ঐকমত্যের পথে বাংলাদেশের রাজনীতি
১০ এপ্রিল ২০২৫ ১২:৫৩
॥ ফারাহ মাসুম ॥
ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক শক্তির পুনরুত্থানের চেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতে ঐক্যের উদ্যোগ ও রাজনীতি আবারো গতি পেতে শুরু করেছে। সরকারের ঐকমত্য কমিশন নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো যেসব সংস্কারে একমত, সেসব বিষয়ে ঐক্যসূত্র বের করে সংস্কারের অগ্রাধিকার তালিকা করতে চাইছে। অন্যদিকে ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক শক্তির পুনরুত্থানের বেপরোয়া প্রচেষ্টার প্রেক্ষিতে কর্তৃত্ববাদ ও আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধের দেশপ্রেমিকদের ঐক্যের জন্য কাজ হচ্ছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশনায়। এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে। ক’দিন আগেও ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি ও দোষারোপ দেখা গিয়েছিল, সেটি এখন আর দেখা যাচ্ছে না।
সংস্কারে ঐক্যসূত্রের সন্ধান
প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কার ও নির্বাচন ইস্যুতে কোনো কিছুই চাপিয়ে দিতে চাইছে না। এ সরকার একদিকে লুটেরা ফ্যাসিবাদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স দেখাচ্ছে; অন্যদিকে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে যাতে সংস্কার ও নির্বাচনের পথে অগ্রসর হতে পারে, তার জন্য কাজ করছে। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূস ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে যাতে তত্ত্বাবধান করতে পারেন, তার জন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রধানের দায়িত্ব নিজ হাতে রেখেছেন। আর ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে এর সমন্বয় করছেন সংবিধান বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ। সবগুলো সংস্কার কমিশনের প্রধানকে এর সদস্য করা হয়েছে- যাতে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ ও আলোচনায় যুক্ত থেকে তারা অবদান রাখতে পারেন।
জানা গেছে, রাজনৈতিক শক্তি ঐক্যের বিষয়ে ঐকমত্য কমিশন বেশ পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হতে চাইছে। এ লক্ষ্যে তারা একটি প্রশ্নমালা তৈরি করে রাজনৈতিক দলগুলোকে দিয়েছে, যেখানে মৌলিক ইস্যুগুলোয় একমত, দ্বিমত, আংশিক একমত হওয়ার ঘর রেখে এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য মন্তব্য ঘর রাখা হয়েছে। প্রধান প্রধান দলগুলো কোনো ইস্যুতে একমত হলে সেগুলো বাস্তবায়নের তালিকার শীর্ষে রাখা হবে। আর কেউ একমত, আবার কেউ আংশিক একমত হলে সে ইস্যুতে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর সাথে আলোচনা করে ঐকমত্যে পৌঁছার চেষ্টা করা হবে। এই ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার উপসংহারে জুলাই সনদ ঘোষণা প্রকাশ করা হবে, যার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন শুরু হবে সংস্কারের। ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমঝোতার এ দলিল চলতি বছরের ১৫ জুলাই জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সমাপ্ত করতে চায় কমিশন।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক আলী রীয়াজ এ প্রসঙ্গে বলেছেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য একটি রোডম্যাপ তৈরি করা তাদের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। তিনি উল্লেখ করেন, স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে এই প্রথম আমরা রাষ্ট্রীয় সংস্কারের পথ তৈরি করার সুযোগ পেয়েছি। এটা সম্ভব হয়েছে এদেশের গণমানুষের সংগ্রামের কারণে। আমরা এ সময়ের মধ্যে আমাদের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নিয়েছি। সব স্টেকহোল্ডারের সাথে অব্যাহত আলোচনার মাধ্যমে আমরা একটি জাতীয় সনদ প্রণয়ন করতে পারার বিষয়ে আশাবাদী। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে উল্লেখ করে অধ্যাপক রীয়াজ বলেন, আগামী নির্বাচন যাতে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়, সেজন্য ঐকমত্য কমিশন যথা সম্ভব ভূমিকা পালন করবে।
কমিশন এ পর্যন্ত ২৯টি রাজনৈতিক দলের সংস্কার মতামত পেয়েছে এবং ছয়টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করেছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ঐকমত্য কমিশন ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ কাজ শুরু করে। কমিশনের পাঁচটি সংস্কার কমিশন- সংবিধান সংস্কার কমিশন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন, নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন এবং দুদক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো চিহ্নিত করেছে। পরে কমিশন একটি স্প্রেডশিট ফরম্যাটে সুপারিশের একটি সেট ৩৮টি রাজনৈতিক দলের কাছে পাঠিয়েছে এবং তাদের ১৩ মার্চের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সুপারিশগুলোর বিষয়ে তাদের নির্দিষ্ট মতামত পাঠাতে বলেছে। ঐকমত্য কমিশন গত ২০ মার্চ রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ শুরু করে এবং মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে প্রথম দফা সংলাপ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
জুলাইয়ের মধ্যে সংস্কারের ঘোষণা প্রকাশ করা হলে পরবর্র্তী ৬ মাসের মধ্যে জরুরি সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের কাজ যথাসম্ভব শেষ করে আনা যেতে পারে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে মে ও জুন মাসের মধ্যে নির্বাচন শেষ করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উপদেষ্টা পরিষদের এক প্রভাবশালী সদস্যের সাথে আলাপ করে জানা যায়, প্রধান উপদেষ্টাসহ প্রায় সব উপদেষ্টা ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে নির্বাচন শেষ করে বিদায় নিতে চান। তারা নীরবে কাজ করে ৮ মাসের মধ্যে একটি স্বস্তিকর জায়গায় দেশকে নিয়ে আসতে পেরেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, যেসব কার্যসূচি মাথায় রেখে উপদেষ্টা পরিষদ কাজ করছে, তাতে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ একটি দৃশ্যমান পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশকে দেখা যাবে।
ঐক্যের জন্য খালেদার আহ্বান ও পদক্ষেপ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দীর্ঘদিন ধরে বিভাজন ও প্রতিহিংসা দ্বারা সংজ্ঞায়িত হয়েছে। যেখানে ক্ষমতায় থাকা একটি দল বিরোধীদের নীরব করতে এবং শাস্তি দিতে চায়- এমন এক প্রতিশোধের চক্র রাজনীতিকে জাতীয় অগ্রগতির প্ল্যাটফর্মের পরিবর্তে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে। এ বিষাক্ত পরিবেশ শুধু অবিশ্বাসই গভীর করেনি, দেশের গণতান্ত্রিক উন্নয়নকেও বাধাগ্রস্ত করেছে। এমন একসময়ে যখন রাজনৈতিক আলোচনা ক্রমশ বৈরিতার আকার ধারণ করছে, তখন লন্ডন থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঐক্যের জন্য নীরবে কাজ করছেন। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি নির্দেশনা দিচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে। সাম্প্রতিক এক ভাষণে তিনি প্রতিহিংসার বাইরে যাওয়ার জন্য বিশেষভাবে আবেদন জানান দেশবাসীকে। এ আবেদন যে শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়- এটি আরও স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্য তার একটি স্বপ্ন, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না।
পর্যবেক্ষকদের মতে, লন্ডন থেকে খালেদার ছয় মিনিটের ভার্চুয়াল বক্তৃতা শুধু তিনি যা বলেছেন তার জন্য নয়, তিনি যা বলেননি তার জন্যও উল্লেখযোগ্য ছিল। চিকিৎসাধীন থাকা সত্ত্বেও এবং ১৭ বছরের রাজনৈতিক নিপীড়ন কারাবাসের পরও তিনি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। তিনি সরাসরি আওয়ামী লীগের কথাও বলেননি। সাবেক ক্ষমতাসীন দল এবং তার নেতারা তাকে ও তার দলকে দুর্বল করার প্রচেষ্টায় কোনো কসরত রাখেনি, তবুও ক্ষোভ বা প্রতিশোধের ডাকে সাড়া দেওয়ার পরিবর্তে, তিনি ঐক্যের বার্তা দিয়ে জনগণের কাছে আবেদন করেছিলেন। এটি তাকে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ থেকে আলাদা করে তোলে, যার বক্তৃতা প্রায়ই বিরোধীদের প্রতি অভিযোগ এবং শত্রুতায় ভরপুর থাকে।
দেখা গেছে, ২০০৯ সালে হাসিনার সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে খালেদার রাজনৈতিক জীবন একটি সিরিজ অপমান ও কষ্টের দ্বারা চিহ্নিত হয়েছে। তাকে জোরপূর্বক ঢাকা সেনানিবাসে তার দীর্ঘদিনের বাসভবন থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। এটি ছিল এমন একটি পর্বÑ যাতে তিনি একটি সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। তখন তার আবেগপূর্ণ আবেদনকে আওয়ামী লীগ নেতারা অসৎ বলে খারিজ করে দিয়েছিলেন। ২০১৩ সালে শত্রুতা আরও তীব্র হয়, যখন খালেদাকে বিএনপির ‘গণতন্ত্রের জন্য মার্চ’ বিক্ষোভে অংশগ্রহণ থেকে শারীরিকভাবে অবরুদ্ধ করা হয়েছিল। রাজনৈতিক দমনের কুখ্যাতি প্রদর্শনে সরকার তার বাসভবনের বাইরে বালুবোঝাই ট্রাক স্থাপন করে নিশ্চিত করে যে, তিনি যেন বাইরে যেতে না পারেন। এটি এমন একটি মুহূর্ত, যা দেশের গণতন্ত্র ধ্বংসে রাষ্ট্রের প্রতীক হিসেবে এসেছিল, যেখানে ভিন্নমতকে কেবল নিরুৎসাহিত করা হয়নি, সক্রিয়ভাবে নীরব করা হয়েছিল।
এতকিছুর পরও রাজনৈতিক বাধায় খালেদার অগ্নিপরীক্ষা থেমে থাকেনি। পরে তাকে দুর্নীতির অভিযোগে কারারুদ্ধ করা হয় এমন পরিস্থিতিতে যে অনেকেই বিশ্বাস করেন সেটি রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল, যখন হাসিনা একই ধরনের অভিযোগের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতা গ্রহণের পর তার বিরুদ্ধে সব মামলা খারিজ করে দেওয়া হয়। এমনকি কারাগারের আড়ালে থেকেও খালেদা উপহাসের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন, হাসিনা তাকে উপহাস করে ‘চোর’ বলে উল্লেখ করেন এবং বার বার তার রাজনৈতিক আন্দোলনকে হেয় করেন। একপর্যায়ে হাসিনা এমনকি খালেদাকে নবনির্মিত পদ্মা সেতুতে ‘নিক্ষেপ’ করার পরামর্শও দিয়েছিলেন, যা একজন প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি বিস্ময়কর মন্তব্য।
এতকিছুর পরও খালেদা জিয়া অতীতের অভিযোগে ফোকাস না করা বেছে নিয়েছেন। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ফ্যাসিবাদী শক্তি ও দেশের শত্রুরা গণঅভ্যুত্থানকে নস্যাৎ করার জন্য কাজ করছে এবং বিএনপি নেতাকর্মীদের বৃহত্তর সংকল্প নিয়ে ঐক্যবদ্ধ ও পুনর্গঠিত হওয়ার জন্য তিনি আহ্বান জানান। তার বার্তা স্পষ্ট ছিল- রাজনীতি করা উচিত উন্নতির জন্য, প্রতিশোধ নয়।
বাংলাদেশে ক্ষমতা এবং রাজনীতি প্রায়ই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে, যারা প্রতিপক্ষের পরিবর্তে শত্রু হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এর ফলে সমাজে গভীরভাবে মেরুকরণ হয়েছে, যেখানে নীতি বিতর্ক ব্যক্তিগত আক্রমণে রূপ নিয়েছে। এ বৈরিতার চক্রে জড়িত হতে খালেদা জিয়ার অস্বীকৃতি একটি ভিন্ন নজির স্থাপন করেছে- যেটি প্রতিশোধের চেয়ে পুনর্মিলনকে অগ্রাধিকার দেয়।
বেগম জিয়া জানেন, ইতিহাস প্রতিহিংসার ওপর ঐক্যের গুরুত্ব সম্পর্কে মূল্যবান পাঠ দেয়। যেসব জাতি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চক্র থেকে মুক্ত হয়েছে, তারা এগিয়ে যেতে এবং পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছে। বর্ণবৈষম্য থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তরণ, স্বৈরাচারের পর চিলির গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন এবং জার্মানির যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্মিলন সবই প্রমাণ করে যে অগ্রগতি সম্ভব যখন নেতারা বিভাজনের বিষয়ে সংলাপ বেছে নেন। স্থিতিস্থাপকতার নিজস্ব ইতিহাসসহ বাংলাদেশের কাছে একই সুযোগ রয়েছে: শাস্তির রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করার এবং গণতান্ত্রিক নীতির ওপর নির্মিত ভবিষ্যৎকে আলিঙ্গন করার।
বিএনপি চেয়ারপাসন মনে করেন, অবশ্যই ঐক্যের অর্থ অতীতের অন্যায় ভুলে যাওয়া বা অন্যায়কে শাস্তিহীন হতে দেওয়া নয়। একটি জাতি শুধুমাত্র তার অতীতের প্রতিশোধ নিয়ে তার ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে না। জবাবদিহি অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে, তবে রাজনৈতিক লাভের জন্য এটিকে অস্ত্রে পরিণত করা উচিত নয়। সত্যিকারের গণতন্ত্র বিকশিত হয় যখন মতপার্থক্য নিয়ে বিতর্ক হয়, চাপা দেওয়া হয় না এবং যখন ন্যায়বিচার এমনভাবে পরিবেশিত হয়, যা জাতিকে বিভক্ত না করে বরং শক্তিশালী করে।
খালেদা জিয়ার প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে যাওয়ার আহ্বান এ গতিশীলতাকে পুনরায় সেট করার একটি সুযোগ সৃষ্টি করে। এ সময়ে প্রশ্ন আসে- দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সবদিক থেকে উপলক্ষে উঠতে ইচ্ছুক কিনা। ঐক্যের এ আহ্বানকে নিছক বাগাড়ম্বর বলে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয় এ কারণে যে, তিনি কথার মধ্যে তার দায়িত্ব পালন শেষ করেননি। এখনো খালেদা জিয়ার একটি আহ্বান তার দলের প্রবীণ নেতাদের কাজ ও সিদ্ধান্তকে শুধু পাল্টে দেয় না। তার দলের সাথে জোটবদ্ধ দলের অনেক নেতা বেগম জিয়ার কথাকে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হিসেবে দেখেন।
কাদা ছোড়াছুড়ির বিদায়!
খালেদা জিয়ার ঐক্যের আহ্বান জানানোর পর বিস্ময়করভাবে ফ্যাসিবাদ বিরোধীদলগুলোর মধ্যে পরস্পরের সমালোচনা ও কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ হয়ে যায়। বেগম জিয়া এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন দেখে যেতে চান, যেখানে দলগুলোর পথ ও কর্মসূচি আলাদা হলেও রাষ্ট্রের স্বার্থ যেখানে, সেখানে সবাই এক সুরে কথা বলবেন। তিনি দলের নেতাদের অন্তর্বর্তী সরকারকে যথাসম্ভব সহযোগিতা দেয়া এবং সীমাছাড়ানো সমালোচনা থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন। তার নির্দেশনা দলের কার্যক্রমকে বেশ পাল্টে দিয়েছে। সরকারের সংস্কার আলোচনায় বিএনপি সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। ঐকমত্য কমিশনের প্রশ্নের জবাব দিয়েছে বিএনপি। সরকারের যেসব কাজে প্রশ্ন সৃষ্টি হচ্ছে সেক্ষেত্রে প্রয়োজনে প্রধান উপদেষ্টার সাথে আলোচনা করে দূরত্ব দূর করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
ফ্যাসিবাদবিরোধী দলগুলোর সাথেও বেগম জিয়া প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী অন্যতম প্রধান দল জামায়াতের সাথেও বিএনপির সর্বোচ্চ পর্যায়ের নতুন করে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার কথা জানা যাচ্ছে। দলটির শীর্ষ দুই নেতা এখন ইউরোপ সফরে রয়েছেন। ব্রাসেলস সফর শেষ করে তারা লন্ডনেও যেতে পারেন। সেখানে তারা অসুস্থ খালেদা জিয়াকে দেখতে যেতে পারেন।
জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার যেমন খালেদা জিয়ার ওপর দৃঢ় আস্থা রাখছেন, তেমনিভাবে বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রধান উপদেষ্টার প্রতি অগাধ আস্থা রয়েছে। তিনি মনে করেন, নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণের পরও প্রফেসর ইউনূসের সেবা বাংলাদেশ উন্নয়ন ও আধিপত্যবাদ প্রভাবমুক্তভাবে স্বাধীন পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি এবং শাসন যাতে জনগণকে সেবা দেয় তা নিশ্চিত করার জন্য প্রফেসর ইউনূস ও বেগম জিয়ার চিন্তার মধ্যে বড় অংশজুড়ে ঐক্য রয়েছে যার সাথে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের চিন্তাভাবনার মিল রয়েছে বলে জানা গেছে।