল অথবা বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী দল নয়- এমন সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিভক্তি এবং বিভাজনে আমরা যেন না জড়াই। যারা স্বৈরাচারী বা ফ্যাসিবাদী ছিল, তাদের তো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাদের বিষয়ে অবশ্যই আমাদের সতর্ক ও সাবধান থাকতে হবে। এর বাইরে কারা বেশি ত্যাগ ও কুরবানি করেছেন এবং কারা কম করেছেন- এ নবতর বিভাজনে আমরা না যাই।
বৈষম্য ক্ষেত্রে ‘ইকুয়াল’ না হোক, অন্তত ‘ইকুলুব্রিয়াম’ অবস্থায় যেন আমরা অবস্থান করি, সে বিষয়ে আমাদের সর্বাধিক সচেতন হতে হবে। আমরা আশা করবো, সব রাজনৈতিক দল নিয়ে সরকার একটি বৈঠকের ব্যবস্থা করবেন।