মোবাইলের অপব্যবহার


১৩ জুন ২০২৫ ০৮:২৮

॥ আসমা খাতুন ॥
কারো সাথে কথা বলার প্রারম্ভে সালাম বিনিময় করা ইসলামের সুমহান আদর্শ। এ সালামে রয়েছে একে অপরের জন্য দোয়া ও শান্তির প্রার্থনা। তাই পারস্পরিক সাক্ষাতের মতো মোবাইল ফোনে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সালাম বিনিময়ের মাধ্যমে কথাবার্তা শুরু করতে হবে। যেমন রাসূল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সালামের পূর্বে কথা শুরু করে তার কথার উত্তর দিও না’। অনুরূপভাবে একজনের সাথে একাধিকবার ফোন করা হলেও প্রতিবারই সালামের মাধ্যমে কথা বলা উচিত। যেমন রাসূল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন তার ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, তখন সে যেন তাকে সালাম দেয়। অতঃপর দুজনের মাঝে যদি গাছ, দেয়াল বা পাথর আড়াল হয়ে যায় এবং তারপর আবার সাক্ষাৎ হয়, তাহলেও যেন তাকে সালাম দেয়’।
অন্যত্র তিনি বলেন, ‘তোমাদের কেউ মজলিসে উপস্থিত হলে যেন সালাম দেয় এবং মজলিস থেকে বিদায়ের সময়ও যেন সালাম দেয়। প্রথম সালাম শেষ সালাম অপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ নয়’।
ফোনে বা মোবাইলে কল রিসিভ করে সালাম বিনিময়ের পর নিজের পরিচয় পেশ করা অন্যতম শিষ্টাচার। যেমন জাবের (রা.) বলেন, ‘আমার পিতার কিছু ঋণ ছিল। এ সম্পর্কে আলোচনা করার জন্য আমি নবী করীম (সা.)-এর কাছে এলাম এবং দরজায় আঘাত করলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কে? আমি বললাম, আমি। তখন তিনি বললেন, আমি আমি, যেন তিনি তা অপছন্দ করলেন’। অনুরূপভাবে মোবাইল ফোনে কথা বলার ক্ষেত্রেও উভয়ে কাক্সিক্ষত ব্যক্তি কিনা, তা যাচাই করে নেয়া উচিত। অতঃপর প্রয়োজনীয় কথা বলাই সমীচীন। কেননা নাম-পরিচয়বিহীন লোকের সাথে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলায় ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি থাকে।
জনবহুল স্থানে যেমন রাস্তা-ঘাট, যানবাহন, হাসপাতাল, মসজিদ কিংবা বাজার বা সর্বসাধারণের জন্য নির্ধারিত স্থানে উচ্চ আওয়াজে কথা বলা শালীনতা পরিপন্থী কাজ। অনুরূপভাবে মোবাইল ফোনের কথাবার্তায়ও যেন অন্যের অসুবিধা না হয়, সে বিষয়ে লক্ষ রাখা জরুরি। আবার নিজেদের একান্ত প্রয়োজনীয় কথাগুলো অন্য কেউ শুনলে তা যেমন দৃষ্টিকটু, তেমনি তাতে ক্ষতির সম্ভাবনাও থাকে। উপরোক্ত স্থানগুলোয় কথা বলার ক্ষেত্রে সংযত হওয়া একান্ত প্রয়োজন।
তাছাড়া কথা বলার সময় আওয়াজ এমন হওয়া উচিত, যা অপর প্রান্তের মানুষ শুনতে পায়। অযথা অধিক উচ্চ আওয়াজে কথা বলে মানুষকে বিরক্ত করা এবং তাদের অসুবিধা করা সমীচীন নয়। কেননা অনর্থক চিৎকার করাকে গাধার আওয়াজের সাথে তুলনা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি পদচারণায় মধ্যপন্থা অবলম্বন কর এবং তোমার কণ্ঠস্বর নিচু কর। নিশ্চয়ই সবচেয়ে বিকট স্বর হলো গাধার কণ্ঠস্বর।’ (লুকমান : ১৯)।
মোবাইলের মাধ্যমে অশ্লীল ছবি, ভিডিও ইত্যাদি আদান-প্রদান ও প্রদর্শিত হচ্ছে। ইন্টারনেট, ভার্চুয়াল ও সাইবার ক্রাইম সম্পর্কে যাদের ন্যূনতম জ্ঞান আছে, তারা জানে এ দুটিতে অশ্লীলতা ও চরিত্র বিধ্বংসী কত কিছুই না সহজলভ্য। আগে সিনেমা হলে কিংবা ডিসের মাধ্যমে অশ্লীল ছবি প্রদর্শিত হতো। আর বর্তমানে প্রতিটি মোবাইল একেকটি সিনেমা হল। ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ার টেবিল, আবাসিক হলের নিজস্ব কক্ষ, চলাচলের ক্ষেত্রে যানবাহনে, বিনোদন কেন্দ্রে অবসর সময় কাটাতে সবখানেই সুযোগ আছে মোবাইলে অশ্লীল ছবি, ভিডিও, গান ইত্যাদি দেখার। এসব অশ্লীলতা হতে নিজেদের বিরত রাখা আবশ্যক।
ফোন বা মোবাইল কোনো গল্প-গুজব করার যন্ত্র নয়। বরং এতে একান্ত প্রয়োজনীয় কথা বলতে হবে। কেননা অধিক কথা বলাতে কোনো উপকারিতা নেই। তাছাড়া অপ্রয়োজনীয় কাজ পরিহার করাই ইসলামের নির্দেশ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মানুষের জন্য ইসলামের সৌন্দর্য হচ্ছে তার অনর্থক বিষয় পরিহার করা’। এছাড়া অপ্রয়োজনে অধিক কথা বলা আল্লাহর নিকটে অপছন্দনীয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আর তিনি (আল্লাহ) তোমাদের জন্য অপছন্দ করেন অনর্থক কথাবার্তা বলা, অধিক প্রশ্ন করা এবং ধন-সম্পদ বিনষ্ট করা’।
মানুষের বলা প্রতিটি কথা রেকর্ড হয়। যার হিসাব পরকালে নেওয়া হবে। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা গ্রহণ করার জন্য তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।’ (কাফ : ১৮)। তিনি আরো বলেন, ‘অবশ্যই তোমাদের ওপরে তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত আছে। সম্মানিত লেখকবৃন্দ। তারা জানেন তোমরা যা কর।’ (ইনফিতার : ১০-১২)। সুতরাং অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয় কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে।
মোবাইল ফোনে কথাবার্তা বলার ক্ষেত্রে আস্তে আস্তে বলা উচিত। যাতে তা অপর প্রান্তের লোকের নিকটে বোধগম্য হয়। কারণ দ্রুত কথা বলার কারণে অনেক সময় অপর প্রান্ত থেকে সঠিকভাবে কথা বোঝা যায় না। আর অতি দ্রুত কথা বলা শিষ্টাচারও নয়। আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবী করীম (সা.) এমনভাবে কথা বলতেন, যেকোন গণনাকারী গুনতে চাইলে তাঁর কথাগুলো গণনা করতে পারত’। অন্য বর্ণনায় এসেছে, আয়েশা (রা.) বলেন, আবু হুরায়রার আচরণ কি তোমাকে অবাক করে না? সে এসে আমার ঘরের এক পাশে বসে আমাকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদীস পড়ে শোনাতে লাগল। আমি তখন সালাতরত ছিলাম। আমার সালাত শেষ হওয়ার পূর্বেই সে উঠে চলে গেল। আমি যদি তাকে পেতাম তবে তাকে বলতাম, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) তোমাদের মতো তাড়াহুড়া করে কথা বলতেন না’।
আনাস (রা.) বলেন, ‘নবী করীম (সা.) যখন কথা বলতেন, তখন তিনি তা তিনবার বলতেন, যাতে তা বোঝা যায়’। ফোনে বা মোবাইলে কথা বলার ক্ষেত্রেও মানুষের সাথে তাদের বোধগম্য ভাষায় কথা বলা উচিত। দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলা সমীচীন নয়। কারণ এতে মানুষ কথা বুঝতে না পেরে কষ্ট পায়। আলী (রা.) বলেন, ‘মানুষের নিকট সেই ধরনের কথা বল, যা তারা বুঝতে পারে। তোমরা কি পছন্দ কর যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি মিথ্যা আরোপ করা হোক’?
কারো সাথে মুখ ভারী করে কথা বলা উচিত নয়; বরং হাসিমুখে কথা বলা উচিত। কেননা এতে নেকী রয়েছে। রাসূল (সা.) বলেন, ‘তোমার হাস্যোজ্জ্বল মুখ নিয়ে তোমার ভাইয়ের সামনে উপস্থিত হওয়া তোমার জন্য সাদাকাস্বরূপ’। তিনি আরো বলেন, ‘কল্যাণমূলক কোনো কর্মকেই অবজ্ঞা করো না, যদিও তা তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করেও হয়’। যার কাছে কল করা হচ্ছে তার মর্যাদার প্রতি লক্ষ রেখে কথা বলা উচিত। যে ব্যক্তি যতটুকু সম্মান পাওয়ার হকদার তাকে ঐভাবে সম্মান দিয়ে কথা বলা শালীনতার পরিচায়ক। এ মর্মে হাদীসে এসেছে, আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে আদেশ করেছেন মানুষকে তার পদমর্যাদা অনুযায়ী স্থান দিতে’।
দিনে-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় নির্ধারিত। এ নির্ধারিত সময়ে মোবাইল ফোনে কাউকে কল করা বা মেসেজ পাঠানো উচিত নয়। কারণ জামাত চলাকালে কোনো কল কিংবা নোটিফিকেশন আসলে তা মুসল্লির একাগ্রতায় বিঘ্ন ঘটায়। অনুরূপভাবে তার পার্শ্ববর্তী মুসল্লির মনোযোগেও বিঘ্ন ঘটে। আর সালাতে মানুষের একাগ্রতাই মূল। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই সফলকাম হবে মুমিনগণ। যারা তাদের সালাতে তন্ময়-তদ্গত।’ (মুমিনূন : ১-২)।
সারা দিনের কর্মক্লান্তির পর রাতে ঘুমানোর মাধ্যমে মানুষ তার ক্লান্তি-শ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করে এবং পরবর্তী দিন পূর্ণ উদ্যমে কাজ করার জন্য মানসিক ও দৈহিক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। বিধায় ঘুম মানুষের জন্য অতি প্রয়োজনীয়। এজন্য জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত ঘুমের সময় কাউকে ফোন দেওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। তাছাড়া কারো কারো একবার ঘুম ভেঙে গেলে পরবর্তীতে আর ঘুম আসে না। তাই একান্ত প্রয়োজন বা বিপদ-আপদ না হলে ঘুমের সময়ে ফোন দেয়া থেকে বিরত থাকা কর্তব্য।
অনেক সময় মানুষ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করে। যখন ফোন করলে তারা যেমন বিরক্ত হয়, তেমনি কথা বলতে অস্বস্তিবোধ করে। অনেক সময় কথা বলতে না পারা তাদের মনঃকষ্টের কারণ হয়। তাই অবস্থা জেনে কথা শুরু করা উচিত। রাসূল (সা.) বলেন, ‘এমন দুটি নিয়ামত আছে, যে দুটিতে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। তা হচ্ছে, সুস্থতা ও অবসর’। সুতরাং অবস্থা বিবেচনায় কথাবার্তা বলতে হবে। যাতে কারো কথা অন্যের বিরক্তি ও অসুবিধার কারণ না হয়।
কাউকে কল দেয়ার পর রিসিভ না হলে কিংবা মেসেজ পাঠালে কোনো উত্তর না পেলে কিছু সময় অপেক্ষা করা উচিত। কল রিসিভ না হলে কিংবা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর না পেলে লাগাতার কল কিংবা ম্যাসেজ পাঠানো অনুচিত। কারণ যাকে কল বা মেসেজ দেয়া হয়, তিনি কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকলে এ কল ও মেসেজ তার কাজে বিঘ্ন ঘটাবে। বেশি প্রয়োজন হলে বিরতি নিয়ে সর্বোচ্চ ২-৩ বার কল দেয়া অথবা মেসেজ পাঠিয়ে জরুরি প্রয়োজনের বিষয় অবহিত করা যায়। অন্যথা পরবর্তীতে যোগাযোগের চেষ্টা করতে হবে।
মোবাইলে কথা শেষ করার পর একে অপরকে সালাম দিতে হয়। সালামের উত্তর শোনার পূর্বেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া ঠিক নয়। কেননা সালাম দেয়া সুন্নত আর উত্তর দেয়া ওয়াজিব। (নিসা : ৮৬)। তাই সালাম দিয়েই কল না কেটে দিয়ে সালামের উত্তর শুনে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা উচিত।
মোবাইল ফোনে কিংবা পর্দার আড়ালে কথা বলার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ যথাযথ সতর্কতা ও সংযত হওয়া আবশ্যক। নারী-পুরুষ মাহরাম না হলে তাদের কথা বলার প্রয়োজনীয়তা ও ধরন বিবেচনা করা উচিত। কেননা অপরিচিত নারী-পুরুষ পর্দার আড়ালে কিংবা মোবাইল ফোনে কথা বলার ক্ষেত্রে আকর্ষণ সৃষ্টি হলে কিংবা ফিতনার আশঙ্কা থাকলে উভয়ে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘তবে পর পুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে কথা বলো না। তাহলে যার অন্তরে রোগ আছে, সে প্রলুব্ধ হয়ে পড়বে।’ (আহযাব : ৩২)।
মোবাইল ফোনে অবস্থান সম্পর্কে অনেকেই মিথ্যাচার করে থাকেন। অনেক সময় দেখা যায়, কোথায় আছেন প্রশ্ন করা হলে, উত্তরে সঠিক স্থানের নাম না বলে অন্য কোন স্থানের নাম বলে। এটিও মিথ্যাচার। আর মিথ্যা বলা কবীরা গুনাহ। সুতরাং এ থেকে বিরত থাকা কর্তব্য। রাসূল (সা.) বলেন, ‘তোমরা মিথ্যা বর্জন কর। কেননা মিথ্যা পাপাচারের দিকে ধাবিত করে এবং পাপাচার জাহান্নামে নিয়ে যায়। কোনো ব্যক্তি সর্বদা মিথ্যা বলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত আল্লাহর নিকট তার নাম মিথ্যুক হিসাবেই লেখা হয়’। আরেকটি হাদীছে এসেছে,
আসমা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক মহিলা বলল, হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! আমার সতীন আছে। তাকে রাগানোর জন্য যদি আমার স্বামী আমাকে যা দেয়নি তা বাড়িয়ে বলি, তাতে কি কোনো দোষ আছে? রাসূল (সা.) বললেন, যা তোমাকে দেয়া হয়নি, তা দেয়া হয়েছে বলা ঐরূপ প্রতারকের কাজ, যে প্রতারণার জন্য দু’প্রস্থ মিথ্যার পোশাক পরিধান করল’।
মোবাইল কোম্পানি কখনো কখনো ফ্রি মিনিট কিংবা স্বল্প মূল্যে কথা বলার সুযোগ দেয়। এ সুযোগ গ্রহণ করে কোনো ব্যক্তির পক্ষে অহেতুক কথা বলে সময় কাটানো কিংবা অনর্থক অর্থ খরচ করা ঠিক নয়। কোম্পানির পক্ষ থেকে কোনো সুযোগ পেলে তা ভালো কথা ও কাজে ব্যবহার করা উচিত। যেমন আত্মীয়দের খোঁজখবর নেয়া, কোনো দীনি বিষয়ে জানার প্রয়োজন হলে বিজ্ঞ কোনো আলেমের নিকট থেকে তা জেনে নেয়া বা অনুরূপ কোনো বৈধ প্রয়োজনে ফ্রি মিনিট বা কোম্পানি প্রদত্ত সুযোগ ব্যবহার করা উচিত। কোন মুমিন ব্যক্তি কখনো অহেতুক কাজে সময় ও অর্থ বিনষ্ট করতে পারে না। কেননা তা অপচয়-অপব্যয়ের শামিল, যা আল্লাহ নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আর তুমি মোটেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান স্বীয় প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় কৃতজ্ঞ।’ (বনী ইসরাঈল : ২৬-২৭)।
কর্মক্ষেত্রে যথাসাধ্য মোবাইলে কথা বলা থেকে বিরত থাকা উচিত। বিশেষ করে যেসব কাজে হাত ও চিন্তাশক্তি ব্যবহৃত হয়, এ ধরনের কাজের ক্ষেত্রে মোবাইল ফোনে কথা বলা মোটেই উচিত নয়। যেমন গাড়ি চালানোর সময় কিংবা অপারেশন থিয়েটারে বা ফায়ার সার্ভিসের কাজ করার সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা আদৌ ঠিক নয়। এসব স্থানে ফোন রিসিভ করা একেবারেই অনুচিত। কারণ এসব স্থানে কথা বলায় ঘটে যেতে পারে অনেক বড় দুর্ঘটনা। যাতে জান-মালের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বা কাজের সময় অনেকেই মোবাইল সাইলেন্ট কিংবা ভাইব্রেশন করে রাখেন। এমনটি না করে কল এলার্ট নোটিফিকেশন সেট করে রাখা উচিত। এতে মোবাইল বন্ধ থাকলেও খোলার সঙ্গে সঙ্গে কলকারী ব্যক্তির কাছে নোটিফিকেশন চলে যাবে। এতে কারো কোনো চিন্তা থাকে না। কেননা সাইলেন্ট কিংবা ভাইব্রেশন অবস্থায় যদি কেউ কল রিসিভ না করে তবে এটিও একটা চিন্তার কারণ। কারো মোবাইলের স্ক্রিনে এমন কিছু থাকতে পারে, যা অন্যের দেখা ঠিক নয়। সেজন্য মালিকের বিনা অনুমতিতে তার মোবাইলের দিকে তাকানো অথবা তার মোবাইলের মেসেজ পড়া ঠিক নয়। কেননা এতে তার গোপনীয়তা প্রকাশ হয়ে পড়ে।
মোবাইলে যে ক্ষতি হচ্ছে, তা টের পাওয়া যায় না। এজন্য একে সাইলেন্ট কিলার বলা যায়। মোবাইলের রেডিয়েশন অত্যন্ত ক্ষতিকারক। মোবাইলে ১৫ থেকে ২০ মিনিট কথা বলার পর মাথা ঝিম ঝিম করে, অস্থিরতা বেড়ে যায়। মোবাইলে অধিক কথা বলার ফলে একসময় ব্রেইন ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। বড়দের তুলনায় শিশুদের ক্ষতি বেশি হয়। তাই শিশুদের মোবাইল থেকে দূরে রাখা জরুরি। শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে বলে এদের ক্ষতির পরিমাণ বেশি থাকে। রেডিয়েশনের হাত থেকে রক্ষা পেতে মোবাইল বুক পকেটে রাখা ঠিক নয়।
যোগাযোগের ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নতি ও অভূতপূর্ব অগ্রগতি আনয়নই মোবাইলের সবচেয়ে বড় অবদান। তাই এটি আধুনিককালের একটি অতি প্রয়োজনীয় নিত্যব্যবহার্য সামগ্রীতে পরিণত হয়েছে। যে তথ্যের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, লম্বা সফর, অধিক শ্রম ও অর্থ ব্যয় করতে হতো, মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই দু’চার টাকা ব্যয়ে তা অর্জন করা সহজসাধ্য হয়েছে। হাজার মাইলের দূরত্ব মুহূর্তে ঘুচিয়ে দিচ্ছে এ মোবাইল। মোবাইলে ইন্টারনেট সেবা যোগ হওয়ায় এর কার্যকারিতা ও সেবা পরিধি বহুগুণ বিস্তৃত হয়েছে। বলাবাহুল্য যে, ‘দুষ্টের দমনে ও শিষ্টের লালনে’ ব্যবহৃত হচ্ছে এ আধুনিক প্রযুক্তি। আজ এ মোবাইল নামক ক্ষুদ্র যন্ত্রটি যেমন সুকর্মে ব্যবহৃত হচ্ছে, তেমনি অপকর্মেও হচ্ছে এবং মন্দ বিস্তারে সমভাবে ভূমিকা রাখছে। মোবাইলের মন্দকর্ম প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হলে, সমাজকে চরম মূল্য দিতে হবে।
মোবাইল প্রযুক্তি ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তরুণ-তরুণীরা। এর বদৌলতে অবৈধ প্রেম ও মেকি ভালোবাসার প্রসাদ পুরো তরুণ যুবসমাজের জন্য যেন অবারিত হয়ে পড়েছে। পারিবারিক শাসনের কারণে যারা এতদিন প্রেম বা ভালোবাসার মহার্ঘ ছুঁয়ে দেখতে পারেননি, তারাও আজ তা অনায়াসে ছুঁয়ে দেখতে পারছে। মোবাইলের যেকোন দোকানে গিয়ে রাত ৮-টার পর দাঁড়ালে দেখা যাবে অবৈধ সম্পর্কের তোড়ে ভেসে যাওয়া তরুণ-তরুণীরা গ্লাসের আড়ালে কিংবা দোকানের বাইরে এক-দুই ঘণ্টা ধরে নিচু স্বরে কথা বলে যাচ্ছে। কোনো কোনো দোকানদার গল্পচ্ছলে এ কথা স্বীকার করেন যে, এই তরুণ-তরুণীদের গল্প প্রেমালাপের বিলেই ওদের দোকান টিকে আছে। অবশ্য দোকানে গিয়ে কথা বলার এখন প্রয়োজন ফুরিয়ে এসেছে। এখন যে যুবক টাকার অভাবে ভালোমতো লেখাপড়া করতে পারে না, সেও টিউশনি করে একটি স্মার্ট ফোনের মালিক বনেছে। একটু ঝড়-বৃষ্টিতেই যারা নীড়হারা হয়ে পড়ে, তাদেরও দেখা যায় পথ চলতে গিয়ে নিজের মোবাইল সেটে সজোরে লেটেস্ট গান শুনছে। স্বল্প মূল্যের চায়না সেটগুলোর প্রতিটিতে মাল্টিমিডিয়া সুবিধাগুলো অবারিত করে দেয়ায় এমনটি ঘটছে। এই মোবাইলের কারণে অনেক রক্ষণশীল পরিবারের পর্দানশীল মহিলারাও প্রতারণার শিকার হয়। ভেঙে যায় পরিবার। আর এর অসহায় বলি হয় ঐ পরিবারের অবুঝ শিশু সন্তানরা। এমনকি এতে অনেকের জীবনও ঝরে যায়। বংশের মান-মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়, সৃষ্টি হয় সমাজে বিশৃঙ্খলা।