সম্পাদকীয়

ঈদুল আজহার ত্যাগের আলোয় দূর হোক জাহেলিয়াতের অন্ধকার


৪ জুন ২০২৫ ১১:৪৭

ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহিম আ., মা হযরত হাজেরা আ. ও হযরত ইসমাইল আ-এর স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র ঈদুল আজহা আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়ছে। আমাদের সম্মানিত পাঠক, গ্রাহক, বিজ্ঞাপনদাতা, সাংবাদিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শুভানুধ্যায়ীদের জানাই ঈদুল আজহার আন্তরিক শুভেচ্ছা- ঈদ মোবারক। ‘তাক্বাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম’ ‘আল্লাহ তায়ালা আমাদের ও আপনার নেক আমল তথা ভালো কাজগুলো কবুল করুন’।
আমরা জানি, আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে নিজের পুত্রের গলায় ছুরি চালিয়ে হযরত ইবরাহিম আ. এক কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। আল্লাহ তাঁকে খলিল অর্থাৎ বন্ধু সম্বোধন করে বিশেষ মর্যাদাদানে ধন্য করেছেন। মুসলমানরা ছাড়াও আহলে কিতাব দাবিদার ইহুদি, খ্রিস্টানরা হযরত ইবরাহিম আ.-কে তাঁদের উত্তম পূর্বপুরুষ ও পথপ্রদর্শক আল্লাহর পবিত্র বান্দা বলে সম্মান করেন। তাই ঈদুল আজহায় পশু কুরবানির দৃষ্টান্ত মানুষকে মানুষের গোলামি থেকে মুক্ত করে আল্লাহর গোলামে পরিণত করার রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমে পুত্রসম প্রিয় স্বজন ও বস্তু ত্যাগের এক বিস্ময়কর স্মারক। মুসলিম উম্মাহকে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বা জিহাদে অনুপ্রাণিত করার এক আধ্যাত্মিক শিক্ষা কুরবানির আসল হাকিকত। বিশ্ব মুসলিমের সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার শপথের দিন ঈদুল আজহা।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, ‘ওরে সত্য মুক্তি স্বাধীনতা দেবে এ সে খুন-মোচন!/ ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ, শক্তির উদ্বোধন।’
আমরা জানি, কুরবানির শাব্দিক অর্থ ত্যাগ। ১০ জিলহজ ঈদুল আজহা পালন করা হয়। কুরবানির ঈদকে ‘ঈদুল আজহা’ বলা হয়। ঈদুল আজহার দিন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যে পশু জবাই করা হয়, পারিভাষিক অর্থে তাকে ‘কুরবানি’ বলা হয়। ইবরাহিমি সুন্নত হিসেবে কুরবানি ইবাদত হিসেবে আমরা পালন করি। কিন্তু আদম (আ.)-এর যুগ থেকেই কুরবানির বিধান চালু ছিল। পরবর্তী সময়ে হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর একটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে কুরবানি বিশেষ বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে। ঈদুল আজহার গুরুত্ব অপরিসীম। কুরআন-হাদিসে এ ব্যাপারে যথেষ্ট তাগিদ দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, কুরবানির পশুগুলোকে তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্তর্ভুক্ত করেছি। এর মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে। ইসলামের এ ‘মহান নিদর্শন’, যা ‘সুন্নতে ইবরাহিম হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে মদিনায় প্রতি বছর আদায় করেছেন এবং সাহাবীরাও নিয়মিতভাবে কুরবানি করেছেন।’ অতঃপর অবিরত ধারায় মুসলিম উম্মাহর সামর্থ্যবানদের মধ্যে এটি চালু আছে।
আমরা মনে করি, পশু কুরবানি আল্লাহর জন্য আত্মত্যাগের একটি দৃষ্টান্ত মাত্র। সারা বছরই আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রত্যাশায় নিজ সম্পদ অন্য মানুষের কল্যাণ ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজে ত্যাগ করতে হবে। নিজের পশুত্ব, নিজের ক্ষুদ্রতা, নীচতা, স্বার্থপরতা, হীনতা, দীনতা, আমিত্ব ও অহংকারী মনোভাব মুমিনের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য নয়। তাই কুরবানির ঈদ সার্থক হবে সেই দিন, যেদিন আমরা উল্লেখিত নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য ত্যাগ করে ত্যাগের মহিমায় আত্মগঠন করতে পারবো। এবার ঈদুল আজহা আসছে এমন একসময়, দেশ যখন ফ্যাসিস্ট হাসিনার জাহেলিয়াতের দুঃশাসন থেকে মুক্ত। গত বছরের ৩৬ জুলাই অর্থাৎ ৫ আগস্ট হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে দেশ জাহেলিয়াতমুক্ত হয়েছে। এখন সময় খুনি, ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার দোসরদের বিচার এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার। এ কাজ এগিয়ে নিতেই হবে। তা না হলে শহীদের রক্তের সাথে বেঈমানি করা হবে। তাই গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ থাকবে হবে- যাতে ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও তাদের দোসররা আমাদের লক্ষ্যচ্যুত করতে না পারে।
আসুন, আমরা বৈষম্য ও দুঃশাসনমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করি। জাহেলিয়াতের অন্ধকার দূর করে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় কুরবানির শিক্ষা হোক আমাদের পথচলার অনুপ্রেরণা। ত্যাগ ও কুরবানির মানসিকতা নিয়ে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সত্য-ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামকে পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করি। উঁচু-নীচু, ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ ভুলে সবাই মিলে ঈদুল আজহার আনন্দ উদযাপন করি। ঈদুল আজহার ত্যাগের মহিমায় দূর হোক অন্যায়-অনাচার ও স্বৈরাচার এবং জাহেলিয়াতের আঁধার কালো। আল্লাহ আমাদের সালাত, কুরবানি ও যাবতীয় সৎকর্ম কবুল করুন। আমীন।