আলোকে তিমিরে

এখন ড. ইউনূসকে নিয়েই আমাদের চলতে হবে


১৩ জুন ২০২৫ ০৮:২৫

মাহবুবুল হক
৩ জুন ২০২৫ বেশ অসুখ নিয়ে মিয়া-বিবি লন্ডনে এসেছি। Harlow এলাকায় মেয়ে ও জামাইয়ের জীবনের ছোট্ট নিকেতন। বাসা ভর্তি মেহমান। তার মধ্যে জান্নাতের ফুল ও পাখি ছিল ৩ জন। ওরা ছিল কলকাকলিতে মশগুল। পেশার মধ্যে ৩ জন ছিলেন আইনের মানুষ, ২ জন ছিলেন পুলিশের, ১ জন ছিলেন চার্টার্ড একাউন্টেন্ট এবং বাকি ৩ জন ছিলাম সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। পুলিশ পেশার যারা ছিলেন তারা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। জানা-শোনা লোক। রাজধানী ঢাকাসহ ৩টি বিভাগে উচ্চপদে কাজ করেছেন। অভিজ্ঞতার ঝুড়িটা তাদের অনেক বিশাল।
৬ জুন Harlow Islamic Centre-এ ঈদের সালাতে অংশগ্রহণ করলাম। ৪০ শতাংশ নারী ও শিশু এবং ৬০ শতাংশ পুরুষ প্লাস যুবক। সালাতের পূর্বে ও পরে অনেকের সাথে ইচ্ছা করেই আলাপ করলাম। সাব কন্টিনেন্টসহ মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বেশ কিছু মুসল্লির সাথেও কথা হলো। তাদের প্রায় সবারই একই কথা, ইউনূস সাহেবকে ধরে রাখুন, তাকে কাজ করতে দিন। তারা বিএনপিকে আওয়ামী লীগের ‘খয়ের খাঁ’ মনে করছেন। নির্বাচন বাংলাদেশকে বড় কিছু দেবে, এ ধরনের কোনো চিন্তা তাদের মাথায় নেই। ভারতের হায়দরাবাদের ইমাম তরুণ হলেও বেশ শিক্ষিত। আমাদের জন্য অনেক দোয়া করলেন। মসজিদের লাইব্রেরি ও পাঠাগারে নানা ভাষার কুরআন ও তাফসির দেখলাম। দেখলাম, সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর তাফহীমুল কুরআন, যা সাধারণত আমাদের মসজিদগুলোতে দেখা যায় না। একইদিনে অনেকের সাথে Hollow Pond-এ গেলাম। আত্মীয়রা বললো, ঈদের দিনে Pondএলাকায় মুসলিমরাও আসবে। আসবে বাঙালিরাও। অনেকের সাথে কথা বলা যাবে। গেলামও। সত্যি সত্যি অনেকের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হলো। বেশিরভাগ মানুষই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমালোচনা করলো। বললো, ওরা ভারতের সাথে ষড়যন্ত্র করছে। ওদের সাথে রাজনীতি নিয়ে কথা বলারই দরকার নেই। প্রয়োজনে নির্বাচন না করলেই হয়। বড়জোর নির্বাচনের ওপর একটা রেফারেন্ডামও করা যেতে পারে।
রাতে দলবল নিয়ে ইস্ট লন্ডনের Dagenham (ড্যাগেনহ্যাম)-এ গেলাম। এক পুত্রার বাসায় জমজমাট আড্ডা হলো। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা, পূর্বেও তাই ছিল বলে আমার ধারণা। বাঙালি পাড়া অলগ্যাটের আশপাশে অবস্থিত। মুসলমানরা এখানে মিলেমিশে থাকে। মহিলারা এ এলাকায় ওড়না-হিজাব-বোরকা পরে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে ও একসাথে বেড়াতে বের হয়। এলাকায় মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানা রয়েছে। রয়েছে মুসলিমদের জন্য পৃথক স্কুল, লাইব্রেরি ও পাঠাগার।
এখানে যে আলাপ-আলোচনা হলো, তার সারসংক্ষেপ দারুণ। বাঙালিরা বলছে নির্বাচনের এখন আর কোনো দরকার নেই। সংস্কার আর বিচার চলুক, ছাত্র-জনতা নিজেদের সংগঠিত করুক। ইউনূস সাহেব নিজকে সংহত করুক- এভাবে ধীরে ধীরে চলতে থাকলে ভোটারদের মধ্যে কনফিডেন্স বাড়বে। ভোটাররা সংশ্লিষ্ট হতে থাকবে। এখনই নির্বাচন দিলে নির্বাচন সফল হয় কিনা, দারুণ সন্দেহ আছে। কারণ পতিত সরকার ও তাদের দলের লোকেরা বসে বসে আঙুল চুষবে না। পতিত সরকারের প্রধান নতুন করে দল গঠনের পূর্বে বিবিসির প্রখ্যাত প্রবীণ সাংবাদিক সিরাজুর রহমানের সাথে এক ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন : তাদের বৃহত্তর সংসারের নির্মম হত্যাকাণ্ডের বদলা তিনি আদায় করবেন। ইতিহাস সাক্ষী, পতিত সরকারের প্রধান আর যাই হোন, মুনাফিক ছিলেন না। তিনি তার ঐতিহাসিক অঙ্গীকার বা শপথ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। একটা দেশকে এবং দেশের মানুষকে শুধু নয়, দেশ ও দশের ভবিষ্যতকেও তিনি ধূলায় লুণ্ঠিত করেছেন। করেই শেষ করেননি, এখনো মহান আল্লাহর রহমতে যতটুকু বিরাজমান আছে, তাও ধ্বংস করার জন্য তিনি ও তারা উঠেপড়ে লেগে আছেন। তাদের পার্টি ও তাদের পার্টির ছাত্র, অঙ্গদল, ব্যান্ড করার পরও পরাজিত দলের কাজ-কর্ম কি বন্ধ আছে? হিজবুত তাহরিরের মতো তারাও কি কাজ করছে না? নিশ্চয়ই করছে, সবাই করে এবং সবাই করছে। পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্ট পার্টি ব্যান্ড ছিল। তাই বলে তারা কি সব কাজ-কর্ম বন্ধ রেখে ইয়া নফসি, ইয়া নফসি বলে জিকির করতো? সব বাদ দিন। বাংলাদেশ আমলে জামায়াতে ইসলামীকে কয়েকবার ব্যান্ড করা হয়। কিন্তু তাই বলে দলটি কি তাওবা-তিল্লা করে সব কাজ বন্ধ রেখে মসজিদে মসজিদে তসবি নিয়ে বসেছিল? যদি তাই হয়, তাহলে যে শোনা যাচ্ছে, জামায়াতে ইসলামীর সদস্য সংখ্যা গত ১৬ বছরে ২ গুণ বেড়েছে। আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকলে সেক্যুলার ফ্যাসিবাদী সরকার নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে আর জামায়াতে ইসলামী শক্তিশালী হবে, এ কেমন কথা? যুক্তিতে তো মিল খায় না! সুতরাং ভালো হোক, মন্দ হোক ব্যান্ড করলেই আদর্শিক যেকোনো দল উন্নতি অর্জন করবে, এটাই সত্য, এটাই বাস্তবতা।
এছাড়া পতিত দল বা সরকারের লোকজন নিকট প্রতিবেশী বা দূর প্রতিবেশীদের সাহায্য-সহযোগিতা পাবে না, এমন তো নয়। তারা সব সময় সাহায্য-সহযোগিতা পেয়েছে, পাচ্ছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত পাবে, এটা তো স্বতঃসিদ্ধ কথা। পতিত সরকার বা দলকে কে বা কারা এবং কেন সাহায্য-সহযোগিতা করবে, সেটা বিশ্ববাসী জানে। ‘দুনিয়ার মুসলিম এক হও’, ‘উম্মাহ এক হও’, জালেমদের বিরুদ্ধে দুনিয়ার মজলুম এক হও’, ‘আধিপত্যবাদ, ঔপনিবেশবাদ-এর বিরুদ্ধে বিশ্বের মজলুম এক হও’- এসব তথাকথিত স্লোগান এখন আর কাজে আসছে না। বিশ্বায়ন, আঞ্চলিকতা, জাতীয়তাবাদ, বাঙালিত্ব, বাঙালি, মুসলিম জাতীয়তাবাদ, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ কোনো কিছুই আর এখন বজায় থাকছে না। কে কার বন্ধু, কে কার শত্রু, সবই এখন নির্ণিত হচ্ছে অর্থের খেলায়। অস্ত্রের খেলায়।
যুদ্ধ আছে, যুদ্ধ থাকবে। সুতরাং অস্ত্রের ঝনঝনানিও থাকবে। যুদ্ধের জন্য অস্ত্র এবং অস্ত্রের জন্য যুদ্ধ, সবই এখন সবার নখদর্পণে। মাত্র ক’দিন পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মধ্যপ্রাচ্যে চার দিনের সফরে এসে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করে গেলেন। কেউ কি বলেছে, আপনাদের কাছ থেকে আমরা অস্ত্র ক্রয় করবো না, কেননা আপনারা একের পর এক আমাদের দেশ ধবংস করেছেন এবং এখনো করছেন। অন্যায়ভাবে এসব আপনারা করেই চলেছেন। আপনাদের মদদে মুসলিম নিধন চলছেই- চলছে শিশু ও নারী হত্যা। আপনারাই হুকুম দিয়েছেন ফিলিস্তিন থেকে, গাজা থেকে- সেসব এলাকার ভূমিপুত্রদের নিশ্চিহ্ন করতে।
যাহোক, হিসাব-নিকাশ কিন্তু এখন অনেকটা পাল্টে যাচ্ছে। একসময় ছিল ধর্মযুদ্ধ- ক্রুসেড। ইসলাম তথা মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ হতো খ্রিস্টান বা জায়োনিস্টদের। সে যুদ্ধ একেবারে থেমে গেছে, তাতো নয়। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের কারণে সেসব যুদ্ধের নাম-ধাম-প্রকৃতির পরিচয় পরিবর্তিত হয়েছে। ভেতরে ভেতরে ধর্মযুদ্ধ বিদ্যমান থাকলেও কোনো পক্ষই পূর্বের মতো মুখ ব্যাদান করে ধর্মযুদ্ধের কথা বলেন না। জুনিয়র বুশ বা তার পূর্বের শাসকরা ক্রুসেডের কথা বলতেন, কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্টগণ পরবর্তী সময় কী বুঝে যেন সেসব অভিধা থেকে তারা সরে দাঁড়িয়েছেন। কাজটা ভালো কী মন্দ, সে বিশ্লেষণে আমরা যাচ্ছি না। আমরা দিব্বি দেখছি, যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মূলত মুসলিমরাই।
সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানের সাথে যুদ্ধে জড়াল। সেই যুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট হলো যুগোশ্লাভিয়া এবং ধীরে ধীরে সে যুদ্ধ মধ্য এশিয়ায় গড়াল, গড়াল মধ্যপ্রাচ্যে। আফগানিস্তানের তেমন কিছু হলো না। ক্ষতিগ্রস্ত হলো। পাহাড়-পর্বত নষ্ট হলো। জীবন অনেক কষ্টে নিপতিত হলো। বিশ্বের অনেক শক্তিধর দেশ এ যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় দুর্বল হয়ে গেল। যেমন- সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। শক্তিমান দেশ যুগোশ্লাভিয়ার সাথে ছোট ছোট কিছু দেশ ছিল, তারা সুযোগ বুঝে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। এতে লাভ হলো কার? কারো না। পৃথিবীর। আফগানিস্তানকে পরাজিত করতে পারলো না সোভিয়েত ইউনিয়ন। নিজেই পরাজিত হলো। ছোট হয়ে গেল সোভিয়েত ইউনিয়ন। নাম হলো রাশিয়া। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট গরভাচেভের কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র ওতপ্রোতভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লো আফগানিস্তানে। সেই যুদ্ধ এখনো সম্পূর্ণভাবে থেমে গেছে বলা যাবে না। মাঝখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বহু মুসলিম দেশ। অযথা জীবনের গতি হারালো- ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার থেকে শুরু করে লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন, সৌদি আরব পর্যন্ত অনেক দেশ। জঙ্গিবাদের নামে, ইসলামোফোবিয়ার নামে, ফান্ডামেন্টালিজমের নামে কত গরম ও নরম যুদ্ধ বিরাজমান রয়েছে, কে তার হিসাব রাখবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধ একদিনও থামেনি। যুদ্ধ চলছেই। কিন্তু এসব যে তৃতীয় যুদ্ধের নামে তাও কেউ বলছে না। ঔপনিবেশকরা যেসব দেশ-মহাদেশ থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে চলে এলো, তারা কি সেখানে ভূ-রাজনীতি বা আঞ্চলিক স্বস্তি ও শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে এসেছে? না।
পাকিস্তানের সাথে ভারতীয়দের ঝগড়া-বিবাদ শেষ হয়েছে? না। এক শতাব্দী তো প্রায় পার হয়ে গেল! নতুন করে বর্ডার চিহ্নিত করা কি শেষ হয়েছে? না।
আমাদের সীমান্ত, আমাদের পানি, আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিষয়গুলো কি নিষ্পত্তি হয়েছে? হয়নি। ভারতের মুসলিম অধ্যুষিত রাজ্যগুলো স্বাধীন হয়েছে? হয়নি।
নতুন করে শক্তিধর দেশগুলো প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি হুঙ্কার দিচ্ছে, তোমরা তাড়াতাড়ি আমাদের সাথে মিশে যাও। ঐক্য গড়ে তোল।
বিশ্বব্যাপী এ আস্থার মধ্যে অনেক যুদ্ধ করে আমরা আল্লাহর রহমতে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শক্তিকে পরাভূত করেছি। মাত্র ১০ মাসে আমরা অনেক আবর্জনা দূর করতে পেরেছি। অনেক বৈদেশিক ঋণ আমরা পরিশোধ করতে পেরেছি। আমাদের জীবন-জগৎকে পুনর্বার সাজানোর চেষ্টা করছি। স্কুল-কলেজ, মাদরাসা-পাঠশালা পুনঃনির্মাণের বা পুনঃসংযোজনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। বিভক্তি বা বিভাজনের বদ্ধ দরজা খুলে দিয়েছি। ঐক্য, ঈমান, শৃঙ্খলার রেলমেন্টে ওঠার তীব্র আকাক্সক্ষা পোষণ করছি।
দুটি অনেক বড় কাজে আমরা হাত দিয়েছিলাম। ১. সংস্কার, ২. দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালন। যা না করলে আমরা আবার আগাতে পারবো না। অগ্রসর হতে পারবো না।
কিন্তু এসব করতে দেয়া হচ্ছে না। তীব্র বাধার সৃষ্টি করা হচ্ছে। পতিত সরকার ও তাদের বন্ধুরা এখনই নির্বাচনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে- যা আমাদের জন্য হবে সুইসাইডাল। জাতির জন্য হবে আত্মঘাতী।