ফিঙ্গারপ্রিন্টের আচানক ব্যবহার

আবিষ্কারক কে এই বাঙালি মুসলিম?


১০ এপ্রিল ২০২৫ ১৩:৪১

॥ ইবরাহীম খলিল॥
ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপ, বর্তমানে নিত্যদিনের কাজকর্মে সাথে জড়িত। এর ব্যবহার রীতিমতো আচানক। এ আঙুলের ছাপ দিয়ে মানবদেহের যে কত কী নির্ণয় হচ্ছে, তা জেনে অবাক হওয়া ছাড়া উপায় নেই। প্রথমত, পৃথিবীতে জন্ম নেওয়ার মানুষগুলোর মধ্যে একজনের আঙুলের ছাপ আরেকজনের সাথে মিল নেই। এ কারণে এর ব্যবহার হয়ে উঠেছে সবচেয়ে নিরাপদ এবং জুতসই। এ ফিঙ্গারপ্রিন্টের ব্যবহার এখন মোবাইল ফোনের লক খোলা, অফিসের উপস্থিতি কিংবা বিভিন্ন গেটে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে লক খোলাসহ অপরাধী শনাক্তের কাজেও নিত্যদিনের ব্যবহারে পরিণত হয়েছে। ফিঙ্গারপ্রিন্টের আবিষ্কারক একজন বাঙালি মুসলিম এবং নাম খানবাহাদুর কাজী আজিজুল হক। আজ জানাবো তার আবিষ্কারের ইতিহাস ও জীবনের গল্প।
সম্প্রতি এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এক বিশেষ পদ্ধতিতে আঙুলের ছাপের তৈলাক্ত অংশ থেকে বের করা সম্ভব আঙুলের ছাপের বয়স। যার মাধ্যমে অপরাধ সংঘটনের সময়কে খুব নির্দিষ্ট করে বলে দেওয়া সম্ভব। আঙুলের ছাপের তৈলাক্ত অংশে পাওয়া যায় পালমিটিক এসিড, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমে যায়। মূলত এর মাধ্যমেই আঙুলের ছাপের বয়স নির্ধারণ করা সম্ভব।
আমাদের আঙুলের অগ্রভাগে আঁকাবাঁকা দাগের সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে অসংখ্য ছিদ্র। প্রতিটি ছিদ্রই ঘাম গ্রন্থির সঙ্গে যুক্ত। ঘাম গ্রন্থিগুলোর মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত গ্রন্থিটি হচ্ছে এক্রাইন গ্রন্থি। এটি হাতে এবং পায়ে সর্বাধিক ঘনত্ব নিয়ে অবস্থান করে। মাঝেমধ্যে যখন কারো হাত এবং পা ঘামে ভেজা ভেজা লাগে তখন প্রায় কয়েক মিলিয়ন এক্রাইন গ্রন্থি সক্রিয় হয়ে যায়। কয়েকশ জৈব পদার্থ ঘামের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে যায়। ঘামের মূল উপকরণ হিসেবে উপস্থিত থাকে পানি, এমিনো এসিড, লবণ, লিপিড। সেবেশাস গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয় তৈলাক্ত সেবাম। সেবাম নিশ্চিত করে আমাদের ত্বক দিয়ে যেন খুব বেশি পানি বেরিয়ে যেতে না পারে। যখন কেউ গালে বা মাথার ত্বকে হাত দেয়, তখন ঘামের সঙ্গে এ তৈলাক্ত তেলও আঙুলের অগ্রভাগে লেগে যায়। এ অবস্থায় যখন কেউ কোনো কিছু স্পর্শ করে তখন ঘাম এবং তৈলাক্ত সেবাম মিলে তৈরি করে আঙুলের ছাপ। তেল মিশে থাকার কারণে এ ছাপ পানিতে মুছে যায় না। যদি কারও ত্বক রুক্ষ হয়, তাহলে তেলের পরিমাণ হবে কম। এবং তার ফলে উৎপন্ন আঙুলের ছাপটি হবে কম স্পষ্ট। আবার ছাপ কেমন হবে তা নির্ভর করে যেখানে তা পাওয়া যাচ্ছে তার উপরিভাগের ওপরেও। অমসৃণ স্থান যেমন কাগজ, কাঠ আঙুলের ছাপের তেল শুষে নিতে পারে। ফলে ছাপ হয়ে যায় স্থায়ী কিন্তু শুষে নেওয়ার ফলে ছাপ খুবই অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। আবার মসৃণ তল যেমন স্টিল, গ্লাস, প্লাস্টিকের ওপরে বসা আঙুলের ছাপ হয় খুবই স্পষ্ট, কিন্তু যেহেতু মসৃণ তেল তাই এটি সহজেই মুছে ফেলা সম্ভব।
আঙুলের ছাপ দেখে বলে দেওয়া সম্ভব ব্যক্তির লৈঙ্গিক পরিচয়। আঙুলের ছাপে উপস্থিত কিছু এমিনো এসিড এবং তৈলাক্ত অবশিষ্টের অনুপাত বিশ্লেষণ করে বলে দেওয়া যায় ব্যক্তিটি ছেলে নাকি মেয়ে। ঘামের মধ্য দিয়ে এমিনো এসিডগুলো নিঃসৃত হয়। ছাপে সেগুলোর স্পষ্ট উপস্থিতি থাকে। পুরুষদের তুলনায় নারীদের ঘামে কিছু এমিনো এসিডের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ। হরমোনের পার্থক্যের জন্য এ পরিমাণের হেরফের হয়ে থাকে। এমিনো এসিডের এ পরিমাণ দেখেই বলে দেওয়া সম্ভব সন্দেহভাজন ব্যক্তিটি নারী নাকি পুরুষ।
ছাপের নানা ধরন
পেটেন্ট ফিঙ্গারপ্রিন্ট : রক্ত, কোনো তরল বা কালি, গ্রিজ, ময়লা কারো আঙুলে লেগে যে আঙুলের ছাপ তৈরি হয় সেটাই পেটেন্ট ফিঙ্গারপ্রিন্ট। সাধারণত খুবই স্পষ্ট হয়ে থাকে এ ছাপ। পেটেন্ট ফিঙ্গারপ্রিন্টকে ছবি তুলে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
প্লাস্টিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট : প্লাস্টিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট সাধারণত ক্লে, মোম বা ভেজা রঙের ওপরে হাত পড়ে যে আঙুলের ছাপ তৈরি হয়। এটি খোলা চোখে দেখতে পাওয়া যায়। পেটেন্ট ফিঙ্গারপ্রিন্টের মতো এটিও ছবি তুলে তদন্তের কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
লেটেন্ট ফিঙ্গারপ্রিন্ট : অপরাধ সংঘটনের স্থানে না দেখতে পাওয়া ফিঙ্গারপ্রিন্ট হলো লেটেন্ট ফিঙ্গারপ্রিন্ট। ডাস্টিং টেকনিকের মাধ্যমে এটিকে দৃশ্যমান করে তোলা হয়। যেমন কোনো রঙের গুঁড়ো ছিটিয়ে দেওয়া হলে আস্তে আস্তে এটি দৃশ্যমান হয়। এরপরে ছবি তুলে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয় অথবা ফিঙ্গারপ্রিন্ট টেপ ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
এক্সামপ্লার ফিঙ্গারপ্রিন্ট : বিশেষভাবে তৈরিকৃত ফিঙ্গারপ্রিন্ট হলো এক্সামপ্লার ফিঙ্গারপ্রিন্ট। যেমন পাসপোর্ট তৈরির সময়ে অথবা কোনো নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কাজে জড়িত থাকা লোকেদের আঙুলের ছাপ। এ কাজে ব্যবহারের জন্য আছে বিশেষভাবে তৈরি কালি ফিঙ্গারপ্রিন্ট ইঙ্ক। এখন অবশ্য ডিজিটাল ছবিও ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
১৯১০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রাতের ঘটনা। মেরি হিলার মাঝরাতে একটা শব্দ শুনে জেগে উঠলেন। খেয়াল করে দেখলেন শব্দ আসছে তার মেয়ের ঘর থেকে। উঠেই তিনি তার স্বামী ক্লারান্সকে ডাক দিলেন। তারা মেয়ের ঘরে সব ঠিক আছে কিনা, দেখতে গিয়ে টের পেলেন ঘরে আরও একজন আছে। সিঁড়িতে তাকে দেখতে পেয়েই ধাওয়া করতে শুরু করেন। তাড়া করতে গিয়ে সেই অচেনা মানুষটি ধস্তাধস্তির পরে ক্লারান্সকে পরপর দুটি গুলি করে। সেই গুলিতেই মারা যান ক্লারান্স। খুনি পালিয়ে যাওয়ার সময় তাড়াহুড়োয় একটি কাজ করে রেখে যায়। বাড়ির বাইরে উঠোনের রেলিং নতুন করে রং করা হচ্ছিল। সেই কাঁচা রঙে খুনি তার চার আঙুলের ছাপ রেখে যায়। পুলিশ কিছুদিনের মধ্যেই থমাস জেনিংস নামের সেই খুনিকে গ্রেপ্তার করে। রঙের ওপরে পাওয়া সেই চার আঙুলের ছাপের সঙ্গে তার আঙুলের ছাপের মিলও পাওয়া যায়। তাকে খুনের আসামি প্রমাণ করার জন্য সেই আঙুলের ছাপ ব্যবহার করা হয়।
এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আমেরিকায় প্রথমবারের মতো পুলিশি তদন্তের কাজে আঙুলের ছাপ ব্যবহার করা হয়। এখন সন্দেহভাজন কাউকে শনাক্ত করার জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোয় আঙুলের ছাপকে ভাবা হয় প্রধান উপকরণ হিসেবে। আঙুলের ছাপের উৎপত্তি থেকে শুরু করে কীভাবে তা তৈরি এবং শনাক্ত করা হয় পুরোই নির্ভর করে রসায়নের ওপরে। আরও স্পষ্ট করে বললে জৈব রসায়নের ওপরে। মূলত ফরেনসিক সায়েন্স দাঁড়িয়েই আছে রসায়নের ওপরে।
বলা হয় শত শত কোটি মানুষের পৃথিবীতে কোনো দুজন মানুষের আঙুলের ছাপ এক হয় না। এমনকি অভিন্ন যমজ (ওফবহঃরপধষ ঃরিহং) যাদের আচরণ থেকে শুরু করে হাসি-কান্না সবকিছু মিলে যায় তাদেরও আঙুলের ছাপ এক হয় না। কারণ আঙুলের এ মৌলিক ছাপ তৈরি হয় মাতৃগর্ভ থেকে। মাতৃগর্ভে ভ্রƒণের ১০ সপ্তাহ বয়সে এ আঙুলের ছাপ তৈরি হয়। মাতৃগর্ভে ভ্রƒণের আঙুলের ছাপ স্থায়ী হয় ছয় মাস বয়সে।
মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আছে : মানুষ কি ভেবেছে আমি তার অস্থিসমূহ একত্র করতে পারব না? অবশ্যই আমি সক্ষম এমনকি তার আঙুলের আগাকেও পুনরায় সৃষ্টি করতে। আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগের লোকেরা ফিঙ্গারপ্রিন্ট সম্পর্কে খুব কম-ই জানত। তবে কেন আল্লাহ কুরআনে ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর তুলনা দিয়েছেন? আসুন একটু দেখি। ১৮৭৫ সালে জেন জিন্সেন নামক এক ইংলিশ বিজ্ঞানী আবিষ্কার করেন যে, আঙুলের ছাপ একটি অসাধারণ বিষয়। এর রেখার ধরন একটি আরেকটির চেয়ে ভিন্ন এবং সম্পূর্ণ আলাদা। এবং আপনি যা কিছু ছোঁবেন তাতেই আপনার আঙুলের ছাপ বসে যাবে, এটা সবারই জানা কথা, তবে ১৪০০ বছর আগের লোকেরা এ ব্যাপারে খুব কম জানতেন।
এ আঙুলের আগার রেখার গঠন এবং গড়ন মাতৃগর্ভের প্রথম তিন মাসে হয়। এর অনেক ব্যাখ্যা রয়েছে, একটি হলো মানুষের সকল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এ আঙুলের ছাপে এনকোডেড রয়েছে। সুতরাং আমাদের পুনরুত্থান এর সময় আল্লাহ আমাদের শরীর পুরোপুরি ফিরিয়ে দিবেন এবং আমাদের বিচার করবেন, আর শুধু আঙুলির মাথার ছাপ দিয়েই আমাদের সকল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য জানা সম্ভব। আঙুলের আগাকে এককথায় ডাটা ব্যাংক বলা জেতে পারে। নিশ্চয় ডিএনএ একটি অতি মূল্যবান আবিষ্কার। ডিএনএ আবিষ্কার হবার পর এ ধারণা বদলে গেছে যে, কোষ তার অবস্থিত এলিমেন্ট নিয়ে একটি সাধারণ সৃষ্টি নয়। আরও গভির গবেষণায় এর জটিলতা প্রকাশ পেয়েছে। মানুষের একটি ডিএনএ কোটি কোটি কোডসংবলিত হয়, আমাদের চুলের রঙ থেকে শুরু করে নখ পর্যন্ত সকল তথ্য এই কোড-এ থাকে। আঙুলের আগার একটি ডিএনএ এর কোড ছাপালে লক্ষ পৃষ্ঠার হাজার কপি বই হবে। আর আঙুলের আগার একটি ডিএনএ দিয়ে যে কারো সকল তথ্য জানা সম্ভব। এ কথা তাহলে খুবই স্পষ্ট যে আল্লাহর কাছে আমাদের পুনরুত্থান কোন ব্যাপার নয়। কুরআনে সকল বিজ্ঞানের সমাধান আছে যা আমরা জানি না। আশা করি, ভবিষ্যতে আরও আকর্ষণীও পোস্ট নিয়ে আপনাদের সামনে আসব।
এবার জানা যাক কে এ বাঙালি বিজ্ঞানী আজিজুল হক। বর্তমান খুলনা জেলার ফুলতলার পয়গ্রাম কসবাতে আজিজুল হকের জন্ম ১৮৭২ সালে। সেখানকার স্কুলে পড়ার সময় গণিতে তাঁর বিশেষ প্রতিভা লক্ষ করা যায়। কিন্তু নৌকা দুর্ঘটনায় বাবার মৃত্যুতে পুরো পরিবার আর্থিক অনটনে পড়ে। বড় ভাই সংসারের দায়িত্ব নেন। কিন্তু আগের মতো খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটি না থাকায় আজিজুলের সবিশেষ অসুবিধা হয়। কারণ, আজিজুল খেতে ভালোবাসতেন। আজিজুল তাঁর নিজের ভাগের খাবার শেষ করে প্রায়ই অন্যদের খাবার খেয়ে ফেলতেন। সে রকম একদিন বড় ভাই বাড়িতে খেতে বসে আবিষ্কার করেন আজিজুলের ব্যাপারটা। সেদিন কেবল বকাঝকায় ব্যাপারটা শেষ হলো না। ক্লান্ত-শ্রান্ত বড় ভাইয়ের হাতে বেধড়ক মার খেলেন আজিজুল হক। সঙ্গে মনোবেদনা। সিদ্ধান্ত নিলেন, যেদিকে চোখ যায় চলে যাবেন। বাড়ি থেকে বেরিয়ে চলে গেলেন রেলস্টেশনে। যে ট্রেন পেলেন, সেটাতেই উঠে পড়লেন। ট্রেন তার শেষ গন্তব্য কলকাতার হাওড়া স্টেশনে থামল। সেখানেই নেমে পড়লেন আজিজুল। ভাবলেন, এখানেই থাকবেন। এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়িয়ে রাতে আজিজুল এক বাড়ির বারান্দায় ঘুমিয়ে পড়লেন।
সকালে ঘুম ভেঙে বাড়ির কর্তা বারান্দায় হাফপ্যান্ট ও শার্ট পরা আজিজুলকে আবিষ্কার করেন। কেন জানি আজিজুলকে দেখে তাঁর মায়া হলো। তাঁকে তিনি বাসায় আশ্রয় দিলেন। বাসার ফুটফরমাশ খাটার বিনিময়ে আজিজুল সেখানে থাকতে শুরু করেন। আর এভাবে পূর্ব বাংলার পিছিয়ে পড়া এক গ্রাম্য কিশোরের আস্তানা হয়ে ওঠে সেই সময়কার সম্ভ্রান্ত কলকাতা। এটা ১৮৮৪ সালের কথা। তখন কে জানত, এর এক যুগ পরই আজিজুলের হাতেই সূচিত হবে হাতের আঙুলের ছাপ দিয়ে অপরাধী শনাক্তকরণের বিশেষ পদ্ধতি! আর সে সূত্রে আজিজুল হবেন খানবাহাদুর কাজি আজিজুল হক! গাণিতিক পদ্ধতিতে যাওয়ার আগে তাঁরা এ সাত হাজার আঙুলের ছাপকে খিলান, বৃত্ত ও ঘূর্ণিতে ভাগ করেন। দেখতে পান, এগুলোর মধ্যে মাত্র ৫% খিলান, ৬০% চক্র ও ৩৫% ঘূর্ণি।
কলকাতার আশ্রয়দাতার বাড়িতে শুধুই ফুটফরমাশ খেটে সময় পার করলেন না আজিজুল। তাঁর মনোযোগ ওই বাড়ির ছেলেমেয়েদের ওপরও। খেয়াল করলেন, তিনি গণিতের যে সমস্যাগুলো সহজে সমাধান করতে পারেন, সেগুলো বাড়ির ছেলেমেয়েরা সমাধানে গলদঘর্ম হয়। ছেলেমেয়েরা যখন পণ্ডিতের কাছে পড়তে বসে, তখন আজিজুল তাঁর প্রতিভা দেখাতে শুরু করেন। হকচকিত পণ্ডিত একটি কাজের ছেলের গাণিতিক প্রতিভা দেখে অবাক হন এবং তাঁর আরও পরীক্ষা নেন। সে পরীক্ষায়ও পাস করে যান আজিজুল। পণ্ডিত তাঁর প্রতিভার কথা জানান বাড়ির কর্তাকে। কর্তাও অবাক হন এবং তখন জানতে পারেন, আজিজুল বাড়ি থেকে পালিয়ে আসার আগে স্কুলে পড়তেন। কর্তাটি উদার ছিলেন। তিনি আজিজুলকে ভর্তি করিয়ে দেন কলকাতার স্কুলে। আজিজুল সেখান থেকে এফএ পাস করে নিজের যোগ্যতায় প্রেসিডেন্সি কলেজে গণিতে ভর্তি হন। সেখানেও তিনি গণিতের শিক্ষকদের নজরে পড়েন এবং অধ্যক্ষ তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিশেষ স্নেহ করতে থাকেন। এখান থেকেই তিনি গণিতে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।
ইতিহাস ঘাঁটলে পাওয়া যায়, প্রায় এক হাজার খ্রিস্টপূর্বে আঙুলের ছাপ দাপ্তরিক কাজে ব্যবহার করা হতো। প্রাচীন ব্যাবিলন, চীন, নোভা স্কশিয়া এবং পার্সিয়ায় আঙুলের ছাপ স্বাক্ষরের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ১৬৮৬ সালে ইতালির বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাসেলো মালপিগি খেয়াল করেন আঙুলের ছাপের সাধারণ কিছু প্যাটার্ন, প্যাঁচ, বাঁক এবং জালিকা রয়েছে যেগুলো সবার হাতেই কমবেশি দেখা যায়। ১৮২৩ সালে প্রাগের চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর জোহানেস ইভানগেলিস্টা পুরকিঞ্জি আঙুলের ছাপের নয়টি প্যাটার্ন আবিষ্কার করেন। সেখানে আঙুলের ছাপের ৯টি প্রধান রূপরেখা বিস্তারিত বলা হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আঙুলের ছাপের প্রায়োগিক ব্যবহার কোথাও শুরু হয়নি। ১৮৫৮ সালে ইন্ডিয়ার একজন ম্যাজিস্ট্রেট দ্বিতীয় ব্যারোনেট স্যার উইলিয়াম হার্শেল অনুধাবন করেন আঙুলের ছাপ মৌলিক এবং তা দিয়ে মানুষকে চিহ্নিত করা যায়। তাই ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথমবারের মতো তিনি আঙুলের ছাপকে দাপ্তরিক কাজে ব্যবহার শুরু করেন। চুক্তি স্বাক্ষরের সময় টিপসইয়ের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেন তিনি। টোকিওর ডাক্তার হেনরি ফোল্ডস আঙুলের ছাপের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ১৮৮০ সালে তিনি ফেলে যাওয়া বোতলের ওপরে আঙুলের ছাপ পরীক্ষার মাধ্যমে একজন অপরাধীকে শনাক্ত করে তিনি প্রথমবারের মতো অপরাধবিজ্ঞানে আঙুলের ছাপের প্রয়োগ দেখান। এরপরই ফরেনসিক সায়েন্সে আঙুলের ছাপকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখা শুরু করা হয় এবং আদালত সাক্ষ্য হিসেবে আঙুলের ছাপকে মেনে নেয়। ১৮৯২ সালে স্যার ফ্রান্সিস গ্যাল্টন আট হাজার মানুষের আঙুলের ছাপ নিয়ে পরীক্ষার ফলাফল একটি বইয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। বইটির নাম ফিঙ্গারপ্রিন্টস যেখানে আঙুলের ছাপকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিন্যস্ত আকারে দেখানো হয়েছে। একই বছর আর্জেন্টিনার পুলিশ একটি খুনের কেস সমাধান করার জন্য আঙুলের ছাপ ব্যবহার করেছিল। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো পুলিশি সমস্যা সমাধানে আঙুলের ছাপ ব্যবহার করা হয়। একই বছরে আর্জেন্টিনার পুলিশের সেই দলটি আঙুলের ছাপের একটি ফাইল তৈরি করেন যাতে দ্রুততম সময়ে অপরাধীকে চিহ্নিত করে ফেলা যায়। ১৮৯৬ সালে আস্তে আস্তে আঙুলের ছাপের বহুবিধ ব্যবহার পৃথিবীজুড়ে বিস্তার লাভ করে। আর্জেন্টিনার দেখাদেখি ব্রিটিশ ইন্ডিয়া অপরাধী শনাক্তকরণে তা ব্যবহার শুরু করে। আর্জেন্টিনা এবং ভারতের পরে ১৯০১ সালে লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশের কেন্দ্রীয় দপ্তর স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড লন্ডনেও আঙুলের ছাপের নানাবিধ ব্যবহার তুলে ধরেন। নিজেরাও এর ব্যবহার শুরু করতে পারেন কিনা, তাও আলোচনা করেন। ধারাবাহিকতায় স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যুরো স্থাপিত হয়। ১৯০২ সালে প্যারিসে এবং ১৯০৩ সালে আমেরিকার নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টসহ অন্যরা আঙুলের ছাপের মাধ্যমে মানুষকে চিহ্নিত করা শুরু করে। এরপরের দুই বছরের মধ্যে পশ্চিমা বিশ্বের সবগুলো দেশই অপরাধী চিহ্নিত করতে আঙুলের ছাপকে প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। ১৯০৫ সালে আমেরিকার সেনাবাহিনী তাদের কাজে আঙুলের ছাপের ব্যবহার শুরু করে। ১৯১১ সালে হেনরি ফোল্ডসের কাজের ধারাবাহিকতায় জাপানিজ পুলিশ অফিসিয়ালি আঙুলের ছাপকে অন্তর্ভুক্ত করে। ১৯২৪ সালে এফবিআই আঙুলের ছাপের ক্যাটালগ তৈরি করে। ১৯৭১ সালের ভেতরে তাদের কাছে ২০০ মিলিয়ন লোকের আঙুলের ছাপ জমা হয়ে যায়। ১৯৯০ সালে প্রথমবারের মতো কম্পিউটারের মাধ্যমে আঙুলের ছাপকে নেওয়া শুরু হয়। এএফআইএস অটোমেটেড ফিঙ্গারপ্রিন্ট আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেমটিতে স্ক্যানের মাধ্যমে সব আঙুলের ছাপ জমা করে রাখে। ১৯৯৬ সালে বাচ্চাদের হারিয়ে যাওয়া বা অপহরণকে এড়াতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তাদের আঙুলের ছাপ গুরুত্ব দিয়ে দেখা শুরু করে। ক্রিস্ট মিগলিয়ারো ফিঙ্গারপ্রিন্ট আমেরিকা নামক একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন যারা বাচ্চাদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট থেকে শুরু করে ডিএনএর সব ডকুমেন্ট জমা করে রাখে। ১৯৯৯ সালে এফবিআই তাদের জমা থাকা ফিঙ্গারপ্রিন্টকে ইলেকট্রনিক ফিঙ্গারপ্রিন্টে রূপান্তরিত করেন। যার মাধ্যমে লাখ লাখ অপরাধীর আঙুলের ছাপ এখন বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে চিহ্নিত করা যাচ্ছে।
১৯৩০ সালে ইউরোপিয়ান ব্যাংক ডাকাত জন ডিলিঙ্গার এসিড দিয়ে আঙুলের ছাপ মুছে ফেলার চেষ্টা করেন। সম্প্রতি আরেক সন্দেহভাজনকে পাওয়া গেছে যে কিনা কামড় দিয়ে তার চামড়া তুলে ফেলেছে যাতে তার আঙুলের ছাপ বোঝা না যায়। কিন্তু এতসব সত্ত্বেও আঙুলের ছাপকে পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না। আঙুলের ছাপ জীবন ভর মানুষের সঙ্গে থাকে শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে। ফরেনসিক সায়েন্সের শুরুর দিকে পথিকৃৎ হিসেবে ধরা হয় ফ্রান্সের এমোন্ড লোকার্ডকে। ফরেনসিক সায়েন্সে মূল সূত্র বলা হয়, লোকার্ডের বিনিময় নীতিকে (খড়পধৎফং বীপযধহমব ঢ়ৎরহপরঢ়ষব)। লোকার্ডের বিনিময়নীতিতে উল্লেখ আছে মানুষ সবসময় চলমান পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতি রেখে আচরণ করে এবং সবসময়ই হয় সে কিছু ফেলে যায় অথবা সঙ্গে নিয়ে যায়।
অপরাধ সংঘটনের জন্য যখনই কেউ কোথাও যায়, তখন নিশ্চিতভাবে বলা যায় সে কিছু ফেলে আসছে। সেটি হতে পারে একগোছা চুল, জামার কোনো সূক্ষ্ম অংশ বা সুতা, গায়ের চামড়া বা মরা কোষ। অপরাধ সংঘটনের স্থানে যদি কারও সঙ্গে ধাক্কা লাগে বা ধস্তাধস্তি হয়, তাহলে তো কথাই নেই। ধস্তাধস্তির ফলে আঁচড় ও কামড়ে, গায়ের চামড়ার অংশবিশেষ, রক্ত অনেক কিছুই সে ফেলে যেতে পারে প্রমাণ হিসেবে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুতর জিনিস হিসেবে যা ফেলে আসবে তা হচ্ছে আঙুলের ছাপ।
পুলিশের চাকরি ও আঙুলের ছাপ
হাতের রেখা ও আঙুলের ছাপ নিয়ে আলোচনা, গবেষণা ইত্যাদি শুরু হয় ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে। কিন্তু এর মাধ্যমে কাউকে শনাক্ত করা যেতে পারে, এমন ধারণা কিন্তু মাত্র দেড় শ’ বছর আগে ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৮৫৯ সালের দিকে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষের হুগলি জেলার চিফ ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন স্যার উইলিয়াম জেমস হার্শেল। তিনি লক্ষ করলেন, কোনো মানুষের আঙুলের ছাপ তার জীবনকালে মোটামুটি একই থাকে এবং একজনের আঙুলের ছাপ অন্যজনের সঙ্গে মেলে না। আর একটু খোঁজখবর ও গবেষণা করে তিনি ১৮৭৭ সালে ভারতবর্ষে আঙুলের ছাপ ও হাতের ছাপ দিয়ে মানুষকে শনাক্ত করার পদ্ধতি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেন। এর ফলে দলিল ও আইনি কাগজে আঙুলের ছাপ দেওয়া বৈধ হয়ে যায়। তবে এ রকম রেকর্ড কেবল একজনের সঙ্গে একজনের শনাক্তকরণ তুলনা করার জন্য ব্যবহৃত হতো। হাতের ছাপ সার্চ করার কথা তখনো কারও মাথাতে আসেনি।
কাছাকাছি সময়ে ১৮৮০ সালে বিলেতে ড. হেনরি ফাউল্ডস বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইনের কাছে একটি চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে ফিঙ্গারপ্রিন্টের শ্রেণিকরণের একটি পদ্ধতি নিয়ে সহায়তা চান। কিন্তু ডারউইন তাঁকে সময় দিতে পারেননি। কিন্তু চিঠিটি তাঁর মাসতুতো ভাই স্যার ফ্রান্সিস গ্যালটনের কাছে পাঠিয়ে দেন। যদিও তাঁরা দুজন খুব বেশি যোগাযোগ করেননি, কিন্তু এক দশকের মধ্যে তাঁরা দুজনই প্রায় একই রকম পদ্ধতি বের করেন। এর মধ্যে ড. ফাউল্ডস আগে সেটি করেন। কিন্তু স্যার ফ্রান্সিস গ্যালটন ১৮৯২ সালে তাঁর বিখ্যাত ও জনপ্রিয় বই ফিঙ্গারপ্রিন্ট-এ তাঁর পদ্ধতি প্রকাশ করেন। এই প্রথম আমরা জানতে পারি, মানুষের আঙুলে তিন ধরনের প্যাটার্ন থাকে। খিলান (আর্চ), চক্র (লুপ) ও ঘূর্ণি (হোর্লস)। সেই সময় অপরাধীদের শনাক্তকরণের জন্য তাদের শরীরের বিভিন্ন মাপ লিপিবদ্ধ করা হতো। এই নৃতাত্ত্বিক পদ্ধতি বেশ জটিলই ছিল। কিন্তু কোনো সহজ বিকল্পও ছিল না। ১৮৯২ সালে ভারতের ব্রিটিশ পুলিশ এ অ্যানথ্রোপোমেট্রি পদ্ধতি চালু করে।
১৮৯৪ সালে বেঙ্গল পুলিশের অধিকর্তা বা ইন্সপেক্টর অব পুলিশ ছিলেন স্যার এডওয়ার্ড হেনরি। গ্যালটনের বই পড়ে তিনি ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে অপরাধী খুঁজে বের করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ১৮৯৬ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি বাংলার পুলিশ বাহিনীকে অপরাধীদের অ্যানথ্রোপোমেট্রিক ডেটা ছাড়াও ১০ আঙুলের ছাপ ও হাতের ছাপ সংরক্ষণের নির্দেশ দেন। আঙুলের ছাপ নিয়ে বিশদ কাজ করার জন্য তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যক্ষের কাছে গণিত ও পরিসংখ্যানে অত্যন্ত দক্ষ একজন স্নাতককে চান। ঠিক সেই সময়ে কাজি আজিজুল হক গণিতে মাস্টার্স শেষ করেন। অধ্যক্ষের সুপারিশে কাজি আজিজুল হক পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে যোগ দেন। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন হেমচন্দ্র বসু। স্যার হেনরি পুলিশের দুই সাব-ইন্সপেক্টর আজিজুল হক ও হেমচন্দ্রকে নিয়ে একটি আলাদা টিম গঠন করেন।
হাতের ছাপের শ্রেণিকরণ
আমরা যখন কোনো কিছুকে শ্রেণিবদ্ধ করতে চাই, তখনই প্রথমে আসে বর্ণক্রমিক চিন্তা। কিন্তু অপরাধীদের তথ্য বর্ণক্রম অনুসারে সাজানোর তেমন কোনো অর্থ নেই। কারণ অপরাধীরা নিজের নাম, ঠিকানা, ধর্ম; এমনকি কোনো কোনো সময় নিজেদের চেহারাও পাল্টে ফেলে। এজন্যই অর্থোপোমেট্রিকের সূচনা। কিন্তু সেটি জটিল বলেই স্যার হেনরি হাতের ছাপ দিয়ে কিছু করা যায় কি না, সেটি ভাবেন।
আজিজুল ও হেমচন্দ্র কাজে যোগ দেন। ঘেঁটেঘুঁটে অনেক অপরাধীর হাতের ছাপের রেকর্ড গবেষণার জন্য পেয়ে যান। এরই মধ্যে কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে অর্থোপোমেট্রিক ডেটা সংরক্ষণের ব্যুরো গড়ে ওঠে। আজিজুল হক ও হেমচন্দ্র যখন কাজ শুরু করেন, ততদিনে সেখানে প্রায় সাত হাজার অপরাধীর আঙুলের ছাপ ও হাতের ছাপ সংরক্ষিত ছিল।
সেই ডেটাগুলো বিশ্লেষণ করার পাশাপাশি তাঁরা দুজন স্যার হেনরির সঙ্গে একমত হন, এটি সহজভাবে ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই একটি গাণিতিক সূত্র বের করতে হবে। তবে গাণিতিক পদ্ধতিতে যাওয়ার আগে তাঁরা এ সাত হাজার আঙুলের ছাপকে খিলান, বৃত্ত ও ঘূর্ণিতে ভাগ করেন। দেখতে পান, এগুলোর মধ্যে মাত্র ৫% খিলান, ৬০% চক্র ও ৩৫% ঘূর্ণি। যেহেতু খিলানের সংখ্যা পরিসাংখ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়, কাজেই তাঁরা সেটিকে ঘূর্ণির সঙ্গে একীভূত করে ফেললেন। ফলে হাতের আঙুলের ছাপ হয়ে গেল দুই রকমের- চক্র ও ঘূর্ণি। তারপর তাঁরা এদের চিহ্নিত করলেন যথাক্রমে খ ও ড হিসেবে। এরপর দুই হাতের ১০ আঙুলকে পাঁচটি জোড়ায় ভাগ করা হলো। এ জন্য ছবিতে দেখানো পদ্ধতিতে তালু নিচে রেখে ডান হাতকে বাঁ দিকে ও তালু ওপরে রেখে বাঁ হাতকে ডানে বসানো হলো। ছবিতে দেখানো পদ্ধতি জোড়া তৈরি করা হলো। জোড়া তৈরিকে এভাবে লেখা যায়। এখন প্রথম জোড়া ডান তর্জনী ও ডান বৃদ্ধাঙুলির যেকোনোটি চক্র (খ) বা ঘূর্ণি (ড) হতে পারে। কাজেই মোট চার রকমের বিন্যাস আমরা দেখতে পাব।
১. ডান তর্জনী চক্র (খ), ডান বৃদ্ধাঙুলি ঘূর্ণি (ড)
২. ডান তর্জনী ঘূর্ণি (ড), ডান বৃদ্ধাঙুলি চক্র (খ)
৩. উভয়টি চক্র (খ) এবং
৪ উভয়টি ঘূর্ণি (ড)
একইভাবে বাকি চারটি জোড়াতেও এ রকম চারটি করে বিন্যাস হতে পারে। তার মানে, মোট পাঁচ জোড়াতে বিন্যাস হবে = ৪দ্ধ৪দ্ধ৪দ্ধ৪দ্ধ৪=১০২৪ ১০২৪ কে লেখা যায় ৩২দ্ধ৩২ হিসাবে।
তার অর্থ হলো, আমরা যদি ৩২টি ক্যাবিনেটের প্রতিটিতে ৩২টি করে ফাইল রাখি, তাহলে আমরা ১০২৪ জন অপরাধীর তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে পারব।
এখন প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম জোড়াতে যদি কোনো ঘূর্ণি থাকে, তাহলে সেটির গাণিতিক মান হবে যথাক্রমে ১৬, ৮, ৪, ২ ও ১। আর চক্রের বেলায় যা-ই থাকুক না কেন, সেটির গাণিতিক মান হবে ০। আমরা একটা উদাহরণ দেখি। ধরা যাক, কোনো অপরাধীর ডান বৃদ্ধাঙুলি, ডান অনামিকা, বাম মধ্যমা, বাম তর্জনী এবং বাম অনামিকাতে ঘূর্ণি আর অন্যগুলো চক্র। এখন হরে ও লবে ১ যোগ করে আমরা চূড়ান্ত ফলাফল পেলাম, অর্থাৎ এই লোকের তথ্য পাওয়া যাবে ২০ নম্বর ক্যাবিনেটের ১১ নম্বর ফাইলে।
যদি সব আঙুলের ছাপই চক্র হয়, তাহলে এটির মান হবে ০/০। যেহেতু শূন্য ক্যাবিনেট বা শূন্য ফাইল বলে কিছু নেই, তাই ১/১ যোগ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ জন্য যে ব্যক্তির সব আঙুলেই চক্র, তার ছাপ থাকবে প্রথম ক্যাবিনেটের প্রথম ফাইলে। আঙুলের ছাপের শ্রেণিকরণের এ প্রাথমিক পদ্ধতিকে ইচ্ছেমতো সেকেন্ডারি বা টারশিয়ারি শ্রেণিকরণের মাধ্যমে লাখ লাখ ডেটা সংরক্ষণ করা সম্ভব।
হেনরির সিস্টেম
কিছুদিন কাজ করে আজিজুল হক ও হেমচন্দ্র বসু আঙুলের ছাপের শ্রেণিকরণের কাজটা করে ফেলেন। এর মধ্যে গাণিতিক পদ্ধতিটির মূল কৃতিত্ব আজিজুল হকের। নিয়মিত তাঁদের অগ্রগতি স্যার হেনরিকে অবহিত করতেন। যখন বোঝা গেল সিস্টেমটি ভালো, তখন স্যার হেনরি আনুষ্ঠানিকভাবে গভর্নর জেনারেলের দপ্তরকে জানান। একটি কমিশন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পদ্ধতিটিকে অর্থোপোমেট্রিক পদ্ধতির চেয়ে উন্নত বলে রায় দেয়। কাজেই পুলিশ এটি গ্রহণ করে ১৮৯৭ সালে এবং ওই বছরই কলকাতায় বিশ্বের প্রথম ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যুরো স্থাপিত হয়। ১৮৯৯ সালে স্যার হেনরি বিলেতের ডোভারে গিয়ে এ পদ্ধতি সম্পর্কে একটি পেপার উপস্থাপন করেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, হেনরি শুরু থেকে আজিজুল হক ও হেমচন্দ্র বসুর অবদান সম্পর্কে কোথাও কোনো স্বীকৃতি দেননি। ১৮৯৯ সালে ব্রিটিশ সরকার হেনরির পেপারটি মুদ্রণ করে প্রকাশ করে। ফলে এটি ছড়িয়ে পড়ে। ১৯০০ সালে ব্রিটিশ সরকার একই পদ্ধতি চালু করার জন্য স্যার হেনরিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাঠায় এবং তিনি সেখানেও সাফল্যের সঙ্গে এটি চালু করেন। তারপর থেকে বিশ্বব্যাপী এ পদ্ধতি ‘হেনরির সিস্টেম’ নামে চালু হয়ে যায়। এদিকে কাজের কোনো স্বীকৃতি না পাওয়া সত্ত্বেও আজিজুল হক ও হেমচন্দ্র ওই ব্যুরোতে কাজ করতে থাকেন। এর মধ্যে আজিজুল হক নিজের জন্মস্থানে ফিরে যান। তাঁর ভাইয়েরা তাঁর সাফল্যের কথা শুনে উচ্ছ্বসিত হন এবং এক নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ের ব্যবস্থা করেন। ১৯১২ সালে বিহার বাংলা থেকে পৃথক হয়ে আলাদা রাজ্যে পরিণত হয়। আজিজুল হক ভাবলেন, ব্যুরোতে চাকরি করার পরিবর্তে তিনি পুলিশের মূল চাকরিই করবেন এবং সেটা বিহারে। তারপর তিনি সেখানে চলে যান। বিহারে গিয়ে তিনি সেখানেই স্থায়ী হন।
অনেক বছর পর যখন আজিজুল হক ফিঙ্গারপ্রিন্ট শ্রেণিকরণের কাজে তাঁর অবদানের জন্য ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে স্বীকৃতি এবং ক্ষতিপূরণ চেয়েছিলেন, স্যার হেনরি প্রকাশ্যে হকের অবদানকে স্বীকৃতি দেন এবং পরে বোসের ক্ষেত্রেও একই কাজ করেন। জি এস সোদি এবং যশজিৎ কৌর দুই ভারতীয় পুলিশ কর্মকর্তার ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিকাশে অবদানের বিষয়টি নিয়ে একটি বিস্তৃত গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তাঁদের গবেষণাপত্রে তাঁরা দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় ‘ইন্ডিয়ান অ্যাফেয়ার্স ইন লন্ডন’ নামে নিবন্ধ থেকে উদ্ধৃত করেন, ‘একজন মুহাম্মাদান উপপরিদর্শক ফিঙ্গারপ্রিন্ট শ্রেণিবিন্যাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, কিন্তু তিনি পর্যাপ্ত স্বীকৃতি পাননি।’ আঙুলের ছাপ শ্রেণিবিন্যাসে হকের অবদানকে সমর্থন করার জন্য সোদি ও কৌর আরও কয়েকটি উৎস উদ্ধৃত করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, বিহার ও ওডিশার সরকারি অফিসিয়াল চিফ সেক্রেটারি জে ডি সিফটন একটি চিঠি লিখেছিলেন (চিঠি নম্বর ৭৬৭৬১ পিআর, তারিখ ১৫ জুন ১৯৫২), ‘আজিজুল হককে আঙুলের ছাপগুলোকে শ্রেণিবদ্ধকরণের একটি পদ্ধতিতে গবেষণাকাজ শুরু করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল এবং কয়েক মাস পরীক্ষার পর তিনি তাঁর প্রাথমিক শ্রেণিবিন্যাসটি বিকশিত করেছিলেন, যা স্যার ই আর হেনরিকে বিশ্বাস করিয়েছিলেন যে, ফিঙ্গারপ্রিন্টগুলোকে শ্রেণিবদ্ধকরণের কার্যকর পদ্ধতি সরবরাহ করে সমস্যা সমাধান করা যেতে পারে। খান বাহাদুর (হক) এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
পরে স্যার হেনরি আরেকটি চিঠিতে পরিষ্কার করেন, হক এ গবেষণায় অন্য সবার চেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেছেন এবং তিনি আমার সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। হক ভারতীয় পুলিশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছেন।’ পরবর্তী সময়ে হেমচন্দ্র বসুকেও এ গবেষণার জন্য স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আজিজুল হক ১৯১৩ সালে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে ‘খান সাহেব’ এবং ১৯২৪ সালে ‘খানবাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত হন। এ ছাড়া তিনি বিহারের মতিহারিতে জায়গিরও (রাষ্ট্র কর্তৃক বন্দোবস্তকৃত ভূমি) লাভ করেন। হেমচন্দ্র বসুও একই সমতুল্য ‘রায় সাহেব’ ও ‘রায় বাহাদুর’ উপাধি লাভ করেন। পাশাপাশি দুজনই ৫ হাজার রুপি করে অর্থ পুরস্কারও পান। ২০০১ সালে কলিন বিভানের আঙুলের ছাপবিষয়ক একটি বই এবং ২০০৫ সালে কারেন্ট সায়েন্স জার্নালে আজিজুল-হেমচন্দ্রকে নিয়ে বিশেষ প্রবন্ধ প্রকাশিত হলে তাঁদের বিষয়ে বিশ্বব্যাপী নতুন করে আগ্রহের সৃষ্টি হয়। বর্তমানে ব্রিটেনের ফিঙ্গারপ্রিন্ট ডিভিশনে ‘হক অ্যান্ড বোস অ্যাওয়ার্ড’ নামে বিশেষ একটি পুরস্কারও প্রচলিত রয়েছে, যার মাধ্যমে আঙুলের ছাপ নিয়ে কাজ করে চলা উদ্ভাবনী ব্যক্তিদের পুরস্কৃত করা হয়।
একজন বিশিষ্ট পুলিশ অফিসার হিসেবে আজিজুলের সামনে ছিল নিজের কর্মস্থল নিজেই বেছে নেওয়ার সুযোগ। ১৯১২ সালে বিহার বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার পর তিনি বিহার পুলিশ সার্ভিসকে পছন্দ করেন নিজের কর্মস্থল হিসেবে। সেখানেই কাজ চালিয়ে যান তিনি এবং অবসর গ্রহণের পর বিহারের মতিহারিতে স্থায়ী হন। ১৯৩৫ সালে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন এবং সেখানেই তাঁকে চিরশায়িত করা হয়।