মানবতাবিরোধী অপরাধে হাসিনার বিচার শুরু

স্টাফ রিপোর্টার
৪ জুন ২০২৫ ১১:৩১

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গত ১ জুন রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। এদিন জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার বিপ্লবে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফর্মাল চার্জ) দাখিল করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন বিভাগ। মামলার অপর দুই আসামি তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ দাখিল করা ‘ফর্মাল চার্জে’ তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ৫টি অভিযোগ আনা হয়েছে। পরে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নেয়ার আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের অপর ২ সদস্য হলেন- বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। একইসঙ্গে হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন ট্রাইব্যুনাল। আর মামলার অপর আসামি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারি করেছে, ট্রাইব্যুনাল। আগামী ১৬ জুন আনুষ্ঠানিক অভিযোগের বিষয়ে পরবর্তী আদেশ এবং আসামিদের গ্রেফতার করে ট্রাইব্যুনালে হাজিরের জন্য দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল-১।
গত ১ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের মাধ্যম হাসিনার মানবতাবিরোধী বিচার শুরু হয়নি, মূলত এর মাধ্যমে বিচারের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আদেশ দেওয়ার কথা রয়েছে আগামী ১৬ জুন। অভিযোগের বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়া শেষে আনুষ্ঠানিক চার্জ গঠিত হবে। চার্জ গঠনের পর হাসিনাসহ অন্যান্যদের বিচার শুরু হবে।
এবারের বিচার প্রক্রিয়ার নতুনত্ব হচ্ছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া। বিচারিক কার্যক্রম দেশবাসীকে জানার সুযোগ দেওয়ার জন্যই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ ফর্মাল চার্জ দাখিলের দিনে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের পক্ষে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও মো. আব্দুস সোবহান তরফদার শুনানি করেন। এ সময় অপর প্রসিকিউটর এবিএম সুলতান মাহমুদ, গাজী এইচ এম তামিমসহ অন্য প্রসিকিউটররা উপস্থিত ছিলেন। তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আনসার উদ্দিন খান পাঠান, সহ-সমন্বয়ক শহীদুল্লাহ চৌধুরীসহ তদন্ত সংস্থার অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এ তদন্ত প্রতিবেদন ৬ মাস ২৮ দিনের তদন্ত শেষে ১৩৫ পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদন প্রস্তুতে প্রত্যক্ষদর্শী ও জীবিত ভিক্টিমদের সাক্ষ্য, অপরাধ সংগঠনের সময় ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজ, ড্রোন এবং সিসিটিভি ফুটেজ, আসামিগণের মধ্যে টেলিফোন সংলাপের অডিও ক্লিপ, ডিজিটাল এভিডেন্সের ফরেনসিক রিপোর্ট, আসামিগণের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে প্রাপ্ত ভিডিও থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালে তাজুল ইসলাম বলেন, আমরা ১৩৫ পৃষ্ঠার আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন ও ৮৭৪৭ পৃষ্ঠার অন্যান্য প্রতিবেদন দাখিল করছি। আমরা আসামিদের বিরুদ্ধে মোট ৫টি অভিযোগ এনেছি। এতে সাক্ষীর সংখ্যা ৮১ জন, তথ্য সূত্র মোট ৫ খণ্ডে ২০১৮ পৃষ্ঠা, জব্দ তালিকা ও দালিলিক প্রমাণ ৮ খণ্ডে ৪০০৫ পৃষ্ঠা, শহীদদের তালিকা ১০ খণ্ডে ২৭২৪ পৃষ্ঠা, সর্বমোট ৮৭৪৭ পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট সাবমিট করা হয়েছে।
তাজুল ইসলাম বলেন, এ বিচারকার্য অতীতের প্রতিশোধ নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি প্রতিজ্ঞা। আমরা একটি সভ্যসমাজ চাই, যেখানে গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন থাকবে। সেখানে গণহত্যা কিংবা মানবতাবিরোধী অপরাধ সহ্য করা হবে না। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না। এ সময় জুলাই বিপ্লবে আহত ও নিহতদের স্মরণ করে ট্রাইব্যুনালের কাছে তিনি প্রমাণনির্ভর, নিরপেক্ষ ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ১৪ জুলাই প্রেস কনফারেন্সে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের রাজাকারের বাচ্চা, রাজাকারের নাতিপুতি বলেছিলেন। একথা বলার মধ্য দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোকে লেলিয়ে দেয়া হয়েছিল। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ছাত্রলীগ ও সহযোগী বাহিনী অক্সিলারি ফোর্স হিসেবে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, হত্যা করে, আহত করে এবং অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধ করে।
৫টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ
গণভবনের সংবাদ সম্মেলনে উসকানিমূলক বক্তব্য: ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আসাদুজ্জামান খান কামাল, চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ তৎকালীন সরকারের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্ররোচনা ও সহায়তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী সন্ত্রাসীরা নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর ব্যাপক মাত্রায় ও পদ্ধতিগতভাবে হামলা চালায়।
হেলিকপ্টার ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ: শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি আন্দোলনকারীদের দমনে হেলিকপ্টার, ড্রোন এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন। আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন এ নির্দেশ বাস্তবায়নে তাদের অধীনস্থ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দেন।
রংপুরে ছাত্র আবু সাঈদ হত্যা: ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, এ হত্যাকাণ্ডে তাদের নির্দেশ, প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা, ষড়যন্ত্র, অন্যান্য অমানবিক আচরণের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন হয়েছে।
চানখাঁরপুলে ছাত্র হত্যা: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকার চানখাঁরপুল এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে ছয়জন ছাত্র নিহত হন। এ ঘটনায়ও শেখ হাসিনাসহ ৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
আশুলিয়ায় হত্যা ও লাশ পোড়ানো: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আশুলিয়ায় ছয়জনকে গুলি করে হত্যা; তাদের মধ্যে পাঁচজনের লাশ পুড়িয়ে দেয়া এবং একইসঙ্গে গুরুতর আহত একজনকে পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ঘটনায় তিন আসামি কর্তৃক হত্যার নির্দেশ, প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা, ষড়যন্ত্র, অন্যান্য অমানবিক আচরণ করার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আসামিদের জ্ঞাতসারে এবং তাদের নির্দেশে এ অপরাধগুলো সংঘটিত হয়েছে।
এছাড়া শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আরও ২টি মামলা রয়েছে। যার মধ্যে একটি আওয়ামী লীগ শাসনামলের সাড়ে ১৫ বছরে গুম-খুনের ঘটনায় তাকে আসামি করা হয়েছে। অপরটি রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলা। জাজ্বল্যমান এসব অপরাধের বিচার অনুষ্ঠিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।