আগামীতে ঐকমত্যের সরকার
৪ জুন ২০২৫ ১১:২০
॥ ফারাহ মাসুম॥
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন যে, তিনি আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে বিদায় নিতে চান। কোনো কারণে রোজার পরে এ নির্বাচন করতে হলে সেটি হতে পারে এপ্রিল মাসে। অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির একজন সিনিয়র নেতার মাধ্যমে প্রফেসর ইউনূসের কাছে বার্তা দিয়েছেন যে, তিনি নির্বাচিত সরকারের সময়ও রাষ্ট্রে নোবেল জয়ের আনুষ্ঠানিক ভূমিকা চান। সেই ভূমিকা কি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ নাকি অন্য কোনো অভিভাবকের ভূমিকা হবে, তা স্পষ্ট নয়।
তবে এ ধরনের একটি ফর্মুলা দেশের শীর্ষ টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভির নিউজে একই সময় প্রকাশ করা হয়েছে। জাতীয় সরকারের সেই রূপরেখাটি নির্বাচনের আগে না পরে হবে, সেটি স্পষ্ট করে বলা না হলেও এটি অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি বার্তা হতে পারে বলেও ধারণা করা হয়। এ রূপরেখাটি এমন সময় প্রকাশ করা হয়, যে সময়টাতে বিএনপির প্রতিনিধিদল প্রফেসর ড. ইউনূসের সাথে সাক্ষাৎ করেন। আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর কয়েক মিনিটের জন্য বিএনপির প্রবীণ নেতা ড. আব্দুল মঈন খান প্রফেসর ইউনূসের সাথে কথা বলেন।
এনটিভি নিউজের ফর্মুলায় প্রফেসর ইউনূসকে প্রেসিডেন্ট, তারেক রহমানকে সরকারপ্রধান জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানকে উপপ্রধান এবং ফ্যাসিবাদ ও তার মিত্র দল ছাড়া বাকি সব বাম-ডান দলগুলোর প্রতিনিধিত্বের কথা বলা হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এর আগে বলেছিলেন, নির্বাচিত হওয়ার পর বিএনপি সমমনা দলগুলোর সাথে একটি কোয়ালিশন সরকার গঠন করবে। তখন বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন চলায় ইসলামপন্থীরা এ জোট সরকারের বাইরে থাকবে বলে মনে
করা হয়।
তবে বিএনপি চেয়ারপারসনের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্রের বক্তব্য অনুসারে, বেগম খালেদা জিয়া মনে করেন, বিএনপি একা নির্বাচন করে ক্ষমতায় যেতে পারলেও একটি প্রতিবেশী দেশের বিশেষ সহায়তায় ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক শক্তি এমনভাবে অরাজকতা তৈরি করবে- যাতে সরকারের পক্ষে ৫ বছর ক্ষমতায় থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ কারণে তিনি নির্বাচনের পর জামায়াতসহ অন্য ইসলামপন্থি এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম দলের সাথেও জোট গঠনের পক্ষপাতী। আর আন্তর্জাতিক সমর্থনের জন্য অভিভাবকের ভূমিকায় রাখতে চান প্রফেসর ইউনূসকে। এ অনুভব থেকে প্রফেসর ইউনূস পদত্যাগ করতে চেয়েছেন, সেটি ঠেকানোর জন্য গভীর ভূমিকা পালন করেন খালেদা জিয়া।
এদিকে আনুষ্ঠানিক গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, কিছু প্রেক্ষাপটে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি পশ্চিমা সমর্থন শিথিল হতে শুরু করেছে। তবে বিষয়টি জটিল এবং পুরোপুরি নির্ভর করে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের ওপর।
পূর্বে বেশকিছু নোবেলজয়ী ও পশ্চিমা বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব প্রফেসর ইউনূসের পক্ষে বিবৃতি দিয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমা সরকারগুলোর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক সমর্থন বা চাপ কিছুটা কম দেখা যাচ্ছে। এর অর্থ হতে পারে, তারা এখন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় আরও কৌশলী অবস্থান নিচ্ছে।
বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধিও একটি ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ভারত-চীন প্রতিযোগিতায় তার অবস্থান এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত গুরুত্বের কারণে পশ্চিমা দেশগুলো এখন সরকারবিরোধী অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে ভারসাম্যপূর্ণ নীতির দিকে যাচ্ছে।
ড. ইউনূস একসময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিয়মিত আলোচিত হতেন। এখন তুলনামূলকভাবে তার বিষয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার আগ্রহ কিছুটা কমে গেছে, যা জনমতের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
পশ্চিমা কূটনৈতিক ভারসাম্য
পশ্চিমা দেশগুলো; বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সুশীল সমাজের পক্ষে অবস্থান নিলেও তারা এখন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
ভারত-চীন প্রতিযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হওয়ায় বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় পশ্চিমা শক্তি সরাসরি সরকারের বিরোধিতা করে ঝুঁকি নিতে চায় না। অন্যদিকে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ হলো বাংলাদেশকে পাশে রাখা। ড. ইউনূসের বিষয়টি বড় বাধা নয় এখানে। এছাড়া পশ্চিমের কাছে উন্নয়ন ও বিনিয়োগ অগ্রাধিকার। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কারণে পশ্চিমা বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীলতা চায়, রাজনৈতিক উত্তেজনা নয়। ফলে ইউনূস ইস্যুতে তারা কম সক্রিয়।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে এখন একটি নির্ণায়ক হিসেবে দেখা হয়। আওয়ামী লীগ সরকার ইউনূসকে দীর্ঘদিন ধরে ‘অবাধ্য’ ও ‘রাজনৈতিকভাবে হুমকি’ হিসেবে দেখে। প্রধান কারণ হলো- একসময়ে ইউনূসের রাজনৈতিক দল গঠনের চেষ্টা (২০১০) আর তার পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন। পতিত হাসিনা সরকার মনে করত, ইউনূসের আন্তর্জাতিক সংযোগ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের ঝুঁকি তৈরি করে। এ কারণে তার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অবস্থান নেয়। অন্যদিকে ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রধান দল মাঝে মাঝে ড. ইউনূসের প্রতি সহানুভূতি দেখালেও, তাকে রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইউনূস এখন কিছুটা চাপে আছেন।
আগে ইউনূসের পক্ষে হিলারি ক্লিনটন, নোবেল বিজয়ীরা এবং বিশ্বব্যাংক সক্রিয় ছিল। এখন তাদের সুর অনেকটা নরম, যা তার অবস্থাকে কিছুটা দুর্বল করেছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে কূটনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এটি বাংলাদেশ সরকারের অভ্যন্তরীণ নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি স্পর্শকাতর ছায়া-অঞ্চল হয়ে উঠেছে। এতে কিছু কূটনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দ্বৈত অবস্থান
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে ইউনূসকে গণতন্ত্রপন্থী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করেছে। নোবেলজয়ী হওয়ায় তার প্রতি সম্মান ও সহানুভূতি রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হলে তারা ন্যায়বিচারের আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।
জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয়ের বিবৃতির মতো এ প্রতিক্রিয়াগুলো সাধারণত বিচার প্রক্রিয়ার মান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড রক্ষার ওপর জোর দেয়। এগুলোর ভাষা আইনভিত্তিক এবং রাজনৈতিক চাপ নয়, বরং ন্যায়বিচারের প্রচলিত কাঠামো অনুসরণে কেন্দ্রিত।
কিন্তু সময়ের সাথে তারা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের বাস্তবতা বুঝে নমনীয় হয়েছেÑ জিএসপি সুবিধা, নিরাপত্তা সহযোগিতা, জলবায়ু অর্থায়ন- এসব ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। ইউনূস ইস্যুতে অতিরিক্ত চাপ দিয়ে এ সম্পর্ক ঝুঁকিতে ফেলতে চায় না।
ভারতের কৌশলগত দূরত্ব
ভারত সরকার ইউনূস ইস্যুতে প্রকাশ্যে কিছু বলেনি। তবে ড. ইউনূস সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পতিত সরকারপ্রধান হাসিনাকে আশ্রয়দান, পুশইন করা, সীমান্তে হত্যা, বাণিজ্যে বিধিনিষেধ পর্যন্ত নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। তারা বরাবরই শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখছে। হাসিনার সময় ইউনূসকে তারা ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ হিসেবে দেখেছে, কিন্তু হাসিনার ক্ষেত্রে এখন সেটি বলছে না। তবে ভারতের বিরোধিতা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান ও জনপ্রিয়তাকে আরও শক্তিশালী করে।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা
জাতিসংঘ বা ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মতো সংস্থাগুলো মাঝে মাঝে ইউনূসকে আমন্ত্রণ জানালেও তারা সরকারবিরোধী কোনো বিবৃতি দেয় না।
জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের কিছু সদস্য বিপক্ষের প্রতি কিছু ইস্যুতে সংহতি জানিয়েছে, তবে সরকার এতে গুরুত্ব দেয়নি।
পশ্চিমা চাপের সীমাবদ্ধতা
২০১১ সালের পর থেকে পশ্চিমারা বাংলাদেশে গণতন্ত্রপন্থি চাপ দিয়ে ফল পায়নি। ফলে তারা এখন সংঘাতে না জড়িয়ে সম্পৃক্ততার কৌশল অনুসরণ করছে। ড. ইউনূসের বিষয়টিও এ নীতির বাইরে যাচ্ছে না।
এখন কথা হলো ড. ইউনূসের প্রতি কূটনৈতিক সহানুভূতি এখনো আছে, কিন্তু এটি ব্যবহারিক চাপ বা নীতিগত অগ্রাধিকার নয়। সরকার এ অবস্থাকে ব্যবহার করে তাকে অভ্যন্তরীণভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।